বাজার নিয়ন্ত্রণে যাবে অলিগার্কদের
১২ আগস্ট ২০২৬ ২০:১৩
বেসরকারি খাতে দেয়া যাবে না : জামায়াতে ইসলামী
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হাতে। এবার সেই ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে সরাসরি যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে। একটি আবেদন পর্যালোচনার পর সরকার এখন পুরো বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের জন্য নীতিমালা তৈরির পথে এগোচ্ছে। সরকারের যুক্তি জ্বালানি সরবরাহকে আরও নিরবচ্ছিন্ন করা, আমদানির উৎস ও অবকাঠামো বাড়ানো এবং সংকটের সময়ে বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে কাজে লাগানো। কিন্তু এর বিপরীতে বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো সরকারি এ উদ্যোগের চরমবিরোধী। তারা বলছে, জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণের নামে বড় কয়েকটি অলিগার্ক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকি ফেলবে। এ উদ্যোগ সফল সরকার ও জনগণ ওই বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে।
বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে চারটি ব্যবসায়িক গ্রুপ সরকারের কাছে আবেদন করেছে। চারটির মধ্যে তিনটি হলো- টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ। এর মধ্যে বসুন্ধরা বাদে বাকি তিনটি কোম্পানি দেশে রিফাইনারি বসিয়ে ক্রুড অয়েল আমদানি করে তা পরিশোধনের মাধ্যমে বিক্রির অনুমতি চেয়েছে। শুধু বসুন্ধরা গ্রুপ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে আবেদন করেছে। সরকারের জ্বালানি বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অফিস আদেশে বিপিসির পরিচালককে (অপারেশন্স) আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সূত্র জানায়, কমিটি ২১ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরই বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির খসড়া নীতিমালা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অপারেশন-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আসিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। একই চিঠিতে বিপিসির চেয়ারম্যানকে ১০ আগস্টের মধ্যে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। নীতিমালা তৈরির কাজ কোন পর্যায়ের রয়েছে, জানতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ নতুন মো. জিয়াউল হকের মোবাইল ফোন নম্বরে গত ১০ আগস্ট দুপুর ১টা পর্যন্ত একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি এ প্রতিবেদকের কল রিসিভ করেননি।
বাজার খুলবে, কিন্তু প্রবেশ করবে কারা?
সরকার জ¦ালানি তেল আমদানি ও বিপণনের বাজার সবার জন্য খুলে দিলেও আদৌ কি এই বাজারের সবার প্রবেশের সুযোগ থাকবে? এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট মহলের। সরকার তড়িঘড়ি করে যে নীতিমালা করতে যাচ্ছে, তাতে বলা হয়েছে, সবার জন্য উন্মুক্ত কিন্তু বাস্তবে কতটি প্রতিষ্ঠান এই বাজারে প্রবেশ করতে পারবে? জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অবকাঠামো তৈরি ব্যয়বহুল। প্রয়োজন গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন, পরিবহন অবকাঠামো এবং বড় অঙ্কের ব্যাংক অর্থায়ন। ফলে ছোট বা মাঝারি প্রতিষ্ঠান কাগজে যোগ্য হলেও বাস্তবে প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে না। এ কারণেই খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থা ভেঙে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পেটের ভেতরে ঢুকে যাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই জ¦ালানি খাত।
৬৮ লাখ টনের বাজার নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্র বিশেষ গোষ্ঠীর
বর্তমানে দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। বিপিসি বছরে গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন পরিশোধিত এবং ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। অর্থাৎ যে বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উদ্যোগে নেওয়া হচ্ছে, সেটি ছোট কোনো পরীক্ষামূলক বাজার নয়। আমদানির পরিমাণ, অবকাঠামো এবং ভোক্তানির্ভরতার কারণে এখানে নীতিগত একটি পরিবর্তনের আর্থিক প্রভাবও অনেক বড়। বিশেষ করে ডিজেলের বাজার গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, পরিবহন, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যবহার থাকায় এই পণ্যের সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।
নীতিমালা প্রণয়নে মাত্র চার দিন সময় কেন?
সরকারি উদ্যোগের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো নীতিমালা প্রণয়নে সময়সীমা। গত ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ১০ আগস্টের মধ্যে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া দিতে নির্দেশ দেয়। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, এত বড় একটি বাজারকাঠামোর নীতিমালা কি এত অল্প সময়ে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব? বেসরকারি আমদানির অনুমতি মানেই শুধু আমদানি লাইসেন্স দেওয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে মজুদ সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, মূল্য নির্ধারণ, বাজারে প্রবেশের শর্ত, ভর্তুকি, কর-শুল্ক, জরুরি মজুদ এবং সংকটকালে সরবরাহের বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিমের মতে, বেসরকারি অংশগ্রহণ বিবেচনা করার আগে নিয়ন্ত্রক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র চার দিন সময় দিয়ে নীতিমালা করতে বলার মধ্যে স্বচ্ছতা ও সুপরিকল্পিত চিন্তার ঘাটতি রয়েছে।
বিপিসির বাজার ভাঙার পর কী হবে?
বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দায়িত্ব মূলত বিপিসির হাতে। রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তেল আমদানি করে এবং এর অধীন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশের বাজারে সরবরাহ করে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি আমদানি শুরু করলে বিপিসির ভূমিকা কী হবে? প্রশ্ন হলোÑ বিপিসি কি তখনো বাজারের প্রধান আমদানিকারক থাকবে, নাকি কৌশলগত মজুদ ও সংকট ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- বিপিসি ও বেসরকারি আমদানিকারকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার নিয়ম কী হবে? যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একই বাজারে ভিন্ন সুবিধা নিয়ে কাজ করে, তাহলে প্রতিযোগিতা বিকৃত হতে পারে। আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি অতিরিক্ত বাজারক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
দাম নির্ধারণ করবে কে?
বেসরকারি খাত প্রবেশ করলে ভোক্তা পর্যায়ের দাম নির্ধারণ হবে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ওঠানামা করে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবহন, বিমা, অর্থায়ন, মজুদ, পরিশোধন ও বিতরণ ব্যয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব খরচের পাশাপাশি মুনাফা যোগ করবে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে- দাম কি সরকার নির্ধারণ করবে, নাকি নির্দিষ্ট ফর্মুলার ভিত্তিতে কোম্পানিগুলো দাম নির্ধারণ করতে পারবে? আর যদি সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে অতিরিক্ত ব্যয় কে বহন করবে? এখানে ভর্তুকির প্রশ্নও চলে আসে।
‘আমদানি’ আর ‘বিপণন’ এক বিষয় নয়
দেশের জ¦ালানি খাত বিশেষজ্ঞদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, আমদানি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর বিপণন নেটওয়ার্ক তৈরি করা কঠিন। বিপিসি ও এর অধীন কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরে ডিপো, পরিবহন ব্যবস্থা, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। একজন নতুন আমদানিকারক জাহাজে তেল আনতে পারলেই যে দেশের বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে তা সরবরাহ করতে পারবে, এমন নয়। আমদানি এবং বাজারজাতকরণ দুই স্তরের সক্ষমতা এককভাবে কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেরই রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ের কোনো প্রতিষ্ঠানের এ সক্ষমতা এখন পর্যন্ত নেই। ফলে আমদানি করতে পারলেও সরবরাহে সমস্যা তৈরি হবে। এতে দেশজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।
সংকটের সময় রাষ্ট্রের হাতে কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে?
জ্বালানি তেলের সংকট হলে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সংকট তৈরি করবে। কারণ যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিংবা বিশ্ববাজারে সরবরাহ বিপর্যয়ের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না। বেসরকারি আমদানিকারকদের কি নির্দিষ্ট পরিমাণ কৌশলগত মজুদ রাখতে হবে? সরকার কি জরুরি অবস্থায় তাদের মজুদ ব্যবহার করার নির্দেশ দিতে পারবে? সংকটের সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি বন্ধ করলে রাষ্ট্রের বিকল্প কী থাকবে? এসব প্রশ্ন দেশবাসীর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রশ্নগুলো শুধু বাণিজ্যিক নয়, এগুলো জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন।
বিরোধীদলের ঘোর আপত্তি
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, সরকারের এই উদ্যোগ ‘সংস্কার নয়, হস্তান্তর’ এবং এর মাধ্যমে বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। গত ৮ আগস্ট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব দাবি জানান। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ চলছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করা হয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর এ উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের দাবি, বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিপণনের সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়ার পরিবর্তে কয়েকটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ জ্বালানি তেল আমদানির জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও শত শত কোটি ডলারের ব্যাংক লাইনের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এই সক্ষমতা আছে হাতেগোনা মাত্র ৩-৪টি শিল্পগোষ্ঠীর।
দলটি আরও দাবি করে, বিপিসিকে ‘অদক্ষ’ ও ‘লোকসানি’ দেখিয়ে বেসরকারীকরণের যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে।
জামায়াতের ভাষ্য, ‘চলমান জ্বালানি সংকটকে বেসরকারীকরণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে দলটি দাবি করে, সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।’
প্রেস ব্রিফিংয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত। তাদের মতে, জ্বালানি তেল প্রতিরক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাত বেসরকারি হাতে গেলে যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এছাড়া জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আইনগত সুরক্ষা খর্ব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি। যারা বেসরকারীকরণের বিরোধিতা করবেন, তাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের কাছে সাতটি প্রশ্নও তুলে ধরেছে জামায়াত। এর মধ্যে রয়েছে, বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের কোনো খসড়া নীতিমালা মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন আছে কি না, থাকলে তা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে কি না, কোন সমীক্ষার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং কোন কোন কোম্পানি এ বিষয়ে আবেদন বা প্রস্তাব দিয়েছে তা প্রকাশ করা হবে কি না।
এছাড়া বেসরকারি আমদানিকারক এলে ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম কে নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নাকি সংশ্লিষ্ট প্রাইভেট কোম্পানি- সে প্রশ্নও তোলে দলটি।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা মুক্তবাজার অর্থনীতি বা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়। তবে জবাবদিহিহীন ও অস্বচ্ছ উপায়ে রাষ্ট্রীয় খাত বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করছে তারা।
জামায়াতের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে
এক. পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুদ ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে। দুই. খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করতে হবে এবং জনসাধারণের মতামত গ্রহণের জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের সুযোগ দিতে হবে। তিন. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানির আয়োজন করতে হবে, যেখানে বিরোধীদল, ক্যাব, সিপিডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন। চার. বেসরকারীকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলককরণ এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য উন্মুক্ত করা। পাঁচ. ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এবং ছয়. জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
এদিকে গত ১০ আগস্ট সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত জরুরি খাতকে কোনো অবস্থাতেই মাফিয়া বা লুটেরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোটার হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে এনসিপি বলেছে, ‘মাফিয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে আঁতাত কিংবা জনগণের সম্পদ নিয়ে যেকোনো গোপন রফা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অবিলম্বে এই আত্মঘাতী বেসরকারীকরণ নীতি ও অপপ্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতেই এই খাতের পূর্ণ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।’ বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা।
এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ জ্বালানি খাতকে চিহ্নিত মাফিয়া ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করার এক গভীর দেশবিরোধী অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে কীভাবে আইনি বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, ঋণ জালিয়াতি, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত একটি বিতর্কিত মাফিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে জাতীয় পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণের চাবি তুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব বর্তমান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিয়ে যেকোনো চক্রান্ত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোরভাবে রুখে দেওয়া হবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোও চায় না বেসরকারি খাতে যাক তেলের বাজার
জ¦ালানি তেলের বাজার বেসরকারি খাতে নেওয়ার সরকারি এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন। সংগঠনটির নেতারা গত ৫ আগস্ট এক জরুরি সভায় বলেন, জ্বালানির মতো স্পর্শকাতর খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে তা সরকারের জন্য আত্মঘাতী এবং দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়ছার হামিদের অভিযোগ, সরকারের ভেতরের একটি সুবিধাবাদী মহল বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ তৈরি করতে চাইছে। এতে দেশের মানুষ মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ এবং অংশীজনের মতামত জরুরি
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নÑ সরকার গত ৬ আগস্ট নির্দেশনা দেয় ১০ আগস্টেও মধ্যে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া দিতে। মাত্র চার দিনে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতের বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করতে বলার মাধ্যমেই বোঝা যায় সরকার চিন্তার অপরিপক্বতা। কোনো এক অজ্ঞাত কারণ সরকার তাড়াহুড়া করছে। অথচ এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবতে হবে শতবার নয়, হাজারবার। বাজার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, জ¦ালানি ব্যবহারকারী, রাজনৈতিকসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেইকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে তার পর সেই আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপে যাওয়া।
সমাধান কী হতে পারে
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়িয়ে নিশ্চিত করা যাবে না। দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা, কৌশলগত মজুদ এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার ওপর নির্ভরতা কমে যাবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনতে হবে না। তাছাড়া কারা আমদানির লাইসেন্স পাবে? কী ধরনের আর্থিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকতে হবে? ন্যূনতম কত দিনের মজুদ রাখতে হবে? মূল্য নির্ধারণের সূত্র কী হবে? ভর্তুকি থাকলে কারা তা পাবে? জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের ক্ষমতা কতটুকু হবে? বাজার কারসাজি বা মজুদদারি কীভাবে ঠেকানো হবে? আমদানি মূল্য, পরিমাণ ও বিক্রয়মূল্যের তথ্য কতটা প্রকাশ করতে হবে? এসবের উত্তর অস্পষ্ট থাকলে বাজার উন্মুক্ত করার উদ্যোগই নতুন সমস্যার জন্ম দেবে। নীমিতালার খসড়া তৈরি হলেও চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিস্তৃত কারিগরি সমীক্ষা, বাজার বিশ্লেষণ এবং অংশীজনের মতামত নেওয়ার পর সিদ্ধান্তে যেতে হবে।
সরকারের যুক্তি ও অবস্থান
বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নিয়ে গত ৮ আগস্ট শনিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মুহাম্মদ আরিফ সাদেক স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা। একইসঙ্গে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে জরুরি বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানো। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের পর নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে। জনস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে চলমান অস্থিরতার মধ্যে এ খাত বেসরকারি অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত করা কতটা বিচক্ষণ হবে- সে প্রশ্নও তোলেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, মাত্র চার দিনে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব। তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিবর্তে জ্বালানি আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা উচিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকদের ওপর বেশি নির্ভরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বড় অলিগার্ক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে।