রাসূল সা. মানবতার মুক্তিদূত


২৫ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪৩

॥ এম গোলাম রহমান ॥
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সা. হলেন বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনি মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। চলছে হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাস। রবি মানে বসন্তকাল, আউয়াল অর্থ প্রথম; রবিউল আউয়াল হলো- প্রথম বসন্ত বা বসন্তের প্রথম মাস। ঋতুরাজ বসন্ত। এমনই এক মোহনীয় প্রতিবেশে জগদ্বাসীর জন্য মানবতার মুক্তির মহান বাণী নিয়ে আসেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অবিসংবাদিত মহামানব হযরত মুহাম্মদ সা.। সঙ্গে নিয়ে আসেন শান্তি, সাম্য, ঐক্য, কল্যাণের সুসংবাদ।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মহান আল্লাহ প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-কে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হিসেবে এ ধরাধামে প্রেরণ করেছেন। মানবচরিত্রের সব উত্তম গুণে গুণান্বিত ছিলেন তিনি। তাঁর সর্বজনীন আদর্শ ও চারিত্রিক গুণাবলি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য ছিল অনন্য আদর্শ। তিনি ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শের অধিকারী। রাসূল সা.-এর চারিত্রিক গুণাবলি এত সুন্দর, পবিত্র ও আকর্ষণীয় ছিল, মক্কার কাফির-মুশরিকরাও তাঁকে অত্যধিক বিশ্বাস ও পছন্দ করত; তাই আল-আমিন ও আস-সাদিক বলে ডাকত।
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহর অনন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি বিশ্বজগতের জন্য বিশেষ রহমতস্বরূপ।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)। রাসূল সা. ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি শুধু দার্শনিকই ছিলেন না; বরং তিনি যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, তা নিজেই এর বাস্তব নমুনা হিসেবে মানবজাতির জন্য পেশ করেছেন। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন আঞ্জাম দিয়েছিলেন অত্যন্ত সুচারুরূপে। রাসূল সা. পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করে পৃথিবীতে অনাগতের জন্যও এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন রেখে গেছেন।
প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা. বিশ্বজাহানে শান্তি প্রতিষ্ঠার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন, সর্বক্ষেত্রে তিনি সফল ব্যক্তিত্ব। বিখ্যাত দার্শনিক জর্জ বার্নার্ড শর ভাষায় বলা যায়, ‘If all the world was to be united under one leader then Muhammad (Sm) would have been the best fitted man to lead the people of various needs dogmas and ideas to peace and happiness.’ অর্থাৎ ‘সমগ্র দুনিয়াটাকে যদি একত্র করে একজনের নেতৃত্বে আনা যেত, তাহলে নানা ধর্মমত, ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তার মানুষকে শান্তি-সুখের পথে পরিচালনার জন্য হযরত মুহাম্মদ সা.ই হবেন সর্বোত্তম যোগ্য নেতা।’ আজ অশান্ত বিশ্বে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, জাতি-গোত্রে হানাহানি সবকিছুর মূলোৎপাটন করে বিশ্বমানবতাকে শান্তির সুশীতল ছায়াতলে আচ্ছাদিত করতে নবী মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যুগে যুগে মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন গোত্রের নিকট মহানায়কদের (নবী-রাসূল) পাঠিয়েছেন, যারা অহির মাধ্যমে মানবজাতির শান্তি নিশ্চিত করতে আমৃত্যু কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নবী ও রাসূলকে বিভিন্ন গোত্রের জন্য বা নির্দিষ্ট এলাকার জন্য প্রেরণ করলেও সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সা.-কে সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী বানিয়ে পাঠিয়েছি।’ (সূরা সাবা : ২৮)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো বলেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এ নবী তোমাদের কাছে সত্যদীন সহকারে এসেছেন, কাজেই তোমরা ঈমান পোষণ কর। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ (সূরা নিসা : ১৭০)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘তিনি আল্লাহ, যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য জীবন ব্যবস্থাসহ পঠিয়েছেন- যেন তিনি এ দীনকে সমস্ত বাতিল শক্তির ওপর বিজয়ী করেন।’ (সূরা ফাতহ : ২৮)।
আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগের পশুসুলভ জীবনাচার, জুলুম, নিপীড়ন-নির্যাতনের সামাজিক অন্যায়-অবিচার ও অত্যাচারের তমসা থেকে বিশ্বমানবতাকে সভ্যতার আলোর দিকে এগিয়ে নিতে রাসূল সা. প্রভাত রবির রঙিন আলোয়, সকালের সূর্যের হাসি হয়ে ঊষার আকাশে উদিত হলেন মানবতার মুক্তিদূত রূপে। তখন চলছিল আইয়্যামে জাহেলিয়াত, মানে অন্ধকার যুগ। অজ্ঞানতা, মূর্খতা, কুসংস্কার ও পাপাচারে নিমজ্জিত ছিল জাজিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপ। এ সময় জ্ঞানের আলো ও মুক্তির বাণী নিয়ে পৃথিবীতে আসেন মানবতার মহান বন্ধু হযরত মুহাম্মদ সা.।
