ঢাবি শিবির সভাপতি এস এম ফরহাদের সাক্ষাৎকার

ক্যাম্পাসে অনিয়মের অবসান ঘটেছে, বিলুপ্ত হয়েছে গণরুম ও গেস্টরুম


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৫৭

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের সকল অপকর্ম ও অনিয়মের অবসান ঘটিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা শিক্ষাঙ্গনেও অব্যাহত রয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোয় গণরুম ও গেস্টরুমের বিলুপ্তি ঘটেছে। মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও থেমে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক এ অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ এসব কথা বলেছেন।
গত বছর কোটা সংস্কার ইস্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ জুন কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের রায়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। দলনিরপেক্ষ ছাত্র আন্দোলন একপর্যায়ে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে সক্রিয় হতে থাকে। আন্দোলন দমন করতে হাসিনা সরকার যখন পুলিশ ও দলীয় ক্যাডার ব্যবহার করে বলপ্রয়োগ করে, তখন আন্দোলন তীব্র হয়। প্রতিদিনই ঘটতে থাকে হতাহতের ঘটনা। কিন্তু সরকারের কোনো বাধাই ছাত্র-জনতাকে দমাতে পারেনি। আন্দোলন ঠেকাতে নিহতের ঘটনা বাড়তে থাকায় আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। ছাত্র-জনতা প্রতিরোধের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। অবসান হয় তার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনের। ঐতিহাসিক এ অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হতে চলছে।
এ উপলক্ষে অভ্যুত্থানের সূচনা থেকে সফলতা পর্যন্ত নানা দিক নিয়ে কথা বলেছি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদের সঙ্গে। যিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম সম্মুখযোদ্ধা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে তিনি বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফরহাদ ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, ইতোমধ্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে এমফিল অধ্যয়নরত। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দাওয়াত পান তিনি। সপ্তম শ্রেণিতে সংগঠনের কর্মী, দশম শ্রেণিতে সাথী এবং অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এসে সদস্য মানে উন্নিত হন এস এম ফরহাদ। মাধ্যমিক জীবনের পর উচ্চমাধ্যমিক পার্যায়ে চট্টগ্রামে সংগঠনের একটি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার পর সাংগঠনিক সম্পাদক, সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীমউদ্দীন হলের শিক্ষার্থী ফরহাদ ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে কবি জসীমউদ্দীন হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিবেটিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, ঢাবির ডিবেটিং ক্লাবের এক সেশনে যুগ্ম সম্পাদক এবং আরেক সেশনে সহ-সভাপতি ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্রসংসদের সভাপতি ছিলেন। এছাড়া সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পক্ষ থেকে এ ছাত্রনেতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন সৈয়দ খালিদ হোসেন।
সোনার বাংলা: ছাত্র-জনতার আন্দোলনে জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার এক বছর পূর্তি, অভ্যুত্থান-পরবর্তী এ সময়ে জনআকাক্সক্ষা কতটুকু পূরণ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
এস এম ফরহাদ: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক বছর পার হওয়ার পর যেটা মনে হচ্ছে, সবকিছু যদি প্রত্যাশার আলোকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে রাজনৈতিক দল অন্তত একই প্ল্যাটফর্মে বসে জাতীয় সংস্কার নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারছে, যা এতদিন হয়নি, করা যায়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পুরো জাতিকে কয়েকভাবে ভাগ করে একটা পার্টিকে আরেকটি পার্টির প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছিল, একে অপরের পাশাপাশি না বসে বরং একে অপরকে শত্রুজ্ঞান করা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে এসে মৌলিক কিছু জায়গায় ঐকমত্য হওয়ার যে প্র্যাকটিস সেটা অন্তত শুরু হয়েছে, যা ইতিবাচক। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় গণরুম গেস্টরুমের বিলুপ্তি ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। বাজে রাজনৈতিক প্র্যাকটিস অন্তত এখন নেই বলা চলে, এসব বিষয় পজিটিভ। সেদিক থেকে আংশিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আর হতাশার জায়গা হচ্ছে, অভ্যুত্থানকে বিপ্লবে রূপান্তর করা যেত, দেশের সকল নেতিবাচক দিকগুলো রাজনৈতিক, প্রতিষ্ঠানিক কিংবা অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে দিয়ে নতুন করে তৈরি করা দরকার ছিল, যা করা যায়নি। সেদিক থেকে নেতিবাচক বা হতাশার জায়গা রয়েছে বলা যায়। তবে এখনো বাকি যে সময়টুকু রয়েছে, সে সময়টুকু যদি সব রাজনৈতিক দল এবং অন্য স্টেইকহোল্ডাররা ত্যাগের অনুভূতি মাথায় নিয়ে কাজ করতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ও ঐকমত্য হয়ে মৌলিক পরিবর্তনগুলো করতে পারে, তাহলে জনআকাক্সক্ষা পূরণ হবে বলে বিশ্বাস করি।
সোনার বাংলা: শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটা মূলত শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের উদ্দেশ্যে, কিন্তু সেটি কীভাবে সরকার পতনের এক দফায় রূপ নিল?
