আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দাদের অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য


২৭ জুন ২০২৬ ১১:৫৫

॥ ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস ॥
সূরা ফুরকানের শেষ কয়টি আয়াতে কারীমায় মুমিনদের পরিচয়, আচরণ ও কয়েকটি অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে কারীমাহগুলোয় তাঁর রহমান নামের সাথে সম্পর্কিত করে তাঁর অনুগত প্রিয় বান্দাদের আমল-আখলাক ও অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। এ আয়াতে কারীমাহগুলোয় ‘রহমানের বান্দা’ মুমিনদের বুনিয়াদী বা মৌলিক পরিচয় তুলে ধরে মুমিনদের কয়েকটি আচরণ বা গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে গুণগুলো তাদের বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তার পরম প্রিয় বান্দায় পরিণত করেছে। বিশেষ করে রাতের ইবাদত মুমিনদের মানোন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমেই আল্লাহ তায়ালা তাদের ‘রহমানের বান্দা’ হিসেবে পরিচয় করে এরশাদ করেন, ‘রহমানের (পছন্দনীয়) বান্দা তারাই যারা পৃথিবীর বুকে নম্রভাবে চলাফেরা করে, আর মূর্খরা যখন তাদের সাথে কথা বলতে থাকে তখন তারা বলে দেয়, তোমাদের সালাম। আর তারা রাত কাটায় তাদের রবের সামনে সেজদাবনত হয়ে এবং দাঁড়িয়ে এবং তারা দোয়া করতে থাকে, হে আমাদের রব! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। নিশ্চয়ই তার আযাব সর্বনাশা। আশ্রয়স্থল ও বাসস্থান হিসেবে তা বড়ই নিকৃষ্ট জায়গা। এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না এবং তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যের ইবাদত করে না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না, এসব কাজ যারা করে তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেয়া হবে এবং তাতেই সে লাঞ্ছিত অবস্থায় পড়ে থাকবে। তবে তারা ছাড়া, যারা (ওইসব গুনাহের পরে) তাওবা করেছে এবং ঈমান এনে নেক আমল করতে থেকেছে। এ লোকদের গুনাহগুলো আল্লাহ নেকীতে পরিবর্তিত করে দেবেন, আর তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াবান। আর যে ব্যক্তি তওবা করে নেক আমল করে, সে তো আল্লাহর দিকে ফিরে আসে যেমন ফিরে আসা উচিত। এবং (রহমানের প্রিয় বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যার সাক্ষী হয় না, আর যখন কোনো অর্থহীন ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন তারা শরীফ লোকের মতো ভদ্রভাবে তা অতিক্রম করে। এবং তাদের যখন তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেওয়া হয়, তখন তারা তার প্রতি অন্ধ ও বধির হয়ে থাকে না। এবং তারা দোয়া করতে থাকে হে আমাদের রব! আমাদের নিজ নিজ স্বামী বা স্ত্রীদের এবং সন্তানদের আমাদের জন্য চক্ষু শীতলকারী বানাও এবং আমাদের পরহেযগার লোকদের জন্য ইমাম বা আদর্শস্বরূপ বানাও।’ [সূরা আল-ফুরকান : ৬৩-৭৪]।
আলোচ্য সূরা ফুরকানের ৬৩ নম্বর আয়াতে কারীমায় মুমিনদের ‘ইবাদুর রহমান’ বলা হয়েছে। ‘ইবাদ’ শব্দটি ‘আবদুন’ এর বহুবচন, অর্থ-বান্দাগণ। আর ‘রহমান’ শব্দটি আল্লাহ তায়ালার আসমাউল হুসনার মধ্যে থেকে একটি গুণবাচক নাম। তাই ‘ইবাদুর রহমান’ অর্থ ‘রহমানের বান্দাগণ’ অর্থাৎ আল্লাহর বান্দাগণ। যারা স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে দয়াময় আল্লাহ তায়ালাকে তার একমাত্র মনিব, ইলাহ ও রব হিসেবে মেনে নিয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সেই রহমানুর রাহিম আল্লাহ তায়ালারই আনুগত্য করেছে। মনিবের সম্মান সম্ভ্রম রক্ষা করতে স্বেচ্ছায় নিজের যাবতীয় ইচ্ছা-বাসনা ও কর্মতৎপরতাকে আল্লাহর ইচ্ছার অনুগামী করে দিয়েছেন, তাঁর প্রকৃত ইবাদত বা দাসত্ব করেছেন, তারাই রহমানের প্রকৃত বান্দা। একমাত্র মুমিনরাই তাঁর প্রিয় ও আন্তরিকতাসম্পন্ন পছন্দনীয় বান্দা। তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি পাবার হকদার তারাই। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাদের অনন্য বারটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দিয়েছেন।
