ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ
১১ জুন ২০২৬ ১০:০৮
সংসদ প্রতিবেদক : জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এ ব্যাংক কোনো একটি দলের নয়। ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক বিএনপিরও আছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও আছে, অন্য ধর্মের মানুষেরও আছে। এটি দেশের মানুষের ব্যাংক। সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে বসে যাবে।’
গত ৯ জুন মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন এসব কথা বলেছেন তিনি। জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি ৬৮ অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান প্রস্তাব করেন, ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সকল প্রকার অন্যায়, অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থে আলোচনা’ প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন অর্থ মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সাইফুল আলম খান মিলন, মার্জিয়া মমতাজ, নূরুন্নিসা সিদ্দিকা।
জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারগুলো ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছিল, অনতিবিলম্বে সসম্মানে সেই মূল্যেই তাদের কাছে আবার শেয়ারগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন শফিকুর রহমান। এরপর সরকার সব নিয়ম-কানুন মেনে বোর্ড গঠন করবে, পরিচালনা করবে, আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে, বলেন তিনি।
ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের আমানতকারীরা তাঁদের অর্থ ফেরত পেতে ভোগান্তিতে আছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন যদি দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকগুলোর একটির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।’
ডা. শফিক বলেন, ‘ব্যাংকটাকে ধ্বংস করেছেন শেখ হাসিনা এস আলমকে তাঁর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা এখন স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি, সেই এস আলমকে আবার ফিরে আসার পথ করা হচ্ছে।’ এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি যখন ডেপুটি গভর্নর, তখন এস আলমের সব অপকর্মের তিনি ছিলেন সহযোগী। সেই হিসেবে তিনি একটা প্রাইজ পেয়েছিলেন।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমার মূল বক্তব্যে যাওয়ার আগে সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব চমৎকার চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। এগুলো একটু স্মরণ করতে চাই। উনি বলেছেন যে, শেয়ারহোল্ডারই শেয়ারহোল্ডার। সে কীভাবে শেয়ারহোল্ডার হয়েছে, এটা পরে দেখা যাবে। এটা পরে কেন? এটা তো আগেই এক্সপোজ হয়ে গিয়েছে। সারা দুনিয়া জানে, উনি জানেন না, উনার মতো একজন বিজ্ঞ মানুষ, আমি এটা বিশ্বাস করি না।
তিনি এস আলম গ্রুপকে উদ্দেশ করে বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে উনি একা নিয়েছেন তার নিজের নামেই ৮২ হাজার কোটি টাকা। আর তার সমুদয় শেয়ার যেগুলো তিনি কিনেছেন, ৮২% এর মালিক হয়ে গিয়েছেন, এগুলোর মূল্য হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি কইয়ের তেল দিয়ে শুধু কই ভাজেন নাই, কইও ভাজছেন শোল মাছও ভাজছেন এবং সবগুলা ব্যাংক থেকে ডাকাতি করার টাকা। সেই শেয়ারগুলা কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে, তিনি একটা প্রতিষ্ঠানের নাম এখানে বলেছেন। সবগুলা বলে দিলে ভালো হইতো। এ ধরনের সকল শেয়ারহোল্ডারের ওপরে বিশেষ একটা এজেন্সির মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ ক্রিয়েট করে তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে তাদের শেয়ার হস্তান্তর করতে। এরা তো হস্তান্তরের জন্য এই শেয়ারগুলা কিনে নাই। তারা যুগ যুগ ধরে এই ব্যাংকের সাথে এবং যথারীতি এই ব্যাংক সবাইকে স্যাটিসফ্যাক্টরি সার্ভিস দিয়ে চলছিল, ডিভিডেন্ড দিয়ে চলছিল। একটা মাত্র ব্যাংক যে ব্যাংক তারল্য সংকটে অন্য ব্যাংককেও হেল্প করত। কীভাবে ব্যাংকটা ডাকাতি করে আজকে এটাকে একদম দেউলিয়া করা হয়েছে? এটা করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার। উনি কর্মচারীদের নিয়োগের ব্যাপারে কথা বলেছেন। ১০ হাজার কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সামান্য কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি। পত্রিকায় একটা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। এই ব্যাংকের সমস্ত অতীত ট্র্যাডিশন ভঙ্গ করে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একটা কাগজে কেউ না কেউ সই করে দিয়েছে, এইটাই তার নিয়োগ লেটার।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের এসব ঘটনা ফ্যাসিস্ট আমলে। কিন্তু সালাহউদ্দিন সাহেব একটা অংশ এনেছেন, আরেকটা অংশ আনেন নাই। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পরে, ৫ আগস্টের পরে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি যে তাদের সকলকে আবার পরীক্ষায় আসার জন্য ইনভাইট করা হয়েছিল যে আসেন, বিনা পরীক্ষায় আপনারা চাকরি নিয়েছেন, মিনিমাম নিয়মটা মেনে এখন আপনারা চাকরিতে ফিরে আসেন। তারা কেউ আসেনি। কেন তারা আসলো না?
