বিএনপি সরকারের ছয় মাস

সংস্কারে উল্টোগতি : দলীয় প্রভাব সর্বত্র


১২ আগস্ট ২০২৬ ২১:১২

প্রতিশ্রুতির খাতা দীর্ঘ : জনগণের জন্য শুধুই অপেক্ষা
॥ ফারাহ মাসুম ॥
ক্ষমতায় আসার ছয় মাস। একটি সরকারের জন্য সময়টি খুব বেশি নয়, আবার একেবারে কমও নয়। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসা কোনো সরকারের ক্ষেত্রে প্রথম ছয় মাসেই জনমনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়- সরকার কী করতে চেয়েছিল এবং আসলে কী করতে পেরেছে?
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, সামাজিক সুরক্ষা, ব্যাংকিং খাত, বাজেট, জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা ও অবকাঠামোয় একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের নিজস্ব হিসাবে প্রথম ৬০ দিনে ৬০টি এবং প্রথম ১০০ দিনে প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটি সরকারের সাফল্য কেবল সিদ্ধান্তের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। কারণ উদ্যোগ হলো শুরু, ফলাফল হলো অর্জন। এই ছয় মাসের মূল্যায়নে তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত- কতটি প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে তা নয়; বরং কতটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবে মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে। এখনকার বাস্তবতা হলো, সংস্কারে উল্টোগতি, দলীয় প্রভাব বিস্তারের ছায়া সর্বত্র, প্রতিশ্রুতির খাতা দীর্ঘ এবং জনগণের জন্য শুধুই অপেক্ষা আর অপেক্ষা।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ফলাফলের পরীক্ষা এখনো সামনে
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে মোটামুটি তিনটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের প্রস্তুতি।
এই তিন স্তরের মধ্যে প্রথমটির কিছু ফল দৃশ্যমান। দ্বিতীয়টির বেশকিছু কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু তৃতীয়টির বড় অংশ এখনো পরীক্ষাধীন। এ কারণেই সরকারের ছয় মাসের পারফরম্যান্সকে এককথায় ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’ বলা কঠিন। বরং বলা যায়, সরকার কাজ শুরু করার কিছুটা সক্ষমতা দেখিয়েছে, বাকিটা মোটামুটি ব্যর্থতা; এখন সেই কাজের আরো ফল দেখানোর পালা।
রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ও ছয় মাসের অর্জন
ছয় মাসে কাঠামো বদলের কিছু উদ্যোগ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বড় পরীক্ষা এখনো সামনে। রাষ্ট্র সংস্কারকে বিএনপি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, একটি নতুন ‘সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে সাংবিধানিক, সংসদীয়, বিচারিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি জবাবদিহি, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর আগে ঘোষিত ৩১ দফায়ও ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কারের কথা ছিল।
ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার গণভোটের রায়কে অকার্যকর করে নিজেদের মতো করে সংস্কার বাস্তবায়নের কথা জানায়। এতে করে সংসদের উচ্চ পরিষদ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ ও ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন, দুদকের সংস্কারসহ অনেকগুলো মৌলিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লাইন হারায়। সরকার দ্রুত কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথম ১০০ দিনে সরকার প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্প গ্রহণ বা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে। একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ৬২ শতাংশ বাস্তবায়নের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো বাস্তব প্রভাব তেমন দৃশ্যমান নয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির দাবি করা হয়েছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, সংসদীয় কার্যক্রম এবং কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার উদ্যোগে। বলা হচ্ছে, আইন প্রণয়নের গতি বেড়েছে; প্রশাসনের শূন্যপদ পূরণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংসদের প্রথম ২৫ কার্যদিবসে ৯৪টি বিল পাসের সরকারি দাবি রয়েছে। তবে আইন কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
দুর্নীতি দমন ও সুশাসন বিএনপির সংস্কার অঙ্গীকারের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। কিন্তু এক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি দৃশ্যমান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে বলেছে, সরকারের কিছু পদক্ষেপ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সুশাসন ও জবাবদিহির প্রত্যাশার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ সংস্কারও বড় অগ্নিপরীক্ষা। প্রথম কয়েক মাসে হত্যাকাণ্ড, মব-সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কারের বদলে শুধু অভিযান দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন টেকসই হবে না।
