ইউরোপ সভ্যতার সূতিকাগার মুসলিম আন্দালুসিয়াই আজকের স্পেন
২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:২৫
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
দীর্ঘ প্রায় ৮০০ বছরের শাসনে মুসলিমরা ইউরোপ মহাদেশে একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার জন্ম দেয়, যা ইউরোপিয়ান সভ্যতা তথা রেনেসাঁ সৃষ্টিতেও বিরাট ভূমিকা রেখেছে, যেটির সূতিকাগার ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ মুসলিম আন্দালুসিয়া যা আজকের স্পেন। অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত আর দারিদ্র্যক্লিষ্ট স্পেন ইসলামী শাসনামলে পরিণত হয় সমগ্র ইউরোপের আলোকবর্তিকায় এবং সমৃদ্ধতম দেশে। মুসলিমদের আগমনের আগে প্রায় তিনশত বছর (৪০৯-৭১১) এই অঞ্চলটিতে চলে গথ শাসন। এ সময় স্পেনের অবস্থা পূর্ববর্তী রোমানদের থেকে আরও খারাপ হয়ে যায়। এই শাসনামলে স্পেন পতিত হয় অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় এবং স্পেনের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির মধ্যে সৃষ্টি হয় চরম বিভাজন। আর ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক অঙ্গণে সৃষ্টি হয় চরম অসহিষ্ণুতা ও অস্থিতিশীলতা যার থেকে জনগণের রেহাই মেলে ইসলামী সুশাসনে এবং অঞ্চলটি এই শাসনামলে পৌঁছে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে।
ভৌগোলিক পরিচয় ও জনসংখ্যা : তৎকালীন আইবেরিয়ান উপদ্বীপই বর্তমান বিশ্বমানচিত্রের স্পেন ও পর্তুগাল। মুসলিম আন্দালুসিয়া বা স্পেনের প্রায় আট ভাগের সাত ভাগ সমুদ্রের দিকে উন্মুক্ত যা অঞ্চলটিকে করেছে অনন্য। ত্রিকোণাকার এই উপদ্বীপটির উত্তর সীমানায় আছে বিস্কে উপসাগর, পশ্চিমে সুবিশাল আটলান্টিক মহাসাগর, দক্ষিণ আর পূর্বে আছে ভূমধ্যসাগর। আয়তনে প্রায় ছয় লাখ বর্গকিলোমিটারের এই উপদ্বীপটি উত্তরে পিরেনিজ পর্বতমালা দ্বারা ফ্রান্স থেকে, আর দক্ষিণে প্রায় ১৩ কিলোমিটার প্রস্থের জিব্রাল্টার প্রণালী একে আফ্রিকার মরক্কো থেকে পৃথক করেছে। স্পেনে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা রয়েছে। এটি বিশ্বের ২৮তম বৃহত্তম জনবহুল দেশ এবং ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও ইউক্রেনের পরে ৬ষ্ঠ জনবহুল দেশ। দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখে এবং বেসরকারি হিসাব মতে প্রায় ৩০ লাখ বলে জানিয়েছেন ইসলামিক কমিশন অব স্পেন এর সেক্রেটারি মোহামেদ আজানা।
ইসলামপূর্ব স্পেনের শাসনব্যবস্থা : ফিনিশীয়রা প্রথমে স্পেনের বিভিন্ন ভূমধ্যসাগরীয় নগর ও বন্দর পত্তন করে শাসন করতে থাকে। তাদের শক্তি কমে আসলে তিউনিসিয়াকেন্দ্রিক কার্তাজেনরা স্পেন শাসন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ইতালির রোম শহরকে কেন্দ্র করে রোমান সাম্রাজ্যের পত্তন হলে তারাই কার্তাজেনীয়দের উচ্ছেদ করে সেখানে নিজেদের রাজত্ব গড়ে তোলে। রোমানরা প্রায় দীর্ঘ ৫০০ বছর ধরে সেখানে রাজত্ব করে।
খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতাব্দীর শেষ দিকে পশ্চিমা গথ জাতি এলারিকের নেতৃত্বে রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশের বিভিন্ন নগরী দখল করে নেয়। ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট থিয়োডোসিয়াসের মৃত্যু হলে গথ নেতা এলারিক পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী নেতারূপে আবির্ভূত হন। এলারিকের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন আটাউল্ফ। রোমান সাম্রাজ্য তাকে গল (বর্তমান ফ্রান্স) এর দক্ষিণাংশ আর স্পেন শাসনের অনুমতি দেয়। ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকে, আর গথ জাতিও প্রতিপত্তি লাভ করতে থাকে। বিশেষ করে ভ্যালিয়ার শক্তিশালী নেতৃত্বে গথরা পুরো উপদ্বীপের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
