আলোর পেছনে অন্ধকার
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:২৩
জ্বালানি নিরাপত্তাই অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব
॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট আজ আর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং বাণিজ্যকাঠামোর অর্থনৈতিক সুরক্ষার প্রধান বিষয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে অন্ধকারের চেয়েও বড় অন্ধকার হলো অর্থনীতির অভ্যন্তরে জমা হওয়া প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, কর্মসংস্থান না থাকা এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির ভয়াল চাপ।
কারখানা বন্ধ হলে জিডিপি কমে, শিল্প থমকে গেলে রপ্তানি কমে, রপ্তানি কমলে ডলার সংকট বাড়ে, ডলারের ঘাটতিতে জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরিশেষে সার্বিক প্রবৃদ্ধি ধসে পড়ে- এই ভয়াল বৃত্ত থেকে দেশকে বের করে আনাই এখন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু সেটি যেন সরকার কোনোভাবেই করে উঠতে পারছে না।
বাংলাদেশ যদি এই সংকটকে একটি জ্বালানি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তবেই এ অমাবস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে আমাদের কেবল কাগজ-কলমের ‘মেগাওয়াট উৎপাদন সামর্থ্য’ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন একটি নিজস্ব, সাশ্রয়ী, বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং বহিরাগত ধাক্কা সহ্য করতে সক্ষম টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা। কারণ আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপর নামই হলো জ্বালানি নিরাপত্তা।
মেগাওয়াট বিভ্রম ও বাস্তবতার অভিঘাত
একবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও বহুল প্রচারিত সাফল্যের প্রতীক ছিল বিদ্যুৎ খাতের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ। ২০০৯ সালের মাত্র কয়েক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থেকে দেড় দশকে সর্বজনীন বিদ্যুৎ সুবিধার যে মাইলফলক অর্জিত হয়েছে, তা প্রথম দর্শনে এক যুগান্তকারী রূপান্তর। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এ প্রশ্নটি এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে- আমরা কি বাস্তবে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি করতে পেরেছি, নাকি এক ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর আপাত মেগাওয়াটের রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলেছি?
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যানুসারে, তাদের আওতাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯,৬০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। এই বিপুল সামর্থ্যের মধ্যে গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা ১২,৪৭২ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ৮,৪২৩ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েল কেন্দ্র ৫,৬৪১ মেগাওয়াটের মতো বিশাল জায়গা দখল করে আছে। অথচ, খাতায়-কলমে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা থাকার পরও ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে দেশকে স্মরণকালের তীব্রতম বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। দেশের বড় বড় শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত লোডশেডিং, আবাসিক খাতে তীব্র জ্বালানি সংকট এবং কৃষিতে সেচ ব্যাহত হওয়ার মতো নেতিবাচক দৃশ্য আমাদের অর্থনীতিকে এক অনাকাক্সিক্ষত আঁধারে ঢেকে দিচ্ছে।
এই বৈপরীত্যের মূল উৎস লুকিয়ে আছে একটি মৌলিক ধারণাগত ভুলের মধ্যে- ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো’ এবং ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ যে এক বিষয় নয়, তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়া। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মূল যন্ত্র হলেও সেগুলোকে চালু রাখার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে যে গতি দেখিয়েছেন, জ্বালানির বহুমুখী ও টেকসই উৎস গড়ে তুলতে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে এক বিচিত্র পরিস্থিতি- জ্বালানি আছে তো বিদ্যুৎ নেই, আর বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি থাকলেও গ্যাস-কয়লার অভাবে তা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
জ্বালানির এই সংকটকে যদি কেবল বিদ্যুৎ বা গ্যাস না থাকার একটি সাময়িক নাগরিক দুর্ভোগ হিসেবে দেখা হয়, তবে তার অর্থনৈতিক ধ্বংসক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ছোট করে দেখা হবে। জ্বালানি হলো সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি রক্তনালিতে প্রবাহিত মৌলিক অনুঘটক। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার এই চরম বিপর্যয় সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি স্তম্ভ- শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগপ্রবাহ এবং সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে এক সুগভীর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সংকট কেন কাটছে না? নীতিনির্ধারণী ঘাটতি ও অবকাঠামোগত ফাটল
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফসল নয়; এটি বহু বছরের ভুল নীতি, দুর্বল কৌশলগত পরিকল্পনা এবং বৈদেশিক আমদানির ওপর ক্ষতিকর অন্ধ নির্ভরতার এক অনিবার্য পরিণতি। এই সংকটের গভীরে প্রবেশ করলে মূলত চারটি বড় ধরনের স্ট্রাকচারাল ফাটল ফুটে ওঠে।
১. দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের চরম পতন ও আমদানির ফাঁদ
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড ছিল দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস। বিদ্যুৎ খাতের মোট চাহিদার প্রায় ৪১ শতাংশ মেটানো হতো এই গ্যাস দিয়ে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের অভাব ও দেশীয় ক্ষেত্রগুলোয় অনুসন্ধান থমকে থাকায় গত ছয় অর্থবছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭০০ থেকে ১,৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
