সঙ্কটের মুখোমুখি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
৪ জুন ২০২৬ ১০:৩৪
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
দেশের উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ এক গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা প্রশাসনে সংস্কার ও স্বচ্ছতার যে হাওয়া লেগেছিল, তা আবারও থমকে গেছে পুরোনো সেই দলীয়করণ এবং স্বজনপ্রীতির চাদরে। অতিসম্প্রতি একসাথে দেশের ১১টিসহ মোট ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে তীব্র বিতর্ক ও ছাত্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই কি তবে এখনো প্রধান যোগ্যতা? আসলে দেশের মোট ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ পদ্ধতি এক নয়। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি অর্ডার-১৯৭৩’-এর অধীনে মূলত বাংলাদেশের প্রধান চারটি স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো- ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), ২. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), ৩. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এবং ৪. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয় এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব একাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসিত। এর ফলে ভিসি নির্বাচন এবং সিন্ডিকেট ও সিনেট গঠনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব গণতান্ত্রিক নিয়মাবলি অনুসরণ করার আইনি অধিকার রয়েছে। যদিও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হয় না বলে এ প্রতিবেদককে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক ভিসি জানিয়েছেন। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় উল্লেখিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সংসদে পাস হওয়া আইন অনুসারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ অনুসারে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ভিসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিয়োগ দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সার্চ কমিটির সদস্য কারা? তাদের এ কমিটির সদস্য করা হয়েছে কোন যোগ্যতায়? আমি তো দেখছি, এক্ষেত্রে রাজনীতি ও দলীয় আনুগত্যকেই যোগ্যতার ওপরে প্রাধান্য দেয় হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামকে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাবির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত ৩ সদস্যের প্যানেল থেকে রাষ্ট্রপতি ভিসি নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও, বর্তমান ভিসিকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ- ১৯৭৩-এর ১১ (২) ধারা অনুযায়ী অস্থায়ী বা জরুরি অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ায় সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সিনেট অধিবেশন বা প্যানেল নির্বাচন সচল না থাকায় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় মহামান্য চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতি) সরাসরি এই নিয়োগ আদেশ অনুমোদন করেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) স্বায়ত্তশাসিত অধ্যাদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী পরিচালিত হয় না। বরং এটি নিজস্ব সরকারি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বৃত্তি এবং প্রকৌশল শাখার সুপারিশে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের সুনির্দিষ্ট অনুমোদনক্রমে অধ্যাপক ড. একরামুল হককে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে প্রচলিত প্যানেল নির্বাচন বা দীর্ঘায়িত গণতান্ত্রিক বাছাই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও চ্যান্সেলরের বিশেষ নির্বাহী ক্ষমতাবলে নিয়োগ করা হয়েছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক বাছাই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটাতে ‘সাম্প্রতিক জাতীয় ও প্রশাসনিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও চ্যান্সেলরের বিশেষ নির্বাহী ক্ষমতাবলে’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ভিসি নিয়োগ দেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় নতুন ভিসি নিয়োগ দেওয়ার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জনগণ মনে করে, এসব নিয়োগে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক বিবেচনাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোয় এভাবে দলীয়করণের সংস্কৃতি চালু করা জাতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার সেই অগণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা থেকে সরে আসেনি; বরং এখন তা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও বিস্তৃত করা হচ্ছে।’