তিনি আরো বলেন, এই ব্যাংকটা ১৯৮৩ সালের নভেম্বরের তিনটা শাখা দিয়ে বাংলাদেশে তার কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকার লোকাল ব্রাঞ্চ, মতিঝিলে; আগ্রাবাদ, চিটাগাং; তালতলা, সিলেট। পর্যায়ক্রমে তাদের সততা, দক্ষতা, আমানতদারী এবং গ্রাহকদের প্রতি তাদের সেবার মান, এগুলার কারণে অনন্য উচ্চতায় এই ব্যাংকটা চলে যায়। তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) যে সমস্ত অভিযোগ আনলেন, যে কোনো একটা দলের দিকে ইঙ্গিত করে, একেবারে নাম বলে দিলেই পারতেন জামায়াতে ইসলামী। উনি বলছেন যে, মাঝে মাঝে নেকাব খোলা ভালো, এটাও খুলে দিতেন। এখানে নেকাব রাখলেন কেন উনি? যে এখান থেকে ৭০০ কোটি টাকার লোন কে নিয়েছে, এইটা কোনো একটা দলের নির্বাচনী ফান্ডে ফান্ডিং করা হয়েছে। আমি এটা পরিষ্কার জানতে চাই, উনি জামায়াতকে এটার দ্বারা মিন করেছেন কি না? যদি উনি মিন করে থাকেন, আই এম টেকিং অ্যাবসোলিউট চ্যালেঞ্জ। তিনি এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি তাকে একটা মেডেল দিব পার্সোনালি। এরপরে কার ছেলে, কার নাতি, কোন কোম্পানি শুধু ইসলামী ব্যাংক না, যেকোনো ব্যাংক থেকে চুরির টাকাটি অসততার মাধ্যমে কিছু নিয়ে যদি আত্মসাৎ করে থাকে, তার ব্যাপারে অবশ্যই তদন্ত করে স্টার্ন অ্যাকশন দেশের বিদ্যমান আইনে নেওয়া উচিত। এটা আমি শফিকুর রহমান হলে আমাকেও যেন স্পেয়ার করা না হয়।
বিরোধীদলের নেতা বলেন, এই ব্যাংকটিতে ক্ষুদ্র একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমার বসার সুযোগ হয়েছিল ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ছয় বছর। ব্যাংকের বোর্ডে বসতাম, শিখতাম, জানতাম, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বোঝার চেষ্টা করতাম। সেই সময়টায় এই ব্যাংক এককভাবে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ৩২% পর্যন্ত আর্ন করত। তার ডিপোজিট, তার তারল্য, তার ইনভেস্টমেন্ট, সকল টার্নওভারে ইমপ্যারালাল একটা ব্যাংক ছিল। সবগুলো সরকারি ব্যাংক মিলেও তার সমতুল্য ছিল না। কিন্তু তখন বয়ান বানাতেন একজন বিশেষ অর্থনীতিবিদ ডক্টর আবুল বারাকাত। তিনি বলতেন, এখান থেকে জামায়াতে ইসলামী হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আর এই বয়ানের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত এই ব্যাংকে অভ্যুত্থান করা হলো, দখল করা হলো। সাড়ে ১৫ বছর দুঃশাসন চালানো হলো। কই? প্রমাণ কোথায়? সাড়ে ১৫ বছর তো কম না। এখনো আবার একই তালে যদি কথা বলা হয়, আমি বলব আমরা কি আবার সেকেন্ড আবুল বারাকাত হতে যাচ্ছি? আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কোন মহিলার কোন কোটেশন সংসদের মতো একটা প্রেস্টিজিয়াস জায়গায়, এগুলো আসলে আমরা আশা করি না। ঐ মহিলাকে সংসদে হাজির করা হোক। যদি কোনো প্রভিশন থাকে, সংসদে গণশুনানিও হোক। অসুবিধা নাই। আরডিএস প্রকল্প কোনো দলের নয়, কোনো ধর্মেরও নয়। আমি নিজে বোর্ডে ছিলাম, আমি জানি। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখান থেকে বেনিফিশিয়ারি। এখানে দল-ধর্ম দেখা হয় না, এখানে টার্গেট গ্রুপকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১১ হাজার কোটি টাকার একটা রেফারেন্স দিয়েছেন, কে নিয়েছে এইটা? আমি? আমার সহকর্মীরা? যদি এইরকম হয়, দলের ফান্ডে যদি ১ টাকাও আসে, আমি বলব সার্চ লাইট দিয়ে এইটা তালাশ করে আমাদের বিরুদ্ধে যেন অভিযোগ আনা হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ব্যাংকে পরিবর্তন যেকোনো সময় আসতেই পারে। ব্যাংকের স্বার্থে আসতে হবে, গ্রাহকের স্বার্থে আসতে হবে, মালিকের স্বার্থে আসতে হবে। আমি এই ব্যাংকের একজন মালিক। আমার ১০ টাকা মূল্যের একটা শেয়ার আছে। আমি আমার এই শেয়ারের দাবি কখনো ছেড়ে দেব না। আমার এই ১০ টাকা মূল্যের শেয়ারের পক্ষে আমি, আমার রাইট ধরে রাখার জন্য, এস্টাবলিশ করার জন্য যা করা দরকার, তাই আমাকে করতে হবে। আমি তার রাজনৈতিক পরিচয় করব না, আমি করব এই ব্যাংকের একজন গ্রাহক হিসেবে, একজন মালিক হিসেবে। এভাবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা কোনো দোষের বিষয় নয়। আর এই ব্যাংকের গ্রাহক শুধু জামায়াতে ইসলামীর মানুষরাই নয়, এই ব্যাংকের গ্রাহক বিএনপিরও বহু লোক আছেন। আমার পরিচিত অনেক লোক আছেন। অন্যান্য দলের আছেন, অন্যান্য ধর্মের আছেন। এটা সকলের ব্যাংক। এই ব্যাংক একক কারো না। ঐ ব্যাংকের গায়ে লেখা নাই যে এই ব্যাংক এরাই শুধু সুবিধা নেবে, বাকিরা পারবে না, এরাই শুধু গ্রাহক হতে পারবে বাকিরা পারবে না। এই ধরনের কিছু লেখা নাই। এগুলো হলো বানোয়াট বয়ান।
