বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত
১২ আগস্ট ২০২৬ ২১:০৫
॥ জামশেদ মেহদী ॥
ভারত বাংলাদেশকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলো। গত ১৫ বছর ৭ মাস শেখ হাসিনার সরকার অব্যাহতভাবে ভারতের তাঁবেদারি করায় সে দেশের মনে হয়েছিলো যে, বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তারাই দিল্লির তাঁবেদারি করতে বাধ্য হবে। অবশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও শক্তিসমূহের মধ্যে তারা জামায়াতে ইসলামীকে এর ব্যতিক্রম ধরেছিলো। তাই এখন নয়, সেই বেগম জিয়ার আমল থেকেই তাদের প্রচেষ্টা ছিলো, কোনোভাবেই জামায়াতে ইসলামী যেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে না পারে।
কিন্তু জুলাই বিপ্লব তাদের সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়। এই প্রথম ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রকৃত স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে ভারতের সাথে কথা বলে। ফলে ভারত সরকার জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে টালবাহানা করে। তারা বলে যে, কোনো অনির্বাচিত সরকার নয়, কোনো নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের সাথে ভারত সম্পর্ক করবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনকালে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছিলো। সেই সময় ভারতের প্রায় সমস্ত গণমাধ্যম এমন ভাব দেখায় যে, পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। আর বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারতের সাথে সম্পর্কে দুধ ও মধুর নহর বইবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। তারপর ৬ মাস অতিক্রান্ত হতে চললো। কিন্তু বাংলা-ভারত সম্পর্কের বরফ গলার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এই পর্যায়ে চাণক্য বুদ্ধিতে পরিচালিত ভারত সরকার সেখানে আশ্রিতা শেখ হাসিনাকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করে। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করেছিল। একটি বৈধ আদালত যখন গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন, তখনো ড. ইউনূস সরকার তার প্রত্যর্পণ দাবি করে। কিন্তু ভারত ইউনূস সরকারের কথায় কর্ণপাত করে না। তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে ভারত রাখতে পারে। তবে শর্ত হলো এই যে সেখানে শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশ নিয়ে কোনো কথা না বলেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই কথাতেও তারা কর্ণপাত করে। এর মধ্যে বিগত ২ বছরে শেখ হাসিনা অসংখ্য অডিও বক্তৃতা করেছেন, যেগুলো ভারত এবং বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। বিএনপি সরকারও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতকে চিঠি দেয়। ভারত চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে। কিন্তু তারপর তারা সম্পূর্ণ নিরুত্তর থাকে। ফলে সম্পর্কের বরফ জমাট আকারেই থাকে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দ্বিচারিতার আশ্রয় নেয়। একদিকে তারা বলে যে, তারা বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়; অন্যদিকে তারা শুধু শেখ হাসিনা নয়, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালানোর ‘অনুমতি’ দেয়। এখানে এই অনুমতি বড়চতুর ভাবে দেওয়া হয়। তারা মুখে বলে যে, তারা আওয়ামী লীগের এসব কাজকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। আবার অন্যদিকে আওয়ামী লীগের এসব তৎপরতাকে তারা দেখেও না দেখার ভান করে।
এমন একটি পটভূমিতে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে, তিনি আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সদলবলে ঢাকা আগমন করবেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণের মনোভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। শেখ হাসিনা নিজ থেকে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তিনি দেশে থাকলে তাকে গ্রেফতার করা হতো এবং গণহত্যাসহ অনেক অভিযোগে তার বিচার হতো। কিন্তু তিনি পালিয়ে যান এবং ভারত তাকে হাই প্রটোকল দিয়ে আশ্রয় দেয়।
এর মধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলা করা হয়। তাকে মামলায় হাজির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনও প্রকাশ করা হয়। সুতরাং যখন আওয়ামীপ্রেমীরা বলেন যে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এই বিচার হয়েছে, তাই এই বিচার বৈধ নয়, তখন তারা জ্ঞানপাপীর মতো কথা বলেন। শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে তো কোনো বাধা নেই। তাকে তো কেউ বহিষ্কার করেনি। এখনো শেখ হাসিনা যখন ঘোষণা করেছেন যে, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যেই আসবেন, তখনো সরকার এবং জনগণ তাকে আসতে বাধা দেবেন না। সরকার এবং জনগণের অবস্থান এ ব্যাপারে খুব পরিষ্কার। তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি। তিনি এদেশে এলে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তিনি প্রথমে গ্রেফতার হবেন। এরপর আইন যদি অ্যালাও করে, তাহলে তিনি আপিল করতে পারবেন। আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলবে।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন- এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না। হাসিনার এই ঘোষণা স্রেফ স্ট্যান্টবাজি। এর উদ্দেশ্য দ্বিবিধ। একদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত তার নীরব কর্মীদের চাঙ্গা করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাবলিসিটি পাওয়া। বাংলাদেশের সরকার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল বলেছে যে, ডিসেম্বর কেন? শেখ হাসিনা এখনই আসুন না কেন? আইনত কেউ তাকে বাধা দেবে না। তবে তার আগমন উপলক্ষে জনরোষ কোন দিকে যাবে, সে ব্যাপারে কেউ কোনো আগাম কথা বলতে পারে না।
