হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে না দিল্লি
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:২৪
॥ জামশেদ মেহদী ॥
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ঝুলে গেছে। বাংলাদেশের তরফ থেকে এ কথা স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে, আলোচ্য সফর স্থগিত হয়েছে। কিন্তু কলকাতার আনন্দবাজার গত ২১ আগস্ট খবর দিয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর উপলক্ষে দিল্লিতে যেসব হোটেলের রুম বুক করা হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো এই যে, অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার এক ঘণ্টা পর খবরটি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু পরদিন ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর রিপোর্টে বলা হয়, উক্ত খবরের আকস্মিক প্রত্যাহারের ফলে তারেক রহমানের প্রস্তাবিত সফর নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে। ঐ খবরে আরো বলা হয় যে, তারেক রহমান ভারতে আসছেন কিনা সেই সম্পর্কে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত ভারত এখনো দেয়নি।
গত ২১ আগস্ট শুক্রবার দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ভবনে যে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার রিহার্সেল হওয়ার কথা ছিল, সেটি আর হচ্ছে না।’ এক ঘণ্টারও কম সময়ে এই বিবৃতিও প্রত্যাহার করা হয়।
ভারতীয় পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ এক খবরে বলা হয় যে, অন্যান্য দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান যখন ভারত সফর করেন, তখন রাষ্ট্রপতি ভবনে তাকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং রাতে নৈশভোজ দেওয়া হয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক ট্র্যাডিশন হিসেবে চলে আসছে। যেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, সেখানে অংশগ্রহণ করে সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখা, বাজানো হয় জাতীয় সঙ্গীত এবং অতিথিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। এটি করার জন্য একদিন আগে ফুলড্রেস রিহার্সেল করা হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে আরো বলা হয় যে, তারেক রহমানের সফরের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্ভবত রাষ্ট্রপতির অফিস অথবা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অফিস অবহিত ছিল না। গত ২১ আগস্টেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন যে, এ সম্পর্কে আমার কাছে নতুন কোনো তথ্য নেই। যদি কোনো আপডেট থাকে, তাহলে আমি আপনাদের জানাবো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিককে বলেন, ‘এই সফর সম্পর্কে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।’ পক্ষান্তরে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি বলেন যে, ‘হাসিনা এবং অন্য পলাতকদের প্রত্যর্পণের ব্যাপারে ভারতের কোনো জবাব আমরা এখনো পাইনি’।
তারেক রহমানের সাথে প্রথম সাক্ষাতের পর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে এই কথাটি জানাতে বলেছেন যে, ‘তাকে (তারেক রহমান) ঐতিহাসিক সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এই সংবর্ধনা হবে অবিস্মরণীয়।’
এরপর ৩ দিন পার হয়েছে। এর মধ্যে ২১ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভারতের ইকোনমিক টাইমস আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘যেকোনো সম্পর্ক কার্যকর রাখতে হলে তা পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বাংলা-ভারত সম্পর্কের পটভূমিকায় তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ঢাকার দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জয়শঙ্কর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, “আমি আপনাকে যা বলতে পারি, তা হলোÑ যেকোনো সম্পর্ক কার্যকর হতে হলে তাকে ‘পারস্পরিক স্বার্থের’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সম্পর্কটি আমাদের জন্যও কল্যাণকর হতে হবে।”
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার প্রতিবেশীরা কেবল আমার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবেÑ এমন প্রত্যাশা আমি করি না। আমি যেমন আশা করি, তারা আমার স্বার্থের বিষয়টি উপলব্ধি করবে ও সম্মান জানাবে, তেমনি তাদের স্বার্থ বোঝার ও সম্মান জানানোর ক্ষেত্রেও আমার দিক থেকে একটি যুক্তিযুক্ত ভারসাম্য থাকতে হবে।’ জয়শঙ্কর আরও বলেন, যখন একটি সমঝোতার জায়গা বা ঐকমত্যের ভিত্তি তৈরি হয়, তখনই সম্পর্কগুলো সুন্দরভাবে এগিয়ে যায়। তিনি বলেন, যেকোনো দ্বিপক্ষীয় গভীর সম্পর্কের মূলে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই জয়শঙ্করের এই মন্তব্য এলো। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই সফরের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে উভয় পক্ষই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এস জয়শঙ্করের এমন অস্পষ্ট কিন্তু ইঙ্গিতময় মন্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশ কাজ করছে। দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে সরকারপ্রধানের সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে এস জয়শঙ্করের বক্তব্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন হুমায়ুন কবির।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করাই তার অন্যতম দায়িত্ব। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হবে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে।