তিনি বলেন, ব্যাংকটাকে ধ্বংস করেছেন শেখ হাসিনা এস আলমকে তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা এখন স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি, সেই এস আলমকেই আবার ফিরে আসার পথ করে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রমাণ এই যে ডেপুটি গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক, তিনি রংপুরের রিজিওনাল ম্যানেজার থাকা অবস্থায়, ডিরেক্টর থাকা অবস্থায় অনিয়মের ৫২ লাখ টাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। তাকে তখন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আর ৫ আগস্টের পর তিনি স্বৈরাচারের দোসর এবং দুষ্কৃতকারী হওয়ার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত এখান থেকে বাধ্য হয়েছেন চলে যেতে। সেই লোকটাকে এনে এখানে বসানো হলো। তিনি যখন ডেপুটি গভর্নর, তখন এস আলমের সকল অপকর্মের তিনি ছিলেন সহযোগী এবং সেই হিসেবে তিনি একটা প্রাইজ পেয়েছিলেন। তার স্ত্রীর নামে ভুয়া কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, সেখানে সাড়ে ৩ কোটি টাকা এক্সিম ব্যাংক থেকে গিফট লোন দেওয়া হয়েছে তাকে। তিনি অসৎ। সেই লোকটাকে এনে একটা বিধ্বস্ত ব্যাংকের মাথার ওপর বসায়ে দেওয়া, এটা কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি আরো বলেন, সরকার অবশ্যই সবকিছু চালাবেন, ক্রেডিট হলেও সরকারের, ডিসক্রেডিট হলেও সরকারের। কিন্তু জনগণের পারসেপশনটা কী এই ব্যাংক নিয়ে, এটা অবশ্যই সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে বলে আমি মনে করি। সরকার বিবেচনায় নিলে দেশ লাভবান হবে, জাতি লাভবান হবে। ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সাথে বসে যাবে। আস্থার এটি একটা পিরামিড। এই পিরামিড হেলে পড়লে অথবা বিধ্বস্ত হয়ে গেলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরেই মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে এবং এই অনাস্থা বাংলাদেশের জন্য কোনো ভালো বার্তা বয়ে আনবে না। যারা রেমিটার, তাদের কষ্টে অর্জিত টাকা বাংলাদেশে পাঠায় পরিবারের জন্য, দেশবাসীর জন্য। তাদের মধ্যেও এখন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমি হজের সফরে মাত্র ১১ দিনের জন্য গিয়েছিলাম, সেখানে এ ব্যাপারে অনেকের উদ্বেগ, সরাসরি প্রশ্ন শোনার সুযোগ পেয়েছি। এতে দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরো বলেন, রেমিট্যান্সপ্রবাহ যদি বাধাগ্রস্ত হয়, আমাদের মাত্র দুইটা সোর্স। একটা রেমিট্যান্স, আরেকটা হচ্ছে আরএমজি। আরএমজিও এখন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করছে। রেমিট্যান্সও যদি বিপদে পড়ে যায়, তাহলে আমাদের দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে কোথায় দাঁড়াবে, মাননীয় স্পিকার? এই সবগুলোই তো আমরা বিপদে পড়ে যাব। এজন্য আমরা অনুরোধ করব, জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে এই শেয়ারগুলো ডাকাতি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, অনতিবিলম্বে সসম্মানে সেই মূল্যেই তাদের কাছে আবার শেয়ারগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এরপরে সরকার সকল নিয়মকানুন মেনে বোর্ড গঠন করবে, পরিচালনা করবে, আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। সন্তান তার মায়ের কোলেই তো নিরাপদ, ওরা তো সৎমা হয়ে এসেছিল। ওদের কোনো দরদ ছিল না, ওরা ডাকাতি করেছে। এখন আবার যদি অসৎ লোকদের দিয়ে এই ব্যাংক পরিচালনা করা হয়, যা আছে তাও শেষ হয়ে যাবে, উধাও হয়ে যাবে। আমাদের উদ্বেগটা এই জায়গায়।