এস এম ফরহাদ: শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটা মূলত কোটা সংস্কারের উদ্দেশ্যে হয়েছিল, এটা সত্য, তবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেমন বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনাবাহিনীর অফিসাদের হত্যা, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হত্যা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে গুম-খুন, বিএনপিকে ভিকটিমাইজ করানো, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনকে ভিকটিমাইজ করা, কোটা বাতিলের পর আবার পুনরায় চালু করার ষড়যন্ত্র করা, ক্যাম্পাসগুলোয় গণরুম গেস্টরুমের প্র্যাকটিস, ছাত্রলীগের টর্চার সেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি সব ক্যাটাগরির মানুষ ভিকটিম ছিলো বলে একটি ক্ষোভের জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ শুরু হলো যখন কোটা সংস্কার আন্দোলনের মতো একটা নিরস্ত্র এবং ইতিবাচক আন্দোলনে তৎকালীন সরকার আক্রমণ করা শুরু করলো। শিক্ষার্থীদের ওপর দলীয় পেটোয়া বাহিনী দিয়ে আক্রমণ শুরু করলো, শিক্ষার্থীরা আহত হলো, ছাত্রী বোনেরা আহত হলো- তারপর একদিনেই আমরা ছয়জনের শাহাদাতের খবর শুনেছি। যেদিন আমরা ছয়জনের শাহাদাতের খবর শুনি, সেদিন থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলন ৯ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার পতন আন্দোলনের দিকে যায়। ওই সময় ঘোষিত ৯ দফা ছিল ওই সময়ের সরকারের এক একটা ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে দেওয়ার মতো। আর এর মধ্য দিয়ে ক্রমেই সরকার পতনের দিকে এগোয় আন্দোলন, যা পরবর্তীতে এক দফায় রূপ নেয়।
সোনার বাংলা: শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কীভাবে সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন হয়ে উঠল?
এস এম ফরহাদ: ৯ দফা চলাকালে অনেক বেশি সময় তৎকালীন সরকারের চেষ্টা ছিল ওই দফাগুলোকে বিভিন্নভাগে ভাগ করা, যাতে আন্দোলন ব্যাহত করা যায়। আর আমরা চেষ্টা করেছিলাম ৯ দফা আন্দোলন ৯ দফাই রাখতে। আলহামদুলিল্লাহ, আন্দোলন চলমান রাখার মধ্য দিয়ে সেটা আমরা পেরেছিলাম। কারণ শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এ আন্দোলন, একপর্যায়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলনে রূপ নেয় আন্দোলনটি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সর্বস্তরের আন্দোলনে তখনই রূপ নেওয়া শুরু করে, যখন শিক্ষার্থীরা ভিকটিম হওয়া শুরু করেন। কারণ একজন শিক্ষার্থী যখন ভিকটিম হন, তখন তিনি একা ভিকটিম হয় না। কেননা শিক্ষার্থীরা কারো ভাই, কারো সন্তান, কারো বন্ধু, অর্থাৎ তারা কারো না কারো সঙ্গে যুক্ত। এক একজন আহত ও শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে তার পুরো পরিবারকে এতে যুক্ত করেন, পুরো জাতিও সমাজকে কানেক্ট করে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কানেক্ট করে, স্কুলের শিক্ষার্থী আহত ও শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে পুরো স্কুলের শিক্ষার্থীদের কানেক্ট করে। এভাবে ধীরে ধীরে প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষকে এ আন্দোলনে কানেক্ট করে। অর্থাৎ যত বেশি শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিকটমাইজ হয়েছেন, তত বেশি শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
সোনার বাংলা: কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাবি শাখার অবদান কতটুকু?
