রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনে ভোট ও ব্যালট

প্রিন্ট ভার্সন
২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪১

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ সাধারণ নির্বাচন। এটি অন্য সাধারণ নির্বাচন থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এবার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি দেশে সুশাসন, গণতন্ত্র, সংস্কারের পক্ষে গণভোট হবে। এ নির্বাচনে বাংলাদেশের ১২ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিগত দেড় দশক ধরে জনগণ তাদের ভোটাধিকার যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি। তাই দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে জনগণ নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার সাথে ভোট দিতে পারবে- এ প্রত্যাশা নিয়ে আছে। এমন প্রেক্ষিতে সারা দেশে ভোট নিয়ে একটি আনন্দঘন পরিবেশ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি ঝুঁকিও বেড়েছে।
এ বাংলা ভূখণ্ডের মানুষ এবারই প্রথম ভোট দিচ্ছেন, এমন না। বিগত একশত বছর যাবত বাংলার জনগণ ভোট প্রদান করে আসছে। তবে তৎকালে সব নাগরিকের ভোটাধিকার ছিল না। রাষ্ট্র আরোপিত শর্তসমূহ পূরণ করে ভোটার হতে হতো। বর্তমানেও সবাই ভোটার হতে পারে না, একটি সহজ শর্ত আছে, তা হচ্ছে বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে ভোটার হতে পারে। আর তৎকালে ছিল সম্পদের মালিকানার পরিমাণ, কর প্রদান ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে ভোটার করা হতো।
আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার পরিবর্তনে নির্বাচন, ভোট, ভোটার ও ব্যালট খুবই পরিচিত উপাদান ও চলক এবং ভোটার তার ব্যালট অস্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা তথা সরকার পরিবর্তন একটি চিরাচরিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি। আর নির্বাচন ও ভোটের প্রক্রিয়ায় মানুষ হচ্ছে মূল উপাদান তথা জনশক্তি। শত শত বছরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির বির্বতনের মধ্য দিয়ে ভোট ও ব্যালটের এ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোট কী
ভোট হলো কোনো সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রতিনিধি নির্বাচনের উদ্দেশ্যে মতামত প্রকাশের একটি আনুষ্ঠানিক মাধ্যম বা পদ্ধতি। এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে নাগরিকরা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে। ভোটকে জনমত প্রকাশ, গণতান্ত্রিক মতামত বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া বলা যায়। এটি মূলত স্বতন্ত্র পছন্দ ও মতামতের সমষ্টি, যার মাধ্যমে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত বা জনশক্তি দ্বারা শাসক নির্ধারিত হয়, বরং কঠিন ভাষায় বললে রাষ্ট্র ক্ষমতার আমূল পরিবর্তন হয়। ভোট দেয়ার অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তিকে ভোটার বলা হয়।
ভোটের মূল কাজগুলো হচ্ছে
প্রথমত, প্রতিনিধি নির্বাচন : ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন, যারা নির্দিষ্ট মেয়াদে জনগণের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ : শুধু নির্বাচন নয়, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে (যেমন- গণভোট বা কোনো সভার প্রস্তাব) মতামত জানাতেও ভোট ব্যবহৃত হয়। ইসলামী ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভোটকে একটি ‘আমানত’ বা সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভোটের মাধ্যমে যেমন সৎ, যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থীকে নির্বাচিত করা যায়, তেমনিভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার আমূল পরিবর্তন হয়। সর্বোপরি ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বস্তরে নেতৃত্বের পরিবর্তন আনা সম্ভব এবং হয়ে থাকে।
ভোটাধিকার ও ব্যালট
ব্যালট হলো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি কাগজের টুকরো বা ভোটদানে ব্যবহৃত একটি ছোট আকারে তৈরি করা হয়ে থাকে। ব্রিটিশ ইংরেজিতে এটিকে সাধারণত ‘ব্যালট পেপার’ বলা হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক সকল নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকে, যা ‘ভোটাধিকার’ নামে পরিচিত। প্রতিটি ভোটার একটি করে ব্যালট ব্যবহার করেন এবং ব্যালট ভাগাভাগি করা হয় না। নির্বাচনে একটি ব্যালট কাগজের টুকরো, যার ওপর একজন প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও দলের নাম লেখা থাকে। অধিকাংশ নির্বাচনে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য মুদ্রিত ব্যালট ব্যবহার করা হয়। ভোটার একটি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে একটি ব্যালট পেপারে গোপনে ভোট দিয়ে নির্ধারিত বাক্সে তা জমা দেন। প্রত্যেক ভোটার একটি করে ব্যালট ব্যবহার করেন এবং ব্যালট ভাগাভাগি করা হয় না। নির্বাচনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এ ব্যালট পেপার থেকে প্রার্থী ও তার প্রতীক গণনা করেই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন।
ভোটের ইতিহাস, কখন কীভাবে ভোট চালু হয়েছে
