পাখিপাগল মেয়ে
৭ জুন ২০২৬ ১০:৩৪
॥ আনোয়ারুল ইসলাম ॥
রোজ সকালে পাখির কিচির-মিচির গানে ঘুমকাতুরে আদিবার ঘুম ভাঙে। বাড়ির পাশেই বুড়াইল নদীর কোলঘেঁষে শতবর্ষী বটগাছ। এ বটগাছেই প্রতিদিন কমবেশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা দেখা যায়। অতিথি পাখিরাও মাঝে মাঝে এখানে এসে ভিড় করে। দূরদূরান্তের পাখিপাগল মানুষ পাখি দেখার জন্য প্রতিনিয়ত এখানে আসেন। বটগাছের নিচে মিজান মাঝির ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। চায়ের দোকানের সামনে মানুষের বসার জন্য রয়েছে একটি টং। এ টংয়ে বসে মানুষ পাখিদের সৌন্দর্য উপভোগ করে। আদিবাও সকাল-বিকাল এখানে বসে পাখি দেখে। পাখির কিচির-মিচির গান শোনে। পাখির প্রতি তার হৃদয়ের টান আছে। বাড়ির সকলেই তা জানে।
একটি পাখির সাথে আদিবার ভাব জমেছে। প্রতিদিন ফড়িংছানা এনে গাছের নিচে ফাঁকা জায়গায় খেতে দেয়। পাখিটিও গাছ থেকে নেমে আসে এবং ভীতু মনে এদিক সেদিক তাকায় আর খায়। পাখিটি ভয়ে মাঝে মাঝে ফুরুৎ ফুরুৎ করে উড়ে গাছের ডালে বসে। আদিবা দূর থেকে তা দেখে। মনে মনে ভীষণ খুশি হয়। আদিবা এভাবে প্রতিদিন দু’বেলা ফড়িংছানা খেতে দেয়। কিন্তু পাখিটিকে সে চেনে না।
একদিন আদিবা বাবাকে পাখিটির কথা বলে। মেয়ের কথায় বাবা খুবই খুশি হলেন। পরদিন শুক্রবার আদিবা বাবাকে নিয়ে পাখিটির কাছে এলো। সাথে নিয়ে আসা ফড়িংছানা খেতে দিল। পাখা মেলে লেজ গুটিয়ে পাখিটি মাটিতে নেমে ফড়িংছানা খেতে লাগল। আর ভয়ে ভয়ে তাদের দিকে তাকায়। আদিবার বাবা মুগ্ধ হয়ে তা দেখে।
একপর্যায়ে আদিবাকে জিজ্ঞেস করলেন, মা, পাখিটির নাম জানো?
– না বাবা, জানি না।
-এটি আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল।
-বাবা আমার বইয়ে দেখেছি। আজ বাস্তবে জানলাম।
– মিশুক পাখি মা। সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারে।
বাবা-মেয়ের কথার মাঝেই পাখিটি দূরে কোথাও উড়ে গেল। আর দেরি না করে তারা বাড়িতে ফিরে এলেন।
এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে যায়। পাখিটি আর ভয় করে না। ফড়িংছানা নিয়ে গেলে আদিবার মাথায় এসে পড়ে। ফড়িংছানা খেয়ে উড়ে যায়। শিস দিলে আবার মাথায় এসে পড়ে। আদিবা গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে ছেড়ে দেয়। পাখিটিও মায়ায় ভরা আদর আগলে নেয়।
একদিন এক কাণ্ড ঘটে গেল। পাশের বাড়ির রহিম চাচা ধানক্ষেতে কীটনাশক ওষুধ দিলেন। ধানক্ষেতের বিষাক্ত ফড়িং খেয়ে অনেক পাখি মারা গেল। তার আদরের দোয়েল পাখিটাও মরেছে। আদিবা আজ ব্যস্ততার কারণে সারা দিন দোয়েলের কাছে যেতে পারেনি। বিকেলে গিয়ে ফড়িংছানা হাতে নিয়ে শিস দেয়, কিন্তু পাখি আসে না। কোথাও দেখা যায় না। আদিবার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। গাছের নিচে অনেক পাখির নিথর দেহ পড়ে আছে। খুঁজতে খুঁজতে দোয়েল পাখির দেখা পেল। নিথর দেহে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আদিবা নিজের মনকে আর শান্ত করতে পারছে না। হুহু করে কেঁদে ফেলল।
বেদনায় ভারাক্রান্ত মনে পাখিটিকে বাড়িতে নিয়ে এলো। সবাই দেখে কষ্ট পেলেন। শেষে উঠোনের পাশে ফুলবাগানে পুঁতে রাখলেন।
পাখিটি মরার পর থেকে আদিবার মন ভালো নেই। একা একা আনমনে বসে থাকে। মা-বাবা অনেক সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু তাতেও সে স্বস্তি পায় না। দুদিন থেকে স্কুলে যায় না। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার দূড়াগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে সে পড়ে। এ স্কুলের নিয়মকানুন খুবই কড়া। একদিন না গেলে স্যার-ম্যাডামেরা বাড়িতে এসে খোঁজখবর নেন। অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান। হালিম স্যার একটু ব্যতিক্রম। তার খুবই রাগ। স্কুল ফাঁকি পছন্দ করেন না। বিউটি ও সেলিনা ম্যাডাম আদুরে। আদর দিয়ে সবার মন জয় করেন। নিজের সন্তানের মতো আদরে আগলে রাখেন। ইমান স্যার ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। তিনি সাথে সাথেই ফোনে খোঁজখবর নেন।
আজ দুদিন পর সব শিক্ষক বাড়িতে এসে হাজির। আদিবার বাবার কাছে সবকিছু শুনলেন। তাঁরাও শুনে কষ্ট পেলেন।
বিউটি ম্যাডাম আদিবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা, এতে মন খারাপ করতে নেই, আদরের পশুপাখি মারা গেলে সবাই কষ্ট পায়। কিন্তু তা মেনে নিতে হয়। পশুপাখিকে ভালোবাসা, প্রভুভক্তের মতো। দেশে অনেক পাখি আছে। তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো। তাদের ভালোবাসতে শেখো, দেখবে আর দোয়েলের কথা মনে পড়বে না। এভাবেই ভালোবাসা বিনিময় করে বাঁচতে হয়। তা না হলে তিলে তিলে মনটা ভেঙে যাবে। অসুস্থ হয়ে পড়বে।’ সেলিনা ম্যাডামও বললেন, ‘এক ভালোবাসায় জীবন চলে না, হাজার ভালোবাসায় বাঁচতে হয়।’ স্যার-ম্যাডামের সান্ত্বনায় আদিবা একটু স্বস্তি পেল। হঠাৎ রহিম চাচা পেছন থেকে এসে আদিবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা, আমার ভুল হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করে দিস। তুই যেমন কষ্ট পেয়েছিস, আমিও তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি। আমি তোকে পোষার জন্য একটি ময়নাপাখি এনে দিব, তবু তুই কাল থেকে স্কুলে যাস। আর এমন করে বাড়িতে থাকিস না।’