৪৬৭ খ্রিস্টাব্দে গথ নেতা ইউরিক ‘সম্রাট’ উপাধি ধারণ করে স্বাধীনভাবে শাসন করতে শুরু করেন অঞ্চলটি। পশ্চিমা গথ জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এই ইউরিকই। স্পেনে মুসলিম আগমনের পূর্ব পর্যন্ত তিনশো বছরেরও (৪০৯-৭১২ খ্রিস্টাব্দ) বেশি সময় ধরে এই গথরা শাসন ক্ষমতায় ছিল। গথ শাসন ছিল ধ্বংসলীলা, গণহত্যা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্দয়ভাবে দমন এবং আক্রমণকারী বর্বরদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পরিপূর্ণ। উঁচু-নিচুর ব্যবধান, আস্থাহীনতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও ইহুদিদের দুর্ভোগের ইতিহাস গথ শাসনের ব্যর্থতার স্বাক্ষর বহন করে। ইসলামী সুশাসনের আগমনের মাধ্যমে এই কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে অঞ্চলটিতে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা : তৎকালে স্পেনের সমাজ মোটামুটি শাসক আর শাসিত এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। রাজা, ধর্মযাজক, যুবরাজ ও সামন্ত প্রভুরা ছিল শাসক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বর্গাকার, ভূমিদাস, ক্রীতদাস ও ইহুদিরা ছিল শাসিত শ্রেণিভুক্ত। অন্যদিকে স্পেনের অর্থনীতির সিংহভাগ ছিল ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে। তারাই ছিল স্পেনের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার দরুন তারা মিল-কারখানা, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেশত্যাগ করেন। ফলে স্পেনের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। ধ্বংসপ্রাপ্ত এই অর্থনীতি অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমানদের প্রচেষ্টায় পুনর্জীবন লাভ করে।
ধর্মীয় অবস্থা : স্পেনে ধর্মীয় সহনশীলতা ছিল অনুপস্থিত। গথরা ছিল আর্য খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু ৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা প্রথম রিকার্ড ক্যাথলিক ধর্মমত গ্রহণ করেন এবং একে স্পেনের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। আর এরপরই স্পেনের ইহুদিদের দুর্দিনের শুরু। ক্যাথলিকরা আর্য খ্রিস্টানদের চেয়ে ধর্মের ব্যাপারে বেশি কট্টর ছিল। তারা ইহুদিদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্যে বিরামহীন চেষ্টা করতে থাকে।
৬১১ খ্রিস্টাব্দে গথ রাজা সিসুবুত নতুন আইন করেন, যাতে উল্লেখ ছিলÑ যেসব ইহুদি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নির্বাসনে পাঠানো হবে। এর ফলে ৬১২ থেকে ৬২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার ইহুদিকে বলপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয়। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিবাহ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি তাদেরকে তাদের পুত্র-কন্যাসহ ক্রীতদাসরূপে বিক্রয় করা হয়। ফলে ইহুদীরা বাঁচার জন্য আশপাশের মুসলিম দেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে। এ সময় মুসলিমরা স্পেনে অভিযান চালালে জনগণ ধর্মীয় আশীর্বাদ হিসেবে তাদের সাদরে গ্রহণ করে।
মুসলিমদের আমন্ত্রণ : তৎকালীন সমগ্র উত্তর আফ্রিকা (সিউটা ব্যতীত) ছিল উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ নিযুক্ত গভর্নর ইয়ামেনী বংশোদ্ভূত মূসা ইবনে নূসাইরের শাসনাধীন। তিনি কায়রোয়ান শহর থেকে সমগ্র মাগরিব (বর্তমান তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া ও মৌরিতানিয়া) শাসন করতেন। অন্যদিকে আফ্রিকা তথা মরক্কোর উত্তর উপকূলের সিউটা দুর্গটি ছিল রোমানদের দখলে। কাউন্ট জুলিয়ান ছিলেন সেই দুর্গের অধিপতি। তিনি কনস্ট্যান্টিনোপল সম্রাটের পক্ষ থেকে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কাউন্ট জুলিয়ানের সাথে স্পেনের রাজা ওটিজার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ওটিজা তার এক কন্যার সাথে জুলিয়ানের বিয়ে দিয়েছিলেন। স্বভাবতই ওটিজার সিংহাসনচ্যুত হওয়ার ফলে স্পেনের সাথে জুলিয়ানের সম্পর্কটাও ভেঙ্গে যায়। জুলিয়ান তৎকালীন রীতি অনুযায়ী