এতক্ষণ ধরে ওপরে যা বলা হলো, সেগুলো হলো কূটনীতির পরিভাষা। কিন্তু আসল বিষয়টি কেউই খোলাসা করে বলছেন না। জয়শঙ্কর বলেছেন, সম্পর্ক হয় পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। আর হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘কূটনীতিতে ভারসমাস্য রক্ষা করাই নাকি তার অন্যতম দায়িত্ব।’
তাহলে বাংলাদেশ যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলেছে, তার কী হলো? বাংলাদেশ তো আরো দাবি করেছে যে, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য শেখ হাসিনা এবং তার পলাতক দলবলের প্রত্যর্পণ ত্বরান্বিত করতে হবে। বাংলাদেশ আরো দাবি করেছে যে, শহীদ ওসমান হাদির ঘাতকরা ভারতে রয়েছে। তাদের প্রত্যর্পণ করতে হবে। বলা যেতে পারে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের পূর্বশর্ত ছিলো এই দুটি। অর্থাৎ শেখ হাসিনা ও তার পলাতক দলবলের দ্রুত প্রত্যর্পণ এবং শহীদ হাদির খুনিদের অবিলম্বে বাংলাদেশের কাছে হ্যান্ডওভার করা ছিলো পরোক্ষভাবে সফরে পূর্বশর্ত। এখন যে জয়শঙ্কর বলছেন, পারস্পরিক স্বার্থের কথা এবং হুমায়ুন কবির যে বলছেন, তারা সফরের জন্য কাজ করছেন, তার মধ্যে কি হাসিনা এবং হাদির খুনিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি আছে? এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারতের সাথে আমাদের অনিষ্পন্ন আরো অনেক ইস্যু রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আগামী ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাওয়া ৩০ বছরের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন বা নতুন চুক্তি করা, তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে একটি ফয়সালা করা, সীমান্তে ভাতীয় বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করা ইত্যাদি। তবে এসব ইস্যু প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পূর্বশর্ত ছিলো না। বরং সফরকালে দুই দেশের শীর্ষনেতারা টেবিলে এসব আলোচনা করতে পারতেন। কিন্তু হাসিনা ও হাদি ইস্যুতে দুই শীর্ষনেতার টেবিল আলোচনায় কোনো ফয়সালা হবে না। বরং এ সম্পর্কে তাদের নিচের লেভেলে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে, যেটি শীর্ষ বৈঠকে এন্ডোর্সড (অনুমোদিত) হবে।
কিন্তু এই দুটি আশু এবং জ¦লন্ত ইস্যুর ফয়সালার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে ভারত। হাসিনার প্রশ্নে এখন নতুন সুরে গান ধরেছে ভারত। বলছে যে, হাসিনা তো ভারতে বন্দি নন। অথবা ভারত তো হাসিনাকে আনেনি। হাসিনা ভারতে আসতে চেয়েছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। তাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজেদের সামরিক বিমানে যথাযোগ্য প্রটোকল দিয়ে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর ভারতও প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রটোকল দিয়ে হিন্দন বিমানবন্দরে ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাকে রিসিভ করেছেন।
বাংলাদেশের আদালত হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর জন্য তো ভারত তাকে বাংলাদেশে পাঠাতে পারে না। ভারতীয় আদালত দেখবে, বাংলাদেশে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হয়েছে কিনা। এই বিষয়টি ভারতীয় আদালতে পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশকে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কিত মামলার সমস্ত কাগজ ভারতে পাঠাতে হবে।
হাসিনা সম্পর্কে ভারতের এই সর্বশেষ অবস্থানের পর এ ব্যাপারে ভারতের সাথে আলোচনার আর কোনো অবকাশ আছে বলে মানুষ মনে করে না। বাংলাদেশের আদালতের নথিপত্র পরীক্ষা করার অথরিটি ভারতকে কে দিলো? এর ফলে বাংলাদেশের আদালতকে কি ভারত চ্যালেঞ্জ করলো না?
শহীদ হাদির খুনিদের ব্যাপারে ভারতের সর্বশেষ অবস্থান হলো এই যে, তাদের ইতোমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারতীয় আদালতে মামলা করা হয়েছে। এই মামলার ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়।
ভারতে অনুপ্রবেশ মামলা সম্পর্কে বাংলাদেশের রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে ৮ বছর আগে মেঘালয়ের শিলংয়ে রাস্তায় উ™£ান্তভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। অতঃপর তিনি গ্রেফতার হন এবং তার বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হয়। সেই মামলার ফয়সালা হতে সময় লাগে ৬ বছর। হাদির খুনিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা শেষ হবে কত বছরে?
এভাবে হাসিনা এবং হাদির ব্যাপারে ভারত যা করছে, সেটা দেখে একজন কানাও বুঝতে পারে যে ভারত এ ব্যাপারে শুধুমাত্র সময়ক্ষেপণ করছে। ভারতের এসব চাণক্য বা কৌটিল্যের প্যাঁচ এই জামানায় আর খাটে না। বাংলাদেশের সচেতন মানুষ এই প্যাঁচ ধরে ফেলেছে।
এখন মানুষের প্রশ্নÑ হাসিনা এবং হাদির ইস্যুতে কি তারেক রহমানের সরকার ব্যাক ট্র্যাক করবে? অর্থাৎ তারা কি পিছু হটবে? হাসিনা এবং হাদির ব্যাপারে এই সরকার যে দুটি শর্ত দিয়েছে, সেই দুটি শর্ত বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এখন যদি বাইরের চাপের কাছে বিএনপি সরকার নতি স্বীকার করে, তাহলে এই সরকার দেশের অভ্যন্তরে জনগণের নিকট থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়বে। বাইরের চাপ সামলানোর জন্য কম্প্রোমাইজ করতে গিয়ে ভেতরের চাপের কাছে কোনো কম্প্রোমাইজ জনগণ মেনে নেবে না। এই সরকারই তো বলেছে, আওয়ামী লীগ একটি মাফিয়া সংগঠন। আর শেখ হাসিনা একজন গণহত্যাকারী মার্ডারার বা খুনি। সুতরাং একটি মাফিয়া সংগঠন এবং একজন সেই সংগঠনের ডনের (হাসিনা) ব্যাপারে কোনোরকম আপস বা পিছু হটা জনগণ বরদাশত করবে না।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com