এস এম ফরহাদ: আমাদের ইউনিভার্সিটির দায়িত্বশীলরা (নেতারা) ৫ জুন থেকে আন্দোলনের পলিসি মেকিংয়ে এনগেজইজ (সম্পৃক্ত) হতে শুরু করে। ৫ জুন রাতে সেই সময় যারা আন্দোলন লিড দিয়েছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় হয়। তখন থেকে প্রতিটি কর্মসূচিতে আমরা সম্পৃক্ত হই। প্রতিটি পলিসিতেই আমাদের মতামত ছিল। আন্দোলনটা মূলত তিনটি স্তরে বিভিক্ত ছিল, (প্রথমত) শুরুর দিকে কখনো কখনো তারা মতামত দিত, আমাদের (শিবিরের) কোনো সম্পূরক মতামত থাকলে সেটি আমরা দিতাম, আর না থাকলে আমরা ওই মতামতের ওপর সম্মতি দিতাম। আবার আমরা কোনো মতামত দিলে তারা (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা) নিজেদের ফোরামে আলোচনা করে তাতে তারা সায় দিত। দ্বিতীয়ত, যখন সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলো, তখন আমাদেরকে আরও বেশি এগিয়ে আসতে হয়েছে, মাঠে থেকে আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার হতো, নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ার পর সমন্বয়কদের সঙ্গে আমাদেরই সমন্বয় করতে হয়েছে। তখন অনেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, কেউ কেউ সেইভ জোনে ছিলেন, যারা বিচ্ছিন্ন ছিলেন- তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে হতো। তৃতীয়ত, ২ আগস্ট তারিখে ছয় সমন্বয়ক ডিবি কার্যালয় থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকে আমরা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতাম। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উভয় দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে হতো।
সোনার বাংলা: ছাত্রশিবির নেতাদের কি আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণে কেমন সম্পৃক্ততা ছিল?
এস এম ফরহাদ: হ্যাঁ ছিল, ১০ জুলাই আদালত চার সপ্তাহের জন্য ‘স্থিতাবস্থা’ জারি করার পর আমরা সবাই একসাথে বসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাতে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতিবৃন্দ আমাদের সঙ্গে মিটিংয়ে অংশ নেন। মিটিংয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়- আমরা প্রায় এক সপ্তাহের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করি; যাতে সফট ও হার্ড- দুই ধরনের কর্মসূচিই রাখা হয়। অনলাইন প্রচারণা, স্মারকলিপি প্রদান, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ সব মিলিয়ে একটি সুসংহত সাপ্তাহিক পরিকল্পনা দাঁড় করাই। ১৪ তারিখের প্রোগ্রাম কী হবে, সে বিষয়ে আমার সাথে ১৩ জুলাই সন্ধ্যায় মাহফুজ আলমের সাথে কথা হয়। আমি মাহফুজ আলমকে স্মারকলিপি প্রদানের প্রস্তাব দিই। মাহফুজ ভাইকে বলি- ‘ভাই! সরকার তো আমাদের সাথে নাটক করতে থাকবে। আমাদের কঠিন আন্দোলনে যেতে হবে। আন্দোলনের কঠিন ধাপে যাওয়ার আগে আমরা একটা কাজ করি। রাষ্ট্রের প্রধান হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, ওনাকে স্মারকলিপি প্রদান করে অবহিত করি। রাষ্ট্রপক্ষ যাতে আমাদের ওপর বড় কোনো আক্রমণ করে আবার কারণ হিসেবে দেখাতে না পারে যে- আমরা এখনো তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করিনি। রাষ্ট্রকে অবহিত করেই কঠোর কর্মসূচিতে যাই, এর মাধ্যমে একরকম ফর্মালিটি মেইনটেইনের ঝামেলা শেষ হবে।’