তার কন্যা ফ্লোরিডাকে রাজকীয় আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার রপ্ত করার জন্য স্পেনের তৎকালীন রাজধানী টলেডোর রাজপ্রাসাদে পাঠান। ওটিজার পতনে টলেডোর স্থানে ক্ষমতায় আসেন রডারিক। রডারিক বলপূর্বক ফ্লোরিডার শ্লীলতাহানি করেন। এতে কাউন্ট জুলিয়ান গভীরভাবে মর্মাহত হন এবং অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার শপথ করেন। এর ফলে কাউন্ট জুলিয়ান, সেভিলের প্রধান ধর্মযাজক ও কয়েকজন খ্রিস্টান সর্দারকে সাথে নিয়ে কায়রোয়ানে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসক মূসা ইবনে নূসাইরের কাছে গিয়ে স্পেনে অভিযান চালানোর অনুরোধ করেন আর সাথে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন। মূসা ইবনে নূসাইর জুলিয়ানের আবেদন গুরুত্বের সাথে নেন এবং স্পেন অভিযানের অনুমতির জন্য খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের দরবারে চিঠি পাঠান। অন্যদিকে এ সময় একটি অত্যাচারী ত্রিত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে একতাবাদী খ্রিস্টানদের বিদ্রোহ চলছিল এবং তারাও নিপীড়ন অপসারণ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম সেনাবাহিনীকে বিশেষভাবে স্পেনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই একতাবাদী এবং মুসলিমদের মধ্যে বিশ্বাসের সাদৃশ্যও আইবেরিয়া উপদ্বীপের জনসংখ্যাকে ইসলামে দীক্ষিত হতে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছে।
আন্দালুসিয়া মুসলিম বিজয় : স্পেন মুসলিম বিজয়ের বছরখানেক আগে স্পেন শাসন করতেন গথ সম্রাট ওটিজা। তিনি ৭০২ খ্রিস্টাব্দে তার পিতা এজিকার উত্তরাধিকার নির্বাচিত হন। ওটিজা পূর্ববর্তী গথ শাসকদের মতো এতটা অত্যাচারী ছিলেন না। তিনি ইহুদিদের সাথে যথেষ্ট সদয় ব্যবহার করতেন। তার সাথে জনসাধারণের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় জনগণের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। কিন্তু তৎকালীন পাদ্রীরা এটা ভালো চোখে দেখেনি। তারা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে জনগণকে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের সাহায্যের অভিযোগে পাদ্রী ও অভিজাতদের একাংশের সহযোগিতায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করে ক্ষমতায় আসেন জনৈক সেনাপতি রডারিক। তিনি ওটিজার পুত্র যুবরাজ আচিলাকে রাজধানী টলেডো থেকে গ্যালিসিয়ায় নির্বাসনে পাঠান। এই রডারিকের পতনের মাধ্যমে স্পেন মুসলিমদের অধীনে চলে আসে।
মুসলিম বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ : কাউন্ট জুলিয়ানের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মূসা ইবনে নূসাইর ৭১০ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের বাস্তব অবস্থা অনুধাবনের জন্য তারিফ বিন মালিককে স্পেনে প্রেরণ করেন। তিনি স্পেনের দক্ষিণ উপকূল প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি সেখানে বিজয়াভিযান প্রেরণের অনুকূল অবস্থা জানালে মূসা ইবনে নূসাইর তার অপর একজন সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদকে ৭১১ সালে ৭ হাজার সৈন্যসহ স্পেন বিজয়ে প্রেরণ করেন। তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ানের সাহায্যে মোট ১২ হাজার সৈন্যসহ জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বের এক উচ্চ ভূমিতে অবতরণ করেন। তারিকের নামানুসারে উক্ত স্থানের নাম হয় জাবালুত তারিক। ‘জাবাল’ আরবী শব্দ যার অর্থ পাহাড়। ‘জাবালুত তারিক’ মানে তারিকের পাহাড় (ইংরেজিতে The rock of Tariq)। বর্তমানে এই স্থানটির পরিবর্তিত নাম জিব্রাল্টার। তারিকের আগমনের সংবাদে রডারিক ১ লাখ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। গুয়াডেল্ট নদীর তীরে মেডিনা সিডোনিয়া শহরের নিকটবর্তী ওয়াদী লাক্কো নামক স্থানে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হয়। রডারিকের সৈন্যবাহিনী পরাজিত ও বিধ্বস্ত হয়। রডারিক পলায়নকালে নদী গর্ভে নিমজ্জত হয়ে প্রাণ হারান। তারিক তৎকালীন রাজধানী টলেডোসহ পরবর্তী মুসলিম রাজধানী কর্ডোভা, মুর্সিয়া, ভ্যালেন্সিয়া, আলমেরিয়া, মালাগা ইত্যাদি অঞ্চল দখল করে স্পেন বিজয় সম্পন্ন করেন।
