নিষেধাজ্ঞার খড়গে আফগান তালেবান সরকারের পাঁচ বছর


১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২৮

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
আফগানিস্তানে বর্তমানে ক্ষমতাসীন রয়েছে তালেবান নেতৃত্বাধীন একটি সরকার। বিগত ২০২১ সালের আগস্ট মাসে মার্কিনিদের হটিয়ে ক্ষমতায় আসে তারা। ক্ষমতায় এলেও রাশিয়া ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বসহ কোনো মুসলিম ও মিত্র দেশ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। শুধু তাই নয়, বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও ইরানের সাথেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না তালেবান সরকারের। ইসলামী আমিরাত অব আফগানিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হচ্ছেন আমীর হিবাতুল্লাহ আখুনজাদাহ। কান্দাহারভিত্তিক নেতৃত্ব পরিষদের মাধ্যমে তিনি সমস্ত নীতিগত ও আইনি সিদ্ধান্ত নেন। কোনো নির্বাচনী ব্যবস্থা ছাড়াই বিগত পাঁচ বছর ধরে দেশটি শাসন করে আসছে তালেবানরা। তাদের দাবি, তারা ইসলামী শরীয়াহ আইনের ভিত্তিতে দেশটি পরিচালনা করছেন। দেশটিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাত স্থিতিশীল হলেও বেকারত্ব সমস্যা ও কূটনৈতিক স্বীকৃতি না পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে।
আফগানিস্তান দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ার একটি ব্যতিক্রমী দেশ। স্থলবেষ্টিত এ দেশটির প্রাচীনকাল থেকে অসংখ্য বৈদেশিক আক্রমণ, বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ এবং ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান রয়েছে। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলকে দীর্ঘকাল যাবৎ ‘সাম্রাজ্যবাদীদের কবরস্থান’ এবং ‘প্রাচীন বিশ্বের চৌরাস্তা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। একবাক্যে বলা যায়, বিশ্বের কোনো জাতিই আফগানিদের পরাভূত করতে পারেনি।
আফগানিস্তানের মোট আয়তন ৬ লাখ ৫২ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আফগানিস্তান দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি ভূ-বেষ্টিত মালভূমির ওপর অবস্থিত। দেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই হিন্দুকুশসহ সুউচ্চ পর্বতমালা রয়েছে। উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান, পূর্ব ও দক্ষিণে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান ও উত্তর-পূর্বে চীন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটির চারপাশের দেশগুলোও মুসলিম অধ্যুষিত।
প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ‘আরিয়ানা’ নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পারস্য এবং ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার এটি জয় করেন। সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের মধ্যে আরব বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটে। একাদশ শতকে সুলতান মাহমুদ গজনভী এবং পরবর্তীকালে তৈমুর লং ও মোগল রাজবংশ এই অঞ্চল শাসন করে।
আহমদ শাহ দুররানি আধুনিক আফগানিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশরা তিনবার আক্রমণ করেও আফগানদের কাবু করতে পারেনি। অবশেষে ১৯১৯ সালে তৃতীয় যুদ্ধের পর আফগানিস্তান পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।
১৯৩৩ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজা জহির শাহের ৪০ বছরের শাসনামলে দেশটিতে আপেক্ষিক শান্তি ও আধুনিকায়ন শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দেশটিকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৮ সালের ‘সওর বিপ্লবের’ মাধ্যমে আফগানিস্তানে একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে।
আফগান কমিউনিস্ট সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা পাঠায়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সময়কালে এক দশক ধরে এর বিরুদ্ধে মার্কিন ও পাকিস্তানি সহায়তায় আফগান ‘মুজাহিদিনরা’ গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে, যা সোভিয়েত বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। তারপর ১৯৯৬ সালে তালেবানরা প্রথমবারের মতো ক্ষমতা গ্রহণ করে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের কাবুল দখল
দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধ শেষে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখলের মাধ্যমে তালেবানরা পুনরায় ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর অভিযানে ক্ষমতা হারানোর পর তারা মূলত গেরিলা যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
