জুলাই বিপ্লবীরা পিছপা হবে না
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫২
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দীর্ঘদিন দেশের মানুষ বাকশাল, স্বৈরতন্ত্র, ডামি নির্বাচন দেখে অতিষ্ঠ হয়েই কিন্তু ৩৬ জুলাই বিপ্লব ঘটিয়েছে ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে। দুনিয়ার ইতিহাস বদলায়ে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ থেকেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, মন্ত্রী-এমপি-আমলা, বিচারপতি, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে বায়তুল মোকাররমের ইমাম পর্যন্ত পাালিয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের কারণেই দেশের হাজার হাজার বিরোধীদলের নেতাকর্মী জেল থেকে মুক্ত হয়েছে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীও মুক্তি পেয়েছিলেন এবং স্বাধীন মানুষ হিসেবে জনতার ভালোবাসা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ১৭ বছর বাধ্যতামূলক পরবাস থেকে দেশে ফিরতে পেরেছিলেন। বর্তমান শিলং সালাহউদ্দিন নামে পরিচিত ডি ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে পেরেছেন জুলাই বিপ্লবের কারণেই।
বিতর্কিত সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সরকার জুলাই বিপ্লবকে হেয় করতে পিছপা হচ্ছে না। প্রায় ৭০% হ্যাঁ ভোটকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নিচ্ছে না। যা দেশের জনগণকে অবজ্ঞা করার শামিল। সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের প্রকাশ্যে ঘোষণাÑ তারা জামায়াত জোটকে সরকারের মেইন স্ট্রিমে আসতে দেয়নি। ভোটের দিনে মানুষের উৎসবমুখর পরিবেশ ভোট দিয়েও রাতের গণনায় ধূলিসাৎ করে জামায়াত জোটকে ক্ষমতার মেইন স্ট্রিমে আসতে দেয়নি কুচক্রী মহল।
তারপরও জামায়াত জোট অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে বিরোধীদল হিসেবে দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ পর্যন্ত সংসদে বিরোধীদল দায়িত্বশীলতার সাথেই তাদের দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সরকারি দলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী জুলাই বিপ্লবের মূলধারা থেকে সরে এসে আগের স্বৈরতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। বিরোধীদল যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সংসদে জনগণের কথা, জুলাই বিপ্লবের কার্যকারিতা বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত রাখলেও সরকারি দল তাদের ২-৩ অংশের ক্ষমতাবলে বাকশালী কায়দায় সংসদ চালাচ্ছে, যা ছাত্র-জনতা ভালোভাবে নিচ্ছে না।
শুরু হয়েছে মাঠে-ময়দানে মিটিং-মিছিল, সেমিনার, মতবিনিময় সভা। ছাত্র-জনতা দীর্ঘদিন সহ্য করেছে। গণভোট উপেক্ষা করে জুলাই সনদ পাস না করার সাহস না দেখানোই ভালো। এ দেশের মানুষ আবেগপ্রবণ, তারা ভাষা আন্দোলনে রক্ত দিয়েছে, ৬৯-এর আন্দোলনে রক্ত দিয়েছে, ৭১ সালে রক্ত দিয়েছে; সর্বশেষ দুর্নীতির রানি হাসিনাকে তাড়াতে রক্ত দিয়েছে ছাত্র, শিশু ও জনগণ। তাই ছাত্র-জনতার রক্তের সাথে গাদ্দারি করলে, বেঈমানী করলে ছাত্র-জনতা আবার জেগে উঠবে।
ছাত্র-জনতার আবেগ-অনুভূতির দিকে নজর দিতেই হবে। শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়া দেশের মানুষের ভাষা বুঝেই দল-মতের বাধা পেরিয়ে সবাইকে নিয়ে চলেছেন। তাই তো তাদের জানাজায় ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি জনতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমরাও দুই জানাজায় উপস্থিত ছিলাম।