১৩ তারিখ রাতে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। রাত প্রায় ১২টার দিকে মাহফুজ আলম আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ভাই আমরা এটা চূড়ান্ত করলাম। এখন বাকিটা আপনাদের দায়িত্ব। এরপর স্মারকলিপির খসড়া তৈরি করার দায়িত্ব এসে পড়ে আমার ওপর। আমি চিন্তা করলাম এটা কার মাধ্যমে লেখা যায়? তখন আমাদের আরেকটা টিমের মেম্বার ছিল মুসাদ্দেক। তাকে ফোন দিয়ে বলি- রাষ্ট্রপতি বরাবর একটা স্মারকলিপি দিতে হবে, তার একটা খসড়া তৈরি করে দাও। সে আমাকে একটি খসড়া লিখে দেয়। আমি সেটি কিছুটা সম্পাদনা করি এবং এরপর পাঠিয়ে দিই মাহফুজ আলমকে। আমি শুরুতে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম রেখেছিলাম। কিন্তু মাহফুজ আলম বলেন, ‘এত সময় দেওয়া যাবে না, কমিয়ে দেন।’ এরপর আমি সেটি সংশোধন করে সময় কমিয়ে আনি। বাকি সবকিছু আগের মতোই রেখে দিই। চূড়ান্ত খসড়াটি আমি মাহফুজ আলমের কাছে পাঠিয়ে দিই। পাশাপাশি রাত সাড়ে ৩টার দিকে সারা দেশের ক্যাম্পাস শাখার দায়িত্বশীল ভাইদের কাছেও স্মারকলিপির খসড়াটির কপি পাঠিয়ে দিই। সেদিন স্মারকলিপির খসড়া প্রস্তুত করে সবার কাছে পৌঁছাতে পুরো রাত কেটে যায়। শেষে সবাইকে পাঠিয়ে আমি ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যাই। স্বাভাবিকভাবে এটা শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে- এমনটা বোঝানোর জন্য মুসাদ্দেকের একটা বিকল্প ইমেইলে ড্রাইভ করে লিংকটা ফেসবুকে ওপেন করে দিই। আমাদের পরিকল্পনা ছিল- প্রতিটি জেলার ডিসির (জেলা প্রশাসক) কাছে এ স্মারকলিপি পৌঁছে দেওয়া। যেখানে লেখা ছিল- বরাবর রাষ্ট্রপতি, মাধ্যম ডিসি। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে একত্রিত হয়ে বিশাল মিছিল নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে বের হয়। মিছিলের মাঝে মাঝে ছোট-বড় অনেকগুলো মিছিল এসে মূল মিছিলে যুক্ত হয়, পথে পথে যথেষ্ট পুলিশি বাধাও মোকাবিলা করতে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সেদিন কোনো বাধাই মানেনি ঐ মিছিল। মিছিল শেষে প্রতিনিধি টিম রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে।
সোনার বাংলা: হাসিনার আলোচিত সেই সংবাদ সম্মেলনের পর আন্দোলনের গতি বাড়ার নেপথ্যে কী ছিল?
এস এম ফরহাদ : ওইদিন বিকেলে শেখ হাসিনা চীন সফর শেষে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে আমাদের আন্দোলনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এত ক্ষোভ কেন?’ একপর্যায়ে সাংবাদিক প্রভাষ আমিন হাসিনার ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘একটা মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতি আর একটা রাজাকারের নাতি-পুতি যদি একই নম্বর পায়, তাহলে কি আমাদের উচিত নয় মুক্তিযোদ্ধার নাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া?’ হাসিনা উত্তরে বলেন, ‘অবশ্যই! মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কি আর মেধাবী হয়! মেধাবী তো ওই রাজাকারের নাতি-পুতিরা, তাই না?’