২০২০ সালে কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তালেবানদের একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরই মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে তাদের সমস্ত সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। বিদেশি সৈন্য চলে যাওয়ার ঘোষণা আফগান সরকারি বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। অপরদিকে তৎকালীন আশরাফ ঘানি সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ জনগণের সংকট সমাধানে সরকারি প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছিল। এসব কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আশরাফ ঘানির সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা লোপ পায়। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগান সামরিক বাহিনী মনোবল হারিয়ে ফেলে। অনেক এলাকায় আফগান সেনারা কোনো প্রতিরোধ না গড়ে সরাসরি তালেবানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। দুর্নীতির কারণে মাসের পর মাস সামরিক বাহিনীর সদস্য বেতন পাচ্ছিল না, যার ফলে তারা যুদ্ধ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অপরদিকে তালেবানরা প্রথমে আফগানিস্তানের গ্রামীণ এলাকা ও সীমান্ত চেকপোস্টগুলো দখল করে। জেলা শহরগুলো একের পর এক দখল করে তারা বড় শহরগুলোকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বে তালেবানরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে আফগান সরকারের সম্পূর্ণ পতন ঘটে এবং তালেবানরা কোনো রক্তপাত ছাড়াই কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতা পুনর্দখল করে। তারপর তালেবানরা পুনরায় ইসলামী আমিরাত সরকার চালু করে।
রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও কাঠামো
আমীর আখুনজাদার নেতৃত্বে একটি পরিষদ আফগানিস্তান শাসন করছে। তবে রাজধানী কাবুলে একজন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে পরিচালিত মন্ত্রিসভা প্রশাসনিক কাজ ও দৈনন্দিন সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে ইসলামিক শরীয়া আইন প্রয়োগ করা হয়। এখানে কোনো স্বতন্ত্র আইনসভা বা সংসদের অস্তিত্ব নেই। দেশটিতে কোনো রাজনৈতিক দল নেই এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল তো থাকারই কথা নয়। বিগত পাঁচ বছর কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাফত আমল থেকে শুরু করে যুগে মুসলিমদের শাসন ব্যবস্থায় শূরা ও পরামর্শ পরিষদ নির্বাচিত ছিল। কিন্তু আফগানিস্তানে তালেবানরা রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় কোনো ভোট ও নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করছে না। তাদেরই প্রতিবেশী দেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে তাদের ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট, বিশেষজ্ঞ পরিষদ সবই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করে থাকে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক সংকটে তালেবান সরকার
বর্তমানে তালেবান শাসনের মূল সংকট হচ্ছে কূটনৈতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে তালেবান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো তারা আফগানিস্তানে একটি কার্যকর De facto authority প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণ স্বীকৃতি না পেলেও দেশের অধিকাংশ ভূখণ্ডে তাদের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ অনেক সময় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এখানেই তালেবান সরকারের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। একটি সরকার দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারলেই আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণ বৈধতা অর্জন করে না। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নির্ভর করে শুধু ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের ওপর নয়; রাষ্ট্রের আচরণ, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা, মানবাধিকার, প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের সার্বিক সহায়তায় ক্ষমতায় এলেও তালেবান সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই ইসলামাবাদের। প্রতিবেশী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথেও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই কাবুলের। শুধু তাই নয়, প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশের কোনো একটি দেশও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং কাবুল মুসলিম বিশ্বের সাথে বৈরী সম্পর্ক ভারতের সাথে দহরম সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তবে চীনের কয়েকটি প্রদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠছে। সেই সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে পৌঁছুতে পারেনি।
অর্থনৈতিক সফলতার পাশাপাশি রয়েছে চ্যালেঞ্জ
আফগানিস্তানের জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ১৭.৮ থেকে ১৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশটির বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১.৬ থেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ প্রায় ৮.৫ থেকে ১১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ইউএনডিপির প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা গেছে, তালেবানরা ক্ষমতা গ্রহণের পর আফগানিস্তানের অর্থনীতি প্রায় ৩০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের গত পাঁচ বছরের শাসনামলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং কুশটেপা খালের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার মতো কিছু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সাহায্য হ্রাস এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের মানবিক সংকট ও দারিদ্র্য বজায় রয়েছে।