আরেকটি বিষয় সরকারি দলকে মনে রাখতে হবে, দেশের বাইরে কোনো শক্তি আপনাদের জনতার ক্ষোভ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আমেরিকা, ইসরাইল ও তার দোসররা টের পাচ্ছে, কত ধানে কত চাল। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে অহেতুক আক্রমণ করে, তাদের নেতাদের হত্যা করে এখন টের পাচ্ছে এর কত মূল্য দিতে হবে। প্রায় দেড় মাস যুদ্ধ করে ইরানকে কাবু করতে পারেনি বলেই আমেরিকা বন্ধুভাবাপন্ন পাকিস্তানকে দিয়ে যুদ্ধবিরতি করার চেষ্টা করছে। ইরান ১০ দফা দাবি করেও এর স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হবে না, যদিও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছে। এর মধ্যেই আবার ইসরাইল লেবাননে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যেই আমেরিকা তার দেশের মানুষের সমর্থন হারিয়েছে ন্যাটোর সমর্থন হারিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থনও আগের মতো নেই। আমেরিকা আর্থিকভাবে এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে যুদ্ধের খরচ মেটানোর চেষ্টা করছে। আমরা কোনো দেশের সাথেই যুদ্ধাবস্থা চাই না। সবাই সৎ প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করতে চাই। কোনো বিরোধ হলে আলোচনার মাধ্যমে মেটাতে চাই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নবী মুহাম্মদের সা. উপস্থিতিতে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছিল একটি অসম ধারাসংবলিত চুক্তি। তাও তিনি ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করে এই চুক্তি করেছিলেন। ঠিকই দেখা গেল পরের বছর নবী মুহাম্মদ সা. তাঁর লোকজন নিয়ে হজ করতে পারলেন এবং হজে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা বিদায় হজের ভাষণ হিসেবে পরিচিত। কারণ এরপর আর তিনি হজ করতে পারেননি। বিদায় হজের ভাষণ এখন মানবজাতির কল্যাণেই গণ্য হয়।
আমরা বলছিলাম, দেশের সরকার যদি ছাত্র-জনতার মতামতকে গুরুত্ব না দেয়, ৭০% লোকের ভোটের সাথে প্রতারণা করে, তবে তাদের অনেক মূল্য দিতে হবে। আমরা দেশের ও সব দলের ভালো চাই। সবাই মিলেই দেশ গড়তে চাই।
দেশের ভালোর জন্য বর্তমান ভূরাজনীতির আলোকে সবার সাথে সম্পর্ক ভালো রেখেই চলতে হবে। আমেরিকা ব্লক ও চায়না ব্লক কারোর সাথেই গড়ে তোলা যাবে না। বর্তমান ইরান-আমেরিকার যুদ্ধের ফলে দুনিয়াব্যাপী যে জ¦ালানির সংকট দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু সহজেই উৎরানো যাবে না। আমাদের মন্ত্রীরা সংসদে যতই বলুক না কেন, দেশে জ¦ালানির ঘাটতি নেই; তা কিন্তু পেট্রোলপাম্পে গেলে মনে হয় না মন্ত্রীদের কথার সাথে কাজের মিল আছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে গাড়িতে জ¦ালানি নেয়া সম্ভব হচ্ছে। বাস্তবতার আলোকে সংসদে সরকারি দলের লোকেরা কথা বললে ভালো। বিরোধীদলের সদস্যদের কণ্ঠরোধ করলে ভালো ফল হবে না। তারা সংসদে কথা না বলতে পারলে মাঠে-ময়দানে তারা বলবে। আর মিডিয়ার প্রচারে কোনো কিছু লুকানো যাবে না।