এ মন্তব্যে ছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের ঘৃণার চাষাবাদ এবং বানানো ন্যারেটিভ। হয়তো ভেবেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম দিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে। হাসিনার ডিহিউম্যানাইজ ও ট্যাগিংয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার!’ এটা মূলত হাসিনার বিরুদ্ধে স্যাটায়ারমূলক প্রতিবাদ। সন্ধ্যার পর ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চারদিক ‘রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। এটা ছিল প্রতিবাদের ভাষা। এতদিন যে রাজাকার শব্দকে ঘৃণা করত, হাসিনার মন্তব্যের কারণে সবাই এটাকে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদী ভাষায় পরিণত করে।
১৪ তারিখ মাগরিবের পরপর নাহিদ ইসলাম আমাকে ফোন করে বলেন, ‘ভাই, কী করব বলেন। ক্যাম্পাসে তো দেখতেছেন এখন কী হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছে, আমাদের কিছু একটা করা দরকার।’ তখন আমি কিছুক্ষণ ভেবে বলি, “ভাই, রাত ১১টার দিকে একটা বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন। সেখানে উল্লেখ থাকতে পারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল। তবে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নাম কোনোভাবেই ব্যবহার করবেন না এবং আন্দোলনের মূলধারার নেতৃত্বে যারা আছেন, তাঁরা কাউকে দিয়ে ঘোষণা দিয়েন না। বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বা বিকল্প কোনো এক্টিভিস্ট দিয়ে পোস্ট দিয়েন।” এটা একটাই কারণেÑ যাতে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার, রাজাকার!’ এই স্লোগান নিয়ে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর ব্যানারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে।
সোনার বাংলা: আসিফ-নাহিদদের গুম এবং হাসনাত-সারজিসদের পণবন্দি করে রাখার পর আন্দোলন চালিয়ে নিতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলেন?
এস এম ফরহাদ: আন্দোলনের কঠিন সময়ে একদিকে কিছু সমন্বয়ক ছিলেন নিখোঁজ; অন্যদিকে কিছু সমন্বয়ককে সরকারের নজরদারিতে রাখা হয়েছিলো। তখন আমরা চিন্তা করি- সরকার তিন সমন্বয়ক তথা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারকে গুম করে রেখেছে এবং আরও তিন সমন্বয়ককে তথা হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম ও হাসিবকে সরকার পণবন্দি করেছে। তাদের ব্ল্যাকমেইল কিংবা নির্যাতন করে বা কন্ট্রোলে রেখে আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্রমূলক কাজে বাধ্য করার আশঙ্কা লক্ষ করছিলাম। আমরা আরো আশঙ্কা করছিলাম যে, আমরা যদি ৬৫ সমন্বয়ককে সবাইকে রেখে প্রেস কর্মসূচির প্রেস রিলিজ পাঠাই, তাহলে গুম হওয়া ও সরকারের কন্ট্রোলে থাকা সমন্বয়কদের তারা বাধ্য করবে এটা বলতে যে, এ বিবৃতিতে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই। এমন হলে মিডিয়ায় সাংঘর্ষিক নিউজ আসতে থাকবে, যা আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সেই আশঙ্কা দূরীকরণে আমরা কর্মসূচি ঘোষণায় ৬৫ জন থেকে ৬ জন বাদ দিয়ে ’৫৯ সমন্বয়কের বিবৃতি’ উল্লেখ করতাম। এর মাধ্যমে আমাদের দুইটা লাভ হয়- এক. মিডিয়াকে ব্যাখ্যা দিতে পারি যে, তিনজন গুম এবং তিনজন পণবন্দি। বাকিদের সমন্বিত বিবৃতি এটা। দুই. সরকারও এক গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে যায়। গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারের ধারণা হলো, ৫৯ জন সমন্বয়ক একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ফলে তারা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে যে, কোথায় ৫৯ সমন্বয়ক মিটিং করে, ইন্টারনেট বন্ধ কীভাবে তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বাস্তবতা ছিল, আমাদের টিমই এ শিরোনামে প্রেস রিলিজ লিখতো। ‘৫৯’ সংখ্যার বাস্তবিক কার্যকারিতা তখন ছিল না।
