ভাস্বর সেনাপতি শহীদ আবদুল মালেক
১২ আগস্ট ২০২৬ ২১:০১
॥ আবু হামীম ॥
“বিপ্লবী বীর তেজ শমশীর/ প্রদ্যোত প্রোজ্জ্বল/উঁচু ইতিহাস অনুপ্রেরণার অম্লান অবিচল। /মালেক মালেক শহীদ মালেক/আমাদের সেনাপতি
ঘন দুর্যোগে শত দুর্ভোগে/ নির্ভীক এক/চির অবিকল/ভাস্বর সভাপতি।”- বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ এভাবেই স্মরণ করেছেন এ ভূখণ্ডে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের শহীদদের সেনাপতি আবদুল মালেককে। তিনি ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণ করেছেন। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন ঈমানদার দেশপ্রেমিক, সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক তৈরির কাজকে যারা জীবনের মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তারা প্রতি বছর ১৫ আগস্ট পালন করেন, ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে। ইসলামী ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে জাতিকে আহ্বান জানাচ্ছেন প্রায় শতাব্দীকাল ধরে। কিন্তু আজও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এ দেশে তারা তাদের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ অতিক্রম করছে এমন আশায় বুক বাঁধলেও দিন যত যাচ্ছে প্রত্যাশার পারদ তত নিচে নামছে; যা সত্যি এদেশের মানুষের জন্য এক দুর্ভাগ্য বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকমহল।
ইতিহাসের গতিধারা কখনো সমান্তরাল সরলরেখায় চলে না; তা বাঁক নেয় ত্যাগ, তিতিক্ষা ও বীরোচিত আত্মদানের মধ্য দিয়ে। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অস্তিত্ব সুরক্ষায় যখন ঘুণেধরা ও চরিত্রহীন শিক্ষার রূপরেখা চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত হয়, তখন সত্যের পতাকাবাহীরা নিশ্চুপ বসে থাকতে পারে না। ১৯৬৯ সালের উত্তাল আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মেধাবী ছাত্র তাই গর্জে উঠেছিলেন। তাদের নেতা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবদুল মালেক। তাঁর বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে সেদিন রচেছিলেন স্বীয় বিশ্বাসের লালিত ইশতেহার। শহীদ আবদুল মালেক আজ শুধু একটি নাম নয়, শাশ্বত আদর্শের পক্ষের প্রেরণার বাতিঘর।
শিক্ষা আন্দোলন ও ইসলামী শিক্ষার দাবি
১৯৬৯ সালে নূর খান শিক্ষা কমিশন গঠিত হলে দেশজুড়ে শিক্ষানীতি নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। একটি নৈতিকতাপূর্ণ, চরিত্র গঠনমুখী ও ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে তৎকালীন ছাত্রসমাজ সোচ্চার হয়ে ওঠে। আবদুল মালেক সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে যুক্তির তীক্ষèতায় তুলে ধরেন কেন তৎকালীন পাকিস্তান অঞ্চলের জনগণের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা অনিবার্য।
তিনি স্পষ্টভাষায় উপস্থাপন করেছিলেন- ১. নৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর : বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাধারণ জ্ঞানের সাথে ঐশ্বরিক হেদায়েত ও নৈতিকতার সংমিশ্রণ না ঘটালে শিক্ষা দুর্নীতিবাজ ও অর্থলোভী সমাজ তৈরি করবে। ২. স্বকীয় সংস্কৃতির বিকাশ : আমদানিকৃত কোনো বিজাতীয় দর্শন দিয়ে এ দেশের গণমানুষের সত্যিকারের মেধা ও মননের বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ৩. সর্বজনীন অধিকার : শিক্ষা কেবল একটি এলিট শ্রেণির বিলাসিতা নয়, বরং তা হতে হবে প্রতিটি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনার অনুকূল।
১৫ আগস্টের শাহাদাতের অমর গাঁথা
১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে (টিএসসি) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নিপা) আয়োজিত এই আলোচনা সভার মূল বিষয়বস্তু ছিল ‘নূর খান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ এবং ‘শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি’। উক্ত অনুষ্ঠানে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির অসারতা তুলে ধরে পাকিস্তানের জন্য একটি আদর্শিক ও ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে মাত্র ৫ মিনিটের একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই বক্তব্যের পর আদর্শিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের গুরুতর হামলার শিকার হন এবং পরবর্তীতে ১৫ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে শাহাদাতবরণ করেন।
আবদুল মালেকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আব্দুল মালেক ১৯৪৭ সালের মে মাসে ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের বগুড়া জেলার খোকশাবাড়ী গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশের ধুনট উপজেলার স্থানীয়ভাবে বোঘা গ্রামে) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী মুন্সি মোহাম্মদ আলী এবং মাতা মোছাম্মৎ সাবিরুন নেছা। ছয় ভাই-বোনের পরিবারে তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে কনিষ্ঠ। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনি খোকশাবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গোঁসাইবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, যা তার গ্রামের প্রায় চার মাইল দূরে অবস্থিত। ১৯৬৩ সালে তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় ১১তম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে রাজশাহী বোর্ডে ৪র্থ স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের অফিসিয়াল ওয়েব পেজের সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিদ্যালয় জীবনে শহীদ আবদুল মালেক যুক্তফ্রন্ট ও পরবর্তীতে মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। কলেজ জীবনেও তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ১৯৬৬ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সংগঠনটির ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং একই বছর জুলাই মাসে ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৭-৬৮ সেশনে তিনি পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।’