ভারত ও আওয়ামী লীগের সাথে সরকারের দহরম-মহরম দেশের ছাত্র-জনতা, বুদ্ধিজীবী মহল ভালো চোখে দেখছে না। কয়েকদিন যাবত প্রফেসর দিলারা চৌধুরী তো আক্ষেপ করে বললেন, কথা বলতে বলতে মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে। তিনি উচিত কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। ড. বদিউল আলম, ব্যারিস্টার ফুয়াদ, এডভোকেট শিশির মুনিরসহ আরো উকিল-ব্যারিস্টার জুলাই সনদের গণভোট বাস্তবায়নের ব্যাপারে কড়া বক্তব্য রাখছেন; এমনকি জাতীয় নির্বাচনের বৈধতার ব্যাপারেও রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দেশের চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিছুই কমেনি। কয়েকনি পূর্বে শ্যামলিতে এক ডাক্তারের কাছে চাঁদা দাবি করে যুবদলের একজন ধরাই পড়ে গেছে। সরকারকে মনে রাখতে হবেÑ অন্য সময়ের মতো অনুগত বিরোধীদল কিন্তু এখন না। বিরোধীদলের জামায়াত ঐক্যের এমপিরা এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। আর সরকারি দলের লোকেরা ব্যাংকের ঋণখেলাপি থেকে বিশেষ কায়দায় টাকা খরচ করে এমপি হয়েছেন। তারা তো তাদের খরচের টাকা উঠানোর অপচেষ্টা করবেই। সরকারকে মনে রাখতে হবেÑ জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলের কর্মসূচিও তারা প্রত্যক্ষ করছে। ছাত্র-জনতাকে ফাঁকি দিয়ে ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করা যাবে না। অন্যদিকে জনমানুষের নিত্যপণ্যের দাম চড়া। জ¦ালানির অভাবে দ্রব্যমূল্য আরো বাড়া ছাড়া কমবে না। মানুষের অভাব-অভিযোগ কমাতে না পারলে কোনোভাবেই সরকারের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে না।
সরকারের দখল বাণিজ্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্বৈরাচার হাসিনা পালানোর পর দেশের স্থানীয় সরকারের সব জায়গায় সেবাদান প্রায় বন্ধ রয়েছে। সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক বসাতে ব্যস্ত। তারা আবার জাতীয় নির্বাচনের ব্যর্থ নেতাদের করপোরেশনগুলোয় প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে, যা জনগণ মোটেই মেনে নিতে পারছে না।
অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আগের কথা তো মানুষ ভুলতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব জায়গায় নিয়োগ বাণিজ্য সরকারের খয়ের খাঁরাই দখল করছে। অস্তিত্ব থাক আর না থাক, দলের বা দলের নেতার আনুকূল্য থাকলেই পদগুলোয় নিয়োগ পাচ্ছে দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানেও গভর্নর বসানো হয়েছে ঋণখেলাপি একজন ব্যবসায়ীকে। তিনি তো আর অন্য ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে পারবেন না। গত কয়েকদিন পূর্বে ২০ জন টাকা পাচারকারীর নাম প্রকাশ করেছে মন্ত্রী। তাদের একজন বড় ঋণখেলাপি ও টাকা পাচারকারী এস আলমকে এবং নাসা গ্রুপকে ব্যাংকের মালিকানায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়েছে। একজন পরিচালককে বাদ দেয়া হয়েছে। ৫টি ইসলামী ব্যাংকের সমন্বয়কারী ব্যাংক আবার আগের মালিকদের ফিরিয়ে দেয়ার আইন সংসদে পাস করা হয়েছে।
আইন বিভাগের কার্যকারিতা, গুমের অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমনের অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ অকার্যকর করে ফেলেছে সরকারি দল। মূলত তারা আগের গুম-খুন, টাকা পাচার, দুর্নীতি দমনসহ সবই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে; যা কোনোভাবেই দেশের ছাত্র-জনতা মেনে নিতে পারছে না। আমরা আবার বলতে চাই- দেশটা কারো বাপের না যে, যাচ্ছেতাইভাবে তারা চালাবে। আমরা ছাত্র-জনতা একতাবদ্ধ হচ্ছি আবার একটি বিপ্লব ঘটানোর উদ্দেশ্যে। তাই বলতে চাই- সময় থাকতে ১৩৩ অধ্যাদেশ মেনে নিয়ে বিরোধীদলকে আস্থায় রেখে দেশ চালান, নয়তো হাসিনার চেয়েও অবস্থা খারাপ হবে; যা আমরা ছাত্র-জনতা চাই না।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com