বিরোধীদলের নেতা বলেন, তখন যখন এই সমস্যা দেখা দিয়েছিল, মাত্র ৪ দিনে ওখানে ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে মানুষ উত্তোলন করে ফেলেছিল। আমরা একটি অনুরোধ জানিয়েছিলাম একজন গ্রাহক হিসেবে, ছোট্ট একজন মালিক হিসেবে একটু ধৈর্য ধরুন, ব্যাংকটাকে বাঁচতে দিন। থেমে গিয়েছিল। এখন কী বলব মানুষকে? এখন তো বলার কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। এজন্য আপনার মাধ্যমে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, বিষয়টা নিয়ে তিনি যেন সিরিয়াসলি ভাবেন। কোনো পূর্বধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতেই এই ব্যাংকটাকে বাঁচাতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই ব্যাংক বাঁচলে, তার আগের জায়গায় ফিরে আসলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার ওপরে মানুষের আস্থা আবার ফিরে আসবে।
তিনি আরো বলেন, অর্থনীতির দুই চাকার এক চাকা ব্যাংক, আরেক চাকা স্টক মার্কেট। ব্যাংকে আস্থা ফিরে আসলে অবভিয়াসলি সেই হাত ধরে স্টক মার্কেটেও আস্থা ফিরে আসবে। আমরা আমাদের দেশটাকে সামনে এগিয়ে নিতে যাচ্ছি, এটাই দেখতে চাই। আর লেইম এক্সকিউজ এবং ব্লেইমের যে বিষয়গুলো এখানে চলে আসে, এটা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। অলরেডি ৫টা ব্যাংকের গ্রাহকরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষুকের মতো ঘুরছে। তারা তাদের বিনিয়োগের কোনো রেজাল্ট পাচ্ছে না, তারা তাদের আমানত ফেরত পাচ্ছে না। আবার যদি সর্ববৃহৎ ব্যাংকের একই বিপদ-বিপর্যয় ঘটে, তাহলে আমরা গিয়ে কোথায় দাঁড়াব? আমি আপনার মাধ্যমে একটা প্রতিকার চাই, ব্যাংকটা বাঁচুক- আমরা এইটাই চাই।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অভিযোগ করে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে; কিন্তু এখন উল্টো ব্যাংকের ভেতরে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে।’
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুকের প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, তাঁদের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছিল এবং গ্রাহকদের আস্থাও পুনরুদ্ধার হচ্ছিল; কিন্তু হঠাৎ চেয়ারম্যান পরিবর্তন এবং এমডিকে পদত্যাগে বাধ্য করার কারণ সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা প্রশ্ন করেন, কোন কারণে চেয়ারম্যানকে পরিবর্তন করা হলো, কোন কারণে এমডিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো, সেটি জাতির কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে জুবায়দুর রহমান ও ওমর ফারুককে পুনর্বহাল করে আগের ব্যবস্থাপনা কাঠামো ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেন, এস আলম গ্রুপের বর্তমানে ব্যাংকের ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার ভাষ্য, অন্যান্য শেয়ারধারীর স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে ডিজিএফআইকে দিয়ে জোর করে দখল করে নিয়ে গেছে। তাই প্রকৃত শেয়ারধারীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মালিকানা কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতের এই নায়েবে আমীর বলেন, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাকে ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। সততা ও দক্ষতা ছিল ইসলামী ব্যাংকের মূলশক্তি। সেখানে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে বসানো হলে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
ব্যাংকটিতে আবারও এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে অভিযোগ করে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় এস আলম-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনা হলে গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও অনাস্থা তৈরি হবে।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, ইসলামী ব্যাংককে আগের মতো সৎ, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে এবং তা বৃহত্তর অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা সাধারণ মানুষ এবং ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থাশীল গ্রাহক। তাই তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটি যেন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং অতীতে যেভাবে মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হোক। এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে এই জামায়াত নেতা বলেন, গ্রাহকদের উদ্বেগ দূর করা না হলে আন্দোলনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।