এদিকে টানা কয়েকদিন আবদুল কাদেরের নামে বিবৃতি দেওয়ার পর মিডিয়া হাউসগুলোকে আবদুল কাদেরের নামে বিবৃতি প্রচার করতে ডিজিএফআই ও এনএসআই নিষেধ করে দেয়। তাদের বলা হয়- আবদুল কাদের ‘জঙ্গি, হিযবুত তাহরীর’। তার বিবৃতি প্রচার করা যাবে না। আমাদেরকে বিকল্প খুঁজে নিতে হলো। পরে বিকল্প হিসেবে আমরা হান্নান মাসউদের খোঁজ নিই। আমাদের মুজিব হলের জনশক্তি আবদুর রব নাসিমের বন্ধু হচ্ছে আবদুল হান্নান মাসউদ। তাঁকে বলি যে, তুমি একটা পত্রিকা নিয়ে আবদুল হান্নান মাসউদের কাছে যাও। এখন চলমান বিষয়গুলো অবহিত করতে বলি। এর মধ্যে ২২ তারিখ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে হান্নান মাসউদ বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন যে, “আমার আবদুল কাদের ভাই গুম অবস্থায় আছে।” অথচ ওই সময় আবদুল কাদের পুরোপুরি আমাদের তত্ত্বাবধানেই ছিলেন। আবদুল হান্নান মাসউদ অবহিত ছিল না। নাসিমের বড় ভাই আবদুল গাফফার জিসানের মাধ্যমে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে থেকে আবদুল হান্নান মাসউদ আমাদের সাথে কানেক্টেড ছিল। সেদিন মাসউদের কথাকে সত্য ধরে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা ৫৮ সমন্বয়কের বিবৃতি দিই। এভাবে আমরা ৫৯-৫৮ সংখ্যাগুলো সচেতনভাবে ব্যবহার করতে থাকি।
৫৯ বা ৫৮ সমন্বয়কের সম্মিলন বাস্তবিক অর্থে সম্ভব ছিল না। আমরা শুধু একটি সংখ্যা হিসাব করে দিতাম এমনভাবে, যাতে সরকার সহজেই কিছু অনুমান করতে না পারে। যদিও বিবৃতিগুলো আমরা নিজেরাই লিখতাম, বাইরে থেকে কেউ জানতো না কারা লিখছে বা কোথা থেকে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সজাগ থাকতে হয়েছে, মিসিংয়ে ছয়জনকে ব্যবহার করে সরকার যাতে আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দিতে না পারে।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা: জুলাই আন্দোলনের পেছনের মূল প্রেরণা কী ছিল?
এস এম ফরহাদ: ছোটবেলা থেকেই সংগঠন (ইসলামী আন্দোলন) করতে গিয়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সরকারের দীর্ঘদিনের ফ্যাজিমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়, তখন আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াটাকে নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছি। এক্ষেত্রে আমাদের অনুসরণের জায়গা ছিল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। এ আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেওয়া ক্ষেত্রে বেশি কাজ করেছে আবু সাঈদের শাহাদাত। এছাড়া অন্য ভাই-বোনদের শাহাদাত আমাদের আন্দোলনে আরও বেশি উৎসাহিত করে। আমাদের ছোট্ট শিশুরা রাস্তায় নেমে যায়, আমাদের বোনেরা রাস্তায় নেমে যান। এসব প্রত্যেক জিনিসই আমাদের প্রেরণা জোগায়।
সোনার বাংলা: আন্দোলনের একপর্যায়ে যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সবার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন?