ভোট বা নির্বাচন পদ্ধতির ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং এটি বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক রূপ লাভ করেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ভোট বা নির্বাচনের ধারণাটি প্রথম চালু হয় প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের দিকে (আনুমানিক ৫০৮-৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সেখানে সরাসরি গণতন্ত্র বা ‘ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি’ চালু ছিল, যেখানে পুরুষ নাগরিকরা সরাসরি আইন ও কর্মকর্তাদের বিষয়ে ভোট দিতে পারতেন।
এথেন্সের সমসাময়িক বা তারও আগে প্রাচীন ভারতে ষোড়শ মহাজনপদ (যেমন- বৃজি বা বৈশালী)-এ প্রজাতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল, যেখানে আলোচনার মাধ্যমে বা ভোটের মতো প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সপ্তম শতকে আরব দেশেও হযরত মুহাম্মদ সা.-এর মদীনার রাষ্ট্র ও খেলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিশিষ্ট নাগরিকদের মতামত ও পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপ্রধান তথা খলিফা নির্বাচন ও গভর্নর নিয়োগ করা হতো।
আধুনিক সমান ভোটাধিকার
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সমান ভোটাধিকার বা Universal Suffrage প্রথম চালু করে নিউজিল্যান্ড। ১৮৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে নারীদেরও ভোটাধিকার প্রদান করে বিশ্বমঞ্চে নজির স্থাপন করে। এর আগে বিশ্বের কোনো দেশেই নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। ব্রিটেনে নারীদের ভোটাধিকার প্রধানত দুটি ধাপে অর্জিত হয়- ১৯১৮ সালে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের (Representation of the People Act 1918) মাধ্যমে ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারীরা প্রথম ভোটাধিকার পান। এরপর ১৯২৮ সালে ‘ইকুয়াল ফ্র্যাঞ্চাইজ অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে পুরুষদের সমান বয়স তথা ২১ বছরে নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করা হয়।
ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ভোট শুরু হয় কবে
১৯০৯ সালে ব্রিটিশ বাংলায় (তথা সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে) নির্বাচনের নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট (যা মর্লি-মিন্টো সংস্কার নামেও পরিচিত)-এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আইনসভায় নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
তবে এই নির্বাচন বর্তমান সময়ের মতো সর্বজনীন ছিল না। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল সীমিত ভোটাধিকার: সম্পত্তির মালিকানা, কর প্রদান এবং শিক্ষার যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে।
পরোক্ষ নির্বাচন : সাধারণ ভোটাররা সরাসরি আইনসভার সদস্য নির্বাচন করতে পারতেন না। স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাগুলো (যেমন মিউনিসিপ্যালিটি ও ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড) নির্বাচনী কলেজ গঠন করে আইনসভার সদস্য নির্বাচন করত।
পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী : এ আইনের মাধ্যমেই প্রথম মুসলমানদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী’ (Separate Electorate) ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে মুসলিম সদস্যরা কেবল মুসলিম ভোটারদের মাধ্যমেই নির্বাচিত হতেন। ১৯০৯ সালের এ আইনের ভিত্তিতে ১৯১০ সালে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নির্বাচিত ভারতীয় প্রতিনিধিরা পার্লামেন্টে অংশগ্রহন করার সুযোগ পান।
বাংলা অঞ্চলে প্রথম ভোট শুরু হয় কবে
ব্রিটিশ ভারতের অধীনে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চল বা তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশে (যেখানে পূর্ব বাংলা অন্তর্ভুক্ত ছিল) জনমতের ভিত্তিতে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে এই প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি (KPP) এবং মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। ফজলুল হক বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ আমলের শেষ প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে, যা ভারত বিভাগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ১৯০৯ ও ১৯১৯ সালের সংস্কার আইনের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক আইনসভা গঠনের জন্য ১৯৩৭ সালের নির্বাচনটিকেই প্রথম মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভোট কি শুধুই অধিকার নাকি দায়িত্ব
আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভোট একটি গুরুত্বপুর্ণ অধিকার ও দায়িত্বও বটে। আমাদের এ ভূখণ্ডে এক শত বছর আগে ভোট প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি নির্বাচন শুরু হলেও তখন আপামর জনগণ সবার ভোটাধিকার ছিল না। অনেক চড়াই-উতরাই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এখন কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের সব স্তরেরই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকেন সাধারণ জনগণের ভোটে। বর্তমানে ভোটার হওয়ার জন্য কঠিন কোনো শর্তাবলী নেই। সাবালক তথা ১৮ বছর বয়সী প্রতিটি সুস্থ নাগরিকই তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। তবে তারপরও জনগণের একটি অংশ এখনো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে সচেষ্ট নয়। যার কারণে জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হার কাক্সিক্ষত মানের হয় না। বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে ৩০-৩৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেনি।
রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনে ভোট
অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তন হতো শক্তি প্রয়োগ তথা যুদ্ধের মাধ্যমে। রাজা বা সেনাপতিগণ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজা বা সম্রাটের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে রাজ্য দখল করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহন করতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে শক্তি প্রয়োগ করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের যুগের অবসান হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ করে একটি দেশ পুরোপুরি দখল করা সম্ভব নয়। এখন দেশের জনগণের ভোটেই রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন হচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জনগণের ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হচ্ছেন। তবে পদ্ধতিগত কারণে বাংলাদেশের জনগণ তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারলেও রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান নির্বাচিত হচ্ছেন পরোক্ষ ভোটে। অবশ্য আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশেই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সাধারণ জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হচ্ছেন। বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়া সরকার গঠিত হয়ে থাকে। যদিও বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অতীত রেকর্ড ভালো না। অধিকাংশ নির্বাচনই কারচুপি, জাল ভোট ও দিনের ভোট রাতে অনুষ্ঠানের কলঙ্কজনক ইতিহাস রয়েছে। তারপরও সাধারণ আশায় বুক বেঁধে থাকে সাধারণ নির্বাচনে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের কাক্সিক্ষত সরকার পাবে।
ভোট প্রয়োগে দায়িত্বানুভূতি এবং কেন ভোট দিতে হবে
ভোটার হওয়ার পাশাপাশি যথাযথ প্রার্থীকে ভোট প্রদানের কাজটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ। কারণ আধুনিক বিশ্বে জনগণের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে। নির্বাচনে ভোট প্রদানের এ দায়িত্ব সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যেমন গুরুত্বারোপ করেছেন তেমনিভাবে মুসলিম স্কলাররাও একে অবশ্য করণীয় কাজ হিসেবে বলেছেন।
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামায়াতে ইসলামীর নিখিল পাকিস্তান সম্মেলনে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। তাতে পরিষ্কার বলা হয়, ‘যেহেতু জামায়াতে ইসলামী তার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংস্কার ও বিপ্লব সাধনের পরিকল্পনার জন্য আইনানুগ পদ্ধতিতে কাজ করতে বাধ্য এবং পাকিস্তানে কার্যত এ সংস্কার ও বিপ্লব সৃষ্টির একটি মাত্র পথ আছে, আর তা হলো নির্বাচনের পথ, যেহেতু জামায়াতে ইসলামী অবশ্য দেশের নির্বাচনসমূহ থেকেও অসম্পর্কিত থাকতে পারে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অথবা প্রয়োজনবোধে উভয় পদ্ধতিতেই সে এতে অংশগ্রহণ করতে পারে।’ (ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, ১৪ পৃষ্ঠা)। ১৯৫৮ সালে জামায়াতে ইসলামী তার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। তাতে তার এ উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়, ‘এমন একটি সত্যিকার গণতন্ত্র কায়েম করা- যাতে নিজেদের পছন্দমতো লোককে ক্ষমতাসীন করতে সক্ষম হবে এবং যাদের তারা পছন্দ করে না, তাদের কর্তৃত্বের আসন থেকে সরিয়ে দিতে পারবে।’ (নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ১৪)। জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক উপায়ে তথা নির্বাচন ও ভোটের মাধ্যমে দেশে আদর্শিক তথা ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম মুফতি শফী (রহ.) এ-সংক্রান্ত একটি পুস্তিকায় লিখেছেন যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট হচ্ছে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি। ১. সাক্ষ্য প্রদান, ২. সুপারিশ ও ৩. প্রতিনিধিত্বের সনদ প্রদান।
অর্থাৎ কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে ওই প্রার্থী ভালো এবং যোগ্য বলে আপনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তিনি ভালো এবং যোগ্য বলে আপনি সুপারিশ করছেন। তিনি ভালো এবং যোগ্য বলে আপনি তার প্রতিনিধিত্বের বৈধতার সনদ প্রদান করছেন।
তবে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য দেওয়াটাই হলো মৌলিক বিষয়। আপনি যার পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন বাস্তবেই যদি তিনি ভালো এবং যোগ্য হন এক্ষেত্রে আপনার সাক্ষ্যটা হবে সত্য সাক্ষ্য, অন্যথায় মিথ্যা সাক্ষ্য। আর মিথ্যা সাক্ষ্য যে কত বড় কবীরা গুনাহ ও হারাম কাজ তা কি কারো অজানা রয়েছে?
সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় হযরত আবু বকর (রা.) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ একদা এক জায়গায় হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় তিনবার সাহাবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি তোমাদের কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে বড় কবীরা গুনাহের কথা বলব?
সাহাবীরা হ্যাঁ সূচক উত্তর দেওয়ার পর তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (এ দুটি কথা বলার পর তিনি সোজা হয়ে বসলেন) এবং বললেন, শুনে নাও! মিথ্যা সাক্ষ্য অনেক বড় কবীরা গুনাহ।
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শামসুদ্দীন যাহাবী (রহ.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে চারটি বড় গুনাহের সমষ্টি বলে আখ্যা দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে- ১. নিজে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার গুনাহ, ২. যার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছে তার ওপর জুলুম করার গুনাহ, ৩. যার পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছে তার ওপরও প্রকৃতপক্ষে জুলুম করছে। কারণ, সে যা কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিল না এ ব্যক্তি মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে তাকে এর অধিকারী করে তুলছে এবং এভাবে তাকে করছে জাহান্নামী। ৪. মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার একটি হালাল কাজকে হারাম বানিয়ে নেওয়ার গুনাহ।
দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক দারুল উলুম’-এ মুফতি মুহাম্মাদ নিমাবি কাসেমী বলেন, ‘যদি ভারতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, এখানে সরকার গঠনের মূল ভিত্তি হলো, নির্বাচন। ফলে অনেক সময় এমন অনাকাক্সিক্ষত দল বা ব্যক্তি ক্ষমতায় চলে আসে যে মুসলমানদের জন্য প্রাণবিনাশী বিষের মত হয়। সুতরাং (এরকম পরিস্থিতিতে) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় ভোট দেয়া কেবল বৈধ নয়; বরং ওয়াজিব থেকে কম বলা যাবে না।’ (মাসিক দারুল উলুম, জুমাদাল উলা ১৪৩৪ হি./মার্চ ২০১৩ ইং) ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক দারুল উলুম’।
ভোট প্রদানের মাধ্যমে কিন্তু একজন ভোটার ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষের বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানই করছেন। একজন ভোটার যদি একজন দুর্নীতিবাজ ও অসৎ ব্যক্তিকে ভালো মানুষ বলে প্রচার করে ভোট চান এবং তাকে ভোট দেন তখন তার এ সাক্ষ্য প্রদানের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে।
ইসলামে কারো পক্ষে-বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া, সুপারিশ করা, সনদ দেওয়া এ তিনটি জিনিসেই গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতরও। তাই সর্বাধিক সতর্কতার বিকল্প নেই। তাই প্রতিটি নাগরিককে ভোট দিতে গিয়ে অবশ্যই প্রার্থীর নৈতিক মান, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ভালো না মন্দ, সৎ নাকি দুর্নীতিবাজ ইত্যাদি বিষয়গুলো জেনে বুঝেই ভোট দিতে হবে।
বিশেষ করে এমন কোনো দল ও প্রার্থীকে ভোট দেয়া যাবে না, যে দল ও প্রার্থী আপনার চিন্তা-চেতনা বিশ্বাস ও আদর্শকে লালন করে না। একজন সচেতন নাগরিক ও মুসলিম হিসেবে আপনাকে এমন প্রার্থী ও দলকেই ভোট দিতে হবে যে দল ও প্রার্থী নিজে সৎ খোদাভীরু এবং যে দল আপনার জন্মভূমিতে আপনার চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের আদর্শকেই লালন করে এবং বাস্তবায়ন করবে। এককথায় বলা যায়, একটি দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও সরকার পরিবর্তনে ভোট ও ব্যালট একটি অপরিহার্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। তাই প্রতিটি মুসলিম নাগরিককে আদর্শিক দল মনোনীত প্রার্থীকেই ভোট প্রদান করতে হবে।

ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া