তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্ক বলিষ্ঠ কূটনৈতিক বার্তা
১১ জুন ২০২৬ ১০:২৩
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়ন ভারতমুখী নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে বলিষ্ঠ এক কূটনৈতিক বার্তা। তিন দিনের সরকারি সফর শেষে গত ৬ জুন শনিবার ঢাকা ত্যাগ করেছেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর তুরস্কের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করলেন। উল্লেখ্য, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান দেশটির প্রভাবশালী জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (MIT)-এর দীর্ঘ ১৩ বছর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিভিন্ন সংবেদনশীল ঘটনায় তার এই গোয়েন্দা ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে তার আগে বিশেষ সামরিক ও প্রতিরক্ষার বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। এ সফরে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বার্ষিক ‘২+২’ বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে সমঝোতার বিষয়টি তাই খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে পৃথক পৃথক বৈঠক করেছেন। এ বৈঠকে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার এবং প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যৌথ কমিটি গঠনের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সাথেও বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা। জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতারাও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ সফরে ২+২ বৈঠককে খুব গুরুত্বের সাথে দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের একের পর এক নীলনকশার বিরুদ্ধে এ বৈঠক বাংলাদেশকে শুধু সাহসী নয়, সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও শক্তিশালী করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
‘২+২’ বৈঠক কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
‘টু প্লাস টু’ বা ‘২+২’ বৈঠক হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যকার একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। এ কাঠামোর মাধ্যমে দুই দেশের নিরাপত্তা, কৌশলগত সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি পর্যালোচনা ও ত্বরান্বিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তুরস্কের বৈশ্বিক ‘এশিয়া অ্যানিউ’ (Asia Anew) নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অপরদিকে বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তুরস্ক একটি কৌশলগত মিত্র। এ বৈঠকটি উভয় দেশকে এশীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজ নিজ অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
এছাড়া যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো-
১. প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা : গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের ব্যাপক আগ্রহের কথা কারো অজানা নয়। এ বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যৌথ সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো সংবেদনশীল ও বড় সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়টির গুরুত্ব প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলছেন, ‘সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতময় বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের জন্য সামরিক দক্ষতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে তুরস্কের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সহায়তা বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হবে’।
২. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক : দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। বাংলাদেশে তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (Special Economic Zone) প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা আরো এগিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি আসবে। ভারতের শোষণ থেকে মুক্তির নতুন আরেকটি দুয়ার খুলে যাবে।
৩. রোহিঙ্গা সংকট নিরসন : মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন এবং এ মানবিক সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিকভাবে তুরস্ক সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে। এ আলোচনার মঞ্চটি দুই দেশকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে একযোগে কাজ করার সুযোগ করলে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টির ফলে সংকট নিরসন সহজ হবে।
৪. আধিপত্যবাদী আগ্রাসন মোকাবিলা সহজ হবে : ভারতনির্ভর নতজানু কূটনৈতিক জাল থেকে বাংলাদেশকেই অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে। বড় দেশ, শাক্তিশালী দেশ ও স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতাকারী দেশ ইত্যাদি বয়ান তৈরি করে ভারত বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত শোষণ করছে।
দেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম এবং ভাষা ও সংস্কৃতি এহেন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেদিকে প্রতিবেশী আধিপত্যবাদী ভারত তার কালো হাত প্রসারিত করেনি। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিপ্লবের নেপথ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ ভারতীয় দাদাগিরি বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র ক্ষোভ। এ উপলব্ধি থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হয়েছে দেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের নাগপাশ থেকে বের করার জোর তৎপরতা। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার যে কৌশল নিয়েছে সে সম্পর্কে ইতোপূর্বে ‘সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় এ প্রতিবেদকের ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান সহযোগিতা চুক্তি চাণক্যপুরিতে অস্বস্তি’ (১৫ মে ২০২৬) এবং চীন-তুরস্কের প্রযুক্তি, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা) দেশের নিরাপত্তায় সাহসী উদ্যোগ (২১ মে ২০২৬) শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখিত প্রতিবেদন দুটিতে ব্যক্ত আশাবাদের বহিঃপ্রকাশ সদ্যসমাপ্ত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এতে সন্দেহ নেই। এতে চাণক্যপুরিতে অস্বস্তি আরো বেড়েছে।
চাণক্যপুরিতে অস্বস্তি আরো বেড়েছে
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরের ফলে ভারত মূলত তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের কৌশলগত বলয়ের বিস্তার, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কাশ্মীর ইস্যুতে আঙ্কারার ন্যায়সংগত অবস্থানের কারণে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক চাণক্যপুরিতে অস্বস্তি আরো বেড়েছে।
এতে ভারত তাদের তৈরি বয়ান ফেরি করে বাংলাদেশের ওপর একক আধিপত্য বজায় রেখেছিলো। বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্ক যদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়, তবে তা ভারতের আঞ্চলিক একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রভাবের জন্য বড় ধরনের প্রভাব হিসেবে দেখছে।
তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি; বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি (যেমন : বায়রাক্তার টিবি-২) এবং অন্যান্য উন্নত অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশের কাছে বিক্রয় ও যৌথ উৎপাদনের আগ্রহকে ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তুরস্কের ন্যাটোর (NATO) মানদণ্ডের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের কয়েক বিশ্লেষকের মন্তব্যের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিষয়টি খুব সহজেই অনুমান করা যাবে ভারতের উদ্বেগের কারণ।
ভারতের বিশ্লেষকদের অভিমত
কৌশলগত বিশ্লেষক এবং মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (MP-IDSA)-এর সহযোগী ফেলো ড. স্বস্তি রাও ভারতের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম The Print-এ লিখেছেন, “তুরস্কের ‘এশিয়া অ্যানিউ’ (Asia Anew) কৌশলের অধীনে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সাথে সামরিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ভারতের নিরাপত্তা ভাবনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ‘চীন এবং তুরস্কের সাথে যদি বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সুসম্পর্ক তৈরি হয় এবং সেখানে পাকিস্তানের সংযুক্তি ঘটে, তবে দিল্লি এই আশঙ্কায় ভুগবে যে ভারত তার নিজস্ব অঞ্চলেই ভূ-রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা বা বাদ পড়ে যাচ্ছে কিনা।’
ইউরেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক অদিতি ভাদুরী (Aditi Bhaduri) Deccan Herald-এ প্রকাশিত তাঁর বিশ্লেষণ অনুসারে, বাংলাদেশে তুরস্কের এই কৌশলগত পদচিহ্ন বিস্তারের ফলে ভারতকে তার প্রতিবেশীদের ওপর ঐতিহ্যগত প্রভাব বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত যখন ঢাকার সাথে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রত্যাশা করছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশকে নিজের প্রভাব-বলয়ে নেওয়ার জন্য তুরস্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত এবং আদর্শিক উপস্থিতি দিল্লির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।’
ভারতের অস্বস্তির আরো তুরস্কের সঙ্গে চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া রয়েছে। বাংলাদেশে তুরস্কের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেলে, তা পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
এছাড়া গত ১৩ থেকে ১৫ মে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব কমে গেছে, এতে সন্দেহ নেই। মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক গভীর হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যেমন- আল-জাজিরা, দ্য ওয়্যার ও দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের এই চীন সফরের ফলে ওয়াশিংটনের কাছে দিল্লির গুরুত্ব কমে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে একাধিক প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় পরাশক্তি আমিরকার সাথে তাদের সামরিক ও বাণিজ্য চুক্তি আছে। তাই বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে এ পরাশক্তির চোখরাঙানির ভয়ও নেই বলে মনে করে সামরিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, ভারতের অস্বস্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশ সাহসিকতার এ সুযোগ কাজে লাগাতে আন্তরিক হলে পৃথিবীর মানচিত্রে সমৃদ্ধ স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।