গুপ্ত, গুপ্ত


২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:১৭

॥ শামসুন্নাহার নিজামী ॥
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এক ব্যক্তির বর্ণনা করেছেন। সে ছিল ফেরাউনের খুবই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। আল্লাহ বলেন, “তখন ফেরাউনের সভাসদদের এক মুমিন ব্যক্তি, যে এতদিন তার ঈমান গোপন করে রেখেছিল, বলল, ‘আল্লাহ আমার প্রভু’ শুধু এই কথাটি বলার কারণে কি তোমরা একজন মহাপুরুষকে হত্যা করবে? অথচ তিনি তো তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ ও নিদর্শন নিয়ে এসেছেন। তোমরা যে তাকে মিথ্যাবাদী বলছ, তিনি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকলে তার মিথ্যার দায়িত্ব তো তার। কিন্তু তিনি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকেন, তবে যেসব ভয়ংকর পরিণতির কথা তিনি বলেছেন, তার কিছুটা হলেও তো তা তোমাদের গ্রাস করবে। আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী মিথ্যাবাদীদের সঠিক পথ দেখান না।” (সূরা আল-মুমিন : ২৮)।
এই ব্যক্তি যিনি ঈমানদার ছিলেন, কিন্তু কৌশলগত কারণে তিনি তার ঈমান গোপন রেখেছিলেন। অধিকাংশ তাফসিরকারকের মতে, তিনি ফেরাউনের আত্মীয় বা মন্ত্রী ছিলেন। ঈমানের কথা প্রকাশ করলে ফেরাউনের পক্ষ থেকে তার প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সময়মতো তিনি অত্যন্ত কৌশলে যুক্তি দিয়ে মূসা আ.-এর পক্ষে কথা বলেছেন। কুরআনে মূসা আ. ও ফেরাউনের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মূসা আ. ও তার ভাই হারুন আ.কে ফেরাউনের কাছে দাওয়াত দেওয়ার জন্য আদেশ দেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমরা মূসাকে পাঠিয়েছিলাম আমাদের নিদর্শন ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ।’ (সূরা আল- মুমিন : ২৩)।
সুস্পষ্ট প্রমাণ ও নিদর্শন পাওয়ার পর ফেরাউন মূসা আ.-কে হত্যা করতে চাইলো।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ফেরাউন বলল, তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসাকে কতল করে ফেলবো। সে তার প্রভুকে ডেকে দেখুক (তাকে রক্ষা করতে পারে কিনা)।’ (সূরা আল- মুমিন : ২৬)।
তখন ফেরাউনের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য, যার কথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা মুমিনের ২৮নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে মূসা আ. এর পক্ষে কথা বলেছেন।
তিনি আরো বললেন, ‘হে আমার জাতির ভাইয়েরা! আজ তোমরা রাজত্বের অধিকারী এবং এই ভূখণ্ডের বিজয়ী শক্তি। কিন্তু আল্লাহর আযাব এসে পড়লে তোমাদের সাহায্য করার কে আছে?’ (সূরা আল-মুমিন : ২৯)।
তিনি তার এক দীর্ঘ বক্তব্যে ফেরাউনের কর্মকাণ্ডের যুক্তিনির্ভর পর্যালোচনা করেন। মূসা আ. সম্পর্কে তিনি বললেন যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যার ক্ষতি নিজের ওপরে পড়বে।
ফেরাউনের মতো শক্তিশালী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলতে তিনি ভয় পাননি। এই সত্য কথা বলা একজন ঈমানদার মুমিনের দায়িত্ব। প্রশ্ন আসতে পারেÑ তিনি তার ঈমানের কথা কেন গোপন রেখেছিলেন? এটি ছিল তার কৌশল ও প্রজ্ঞা। তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা যেমন ভেবেছিলেন, তেমনি সময়মতো সত্য কথা বলতেও পরোয়া করেননি। এটিকে ‘হিকমাহ’ বলা হয়, যা তিনি অবলম্বন করেছিলেন। আল্লাহর কাছে এটি পছন্দনীয় ছিল। তাই তিনি তার কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকো হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)।
এখন আসি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দান এখন উত্তপ্ত। বিশেষ করে ছাত্র অঙ্গন। ‘গুপ্ত’ কথাটি ছাত্ররা একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও এই শব্দটি বিশেষ এক ছাত্র সংগঠনকে উদ্দেশ করে তার নির্বাচনী জনসভায় বলেছেন। গুপ্ত শব্দটি এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়। সূরা মুমিনে যে মুমিন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, সেই সময়টা ছিল ফেরাউনের স্বৈরশাসনের আমল। ফেরাউনের অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে কৌশলগত কারণে সত্যকে সত্য হিসেবে জেনেও মুমিন ব্যক্তিটি নিজেকে প্রকাশ করেননি। কিন্তু সময়মতো তিনি চুপ করে থাকেননি। এদিকে হাসিনার স্বৈরশাসনের আমলে শুধু হাসিনার স্বৈরশাসনের কথাই কেন বলি? অতীতে ১৯৮৬ থেকে শুরু করে ছাত্রশিবির অব্যাহতভাবে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ১৯৬৯ সালে শহীদ আবদুল মালেকের হাত ধরে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের শহীদের মিছিল দীর্ঘ। গুম-খুন নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে আছে। প্রতিনিয়ত স্লোগান দেওয়া হতো, ‘একটা একটা শিবির ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর।’ আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। এমনকি আসিফ নজরুলের লেখাÑ ‘আমি আবু বকর’ বইটিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বড় ভাই’দের কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও উঠে এসেছে। এমনকি বিশ্বজিৎ নামে হিন্দু ছেলেটিকেও শিবির সন্দেহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এসব বিবরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিবির নিষিদ্ধ ছিলো। এই কর্মকাণ্ড ছিল সম্মিলিত, ছাত্রলীগ-ছাত্রদল মিলেই এসব কিছু করেছে। কারণ একটাইÑ ইসলাম। ইসলামের অনুসারী হওয়ার কারণে শিবির নৈতিক দিক থেকে দৃঢ়, শক্তিশালী, ভালো ছাত্র, সুশৃঙ্খল এবং বিবেকবান। এদের মোকাবিলা করার মতো অবস্থান অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর কোনোদিনই ছিলো না। তাই তাদের ওপর পেশিশক্তি প্রয়োগ করে কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হতো। ১৯৭৩-৭৪ সালে আমি ছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যদিও শিবিরের তখন জন্ম হয়নি, কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তো থেমে ছিল না। বিনোদপুর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের লোকের কাছে শুনতাম, সাধারণ মানুষ নাকি এদের জামাই হিসেবে পছন্দ করে।
২০২৪-এর স্বৈরশাসনের পতনের পর পরিস্থিতি-পরিবেশ একটু অনুকূল হওয়ায় শিবির ব্যাপক পরিসরে কাজ করছে। এদের গঠনমূলক, মানবকল্যাণ, ছাত্রবান্ধব কার্যক্রমে সবাই মুগ্ধ। যার কারণে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একচেটিয়া বিজয় পেয়েছে। এটাই এখন সবার মাথাব্যথার কারণ। শুরু হয়েছে গুপ্ত ‘ট্যাগিং’।
একটি আদর্শকে মোকাবিলা করতে হলে তার চাইতে বেশি আদর্শবান হতে হয়। জুলুম-নির্যাতন করে আদর্শকে ধ্বংস করা যায় না। আল্লাহ মানুষকে তৈরি করেছেন ভালো-মন্দের স্বাভাবিক জ্ঞান দিয়ে, একজন চোরও জানে চুরি করা খারাপ কাজ।
আমরা চাই আমাদের এই জন্মস্থান বাংলাদেশ সোনার বাংলা হোক। এদেশের নাগরিকগণ হোক সৎ, সাহসী, কর্মঠ সুনাগরিক। সবাইকে আমরা ভালো হয়ে যেতে বলি। কারো বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। যারা ভালো, তারা আমাদের সাথী, কিন্তু অন্যায়ের সাথে কোনো আপস নেই। আমরা নিজেরা নৈতিকতা থেকে কখনো বিচ্যুত হবো না, ইনশাআল্লাহ।
আজ যারা ক্ষমতায় আছে, তারা যদি অতীতে, স্বৈরাচারের মতো আচরণ করে এবং আদর্শবানদের গুপ্ত হতে বাধ্য করে, তাহলে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হবে। শিবিরের ছেলেরা! তোমরা নীতি-নৈতিকতার ওপর দৃঢ় থাকো। কোনো উসকানিতে পা দেবে না। গঠনমূলক ও জনকল্যাণমূলক কাজে মনোনিবেশ করো। আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন।
সূরা মুমিনে বর্ণিত মুমিন ব্যক্তি তার জাতিকে আহ্বান জানিয়েছেন এভাবেÑ ‘হে আমার কওম! এটা কেমন ব্যাপার, আমি তোমাদের ডাকছি নাজাতের দিকে, অথচ তোমরা আমাদের ডাকছো জাহান্নামের দিকে। তোমরা আমাকে দাওয়াত দিচ্ছো যেন আমি আল্লাহর প্রতি কুফুরি করি এবং তাঁর সাথে শিরক করি। যে ব্যাপারে আমার কোনো ইলম নেই। অথচ আমি তোমাদের দাওয়াত দিচ্ছি মহাপরাক্রমশালী অতীব দয়াবান আল্লাহর দিকে। সন্দেহ নেই, প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, তোমরা আমাকে যেসব জিনিসের দিকে ডাকছো, সেগুলো দুনিয়ার জীবনেও কবুল হওয়ার যোগ্যতা রাখে না, আখিরাতেও না। আমাদের ফিরে যেতে হবে আল্লাহর দিকে। আর অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারীরা হবে জাহান্নামের অধিবাসী। আমি যেসব কথা বলছি, তোমরা অচিরেই তা স্মরণ করবে, আমি আমার নিজের বিষয়টি ছেড়ে দিচ্ছি আল্লাহর ওপর। নিশ্চয় আল্লাহ তার দাসদের প্রতি লক্ষ রাখেন।’ (সূরা আল- মুমিন : ৪১-৪৪)।
আমাদের আল্লাহর দাস হতে হবে। এই দাসদের প্রতি আল্লাহ কী আচরণ করেছেন, সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘ফলে আল্লাহ তাদের রক্ষা করেন তাদের (ষড়যন্ত্রকারীদের) জঘন্য চক্রান্ত থেকে। পক্ষান্তরে নিকৃষ্ট ধরনের আজাবের চক্রে পড়ে যায় ফেরাউনের সাঙ্গ-পাঙ্গরাই।’ (সূরা আল-মুমিন : ৪৫)।
আল্লাহ আমাদের কবুল করুক, আমিন।