ভূরাজনীতি, ইরানে আক্রমণ, পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ, রমাদান মাস

প্রিন্ট ভার্সন
৫ মার্চ ২০২৬ ২০:০৮

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ রমাদান মাসের বিশেষ গুণাগুণের কথা আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন। এ মাসে গোটা বিশ্বের মুসলমানরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত না খেয়ে থাকে। এর বিনিময়ে মহান আল্লাহ রোজাদারদের গুনাহ মাফ করেন। রিজিক বাড়িয়ে দেন। যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়িয়ে দিনযাপনের জন্য উৎসাহ দেন। এই রমাদান মাসে যদিও বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। মুসলমানরা এ যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
এবারের রমাদানে শক্তিধর আমেরিকা ও যুদ্ধবাজ ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করে সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে। প্রকাশ্য দিবালোকে ঘোষণা দিয়ে একটি দেশে সরাসরি আক্রমণ করায় জাতিসংঘ কী বলে? পূর্ব থেকে কোনো যুদ্ধাবস্থা ছিল না। দেশে দেশে নিজেদের কর্মক্ষেত্র ও বিশেষভাবে বৈদেশিক লেনদেনে পার্থক্য থাকতেই পারে। আলোচনার মাধ্যমে, কূটনৈতিকভাবে দেশে দেশের বিরোধ মেটানোর অনেক উদাহরণ রয়েছে। নবী সা. হুদায়বিয়াতে অসম চুক্তি করে যুদ্ধ এড়িয়ে চুক্তি করেছিলেন। এতে অনেক সাহাবা অসন্তুষ্ট হলেও নবীর নির্দেশ সবাই মেনে নিয়ে মদিনায় ফিরে গিয়েছিলেন।
এবারের আমেরিকা ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণে বহু সামরিক ও বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে ও হচ্ছে। আমরা এ আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদ করি।
ইরানও পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার ঘাঁটিগুলোয় আক্রমণ শুরু করেছে। আহত-নিহত হয়েছে অনেক মানুষ ও সেনা কর্মকর্তা। ইতোমধ্যেই জ¦ালানি ও খাদ্যদ্রব্য আমদানি-রফতানিতে প্রয়োজনীয় নদীপথ হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে গোটা দুনিয়া জ¦ালানি ও খাদ্যদ্রব্য আমদানি-রফতানিতে বিরাট ঘাটতিতে পড়বে। জ¦ালানি তেল সব দেশেই তাদের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য আবশ্যক উপাদান। খাদ্যদ্রব্যও বড় খাত।
গোটা দুনিয়ায় এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য দায়ী আমেরিকা ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। মহান আল্লাহ তায়ালা ইসরাইল ও ইহুদিদের থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করতে বলেছেন। দীর্ঘদিন যাবত ইহুদিদের বসবাস ইসরাইলে, ফিলিস্তিনিদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে আসছে। জাতিসংঘের কোনো নির্দেশ তারা মানছে না। অবৈধভাবে ফিলিস্তিনে ঘরবাড়ি বানাচ্ছে। ফিলিস্তিনে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো আমেরিকার প্রতি অতিমাত্রিক বন্ধুসুলভ আচরণ করার কারণে আমেরিকা ইসরাইলকে সহযোগিতা করতে উৎসাহ পাচ্ছে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি মুসলমানদের পক্ষে কাজ করতো, তবে আমেরিকা ও ইসরাইল এ ভূমিকা নিতে সাহস পেত না।
মুসলমান দেশগুলোর ঐক্য সংস্থা ওআইসির বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জোর দাবি ২০০ কোটি এক আল্লাহপাকে বিশ্বাসীর করাটা স্বাভাবিক। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলোয় মহান আল্লাহ তায়ালা অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছেন, যা গোটা দুনিয়ায় রফতানি হয়। জ¦ালানি তেল সব দেশে অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস। মধ্যপ্রাচ্যে এই জ¦ালানি তেল প্রচুর পরিমাণ মজুদ রয়েছে। তাই ওআইসিকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জন্য অনতিবিলম্বে জরুরি মিটিং ডেকে আমেরিকা ও ইসরাইলের এই আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
