ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত : অর্থনৈতিক যুদ্ধের হুমকি, হরমুজে নতুন চাপ
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:১৫
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত সামরিক গণ্ডি পেরিয়ে নতুন করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার দিকে যাচ্ছে। তেহরান অভিযোগ করছে, ওয়াশিংটন সামরিক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল না পেয়ে এখন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর পাল্টা জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানি বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনির তেহরান সফর করেছেন। সফরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছে।
সমঝোতা স্মারক মানতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ
গত ২৪ আগস্ট সোমবার তেহরানে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, মার্কিন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত করেছে এবং ওয়াশিংটনের প্রতি নতুন করে অনাস্থা তৈরি করেছে। বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসীম মুনির আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিজের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। এর আগে ওয়াশিংটনের একটি কূটনৈতিক সূত্র আল-জাজিরাকে জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে স্থগিত থাকা আলোচনা পুনরায় শুরুর উদ্যোগ নিতে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানকে তার কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর অনুরোধ করেন।
সামরিক যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মহেব্বি দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমও অব্যাহত আছে। তাসনিম নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে অর্থনৈতিক যুদ্ধে নেমেছে। তার দাবি, সামরিক ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা ও শক্তি এখন সবার কাছে স্পষ্ট। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
‘ইরানের ওপর সৃষ্ট চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই আঘাত করবে’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিকে ব্যঙ্গ করে সতর্ক করেন, ইরানের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের করদাতা ও ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। গালিবাফ বলেন, একটি স্থবির পররাষ্ট্রনীতি স্থবির অর্থনীতি তৈরি করে। তার ভাষায়, ইরানের ওপর প্রয়োগ করা চাপ শেষ পর্যন্ত ‘বুমেরাং’ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই ফিরে আসতে পারে। এর আগে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে মিত্রদেরও যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিকে ‘হতাশার প্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
হরমুজ দিয়ে ‘এক ফোঁটা তেলও নয়’
অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালী কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথ দিয়ে ইরান এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই। তিনি বলেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশ অংশ নিলে বা সহায়তা করলে তেহরান সেটিকে যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে। ইরানের সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেবে বা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করবে, তাদেরও এর দায় নিতে হবে।
নিষেধাজ্ঞাকেও যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছে তেহরান
ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মোহসেন ফারখানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধকে তেহরান শুধু অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে না; এগুলোকে যুদ্ধেরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে চীন, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দিলেও পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। ইউএই, তুরস্ক, ইরাক, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশ মার্কিন চাপের মুখে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করলে তেহরান তাদের অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ফারখানি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে ইরানের নিরাপত্তা নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের প্রভাব বাড়তে পারে।
হরমুজে জাহাজ থেকে সার্ভিস ফি
উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে সার্ভিস ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশন। গত ২৩ আগস্ট রোববারের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাহাজগুলো জ্বালানি, বীমা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার বিনিময়ে এই ফি নেওয়া হবে। ইরানি রিয়াল বা অন্য মুদ্রায় ফি পরিশোধের সুযোগ থাকবে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ঘিরে নতুন কোনো বিধিনিষেধ বা ব্যয় বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেশী দেশগুলোকেও হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে কোনো আরব দেশ সহযোগিতা করলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করেছেন মোহসেন রেজাই। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কথিত অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনের বিকল্প সমুদ্রপথগুলোও ইরানের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। রেজাই আরও জানান, এখন পর্যন্ত ইরান মূলত সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা মার্কিন তেল ও অর্থনৈতিক কোম্পানিগুলোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। ওয়াশিংটন এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বা দেশটিকে সহায়তা করা রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক পরিণতির হুমকি দিয়েছে। বিশেষ করে চীনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বেইজিং বলেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সমাধান করবে না।
হরমুজ নিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। ট্রাম্প সম্প্রতি এই জলপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানোর কথা বলেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি মানচিত্রে হরমুজ প্রণালী ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে হরমুজের বিকল্প জ্বালানি পরিবহনপথ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংযোগ বাড়াতে দুই দেশ ইতোমধ্যে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে পাকিস্তান কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনিরের তেহরান সফরের লক্ষ্য ছিল দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়া। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের উদ্যোগকে তেহরান গুরুত্ব দিচ্ছে। সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সরবরাহ, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক চাপের বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে; অন্যদিকে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ সংঘাত নিরসনে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।