সংকটের মধ্যেই বাড়ছে বিদ্যুতের দাম, কার্যকর হতে পারে ১ জুন
১৪ মে ২০২৬ ১০:২৪
২০ ও ২১ মে শুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
স্টাফ রিপোর্টার : জ্বালানি সংকট তৈরি করে দুই মাস ভোক্তাদের দারুণ কষ্টের মধ্যে রেখেছে দুষ্টচক্র। নানা টালবাহানার পর যখন মূল্যবৃদ্ধি করা হলো, তখন আর কোথাও সংকট থাকলো না। পাম্পে দীর্ঘ লাইনও নেই। সব স্বাভাবিক হয়ে গেল অজ্ঞাত ইশারায়। দেশে বিদ্যুতের সংকটও চলছে, এই সংকটের মধ্যে গ্রাহকরা ঠিকমতো যখন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, ঠিক তখনই নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেয় সরকার। এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠিত হয়, যে কমিটির প্রধান করা হয় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। জানা গেছে, দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিইআরসি সূত্র বলছে, কমিশন সভায় মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আমলে নিয়েছে বিইআরসি। পাইকারির সঙ্গে সমন্বয় করে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছে পিডিবি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় নির্বাহী আদেশে। পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ বাড়ে দাম। প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে এখন ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। আর পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা।
পিডিবির হিসাব বলছে, দেশে আবাসিক বিদ্যুৎ গ্রাহক ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহক লাইফলাইন শ্রেণির, যারা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন। আর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন আরও ২২ শতাংশ গ্রাহক। তবে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন ১ কোটি ৫৩ হাজার ৮৬২ গ্রাহক। বাকি চারটি ধাপ যথাক্রমে ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী (১২ শতাংশ)।
এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে নতুন কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ (স্ল্যাব) বদল করে আয় বাড়াতে চায় সংস্থাটি। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাতে পারেন গ্রাহকদের একটি বড় অংশ। এছাড়া বছরে দুবার দাম সমন্বয় চায় পিডিবি। পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকের ওপর বাড়তি বিলের চাপ তৈরি হতে পারে। তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা মাসে ২০০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এমন গ্রাহকরা সাধারণত বাসায় নিয়মিত একাধিক বাতি, ফ্যান, ফ্রিজ ও টিভি চালাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহক। এটি সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ধাপ। যারা মূলত বাতি ও একটি ফ্যান চালান। এরপর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের গ্রাহক। প্রস্তাব অনুযায়ী, লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়বে না। তবে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেই গ্রাহককে বাড়তি দামের আওতায় পড়তে হবে।
পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকের ওপর বাড়তি বিলের চাপ তৈরি হতে পারে। তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা মাসে ২০০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। বর্তমানে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা দ্বিতীয় ধাপের বিল দেন। পিডিবি এই ধাপটি বদলে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত কম দামের সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। পিডিবির হিসেবে, এ পরিবর্তনে খুচরা পর্যায়ে বছরে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বাড়তি আয় হতে পারে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) থেকেও আয় বাড়ানোর একাধিক পথ খুঁজছে পিডিবি।
পিডিবির প্রস্তাবের প্রভাব বোঝা যেতে পারে মাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের বিলের হিসাব থেকে। বর্তমান নিয়মে তার প্রথম ৭৫ ইউনিটের বিল হয় প্রথম ধাপের দরে, প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। এতে বিল দাঁড়ায় ৩৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাকি ১২৫ ইউনিটের বিল হয় দ্বিতীয় ধাপের দরেÑ প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা। এতে যোগ হয় আরও ৯০০ টাকা। সব মিলিয়ে বর্তমান দরে বিল দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু পিডিবির প্রস্তাব কার্যকর হলে একই ২০০ ইউনিটের পুরোটাই দ্বিতীয় ধাপের দরে হিসাব হবে। এতে বিদ্যুতের দাম না বাড়লেও ওই গ্রাহকের বিল হবে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। অর্থাৎ শুধু ধাপ বদলের কারণেই তার বিল বাড়বে ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা।
এর সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। তারা প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করতে চায়। সেটি কার্যকর হলে মাসে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল হবে ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ তার মাসিক বিল বাড়বে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর বাইরে বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট যুক্ত হবে।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গরিব মানুষের বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় না সরকার। তাই প্রথম দুটি শ্রেণিতে দাম না বাড়িয়ে দ্বিতীয় ধাপ থেকে স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছ। এর ফলে যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা আর প্রথম ধাপের কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা পাবেন না। বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পিডিবির আগে নিজেদের অযৌক্তিক খরচ কমানো উচিত। তা না করে তারা গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা তুলতে চাইছে।
বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য গত ৩ মে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে বলা হয়, চলমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ে গত ২৭ এপ্রিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। পাইকারি পর্যায়ে ২১ শতাংশ (প্রতি ইউনিটে দেড় টাকা) ও সে অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো এবং ধাপ পরিবর্তন করে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ মে বিইআরসিতে প্রস্তাব জমা দেয় পিডিবি। পাইকারির সঙ্গে খুচরা দামও বাড়ানোর প্রস্তাব করে তারা। এরপর অন্য পাঁচটি বিতরণ সংস্থাও পাইকারির সঙ্গে মিলিয়ে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করে। গত ৫ মে এটি আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি করে বিইআরসি। আগামী ২০ ও ২১ মে শুনানি ডেকেছে কমিশন। আগামী ১ জুন থেকে বাড়তি দাম কার্যকরের প্রস্তাব করেছে পিডিবি।