দেশীয় গ্যাসের এই ক্রমবর্ধমান ঘাটতি মেটাতে সরকার সহজ পথ হিসেবে পছন্দ করে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানিকে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থার অনুসন্ধান না করে সস্তা দেশীয় গ্যাসের জায়গায় অতি-উদ্বায়ী বৈশ্বিক বাজারনির্ভর (LNG) বসানোর সিদ্ধান্তটি একটি মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
২. ভাসমান টার্মিনালনির্ভর অবকাঠামো ও কৌশলগত ঝুঁকি
আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ কেবল ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ-এর ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। এই চরম ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত অদূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়গুলোয়। মহেশখালীর দুটি এফএসআরইউ-এর মধ্যে একটিতে অগ্নিকাণ্ড কিংবা আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির ফলে যখন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তখন গোটা দেশের শিল্প উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ডলার সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিলে আগস্টে পুনরায় এফএসআরইউ বন্ধ রাখতে হয়। দুটি ভাসমান অবকাঠামোর ওপর গোটা দেশের জ্বালানিনির্ভর করা যে কৌশলগতভাবে কতটা বিপজ্জনক ছিল, তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
৩. ভূরাজনীতি ও ডলারের দেউলিয়া চক্র
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ কেবল জাতীয় পলিসির ওপর নির্ভর করছে না, বরং তা আটকা পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, কাতার-ওমানের সরবরাহ সক্ষমতা এবং বিশ্ববাজারে এলএনজি-তেল-কয়লার বাজারদরের ওঠানামা। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ে, আমদানির জন্য অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) প্রয়োজন হয়।
এখানেই তৈরি হয় এক ভয়ংকর ‘নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ’Ñ ডলার সংকটের কারণে সরকার পর্যাপ্ত জ্বালানি কিনতে পারে না; জ্বালানির ঘাটতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, যা শিল্প উৎপাদন বন্ধ করে দেয়; শিল্প উৎপাদন কমলে জাতীয় রপ্তানি আয় কমে যায়; রপ্তানি আয় কমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও সংকুচিত হয়, যা ডলার সংকটকে আরও তীব্রতর করে তোলে।
৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধীরগতি ও পরিকল্পনার বৈপরীত্য
বিশ্বব্যাংক ও বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সারা বিশ্ব যখন সৌর ও বায়ুশক্তির দিকে দ্রুত রূপান্তর ঘটাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে সৌরশক্তির অবদান ৩ শতাংশেরও নিচে (মাত্র ৭৯৭ মেগাওয়াট)। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে যে শ্লথগতি এবং গত দেড় দশকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করেছে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রচ্ছন্ন প্রভাব- উৎপাদন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের বহুমাত্রিক অভিঘাত কীভাবে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলোকে ধ্বংস করছে, তা নিচের ১০টি ধাপে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরিÑ
১. উৎপাদন খাতের প্রাথমিক বিপর্যয় : বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হলে কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি ও বয়লার বন্ধ হয়ে যায়, সরবরাহ-শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং শ্রমঘণ্টা ব্যাহত হয়। লোডশেডিংয়ের ক্ষতি কেবল ‘বিদ্যুৎ না থাকা’র সময়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; একটি সুনির্দিষ্ট উৎপাদন চক্র সচল করতে বিদ্যুৎ আসার পরও অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটে শিল্প খাতে প্রতিদিন প্রায় ২,৩৮৭ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে।
২. মূল্যস্ফীতির নতুন জ্বালানি; কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন : জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অপ্রাপ্তি সরাসরি কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন তৈরি করে। ডিজেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে কিংবা বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ হলে কাঁচামাল পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় এক লাফে বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সঞ্চালিত হয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, যা চাহিদা বৃদ্ধি ছাড়াই মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়।
৩. খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি খাতে ‘দ্বিতীয় দফার অভিঘাত’ : কৃষি খাতের আধুনিকায়ন সরাসরি বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। সেচপাম্প সচল রাখা, সার পরিবহন, ধান মাড়াই এবং কোল্ডস্টোরেজে পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণ সবই জ্বালানিনির্ভর। বিদ্যুৎ সংকটে কোল্ডস্টোরেজ বন্ধ থাকলে কৃষকের সংগৃহীত ফসলের ব্যাপক অপচয় হয়। এর ফলে কৃষক যেমন উৎপাদন ব্যয় ওঠাতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি ভোক্তারা চড়া দামে খাদ্যসামগ্রী কিনতে বাধ্য হয়, যা সরাসরি ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি’ ঘটায়।
৪. বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্যে দ্বিমুখী আঘাত : জ্বালানি সংকট দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যকে এক অভূতপূর্ব চাপের মুখে দাঁড় করিয়েছে। উচ্চ আন্তর্জাতিক মূল্যের কারণে বার্ষিক জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ১.১ শতাংশের সমান। একদিকে জ্বালানি আমদানির জন্য বাড়তি ডলার বের হয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে শিল্পে গ্যাসের ঘাটতির কারণে রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ডলার আসা কমে যাচ্ছে।