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. বিভিন্ন নামে পরিচিত। তিনি মুহাম্মদ, আহমাদ, আল-আমিন, আস-সাদিক, রাহমাতুল্লিল আলামিন ইত্যাদি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন, ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদিগকে যাহা বিপন্ন করে, তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনি বলুন, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ বা মাবুদ নাই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি’।’ (সূরা আত-তাওবা : ১২৮-১২৯)।
চিরপ্রশংসিত ‘মুহাম্মদ’ তাঁর নাম। মুহাম্মদ নামটি পবিত্র কুরআনে রয়েছে চারবার। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মুহাম্মদ সা. একজন রাসূল; তাঁর আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন। সুতরাং যদি তিনি ইন্তেকাল করেন অথবা শাহাদাতবরণ করেন, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না; বরং আল্লাহ শিগগিরই কৃতজ্ঞদিগকে পুরস্কৃত করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘মুহাম্মদ সা. তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আহযাব : ৪০)।
বিশ্বব্যাপী সেরা নাম ‘মুহাম্মদ’। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রিয়নবী সা.-এর আলোচনা সমুন্নত করে দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আর আমি আপনার স্মরণ ও আলোচনা উন্নত করেছি।’ (সূরা ইনশিরাহ : ৪)। তিনি আহমাদ, অর্থাৎ সর্বাধিক প্রশংসাকারী। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যখন ঈসা ইবনে মারিয়াম বললেন, ‘হে বনি ইসরাইল! নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসূল তোমাদের প্রতি প্রেরিত; সত্যায়নকারী- তোমাদের মাঝে তাওরাতের যেটুকু রয়েছে, তার এবং সুসংবাদদাতা এমন এক রাসূলের, যিনি আমার পরে আগমন করবেন; তাঁর নাম আহমাদ’।” (সূরা সফ : ৬)। যিনি প্রশংসা করবেন, তিনি প্রশংসিত হবেন।
মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ সা. সকলের জন্যই সর্বোত্তম আদর্শ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, তোমাদের জন্য রাসূল সা.-এর আদর্শই সর্বোত্তম আদর্শ। রবিউল আউয়াল মাসের আগমনের সাথে সাথে সর্বত্র রাসূল সা. সম্পর্কে আলোচনার মাহফিল শুরু হয়। রাসূল সা.-এর আদর্শে নতুন করে পথ চলার শপথ গ্রহণ করে উম্মতরা। কিন্তু রবিউল আউয়াল মাস চলে গেলে শপথের কথা আমরা অনেকেই ভুলে যাই। দুনিয়াব্যাপী চলছে সীমাহীন শোষণ ও নিপীড়ন। সর্বত্র জ্বলছে অশান্তির আগুন। তাই নতুন করে শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তুলতে রাসূল সা.-এর আদর্শের বিকল্প নেই।
বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সূরা আহযাব : ২১)। রাসূল সা. নিজেও এ ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে- হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আমি মহৎ গুণাবলির পূর্ণতা দিতে প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমাদ)। রাসূল সা. আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার জগৎকে শোভায়-সৌন্দর্যে কুসুমিত করেছেন। বিপথগামী মানুষকে হেদায়াতের পথে, এক আল্লাহর পথে পরিচালিত করেছেন। সেই নবীর উম্মত আমরা। শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত। প্রিয়নবী সা.-এর আদর্শও তেমনি শ্রেষ্ঠ। তাঁর জীবনও ছিল উত্তম আদর্শের নমুনা। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উত্তম আদর্শের মডেল। তাঁর জীবনাচরণ ছিল সুষমা আর সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ।
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। কেন তিনি অনুসরণীয় আদর্শ হবেন? সেই সার্টিফিকেট দিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা। কেননা মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা রাসূলের সুমহান চরিত্রের ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে, ‘নিশ্চয়ই আপনি সচ্চরিত্রের মহান আদর্শের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা আল-কলম : ৪)। মুহাম্মদ রাসূল সা. ছিলেন আল্লাহর বাণী পবিত্র আল কুরআনেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। হযরত আয়েশা রা.-এর বক্তব্য থেকেই তা সুস্পষ্ট। সাহাবায়ে কেরাম উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-কে রাসূল সা.-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তোমরা কি কুরআন পাঠ করোনি? জেনে রাখো! পুরো কুরআনই হলো রাসূল সা.-এর চরিত্র। অর্থাৎ তিনি ছিলেন আল কুরআনের বাস্তব নমুনা।’ (মুসনাদে আহমাদ)।