অন্যদিকে জাতিসংঘকেও জরুরি মিটিং ডেকে গোটা দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকারক আমেরিকা ও ইসরাইলের এ অমানবিক আক্রমণে প্রতিবাদ করা জরুরি। যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ নেয়া অতিপ্রয়োজন। মানবতাবাদী সংগঠনগুলোকেও বড় ভূমিকা নেয়া এখন প্রয়োজন। প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ মারার আমেরিকা-ইসরাইলের বিরোধী বলিষ্ঠ ভূমিকা নেয়া জরুরি। প্রয়োজনে আমেরিকা ও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও তাদের উৎপাদিত পণ্য বর্জনের ঘোষণা দেয়া জরুরি। এ যুদ্ধে গোটা দুনিয়ায় অর্থনৈতিক দুরবস্থা সৃষ্টি হবে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ এবং ওআইসিকে কার্যকরী ভূমিকা রাখার ব্যাপারে যার যেখানে সুযোগ আছে, চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে কায়মনে দোয়া করতে হবেÑ যাতে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা যায়। কারণ যুদ্ধ কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। এ যুদ্ধে উভয় পক্ষের যে ক্ষতি হচ্ছে এবং হবে, সেই অর্থ দিয়ে দুনিয়ার না খাওয়া মানুষের পুনর্বাসনে খরচ করলে দুনিয়ায় ভুখা-নাঙ্গা মানুষের কল্যাণ হবে। আমরা দুনিয়াতেই এর ফল পাব এবং আখিরাতে মহান আল্লাহ আমাদের কল্যাণের ভাণ্ডার খুলে দেবেন।
আমরা ইরান-আমেরিকায় যুদ্ধের সাথে সাথে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধের কথাও বলতে চাই। দুই মুসলিম দেশের সহাবস্থান আমরা দেখতে পিয়েছিলাম আফগানিস্তানে আমেরিকা, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের দখলের সময়। আফগানিস্তান থেকে হাজার হাজার লোক পাকিস্তানে আশ্রয় পেয়েছিল। ৩টি পরাশক্তিকে আফগানিস্তানের বীর জাতি তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে বর্তমানে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে চলছে। অর্থনৈতিক অবস্থা পূর্বের চেয়ে ভালো। তাদের অর্থের মান অনেক ভালো। হঠাৎ করেই দেখলাম, পাকিস্তান আফগানিস্তানে আক্রমণ করেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আফগানিস্তান। মুসলিম হিসেবে দুটি মুসলিম দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধাটা মোটেই ভালো মনে হচ্ছে না এবং দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর মনে হচ্ছে না। মুসলিম দেশগুলোর উচিত অনতিবিলম্বে এ যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া। ৫৭টি দেশের সংস্থা ওআইসিকে দ্রুত জরুরি মিটিং করে দুই পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধের তাগিদ দেয়া। কোনো ব্যাপারে বিরোধ থাকলে আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা। কারণ যুদ্ধ কারো জন্যই মঙ্গলজনক ভূমিকা রাখে না।
আমরা দুনিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে বলতে পারি মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান গোটা দুনিয়ার মাঝ বরাবর। জনশক্তির দিক থেকে বিশাল, প্রাকৃতিক সম্পদও অনেক অনেক। বিশ্বের জ¦ালানি সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে বড়। তাই মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিয়ে দেশগুলোর সাথে একে অপরের সুযোগ-সুবিধার কথা বিচার করে ঐক্য করতে হবে। কোনো বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, ৫৭টি দেশ যদি একে-অপরের ভালো-মন্দ বিচার করে সবার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে একে অপরের সহযোগিতায় বড় বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দুনিয়ার মধ্যে চমক লাগাতে পারি। খাদ্যদ্রব্য, ওষুধশিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান করে দুনিয়ায় আমরা রফতানির দ্বার উন্মোচন করে বড় আর্থিক লাভের দরজা খুলতে পারি। মুসলমানদের মহান আল্লাহ যে জ্ঞান দিয়েছেন, কুরআনের আলোকে তা দুনিয়াব্যাপী প্রচার-প্রসার করে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।