এস এম ফরহাদ: আমাদের কাছে আগেই ধারণা ছিল যে সরকার একপর্যায়ে এসে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ আমাদের জানা ছিল এর আগেও বিভিন্ন আন্দোলনের সময় সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেছে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন করার সময়ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমরা পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আগে থেকেই কিছু ফোন এবং সিমকার্ড কিনে রেখেছিলাম। যাতে নেট বন্ধ করে দেওয়া হলে এগুলো ব্যবহার করতে পারি। যখন নেট বন্ধ হয়ে যায়, তখন ওই সিম আমি একটা ব্যবহার করি, সাদিক ভাইকে একটা দিই, সিবগাত ভাইসহ অন্য ভাইদের দিই। এছাড়া আশপাশের শাখাগুলোয় দেওয়া হয়। এভাবে আমরা অফলাইন নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করি এবং প্রতিটি স্পটভিত্তিক আমাদের প্রতিনিধি ছিল, যারা মাঠপর্যায়ে সমন্বয় করতেন, তথ্য সংগ্রহ করতেন, স্পটে যারা দায়িত্ব পালন করতেন- তাদের সবার কাছে অফলাইন নেটওয়ার্ক ছিল। অর্থাৎ ১৮ তারিখ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পর আমরা পুরো দেশের অফলাইন মোবাইল নেটওয়ার্ক সিস্টেম গড়ে তুলি, এটি ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত একটি উদ্যোগ। এটার কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সিবগাতুল্লাহ সিবগা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও সিলেটসহ প্রতিটি আন্দোলনের স্পটে একজন করে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল অফলাইন নেটওয়ার্ক সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের অধীনে আরও অনেকগুলো স্পট নেটওয়ার্ক কাজ করত, যাদের মাধ্যমে মূল খবর সংগ্রহ ও আদান-প্রদান হতো। এই নেটওয়ার্কের অনেক সদস্য রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হন। এদের মধ্যে কেউ শহীদ হয়েছেন, কেউ পঙ্গু, কেউ গুরুতর আহত। তবুও এ দুর্বিষহ সময়েও আমরা আমাদের আন্দোলনের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গতিশীল রাখতে সক্ষম হই।
সোনার বাংলা: সরকারের পক্ষ থেকে যখন কোনো কোনো সমন্বয়ককে বাধ্য করে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে তারপর ফের কীভাবে গতি পেল আন্দোলন?
এস এম ফরহাদ: আন্দোলনের কঠিন সময়ে এসে দেখলাম, পুলিশ, ছাত্রলীগ, প্রশাসনসহ মিলে কয়েকজন একত্রিত হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহার করে দিচ্ছে। বলছে, ‘আগে যা দাবি ছিলো তার সাথে ছিলাম, এখন যা বলা হচ্ছে তার সাথে নাই। আগে আমাদের হাতে ছিল, এখন জামায়াত-শিবিরের হাতে চলে গেছে।’ এমন বক্তব্য প্রতিদিন একেক স্থান থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মিলে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়, ঢাকা কলেজের কিছু সমন্বয়ক আন্দোলন প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়, সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে এর ধারাবাহিতা চলতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠে থাকা সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন শহর ও ক্যাম্পাসে নতুন করে কমিটি গঠন করা শুরু করি। এ কমিটির উদ্দেশ্য ছিল সরকার কর্তৃক আন্দোলন নস্যাৎ করার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়া, কাউকে পদ দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। আবদুল হান্নান মাসউদ, রিফাত রশিদ, মাহিন সরকার, আবদুল কাদেরসহ সেইফ হোমে থাকা অন্য সমন্বয়কদের সাথে কানেক্টেড মাঠে সক্রিয় এমন কারো তথ্য থাকলে সেগুলো সংগ্রহ করতাম, পাশাপাশি আমাদের কেন্দ্রীয় ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক আমিরুল ইসলাম ভাইয়ের সমন্বয়ে সারা দেশে মাঠে সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীদের তালিকাগুলো সংগ্রহ করতাম। আমিরুল ভাইয়ের পাঠানো তালিকাগুলো যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ ছিলো- যেখানে সকল প্রতিষ্ঠান ও সকল ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীর নাম থাকতো। আমিরুল ইসলাম ভাইয়ের পাঠানো লিস্ট- আমরা সেগুলো রায়হান উদ্দিনকে পাঠাতাম। রায়হান উদ্দিন সেগুলো প্যাডে বসিয়ে আমাকে পিডিএফ করে দিলে আমি সেগুলো সাংবাদিকদের গ্রুপ, সমন্বয়কদের গ্রুপসহ সবজায়গায় দিয়ে দিতাম। এভাবেই আন্দোলন আবার তরতাজা হয়ে ওঠে, প্রাণ ফিরে পায় নতুনভাবে। ফলে যারা সংবাদ সম্মেলন করেছিল, তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে আন্দোলনের ফিল্ড সাজানো সহজ হয়।
সোনার বাংলা: শহীদ পরিবারের সঙ্গে ছাত্রশিবির কি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তাদের জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে?