সার্বিকভাবে ছয় মাসে বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের চিত্রকে বলা যায়, প্রতিশ্রুতি থেকে প্রশাসনিক কর্মপরিকল্পনায় উত্তরণ হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগত রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ। সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো মৌলিক সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়Ñ সেটিই নির্ধারণ করবে বিএনপির ‘নতুন রাষ্ট্রচুক্তি’ কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল, নাকি সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো বদলের সূচনা।
ফ্যামিলি কার্ড : প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতার প্রথম পরীক্ষা
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড বিএনপির অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি। নিম্নআয়ের ও দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তার আওতায় আনার এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি অধিকতর সমন্বিত ব্যবস্থায় যাওয়া। ছয় মাসে এর সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলো পাইলট প্রকল্প।
সরকারের প্রথম ৬০ দিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। এটি অবশ্যই বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নও শুরু। পাইলট থেকে জাতীয় পর্যায়- এই পথটি কত দ্রুত অতিক্রম করা যায়? প্রকৃত দরিদ্ররা তালিকায় কতটা ঢুকছেন? রাজনৈতিক প্রভাব বা স্থানীয় অনিয়ম কতটা ঠেকানো যাচ্ছে? সুবিধাভোগীরা নিয়মিত সহায়তা পাচ্ছেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ? ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে বড় অর্জন হলো প্রতিশ্রুতিকে প্রশাসনিক কাঠামোয় নিয়ে আসা। কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে মানুষের হাতে সুবিধা পৌঁছানোর পর।
বাজারের আগুন : সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
নিত্যপণ্যের দাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ অর্থনীতির পরিসংখ্যানের চেয়ে বাজারের অভিজ্ঞতাই সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের পারফরম্যান্সের সবচেয়ে সরাসরি মাপকাঠি। সরকার দাবি করছে, রমজান ও ঈদে বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়েছে এবং খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সরবরাহ সংকট এড়ানো গেছে।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে- দাম স্থিতিশীল থাকা আর দাম কমে যাওয়া এক বিষয় নয়। একজন নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝার সূচক হলো তার আয় দিয়ে মাসের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতা। তাই সরকারের সাফল্য মাপতে শুধু মূল্যস্ফীতির হার নয়, দেখতে হবে- খাদ্যপণ্যের দাম; মজুরি; নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় এবং পরিবারের মাসিক ব্যয়ের চাপ। বাজারে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় স্থায়ী স্বস্তি এসেছে কি না- এখনো তার চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। বরং অস্বস্তিটাই বেশি দেখা গেছে।
ব্যাংক সংস্কার : ৪০ হাজার কোটি টাকার সিদ্ধান্ত, সামনে বড় প্রশ্ন
ব্যাংকিং খাত বিএনপি সরকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং আমানতকারীর আস্থার সংকট কাটাতে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃমূলধনীকরণ তহবিল গঠন করেছে। এটি বড় সিদ্ধান্ত। কিন্তু বড় সিদ্ধান্ত মানেই বড় সংস্কার নয়।
প্রশ্ন হলোÑ এই অর্থ কার ব্যাংকে যাবে? কী শর্তে যাবে? ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোয় কী পরিবর্তন আসবে? খেলাপি ঋণ আদায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? যারা অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নিয়েছে, তাদের দায় কোথায়? কারণ মূলধন জোগান দিয়ে একটি দুর্বল ব্যাংককে সাময়িকভাবে বাঁচানো যায়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও ঋণ আদায়ের কাঠামো না বদলালে একই সমস্যা আবার ফিরে আসবে। এখানে সরকারের সিদ্ধান্ত বড়; কিন্তু সিদ্ধান্তের ফল এখনো অনিশ্চিত।
কর্মসংস্থান : সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
যুবসমাজের কর্মসংস্থান নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। সরকার জানিয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদ পূরণে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়। শূন্যপদ পূরণ মানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়।
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকটের প্রকৃত সমাধান নির্ভর করবে শিল্প, বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি এবং বেসরকারি খাতে নতুন চাকরি তৈরির ওপর। সরকারি নিয়োগ প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেটি কর্মসংস্থান নীতির পুরো উত্তর নয়। কর্মসংস্থানের মূল জোগান আসে বেসরকারি খাত থেকে। এই খাতে এখনো পরিকল্পনার তুলনায় দৃশ্যমান ফলাফল কম।
আইনশৃঙ্খলা : অভিযান আছে, প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান কত দূর?
সরকারের ১০০ দিনের মূল্যায়নে জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যৌথবাহিনীর তৎপরতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলার স্থায়ী সাফল্য শুধু অভিযান দিয়ে মাপা যায় না। প্রশ্ন হলো- চাঁদাবাজি কমেছে কি? দখলদারিত্ব কমেছে কি? রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশি ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে কি? মব-সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি? সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছে কি?
সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেখা যায়, খুন, লাশ, চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসিদের দৌরাত্ম্য। অভিযান চালানোর কথা বলা হচ্ছে। অভিযান তাৎক্ষণিক ফল দিতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান ছাড়া সেই ফল স্থায়ী হয় না।
প্রশাসন : পুনর্গঠন শুরু, কিন্তু নাগরিকের সেবায় পরিবর্তন কোথায়?
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বিএনপি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। শূন্যপদ পূরণ, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের সাফল্য কাগজে নয়, নাগরিকের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে।
একজন নাগরিকের পাসপোর্ট পেতে কত সময় লাগছে? জমির নামজারি কত দ্রুত হচ্ছে? সরকারি সেবা পেতে কতবার দপ্তরে যেতে হচ্ছে? দুর্নীতির সুযোগ কমছে কি? এই সূচকগুলোতেই প্রশাসনিক সংস্কারের প্রকৃত ফল ধরা পড়বে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো অগ্রগতি সেরকম দৃশ্যমান না।
সংসদ : আইন পাসের গতি বনাম আইনের মান
সরকারের দাবি, সংসদের প্রথম ২৫ কার্যদিবসে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার-সংক্রান্ত ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। সংখ্যাটি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। এই সংখ্যা মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ নির্দিষ্ট সময়ে পাস করার বাধ্যবাধকতার কারণে। সংসদের সাফল্য অবশ্যই শুধু কতটি বিল পাস হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। আইনের মান, সংসদীয় বিতর্ক, বিরোধীদলের ভূমিকা, নাগরিক অধিকার এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা- সবই বিবেচনায় নিতে হবে। এতে দ্রুত আইন প্রণয়নের সক্ষমতা দেখা গেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক মৌলিক সংস্কার পাস না করে অকার্যকর করা হয়েছে। এখন দেখা প্রয়োজন পাস করা আইনের কার্যকারিতা প্রমাণ করা।
অর্থনীতি : স্থিতিশীলতা বনাম পুনরুদ্ধার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট এবং পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন এবং পুনর্গঠন- ৩ আর কৌশল সামনে আনা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজেটের দর্শনে পরিবর্তনের চেষ্টা রয়েছে।
কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত স্বাস্থ্য বোঝা যাবে অন্য জায়গায়- বিনিয়োগে কী হচ্ছে? চাকরি কত তৈরি হচ্ছে? উৎপাদন বাড়ছে কি? রপ্তানি বাড়ছে কি? রাজস্ব আদায় কতটা হচ্ছে? বেসরকারি খাতের আস্থা ফিরছে কি? এই প্রশ্নগুলোয় প্রথম ৬ মাসে অগ্রগতি প্রায় শূন্য, এখন এর উত্তরই দ্বিতীয় ছয় মাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রেমিট্যান্স : অর্থনীতির উজ্জ্বল জানালা
ছয় মাসের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স অন্যতম ইতিবাচক দিক। সরকারের ১০০ দিনের প্রতিবেদনে মার্চে ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬.৫৮ বিলিয়ন ডলার হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো- একটি সূচকের উন্নতিকে পুরো অর্থনীতির উন্নতি হিসেবে দেখা যাবে না। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে সরকারের নীতি যেমন ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি আগের ধারাবাহিকতাও থাকতে পারে।
জ্বালানি : সংকট মোকাবিলার চেষ্টা, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিরাপদ তো?