মুসলিমদের স্পেন বিজয়ের ফলাফল : মুসলিমদের স্পেন বিজয়ের ফলে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ধনী-দরিদ্র সমমর্যাদা লাভ করে। উচ্চ শ্রেণি ও ধর্মযাজকদের বিশেষ সুবিধা লোপ পায়। মধ্যবিত্তের করের বোঝা লাঘব করা হয়। দাসদের মুক্ত করা হয়। কৃষক, শ্রমিক, মজুর ও ইহুদি সম্প্রদায় পূর্ববর্তী শাসনের অত্যাচার হতে মুক্ত হয় এবং তারা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন শুরু করে। ফলে সমাজে সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম শাসনামলে বিজয়ী এবং বিজীতদের মধ্যে আন্তঃবৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর ফলে সেখানে মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। মুসলিমদের উদার ও প্রগতিশীল শাসনের কারণে সুষ্ঠু পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং যেটি কৃষ্টি ও সভ্যতা বিকাশের পক্ষে সহজ হয়। অল্প দিনের মধ্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন স্পেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়। মুসলিম স্পেনের আলোকোজ্জ্বল সভ্যতার ছোঁয়ায় ইউরোপ আলোকিত হয়।
‘মোযারব’ : স্পেনে মুসলিমদের বিজয়ের পর ইসলামের অধিকতর গ্রহণযোগ্যতার ফলে বহু খ্রিস্টান ইসলামে দীক্ষিত হয়। আবার আরব সভ্যতা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি একদল খ্রিস্টান আকৃষ্ট হয় এবং তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করেও আরবী ভাষা ব্যবহার, আরবীয় পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের বলা হয় ‘মোযারব’। এর ফলে ধর্মান্ধ খ্রিস্টানরা খ্রিস্টান ধর্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।
ভাষা ও সাহিত্য : ভাষার দিক দিয়ে আল-কালী ও আল-জুবায়দী, সাহিত্যে ইবনে আবদ-রাব্বিহ, আলী ইবনে হাজম, ইবনে খাতিব, ইবনে জায়দুন এবং মহিলা কবি উয়াল্লাদাহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। মুসলিম স্পেনে তাঁদের রচিত রচনাগুলো এখনো উন্নতমানের বলে গণ্য হয়। আলী ইবনে হাজমকে বলা হয় মুসলিম স্পেনের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও মৌলিক চিন্তাবিদ। PK. Hitti; History of the Arabs তাঁকে ইসলামের দু-তিনজন চিন্তাশীল মনীষী ও সুপ্রসিদ্ধ লেখকদের মধ্যে একজন বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে জায়দুন আন্দালুসের শ্রেষ্ঠ কবি বলে গণ্য হন।
শিক্ষা ও শিক্ষার উপকরণ : স্পেনীয় মুসলিমদের একটা বড় অংশ লিখতে ও পড়তে পারতেন। প্রধান প্রধান শহরগুলোর অনেকগুলোতেই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। সেগুলোর মধ্যে কর্ডোভা, সেভিল, মালাগা ও গ্রানাডার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিদেশি ছাত্ররাও পড়াশোনা করত। স্পেনে অনেক গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল এবং সেগুলোয় বইয়ের ব্যাপক সংগ্রহ ছিল। দ্বিতীয় হাকামের লাইব্রেরিতে পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ যা শুধু মুসলিম বাগদাদের লাইব্রেরির সাথে তুলনীয়। স্পেনে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ও বিশাল বইয়ের সংগ্রহ গড়ে তোলা সম্ভব হয় মুসলিম আমলে স্থানীয়ভাবে কাগজ উৎপাদনের জন্য। পরে স্পেন থেকে কাগজ উৎপাদন কৌশল গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এটা কাগজ শিল্পে মুসলিমদের মৌলিক অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইতিহাসতত্ত্ব ও ভূগোল : মুসলিম স্পেনে অসংখ্য ঐতিহাসিক ইতিহাস-শাস্ত্রে অবদান রাখেন। স্পেনের ঐতিহাসিকদের মধ্যে ইবনে আল-কুতিয়া, ইবনে হাইয়ান, ইবনে আল-আব্বার, আবুল কাসিম সাইদ ইবনে আহম্মদ আল আন্দালুসী, ইবনে আল- খতিব, ইবনে খালদুন অন্যতম। ইবনে খালদুন ছিলেন পৃথিবীর সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাস-দার্শনিক।