এস এম ফরহাদ: শহীদ পরিবারের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে যারাই শহীদ হয়েছে, আমরা প্রত্যেককে শহীদ মনে করি। সংগঠনের যে শাখার আওতায় যে শহীদের বাড়ি সেই শাখা সংশ্লিষ্ট শহীদ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে, সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে এবং এটা সবসময় অব্যাহত থাকবে।
সোনার বাংলা: অভ্যুত্থান সফল না হলে আন্দোলনকারীদের পরিণতি কী হতে পারতো?
এস এম ফরহাদ: নাহিদ ইসলাম, তাসনুবা, আবদুল কাদের, হান্নান মাসউদদের সঙ্গে আমাদের অফ লাইনে যোগাযোগ ছিল, মাঠপর্যায়ে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল, এসব যোগাযোগের কারণে (সরকার টিকে গেলে) রাষ্ট্রবিরোধী মামলা দিয়ে আমাদের ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারতো। এছাড়া ওই সময় সরকার যেসব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, যেমন আবু সাঈদের মামলাটা সরকার যেভাবে সাজিয়েছিল (আবু সাঈদের বন্ধুদের আসামি বানানো হয়েছিল), সেভাবে আমাদেরও বিভিন্ন হত্যা মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির আসামি করা হতো। যেহেতু ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সে কারণে তারা হয়তো ক্রসফায়ার দিতো। কেননা আমাদের আগের অনেক নেতাকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। আমরা আন্দোলনের সময় মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম যে, যেকোনো সময় আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। ক্রসফায়ার দেওয়া হতে পারে। জীবন দিতে পারাটাই সৌভাগ্যের ছিল। জীবন দিতে পারিনি এটা আফসোসের জায়গা। জীবন দিতে পারার মধ্যেই সফলতা এবং অল্প মানুষই এই সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারেন।
সোনার বাংলা: বিপ্লবীরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন। সেই স্বপ্ন পূরণে কি সঠিক পথে হাঁটছে বাংলাদেশ?
এস এম ফরহাদ: বিপ্লবীরা যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা পূরণ হয়নি। তবে আমরা আশাবাদী, যেকোনো সময় হয়তো পূরণ হবে। স্বপ্ন পূরণ হয়নি এজন্য শুধুমাত্র কিছু সিস্টেম বা ব্যক্তির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসলে স্বপ্ন পূরণ হয় না। রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যেভাবে দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তা ভেঙে দিয়ে নতুন করে একটা একটা করে গড়ে তোলা দরকার ছিল, সেটি হয়নি। সংবিধানকে আমূল পরিবর্তন করা দরকার ছিল, সেটি হয়নি। সামনে হবে কিনা জানি না। ক্যাম্পাসগুলোয় যেভাবে আমূল পরিবর্তন করা দরকার ছিল, যেমন ফ্যাসিবাদী কায়দায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ থেকে শুরু করে যত অনিয়ম এবং দুর্নীতি হয়েছে তা বের করতে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকাশ করা দরকার ছিল, সেটি হয়নি। বাংলাদেশ যে আধিপত্যবাদের ভিকটিম ছিল আগামীতে যেন কোনো অধিপত্যবাদের ভিকটিম না হয়- সেজন্য শক্ত মেরুদণ্ডের ওপর দাঁড়ানোটা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল, সেটি হয়নি। এটি হচ্ছে হতাশার জায়গা।
সোনার বাংলা: জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের করণীয় সম্পর্কে আপনার পরামর্শ কী?
এস এম ফরহাদ: শিক্ষার্থীদের করণীয়ের চাইতে যারা ভোটার, তাদের করণীয় বেশি। যারা ভোটার নন, তারা বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। আর যারা ভোটার, তারা ভোট দেওয়ার কোন প্রার্থী ব্যক্তি হিসেবে সৎ, দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ নাগরিক, তুলনামূলক কমিটমেন্ট রক্ষা করতে পারবেন, বিশেষ করে বিজয়ের পর মানুষের প্রতি অবিচার করবেন না- এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।
সোনার বাংলা: ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এস এম ফরহাদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।