অবশ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা নতুন নয়। আধিপত্যবাদী শক্তি ও তার দোসররা বাংলাদেশবিরোধী যত ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, সেই তালিকায় তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্বের সাথেই রেখেছে- এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।
ঐতিহাসিক সত্যের সন্ধানে
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আজকের নয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার পর সেই ১৯১২ সালে একটি গোষ্ঠী বন্ধ করতে অপতৎপরতা চালিয়েছিলো। তাদের প্রেতাত্মারা দমে যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন মাথা উচু করে দাঁড়াতে না পারে, সেই অপচেষ্টা চালিয়েছে কলকাতার বাবুরা। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে টিটকারি করে বলতেন, ইস্ট অব মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়, ‘ফাক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’। তাদের সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু ষড়যন্ত্র থামেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেই পরিণত করেছে তাদের ক্রীড়নক। কাগজে-কলমের স্বায়ত্তশাসন আসলে কাজীর গরুর মতো কিতাবি বয়ান।
সবই চলে ক্ষমতাসীন সরকারের আঙুলের ইশারায়। সরকারি রাজনৈতিক নিপীড়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ মন্তব্য করেছেন, “দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ‘টিচিং বিশ্ববিদ্যালয়’ বা কোচিং সেন্টারের মতো পরিচালিত হচ্ছে।” তিনি দাবি করেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি (BRAC University) ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (NSU) যে পরিমাণ গবেষণা করে, তার ‘কানাকড়িও’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে না, সেই সাথে ঢাবির অনেক গবেষণা ‘ফুল প্লেজারাইজড’ বা হুবহু নকল বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন। অবশ্য মন্ত্রিত্ব বাঁচাতে তিনি তার এ মন্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করেছেন। তার এ মন্তব্যের অনেক আগে সেই ১৯৯৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আরো অনেক তীর্যক মন্তব্য করেছেন লেখক ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা। তিনি তার বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস ‘গাভী বিত্তান্ত’তে শিক্ষকদের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ভাই আবেদ, তুমি তো জানো বারো বছর মাস্টারি করলে মানুষ গাধা হয়ে যায়। আমার পঁচিশ বছর চলছে।’… ‘সকলের দৃষ্টির অজান্তে এখানে একের অধিক হনন কারখানা বসেছে, কারা এন্তেজাম করে বসিয়েছেন সকলে বিশদ জানে। কিন্তু কেউ প্রকাশ করে না। ফুটন্ত গোলাপের মতো তাজা টগবগে তরুণরা শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর হনন কারখানার ধারেকাছে বাস করতে করতে নিজেরাই বুঝতে পারেন না, কখন যে তাঁরা হনন কারখানার কারিগরদের ইয়ার দোস্তে পরিণত হয়েছেন। তাই জাতির বিবেক বলে কথিত মহান শিক্ষকদের কারো কারো মুখমণ্ডলের জলছবিতে খুনি খুনি ভাবটা যদি জেগে থাকে তাতে আঁতকে ওঠার কোনো কারণ নেই। এটা পরিবেশের প্রভাব। তুখোড় শীতের সময় সুঠাম শরীরের অধিকারী মানুষের হাত-পাগুলোও তো ফেটে যায়।’
ছাত্রদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের সবচাইতে প্রাচীন এবং সবচাইতে সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি হাল আমলে এমন এক রণচন্ডি চেহারা নিয়েছে। এখানে ধনপ্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। এখানে যখন-তখন মিছিলের গর্জন কানে ঝিম ধরিয়ে দেয়। দুই দলের বন্দুকযুদ্ধে যদি পুলিশ এসে পড়ে, সেটা তখন তিন দলের বন্দুক যুদ্ধে পরিণত হয়। কোমলমতি বালকেরা যেভাবে চীনা কুড়াল দিয়ে অবলীলায় তাদের বন্ধুদের শরীর থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে, সেই দক্ষতা ঠাঁটারি বাজারের পেশাদার কসাইদেরও আয়ত্ত করতে অনেক সময় লাগবে।’ কবি আল মাহমুদের ‘কদর রাত্রির প্রার্থনা’ কবিতায় করা প্রশ্ন- ‘জনতে সাধ জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?’