এছাড়া স্পেনের ভূগোলবিদ, ভূগোল গ্রন্থকার ও মানচিত্রবিদদের মধ্যে অধিক উল্লেখযোগ্য ছিলেন আল-বারি ও আল- ইদ্রিসি। পর্যটকদের মধ্যে ইবনে যুবাইর, ইবনে আহম্মদ, আবু হামিদ ও মুহম্মদ আল-মাজিনি উল্লেখযোগ্য।
জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষবিদ্যা ও গণিত : মুসলিম স্পেনের জ্যোতির্বিদদের মধ্যে আল-মাজরিতি, আল-জারকালি, আল-বিতরুজি এবং ইবনে আফলাহ উল্লেখযোগ্য। আল-মাজরিতিকে আল-হাসিব বা অংকশাস্ত্রবিদ খেতাব দেয়া হয়েছিল। পরিমিতিসহ অংকশাস্ত্রের ক্ষেত্রে তাঁকে একজন পথ-প্রদর্শক বলে গণ্য করা হত। অংকশাস্ত্রে বিভিন্ন আরবি শব্দের ব্যবহার মুসলিম অবদানের স্মৃতি বহন করে।
‘Convivencia’ : মুসলিম স্পেন বা আন্দালুসিয়া (৭১১-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ) ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, স্থাপত্য ও ধর্মীয় সহাবস্থানের অনন্য নজির। মুসলমান শাসনের অধীনে আন্দালুস একটি সাম্যবাদী সমাজে পরিণত হয়, যেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা একত্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করেছিল। এটি ‘Convivencia’ নামে পরিচিত, যা এই যুগে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামাজিক সম্প্রীতির ধারণা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। গ্রানাডায় মুসলিম শাসন পরবর্তীতে খ্রিস্টান শাসনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত। এখানে মসজিদ, গির্জা ও সিনাগগে যার যার ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করত। (উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট, A History of Islamic Spain.)।
জিজিয়া : আন্দালুসিয়ায় অমুসলিমদের জন্য জিজিয়া কর আরোপিত ছিল। এর মাধ্যমে তাদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়। এটি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিত। মুসলিম শাসকরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছিলেন। (আন্নে-মারি এডউইনসন, Muslims and Christians in Medieval Spain.)।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা : মুসলমান শাসকরা অমুসলিমদের (খ্রিস্টান ও ইহুদি) প্রশাসন, বাণিজ্য এবং শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছিল আন্দালুসিয়ায়। কর্ডোবার খলিফা আবদুর রহমান তৃতীয়-এর সময়ে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি পণ্ডিতরা একসঙ্গে কাজ করত এমন অহরহ নজির রয়েছে। (ড্যানিয়েল জি. নেটেলিং, The Jews of Moslem Spain.)।
সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : আন্দালুসে ইসলামিক সংস্কৃতি এবং স্থানীয় রোমান ও গথ ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটে। স্থাপত্যে মুদ্রিত হয় ইসলামী ও খ্রিস্টান শৈলীর মিশ্রণ। উদাহরণত- কর্ডোবার মসজিদ। (ওলেয়ারি, Arabic Thought and its Place in History)।
ইসলামের মহত্ত্বের প্রকাশ : মুসলিম আন্দালুসে (৭১১-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ) ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির মাধ্যমে ইসলামের মহত্ত্ব অসাধারণভাবে প্রকাশিত হয়। এ সময় মুসলমান শাসকরা কুরআনের ‘আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন যে তোমরা ন্যায়বিচার ও সদাচরণ করো।’ (সূরা আন-নাহল : ৯০)। নীতির অনুসরণ করে এমন এক সমাজ গঠন করেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, ন্যায়বিচার ও জ্ঞানচর্চার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় ছিল। এই ঘটনাগুলো ইসলামের মানবিক ও উদারনৈতিক আদর্শকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে।