ডিসেম্বরের মধ্যে আসার ঘোষণায় আর কিছু হোক না হোক, এদেশে কিছু ছদ্মবেশী আওয়ামীপ্রেমী তথা কথিত বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়া কয়েকদিন চায়ের কাপে ঝড় তোলার মতো কিছু খোরাক পেয়েছিলো।
এমন একটি পটভূমিতে ভারত থেকেই ঘোষণা করা হয় যে, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে প্রকাশ্যে প্রেস কনফারেন্স করবেন।’ ভারতের মোদিপন্থী মিডিয়াসমূহ পরবর্তীতে প্রচার করে যে, শেখ হাসিনা সশরীরে প্রেস কনফারেন্সে আসবেন না, তবে অনলাইনে তিনি বক্তব্য রাখবেন। পরবর্তীতে দেখা গেল যে, অনলাইনেও তার কোনো ছবি নেই। অজ্ঞাত স্থান থেকে তিনি অডিওতে বক্তব্য রেখেছেন।
শেখ হাসিনা দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় বক্তৃতা করেছেন ৫ অগাস্ট। তার বেশ কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে এই প্রেস কনফারেন্সের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানিয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার পরিষ্কার ভাষায় বলে যে, শেখ হাসিনার এই প্রেস কনফারেন্স ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে। কিন্তু এবারও ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের এই প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে। তারা এরকম ছেলেভোলানো কথা বলে যে, দিল্লির ঐ ক্লাবটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। ওটা প্রাইভেট। ঐ ব্যাপারে ভারত সরকারের করণীয় কিছু নেই। সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে যার সামান্যতম জ্ঞানও রয়েছে তিনি জানেন যে, শেখ হাসিনার মতো একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে এ ধরনের অপতৎপরতা থেকে বিরত রাখা ভারতের পক্ষে কোনো ব্যাপারই নয়।
বাংলাদেশ সরকারের আগাম বিরোধিতাকে পাত্তা না দিয়ে ভারত হাসিনাকে তাদের মাটিতে প্রকাশ্যে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালানোর পরোক্ষ অনুমতি দেয়।
এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের এই প্রশ্রয়কে যে কঠোর ভাষায় বাংলাদেশ সরকার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়, তেমন কঠোর ভাষা কূটনৈতিক জগতে; বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই ৫০ বছরে দেখা যায়নি।
এবারই প্রথম বাংলাদেশ সরকার কোনোরূপ রাখঢাক না করে জুলাই আন্দোলনকে বলেছে, ‘জুলাই বিপ্লব’। ৫ আগস্টকে বলেছে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত ঐ প্রতিবাদ বিবৃতিতে বলা হয়, On a day when the people of Bangladesh are observing the second anniversary of the July Revolution, this interaction by Sheikh Hasina on the Indian soil stands as an affront to the sovereignty of Bangladesh and a grievous insult to the martyrs of the July Revolution.
বাংলা অনুবাদ : যেদিন বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছেন, সেদিন ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি মারাত্মক অবমাননা। বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, Bangladesh will never be a client State. অর্থাৎ বাংলাদেশ কোনোদিন আর তাঁবেদার রাষ্ট্র হবে না। শেখ হাসিনাকে বলা হয়েছে, Convicted mass murderer Hasina, দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা এবং তার সংগঠনকে বলা হয়েছে, Mafia enterprise, অর্থাৎ মাফিয়া সংগঠন।
ভারতের মাটিতে হাসিনার এই প্রেস কনফারেন্সকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং Grievous insult to the martyrs of the July Revolution, অর্থাৎ জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি মারাত্মক অবমাননা। বিবৃতির শেষে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, হাসিনার এই বক্তব্য বাংলা-ভারত সুসম্পর্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
হাসিনাকে প্রেস কনফারেন্স করার অনুমোদনদানের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতির এমন কঠোর ভাষাকে ওয়াকিবহাল মহল বলছেন, যে দেবতা যে ফুলে তুষ্ট, তাকে সেটিই দেওয়া হয়েছে।
এবারই প্রথম ভারতের টনক নড়েছে। এই বিবৃতির পরদিনই ভারতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন যে, হাসিনার বক্তব্যকে ভারত সরকার অনুমোদন করে না। তার পরদিন বাংলাদেশের ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দেখা করেছেন।
কিন্তু তারপরও বরফ গলেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়াও আরেকটি দাবি তুলেছেন। দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে ভারত সরকারকে প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, তারা যেন অবিলম্বে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির ঘাতকদের প্রত্যর্পণ করে। উল্লেখ্য, শুধুমাত্র ১৪০০ ছাত্র-জনতার ঘাতক হাসিনা এবং তার কয়েক হাজার সাঙ্গ-পাঙ্গই নয়, ওসমান হাদির হত্যাকারীরাও ভারতের মাটিতেই আশ্রয় পেয়েছে।
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের দাবি, যতদিন ভারত শেখ হাসিনা এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গ এবং ওসমান হাদির ঘাতকদের ফিরিয়ে না দেয়, ততদিন পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com