পূর্বের অনেক আবিষ্কারÑ সেটা জ্ঞানের দিক থেকে হোক বা বিজ্ঞানের আবিষ্কারের দিক থেকে হোক, মুসলমানরা কখনো পেছনে ছিল না। এখনো আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে ওআইসির সহযোগিতায় একে-অপরের সুযোগ-সুবিধা বিচার করে হাতে হাত মিলিয়ে বড় সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারি। জ্ঞান গরিমা ও বিজ্ঞানের উন্নয়ন সবই কুরআনের আলোকে আমরা চিন্তাভাবনা করতে পারি। তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান উদ্যোগ নিলে সুপারপাওয়ার হতে বেশি দিন লাগবে না। তাই আসুন, এই যুদ্ধকালীন অবস্থায় আমাদের মেধা কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা নিই। অন্যদিকে আমেরিকা-ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধের ব্যাপারেও আমরা ওআইসি ও জাতিসংঘকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোগ নিতে পারি। মহান আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমাদের অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ বাস্তবায়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে কাজ করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছেও কায়মনে যুদ্ধাবস্থা দূর করার জন্য দোয়া করতে হবে। মহান আল্লাহ সব পারেন। ধনীকে গরিব আর গরিবকে ধনী তিনিই বানাতে পারেন। আবার মর্যাদা দেয়ার মালিকও তিনি, আবার অমর্যাদাকর অবস্থা তৈরি তিনি করতে পারেন। তিনি শুধু বলেন ‘হও’ হয়ে যায়।’ তাই তাঁর দয়ার ওপর আমাদের ভরসা রাখতেই হবে।
আপনাদের মনে থাকার কথাÑ হযরত ইউসুফ আ.কে কূপ থেকে উঠিয়ে জেলখানায় আবার সেখান থেকে রাজপ্রাসাদে এনেছিলেন এবং মিশরের প্রধান হয়েছিলেন। অন্যদিকে আবরাহার কা’বাঘর ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে এমনভাবে শাস্তি দিলেন যে, তার লাশও পাওয়া যায়নি। এই সাম্প্রতিক বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে কীভাবে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেশছাড়া করলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনার আদালত এটিএম আজহারুল ইসলামকে ফাঁসি দিলেও সেই আদালতের রায়েই মুক্ত হয়ে এখন তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে।
তাই বর্তমানে আমেরিকা ও ইসরাইলের এই অমানবিক আচরণ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শত শত বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার জন্য আমেরিকার ট্রাম্প ও ইসরাইলি নেতা নেতানিয়াহুর জন্য অপেক্ষা করছে সীমাহীন দুঃখ আর অপমানের শাস্তি। এর সাথে যোগ হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য অপমানজনক শাস্তি। সে মসজিদ ভেঙে মন্দির করেছে, যা ক্ষমার অযোগ্য।
আমাদের দেশের প্রতি মহান আল্লাহর রহমত রয়েছে বলেই জুলাই ২০২৪ বিপ্লব ঘটেছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে। এখন জনগণ উৎসবমুখরভাবে নিজেদের ভোট দিতে পেরেছে। ভোট গণনায় কারচুপি করলেও জামায়াত জোট ৭৭ আসনে নির্বাচিত হয়েছে এবং ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশনে এমপিরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরবেন। ইতোমধ্যেই বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, দেশের স্বার্থে কারচুপির পরও নির্বাচন মেনে নিয়ে সংসদে দেশের কথা বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরবেন তারা। ভালো কাজে সহযোগিতা করবেন আর দেশের ক্ষতিকারক কাজে বিরোধিতা করবেন সংসদে এবং রাজপথে। তাই আমরা দেশের ভালো চাই। জনগণের প্রত্যাশিত ভালো দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে যেতে চাই। ইতোমধ্যেই আমেরিকা ও ইসরাইলসহ গোটা বিশ্বে শান্তিপ্রিয় জনগণ মাঠে-ময়দানে বিক্ষোভ করেছেন এ যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য।
মহান আল্লাহ আমাদের এই ভূখণ্ডে সৃষ্টি করেছেন। তাই এ দেশের ভালো-মন্দের জন্য আমাদেরই জবাবদিহি করতে হবে। ভূরাজনীতি, আমেরিকার দম্ভ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ এই রমাদানের পবিত্র সময়ে শুভ পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। মহান আল্লাহ ধৈর্য ধরেন একটা সময় পর্যন্ত। তাই ফেরাউন, সাদ্দাদ, হামানদের যেমন পরিণতি হয়েছে। আজকের এই ইহুদিদের পতন হবে নিশ্চয়ই। আমাদের কায়মনে মহান আল্লাহর কাছে বলতে হবেÑ ‘তুমিই আমাদের অভিভাবক, তুমিই আমাদের সাহায্যকারী’। আমরা বিশ্ববাসীর উন্নতি চাই, অগ্রগতি চাই। বিশ্বকে আমরা জান্নাতের বাগান বানাতে চাই। আখিরাতের সীমাহীন শান্তির পথে চলতে চাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল:rnabi1954@gmail.com­

একেএম রফিকুন্নবী

নজরুল মানস ও ইসলামী সঙ্গীত
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৮

সম্পর্কিত খবর