অমুসলিমদের প্রতি উদারতা : ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ এবং ভ্রান্ত পথ পরিষ্কার।’ (সূরা আল-বাকারা : ২৫৬)। যা মুসলিম শাসন ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে নিশ্চিত করে। মুসলিম শাসকরা কুরআনের নীতিকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ওপর জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার কোনো ঘটনা ঘটেনি, বরং তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চর্চায় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। মুসলমানদের উদার মনোভাব এবং ইসলামের সহিষ্ণুতা নীতি গোটা আন্দালুসিয়ায় স্থায়ী শান্তি ও উন্নতির সূচনা করে।
ইসলামের বিশ্বজনীন নীতি : কুরআনের নির্দেশ- ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি জাতি ও গোষ্ঠীতে, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক পরহেজগার।’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)। ধর্ম-বর্ণ-জাতি-নির্বিশেষে এটি একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের দিকে আহ্বান জানায়। ইসলামের শিক্ষাগুলো মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য। কুরআনের এই নির্দেশে উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম শাসকরা ইসলামের বিশ্বজনীন প্রমাণ দেখিয়েছেন। (ওলেয়ারি, Arabic Thought and its Place in History)।
জ্ঞানচর্চার প্রতি উৎসাহ : ইসলামের প্রথম বাণী ছিল ‘পড়ো’ (সূরা আলাক : ১)। আন্দালুসিয়ায় এই নির্দেশনা অনুসরণ করে মুসলিম শাসকরা জ্ঞানচর্চার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতরা একত্রে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও শিল্পকলায় যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। কর্ডোবা ও গ্রানাডার মতো শহরগুলো বিশ্বজুড়ে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ইসলামের এই জ্ঞানচর্চার উদারতা ও বহুমুখিতা ছাড়াও স্পেনে মুসলিম শাসনের অসংখ্য ইতিবাচক দিক রয়েছে, যা আজও উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
Reconquista : মুসলিম শাসনের কিছু ভুল পদক্ষেপের কারণে ১৩ শতাব্দী থেকে স্পেনের খ্রিস্টানরা পুনরায় আন্দালুসিয়া Reconquista বা পুনরুদ্ধার শুরু করে। অবশেষে ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার হাতে গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে স্পেনে মুসলিম সুশাসনের অবসান ঘটে ১৪৯২ সালে। গ্রানাডার পতনের ফলে মুসলিমদের ভাগ্যে নেমে আসে করুণ ও মর্মস্পর্শী বিপর্যয়। গ্রানাডার পতনের পর মুসলিমদের প্রথম ‘মরিস্কো’ বলে সম্বোধন করা হয়। এর আগে তাদের বলা হত ‘মুর’। বিশেষ করে ইসলাম থেকে খ্রিস্টান-ধর্মে ধর্মান্তরিতদের ‘মরিস্কো’ নামে ডাকা হত। আর যেসব মুসলিম তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখে খ্রিস্টান-শাসিত অঞ্চলে বসবাস করত তাদের বলা হত ‘মুদেজারেস’। গ্রানাডার পতনের পর সপ্তদশ শতকের প্রথম দশকের মধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ মুসলিমকে নির্বাসিত বা হত্যা করা হয়।
আন্দালুসিয়া বা স্পেনের ইসলামী সংস্কৃতি কেবল অতীতের ইতিহাস নয়; বরং বর্তমান স্পেনের তথা ইউরোপের পরিচয়ের একটি জীবন্ত অংশ। স্প্যানিশ ফাউন্ডেশন ফর ইসলামিক কালচারের বৈজ্ঞানিক পরিচালক সের্গিও ইসাবেল লুদেনা বলেন, ‘ইসলামী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার স্পেনের সংস্কৃতির একটি অংশ।’ হোসে রদ্রিগেজ-দোমিঙ্গো, অধ্যাপক, গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয় যোগ করেন, ‘ইসলামী ঐতিহ্য স্পেনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি সংজ্ঞায়িত উপাদান।’ স্পেনের সাধারণ মানুষ যে খ্রিস্টানদের থেকে রেহাই পেতে মুসলিমদের ত্রাণকর্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আজ আবার ইসলামী শাসকগোষ্ঠীর ভুলের মাশুল হিসাবে সেই খ্রিষ্টান শাসন ফিরে এসেছে অঞ্চলটিতে।
তথ্যসূত্র : আল-কুরআন, আল-জাজিরা, ডেইলি সাবাহ, ডেইলি ডন, রয়টার্স, সাউদি গেজেট, সিএনএন, এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।