প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা. ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তাঁর জীবন ছিল মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁর চরিত্রে ছিল সব ধরনের উত্তম গুণের সমাবেশ। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী, দয়ালু, ক্ষমাশীল, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ এবং আমানতদার। তাঁর চরিত্রে কোনোরকম অহংকার, মিথ্যাচার, কপটতা বা অন্য কোনো মন্দগুণ ছিল না। তিনি সর্বদা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দিতেন এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকতে বলতেন। প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা. ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে মুসলিমরা উন্নত চরিত্র গঠন করতে পারে। রাসূল সা.-এর উত্তম চরিত্র মানবসমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণাবলি অর্জন করতে পারে। রাসূল সা.-এর আদর্শ অনুসরণ করে মুসলিমরা তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাজনৈতিক জীবনেও উন্নত চরিত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
রাসূল সা. ছিলেন দয়া-মায়া, ভ্রাতৃত্ব-ভালোবাসা, ক্ষমা-করুণা, ধৈর্য-সাহস, সত্য-সততা, নীতি-ন্যায়নিষ্ঠা সর্বক্ষেত্রেই মহান আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ এক মহামানব। তাই তো তখনকার দিনে তাঁর শক্ররাও ছিল তাঁর অনুরক্ত-ভক্ত। তারাই তাঁকে ডাকত ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী বলে। আজকের যুগে অমুসলিম গবেষক ও চিন্তাবিদরাও তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বলে বিবেচনা করেন, মান্য করেন। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা জীব। সেরা জীব হিসেবেই মূল্যবোধে উজ্জীবিত থাকবে মানুষ। মানুষের মধ্যে থাকবে মানবিক গুণাবলি আর পশুর মধ্যে থাকবে পাশবিকতার বৈশিষ্ট্য- এটাই স্বাভাবিক। উত্তম আচরণের গুরুত্ব ও তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। মানুষ তার উত্তম ব্যবহার, আচরণ ও উত্তম চরিত্র দ্বারা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে করে আলোকিত। কিন্তু আচার, ব্যবহার, শিষ্টাচার শব্দগুলো মহাগ্রন্থের পাতায় থাকলেও আমাদের ব্যক্তি জীবনে এর প্রকাশ, ব্যবহার সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতন। এসবের অনুপস্থিতিতে এর বিরূপ প্রভাব লক্ষণীয়।
আজ বিশ্বব্যাপী সমাজের নানা স্তরে এর ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফলে দিন দিন অবক্ষয়ের পথে ধাবিত হচ্ছে মানবসমাজ। মানুষের আচরণ নিয়ে, মানুষের অনৈতিক আচরণ নিয়ে ইসলামপন্থীরা আজ বড়ই উদ্বিগ্ন। সমাজচিন্তকরা বড়ই হতাশ। মানুষের শিষ্টাচার, আচার-আচরণের মতো অভ্যাসগুলো ছোটকাল থেকেই রপ্ত করতে হয়ে। পারিবারিকভাবে চর্চা করেই লাভ করতে হয়। সমাজ থেকে শিখতে হয়ে। মানুষের জীবনে যেসব ভুলত্রুটি বা মতপার্থক্য দেখা দেয়, সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা দেয় ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ক্ষমা করো এবং সহনশীল হও। আল্লাহ ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন।’ (সূরা নূর : ২২)। মহানবী সা. পারিবারিক কাজে সাহায্য করতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বোঝাপড়া ও দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে সৌহার্দ্য বজায় থাকে।
জীবনে যেকোনো সমস্যায় শান্ত ও ধৈর্যশীল মনোভাব প্রদর্শন করার শিক্ষাই ইসলাম প্রদান করে। ধৈর্যের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কগুলো আরো মজবুত হয় এবং অসন্তোষ বা বিভেদ দূর করা সম্ভব হয়। নরম স্বভাব ও স্নেহপ্রবণ আচরণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। মহানবী সা. বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি উত্তম।’ (তিরমিযী)। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতা, শিষ্টাচার এবং আন্তরিকতার শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ছোট-খাটো বিরোধ এড়িয়ে চলা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর প্রতি গুরুত্ব দেয় ইসলাম। কুরআন ও হাদিসে বারবার উত্তম আচরণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার এবং বিবাদ-কলহ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পারস্পরিক পরামর্শের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহপাক বলেন, ‘তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো এবং তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)। প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শের আলোকে উত্তম আচরণের আদবই হলো মানবজীবনের মূল লক্ষ্য। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব হযরত মুহাম্মদ সা.-কে ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে একমাত্র তাঁর অনুকরণ-অনুসরণই দিতে পারে মুক্তির দিশা। স্বমহিমায় উজ্জ্বল বিশ্বশান্তির রোলমডেল এই বিশ্বমানবের আগমন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে অনুকরণ-অনুসরণ করে চলছে তাঁর জীবনাচার ও অনুপম মহান আদর্শ। সব মানুষের হৃদয়ে তিনি জ্যোতির্ময় চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন অনন্তকাল।
সর্বোপরি ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মানুষের সঙ্গে চলাফেরার ক্ষেত্রে প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শের আলোকে উত্তম আচরণ ও শিষ্টাচারগুলো মেনে চললে ইহকালে শান্তি ও পরকালে মুক্তি মিলবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে রাসূল সা.-এর অনুসরণ এবং অনুকরণের মাধ্যমে ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।