শাহাদাত- এ তো কোনো পরাজয় নয়, এ হলো সত্যের চূড়ান্ত বিজয়। আবদুল মালেকের তাজা রক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ঘাসকে রঞ্জিত করে এক অমোচনীয় ঐতিহাসিক শিক্ষা দিয়ে গেল: সত্যের ঝান্ডা সমুন্নত রাখতে হলে ত্যাগের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা দেখাতে পিছপা হওয়া যায় না।
শহীদ আবদুল মালেকের মূল দর্শন
শহীদ আবদুল মালেক যে দর্শনের জন্য নিজের তাজা প্রাণ বিলিয়ে দিলেন, সেই ‘ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা’ আসলে কী? আজকের আধুনিক যুগেও কেন এর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য? একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে জ্ঞান অর্জন, চরিত্র গঠন এবং মেধার প্রায়োগিক দক্ষতা। কিন্তু আধুনিক বস্তুবাদের খপ্পরে পড়ে আজকের প্রথাগত শিক্ষা কেবল চাকরি খোঁজার যন্ত্র তৈরি করছে, মানুষ তৈরি করতে পারছে না।
ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তবে দেখতে পাব-
মনোভাব ও নৈতিকতার ভারসাম্য : ইসলামী শিক্ষানীতি কোনো গোঁড়ামি নয়; বরং তা বিজ্ঞান, ইতিহাস, প্রযুক্তি ও গণিত শিক্ষার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট নৈতিক অনুশাসন যুক্ত করে। এটি শিক্ষার্থীকে শেখায় জ্ঞান হলো আল্লাহর নিয়ামত, আর তার সঠিক ব্যবহার সমাজের কল্যাণেই হওয়া উচিত।
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন : ডিগ্রিধারী চোর কিংবা শিক্ষিত দুর্নীতিবাজের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে কেবল আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন অন্তরের ভয় বা তাকওয়া। ইসলামী শিক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে এই বোধ জাগ্রত করে যে, প্রতিটি কাজের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
সামাজিক সমতা ও মানবতা : এই শিক্ষাব্যবস্থা বর্ণ, শ্রেণি বা বংশমর্যাদার ভিত্তিতে বিভেদ ভুলে এক বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানবিক সংহতির বার্তা দেয়।
আবদুল মালেক বুঝতে পেরেছিলেন, একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার শিক্ষাব্যবস্থাকে নীতিহীন করে তোলা। তাই তিনি চেয়েছিলেন এমন এক শিক্ষা রূপরেখা, যা একই সাথে দুনিয়ার অগ্রগতি ও আখিরাতের মুক্তি নিশ্চিত করবে।
বর্তমান সংকট ও তার বার্তার পুনর্মূল্যায়ন
আজকে আমরা যখন চারপাশের সামাজিক অবক্ষয়, কিশোর গ্যাং, শিক্ষকদের প্রতি অশ্রদ্ধা, জ্ঞানচর্চায় অনীহা এবং সর্বগ্রাসী দুর্নীতি দেখি- তখন অনুমিত হয় আবদুল মালেকের সেই আশঙ্কার সত্যতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ মেধাবিকাশের কেন্দ্র না হয়ে দলীয় রাজনীতি, সহিংসতা ও নৈতিক স্খলনের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে। আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে যদি সঠিক আদর্শ তুলে ধরা না যায়, তবে তারা দিশেহারা হয়ে পড়বে। শহীদ আবদুল মালেকের জীবন ও শাহাদাত আমাদের শেখায়-
মেধা ও ঈমানের সমন্বয় : পড়ালেখায় সর্বোচ্চ ভালো ফলাফলের পাশাপাশি অন্তরে ঈমানি তেজ ধরে রাখা সম্ভব।
সহিংসতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ : আবদুল মালেক কখনো অস্ত্র হাতে নেননি; তিনি ছিলেন যুক্তির শক্তিতে বলীয়ান। সত্যের বার্তা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার লেখনী, সুশীল আচরণ ও উদ্দীপনাময় বক্তব্যের মাধ্যমে।
বিপ্লবের মূল শক্তি ত্যাগ : কোনো সত্য ও ন্যায়সংগত আদর্শ আত্মত্যাগ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় না।
আবদুল মালেক ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি নাম নন; তিনি একটি চিরভাস্বর প্রেরণা, এক অবিনাশী পথপ্রদর্শক। ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্টের সেই রক্তঝরা দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিক্ষার রক্তসংক্রান্ত সংস্কার ছাড়া একটি জাতির আত্মিক ও বস্তুগত মুক্তি অসম্ভব।
আজকের তরুণ সমাজকে যদি একটি সমৃদ্ধ, নৈতিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে হয়, তবে আবদুল মালেকের রেখে যাওয়া অধরা স্বপ্ন- একটি পূর্ণাঙ্গ, মেধাভিত্তিক ও ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রামে শরিক হতে হবে। তার শাহাদাতের মাধ্যমে যে মশাল প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তা যুগের পর যুগ পথহারা তরুণদের পথ দেখাবে। রক্তে লেখা সেই অমর ইতিহাস কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়; তা যুগে যুগে উচ্চারিত হবে সত্য, ন্যায় ও ঈমানি চেতনায় অনড় থাকার এক অপরাজেয় ইতিহাস হিসেবে। এদেশের কোটি কোটি ছাত্র-জনতার ভাস্বর সেনাপতি শহীদ হয়ে আবদুল মালেক অমর হয়ে থাকবেন চিরদিন।