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ অব্যাহত রাখার দাবি করেছে সরকার। তাৎক্ষণিকভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন আরও গভীর। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। আমদানিনির্ভরতা বেড়েই চলেছে।
দেশীয় গ্যাসের মজুদ কতটা? এলএনজির ওপর নির্ভরতা কতটা বাড়ছে? বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কত? আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কত? আজকের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে অগ্রগতি একবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ ও জাতীয় স্বার্থপরিপন্থী আদানি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে তোন অগ্রগতি নেই। আগামী পাঁচ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও জরুরি। সেক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ঢাকা ও পরিবহন : প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি, বাস্তবের যানজট
এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস, চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থা এবং ঢাকার বাইরে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যৎমুখী। ঢাকার নাগরিকের কাছে প্রযুক্তির নাম নয়, ফলটাই গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো- যাত্রার সময় কি কমবে? বাসে যাতায়াত কি নিরাপদ হবে? গণপরিবহন কি সুশৃঙ্খল হবে? যানজট কি বাস্তবে কমবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে বাস্তবায়নের পর।
পরিবেশ : ২৫ কোটি গাছের লক্ষ্য
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি উচ্চাভিলাষী। কিন্তু পরিবেশের ক্ষেত্রে সংখ্যার রাজনীতি সবচেয়ে বিপজ্জনক। এক কোটি গাছ লাগিয়ে যদি অর্ধেকও না বাঁচে, তাহলে অর্জন কোথায়? তাই ভবিষ্যতে গাছ লাগানোর সংখ্যা নয়, বেঁচে থাকা গাছের হার এবং তার পরিবেশগত প্রভাবই হওয়া উচিত মূল্যায়নের মূল সূচক। অভয়ারণ্যে গাছ উজাড় হওয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। সবকিছু রাজনীতিকরণ ও দখলবাজির প্রভাব এখানেও পড়েছে।
প্রথম ছয় মাস কাজ শুরুর : পরের ছয় মাস ফল দেখানোর
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন যদি একটি বাক্যে বলতে হয়, তা হলো- সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা? সিদ্ধান্তের তুলনায় দৃশ্যমান ফল এখনো কম।
ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ, ৩ আর বাজেট কৌশল, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ডিজিটাল উদ্যোগ- সব মিলিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নতুন কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গাগুলো এখনো অপেক্ষায়- চাকরি, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের আয়। এ কারণেই বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হতে পারে- প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ও কাঠামো তৈরির ছয় মাস; ফলাফল প্রমাণের ছয় মাস এখনো বাকি।
দ্বিতীয় ছয় মাসে সরকারের সামনে তাই পাঁচটি অগ্নিপরীক্ষা- এক. ফ্যামিলি কার্ড কত পরিবারে পৌঁছায়। দুই. মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ে। তিন. ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণে জনগণের অর্থ কতটা সুরক্ষিত থাকে। চার. চাঁদাবাজি, দখল, মব-সহিংসতা ও অপরাধ বাস্তবে কতটা কমে। পাঁচ. সরকারি-বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান কতটা সৃষ্টি হয়।
প্রথম ছয় মাসে সরকার বলতে পারে, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি।’ কিন্তু দ্বিতীয় ছয় মাসে জনগণের প্রশ্ন হবে আরও কঠিন- ‘কাজের ফল কোথায়?’