দুর্নীতি দমন ও কাস্টমস শুল্ক ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি করায় সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগান মুদ্রা ‘আভাফানি’-এর মান ডলারের বিপরীতে দীর্ঘদিন তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রেখে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য এসেছে।
কৃষিজমি সেচের আওতায় আনতে উত্তর আফগানিস্তানে বিশাল এই সেচ প্রকল্পের কাজ জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে খনিজ ও খনি উত্তোলনে ছোট-বড় বেশকিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২০২২ সালে আফিম চাষ নিষিদ্ধ করায় আন্তর্জাতিকভাবে মাদক উৎপাদন হ্রাসের স্বীকৃতি মিলেছে।
বিদেশি অনুদান ও সাহায্য আটকে থাকায় জনসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউএসএউড ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের মানবিক সহায়তা কমিয়ে দেয়ায় মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের একটি বড় অংশ ভুগছে। ব্যাংকিং খাতের ওপর কড়াকড়ি ও বৈদেশিক সম্পদ অবরুদ্ধ থাকায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্র দেশগুলো আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। বিশেষ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো বেশকিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে তারা। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৮৮ প্রস্তাবের মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরবর্তীতে অন্যান্য সংস্থা ও দেশ এগুলো বাস্তবায়ন করে আফগানিস্তানের অনেক রিজার্ভ ফান্ড আটক করে রেখেছে।
বিরোধী গোষ্ঠীর প্রতিরোধও আছে
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট (এএফএফ) নামে দুটি বিরোধী গোষ্ঠী তালেবান বাহিনীর ওপর সামরিক হামলা ও প্রতিরোধ করছে। এনআরএফ পানশির ও তার আশপাশের অঞ্চলে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংগঠিত করে কিছুটা প্রতিরোধ করে আসছে। অপরদিকে এএফএফ উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে তালেবান ঘাঁটিতে মাঝে মাঝে হামলা করে থাকে। তবে আইএস খোরাসান নামে একটি জঙ্গি গোষ্ঠীও শিয়া ও হাজারা গোষ্ঠীগুলোর ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা করে থাকে। তবে এসব গোষ্ঠী কোনো অঞ্চল বা বড় কোনো ভূখণ্ড দখল করার ক্ষমতা রাখে না বলেই মনে করা হচ্ছে। তালেবান সরকারও দাবি করছে, আফগানিস্তানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধিতার অস্তিত্ব নেই। আফগানিস্তানেও একসময় জমিয়তে ইসলামী আফগানিস্তান নামে ইসলামী আন্দোলনের কাজ ছিল। বুরহানউদ্দিন রব্বানী জমিয়তে ইসলামী আফগানিস্তানের আমীর ছিলেন। তিনি আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। একসময় তিনি আফগান সরকারের হাই পিস কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজধানী কাবুলে আত্মঘাতী এক বোমা হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। ২০১১ সালে ২০ সেপ্টেম্বর তালেবান প্রতিনিধি সেজে আসা এক আত্মঘাতী হামলাকারী তার পাগড়ির ভেতরে লুকিয়ে রাখা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রব্বানীকে হত্যা করেন।
২০২১ সালে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর জমিয়তে ইসলামী আফগানিস্তান প্রকাশ্যে কোনো কাজ করতে পারছে না। তবে সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হয়নি বলেই জানা গেছে। তালেবানরা ২০২৩ সালে সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয়ায় কোনো দলেরই প্রকাশ্য ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা নেই।
পাকিস্তান-তালেবান সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়
পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়েই বিগত কয়েক দশক ধরে তালেবানরা বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন আফগানিস্তান দখলে নেয়, তখন পাকিস্তানের সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়েই তালেবানরা যুদ্ধ করে। ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তালেবান নেতারা পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে শক্তি সঞ্চয় করেন। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পাকিস্তানসহ কিছু আঞ্চলিক শক্তির পরোক্ষ মদদে তারা অর্থ, গোয়েন্দা তথ্য এবং অস্ত্র সহায়তা পেয়ে আসছিল। পাকিস্তানের সহযোগিতার কারণেই তালেবানরা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল। কিন্তু সেই তালেবানরাই এখন ভারতের সাথে সম্পর্ক করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। অপরদিকে আফগান সরকার তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে দিয়েও পাকিস্তানে সমস্যা সৃষ্টি করছে। এসব কারণে দুই মুসলিম প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে।
ঐকমত্যের সমন্বয় দরকার
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তালেবানরা রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারলে চরম অর্থনৈতিক সংকট, বেকার সমস্যা, আন্তর্জাতিক সহায়তা না পাওয়া ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তবে মুসলিম স্কলারদের অভিমত, তালেবানদের উচিত মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে দেশের ভেতরেও রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে সব মত ও দলের সাথে সমন্বয় করেই দেশ পরিচালনা করা। তবেই আফগানিস্তানে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com