৫. তৈরি পোশাক ও রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্ববাজারে যে স্থান বজায় রেখেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল সময়মতো সরবরাহ এবং সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যয়। কিন্তু কারখানায় নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় উদ্যোক্তাদের অতি উচ্চমূল্যে ডিজেল জ্বালিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে ক্রয়াদেশ বা অর্ডার ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিশ্ববাজারে আমাদের বাজার অংশীদারিত্ব বিকল্প প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের লাল সংকেত : দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিকট নতুন মূলধন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ-গ্যাসের নিশ্চয়তা। শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না জেনে নতুন বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এটি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যা শুধু বর্তমান উৎপাদন কমায় না, বরং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ ও সম্ভাবনাকেও নস্যাৎ করে।
৭. ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সুগভীর বিপর্যয় : জ্বালানি সংকটের ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে গেলে নগদ অর্থপ্রবাহ বা ক্যাশ-ফ্লো কমে যায়। তবে বেতন, ব্যাংকের ঋণের কিস্তি, ভাড়া এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের সুযোগ থাকে না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই নগদ অর্থের সংকট ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণখেলাপি বা এনপিএল বাড়িয়ে দেয়। এভাবে এনার্জি ক্রাইসিস ধাপে ধাপে করপোরেট ক্রাইসিস হয়ে দেশের দুর্বল ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন ঝুঁকিসমূহ চাপিয়ে দিচ্ছে।
৮. বাজেট ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দ্বৈত চাপ : সরকারের জন্য এই সংকট এক চরম আর্থিক উভয় সংকট তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। আবার অন্যদিকে শিল্পে উৎপাদন হ্রাস ও বাণিজ্য স্থবির হওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ও ভ্যাট সংগ্রহ কমে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায় হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ভর্তুকির বাড়তি চাপ সরকারকে উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) ছাঁটাই করতে এবং অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য করছে।
৯. সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ‘ডাবল শক’ : জ্বালানি সংকট একই সাথে অর্থনীতির জোগান বা সরবরাহ এবং চাহিদা উভয় দিকেই সমান শক্তিতে আঘাত হানে। সরবরাহ খাতের আঘাত হিসেবে কাঁচামাল ও জ্বালানির অভাবে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। চাহিদা খাতের আঘাত হিসাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বাজারে ভোগ্যপণ্যের সার্বিক চাহিদা ধসে পড়ে। এই দুই চাকার ধাক্কায় সার্বিক জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হয়ে পড়ার ঝুঁকি জোরালো হয়।
১০. চরম ঝুঁকি; স্ট্যাগফ্লেশন ও মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ভীতি হলো ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ এমন এক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি, যেখানে একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির বা নিম্নমুখী থাকে; আর অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়। এমন অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে গেলে ব্যবসায় ঋণপ্রবাহ কমে বিনিয়োগ পুরোপুরি থমকে যায়; আবার সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে মনিটারি পলিসি তার কার্যকারিতা হারায়।
উত্তরণের গতিপথ- সংকট মোকাবিলা থেকে কৌশলগত পরিবর্তন
বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে হলে কেবল সাময়িক তালি মারা বা ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ পলিসি দিয়ে আর কোনো ফল পাওয়া যাবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি আমূল কৌশলগত পরিবর্তন। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি সমন্বিত রূপরেখা নিচে প্রস্তাব করা হলো-
জ্বালানি ক্রয়ে স্বচ্ছতা
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য
১. স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ (০-১ বছর); জরুরি স্থিতিশীলতা : প্রথমত, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর সার্বক্ষণিক তদারকি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে সরবরাহ বিঘ্নহীন রাখা। দ্বিতীয়ত, সঞ্চালন ও বণ্টন লাইনের কারিগরি অবচয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মার্কেটের চরম অনিশ্চয়তা এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে এলএনজি ক্রয়ের স্থায়ী চুক্তি করা।
২. মধ্যমেয়াদি সংস্কার (১-৩ বছর); কাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি : কেবল সমুদ্রের ভাসমান এফএসআরইউ-এর ওপর নির্ভর না করে অতিদ্রুত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন করা। শিল্প কারখানার খালি ছাদে ‘রুপটপ সোলার’ এবং ব্যবহারহীন জমিতে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ শুল্কছাড় ও ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদান করা। বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংস্কার করে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর মতো অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা পর্যালোচনা করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা।
৩. দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর (৩-৫+ বছর); পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি স্বাধীনতা : আগ্রাসী অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধান পরিকল্পনা নিয়ে বঙ্গোপসাগরের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইইজেড) গভীর ও অগভীর সমুদ্রে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের অনুসন্ধান জোরদার করা। আঞ্চলিক জ্বালানি সংযোগ তৈরির অংশ হিসেবে নেপাল ও ভুটানের বিপুল জলবিদ্যুৎ বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে ক্রস-বর্ডার পাওয়ার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে কম খরচে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ আমদানির স্থায়ী নেটওয়ার্ক তৈরি করা। জ্বালানি দক্ষ শিল্পায়ন পরিকল্পনা নিয়ে শিল্প খাতে পুরোনো কম দক্ষতার প্রযুক্তির বদলে উচ্চকার্যক্ষমতার গ্যাস টারবাইন ও ইনভার্টারচালিত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা নিশ্চিত করা।