লেখক ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা, কবি আল মাহমুদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের মন্তব্য ভুল কি সঠিক সেই বিতর্কের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ব্যর্থতায় ক্ষত আরো বাড়বে। কথায় আছে, চোখ বন্ধ রাখলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করেন ভিসিরা। তাদের নিয়োগের যথাযথ নিয়ম আছে। সেই নিয়মের ব্যত্যয় রাজনৈতিক প্রভাবে ঘটলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। তাই সঙ্কটের গভীরে যেতেই হবে, মূল কারণ নির্ণয় করে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সমাধান তালাশ করতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ভিত্তিতে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগের নামে যে বাণিজ্য চলছে, তা দূর করতে পারলে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা যাবে। এতে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।’
সঙ্কটের মূল
আনুগত্যের পুরস্কার বনাম মেধার অবমূল্যায়ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা বা বৈশ্বিক মানের গবেষণার চেয়ে প্রার্থীর ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক নিয়োগগুলোয়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রথা লঙ্ঘন
দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথাগত প্যানেল নির্বাচন বা আইনি বাধ্যবাধকতা অনেক সময়ই আমল দেওয়া হয় না। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, এবারের নিয়োগেও যোগ্য ও নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের অবজ্ঞা করে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের প্রতি অনুগতদের বেছে নেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পাস বনাম বহিরাগত বিতর্ক
অতিসম্প্রতি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) বহিরাগত ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও বহিরাগতদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠানে বহিরাগত কোনো রাজনৈতিক সুবিধাভোগীকে মেনে নেওয়া হবে না। এই দাবিতে ক্যাম্পাসে দিনের পর দিন অচলাবস্থা চলেছে।
ঢাবির একচেটিয়া প্রভাব
ঐতিহাসিকভাবে ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকদের ভিসি হিসেবে বসানোর একটি একচেটিয়া সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এতে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।
উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কীভাবে নিয়োগ হয়
উন্নত দেশে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান, ভিসি অথবা ‘প্রেসিডেন্ট’ নিয়োগ দেয়? অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের এই দলীয়করণের বিপরীতে উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণ পেশাদার, উন্মুক্ত এবং আন্তর্জাতিক মানের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের প্রধান, ভিসি অথবা ‘প্রেসিডেন্ট’ নিয়োগ দেয়। সেখানে রাজনীতির কোনো স্থান নেই। তারা যে প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করেন তা হলো-
১. উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ও গ্লোবাল সার্চ বা Headhuntin পদ্ধতি : যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ বা হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান পদ শূন্য হলে তা গোপন ফাইলের মাধ্যমে পূরণ করা হয় না। বিশ্বজুড়ে শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও জার্নালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। যোগ্যতাসম্পন্ন যে কেউ আবেদন করতে পারেন। বিশ্বমানের কোনো শিক্ষাবিদকে যুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে (Headhunting)।
২. স্বাধীন ‘সার্চ কমিটি’ (Search Committee) : উন্নত বিশ্বে সার্চ কমিটি গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড, শিক্ষক প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং খ্যাতিমান সাবেক শিক্ষার্থীদের (Alumni) সমন্বয়ে। এই কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে। এখানে সরকারের কোনো মন্ত্রী বা রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না। প্রার্থীদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং তাঁদের অতীত গবেষণার রেকর্ড ও ভিশন ডকুমেন্ট যাচাই করা হয়।
৩. গণশুনানি ও ভিশন প্রেজেন্টেশন : ইউরোপের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চূড়ান্ত তালিকায় থাকা ২-৩ জন প্রার্থীকে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামনে একটি ‘ভিশন প্রেজেন্টেশন’ দিতে হয়। তিনি আগামী ৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় নিয়ে যেতে চান, তা সেখানে ব্যাখ্যা করেন। সবার মতামত ও ভোটের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
জুলাই বিপ্লবের চেতনার আলোকে মেধাভিত্তিক দেশ গঠনে সরকারকে তার অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তা না হলে সঙ্কট বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র। সেখানে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়। অতীতে দলীয়করণের কারণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা, সেশনজট ও সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছিল, জনগণ আবারও সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। জুলাই বিপ্লবের পর জনগণের প্রত্যাশা হলো দেশে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পথেই অগ্রসর হচ্ছে। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পর্যন্ত দলীয়করণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের গণতন্ত্র, শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও একাডেমিক যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। অথচ সরকার তা না করে অগণতান্ত্রিক ও পক্ষপাতদুষ্ট পন্থা অবলম্বন করেছে, যা জাতির সঙ্গে প্রকারান্তরে প্রতারণার শামিল।’
কী করা জরুরি? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা রক্ষা করতে হলে ভিসি নিয়োগের এই ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ এখনই ভাঙতে হবে।
শিক্ষাবিদদের অভিমত, সরকারের প্রভাবমুক্ত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এবং স্থায়ী সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে, যা মেধার ভিত্তিতে ভিসি প্যানেল তৈরি করবে। ভিসি হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা (Scopus/Indexed Journal), পিএইচডি তদারকির অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সুনির্দিষ্ট শর্ত থাকতে হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ আইনগুলোর সংস্কারও সময়ের দাবি।
বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের সংস্কার
১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যোগ্য শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়, এটি জ্ঞান সৃষ্টির পবিত্র স্থান। ভিসি যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পান, তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের চেয়ে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল ‘মেরিটক্রেসি’ বা মেধার শাসন। ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে এই চেতনার প্রতিফলন না ঘটলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে আরও তলিয়ে যাবে।