প্রথম বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ চাল-চলনে হবে অত্যন্ত বিনয়ী : মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রহমানের বান্দাগণ’ যখন যমীনের বুকে চলাফেরা করে তখন অত্যন্ত বিনয় নম্রভাবে চলে। যারা রহমানের অনুগত এবং প্রিয় বান্দা, রাসূল (সা.) এর প্রকৃত অনুসারী, জমিনের বুকে তারা অহংকারীর মতো দর্পভরে বেপরোয়াভাবে চলে না; বরং তারা স্বাভাবিক গতিতে বিনয়-নম্রতার সাথে চলাফেরা করে। অর্থাৎ তারা ভদ্র, মার্জিত, নেক স্বভাবসম্পন্ন, ধৈর্যশীল, সহানুভূতিশীল, বিনয়ী ব্যক্তির মতো চলে। এর মানে এই নয় যে, তারা অত্যন্ত ধীরগতিতে অথবা দুর্বল বক্তির মতো চলে, যেন তাদের দেখলে রোগী বা অক্ষম মনে হয়। নবী করীম (সা.) এর চলার যে বর্ণনা পবিত্র হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, তাতে দেখা যায়, তিনি চলার সময় খুব ধীরগতিতে চলতেন না; বরং কিছুটা দ্রুতগতিতে চলতেন। হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর ভাষ্য অর্থাৎ চলার সময় পথ যেন তার জন্য কুঞ্চিত হয়ে যেত। [ইবনে কাসীর]।
নবী করীম (সা.)-এর চলা দেখলে মনে হত তিনি যেন উঁচু থেকে ঢালুর দিকে নামছেন। হযরত ওমর (রা.) এক যুবককে খুব ধীরে চলতে দেখে জানতে চাইলেন, তুমি কি অসুস্থ? সে বলল, ‘না। তিনি কৃত্রিম বিনয় প্রকাশকারী যুবকটির প্রতি চাবুক উঠান এবং ধমক দিয়ে তাকে সবল ব্যক্তির মতো চলতে বললেন। এ সকল বর্ণনা থেকেও বোঝা যায়, নম্রভাবে চলার মানে একজন ভদ্রলোকের স্বাভাবিকভাবে চলা, যাতে না থাকবে অহংকার ঔদ্ধত্যের ভাব, আর থাকবে না কৃত্রিম দীনতা বা দুর্বলতার ভাব। বিনয় নম্রতা আল্লাহ তায়ালার কাছে এমনি এক পছন্দনীয় গুণ, তিনি নিজে সর্বময় ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও নিজের জন্য নম্রতাকে পছন্দ করেছন। ‘হযরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নম্র, তিনি নম্র স্বভাবকে পছন্দ করেন এবং নম্রতার জন্য এমন পুরস্কার দান করেন যা কঠোরতার জন্য দেন না। নম্রতা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর জন্য তিনি তা দান করেন না।’ [সহীহ মুসলিম]। ‘ইয়াদ ইবনে হিমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট এ নির্দেশ সহকারে ওহী পাঠিয়েছেন, তোমরা পরস্পরের সাথে বিনয়-নম্র আচরণ করবে। এমন কি; কেউ কারো ওপর গর্ব-অহংকার করবে না এবং একজন আরেক জনের ওপর বাড়াবাড়ি করবে না।’ [সহীহ মুসলিম]। আল্লাহর অনুগত বান্দাদের জন্য অপরিহার্য হলো, তার চলাফেরা, ওঠাবসা, লেনদেন তথা যাবতীয় কার্যকলাপে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করা। এ গুণ আল্লাহ তায়ালার নিজের, এ গুণ আল্লাহর রাসূলের। আর তাই যারা আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হতে চায়, সেই মুমিনকেও হতে হবে অবশ্যই নম্র বিনয়ী।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য : মূর্খতার জবাবে মুমিনদের আচরণ হবে শান্তিপূর্ণ : আলোচ্য ৬৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রহমানের প্রিয় বান্দাদের দ্বিতীয় গুণ জানিয়ে দিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, মূর্খরা যখন তাদের সাথে কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে দেয়, তোমাদের সালাম। এ আয়াতে ‘জাহিলুনা’ এর শাব্দিক অর্থ মূর্খরা। তবে আয়াতে শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে মূর্খ বলতে শুধুমাত্র অশিক্ষিত লোকই উদ্দেশ্য নয়; বরং শিক্ষিত লোকও মূর্খসুলভ আচরণ করলে বা জাহেলী ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত হলে সেও এ আয়াত অনুযায়ী জাহেল বা মূর্খ।
‘জাহেল’ শব্দটি ‘জাহালাত’ থেকে উদ্ভৃত। ইসলামী নীতি নৈতিকতা বিরোধী কোনো পথ-পন্থা নীতি অবলম্বন করাই জাহালাত। তেমনটি ইসলামী কৃষ্টি ও সংস্কৃতিবিরোধী কোনো কৃষ্টি সংস্কৃতির অনুসরণ করা এবং ইসলামী আমল আখলাক ও মানসিকতাবিরোধী যে কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়াও জাহালাত। তাই লেখাপড়া জানা শিক্ষিত লোকও ইসলাম বিরোধী নীতি, সংস্কৃতি বা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে সে জাহেল বা মূর্খ। এ শ্রেণির বিদ্বান মূর্খদের সাথে বাগবিতণ্ডা থেকেও মুমিনগণ দূরে থাকে। তাই রহমানের প্রিয় বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মূর্খদের সাথে বির্তকে জড়িয়ে পড়ে না; বরং সযত্নে তাদের এড়িয়ে চলে। আত্মসম্মান বজায় রেখে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আচরণ দ্বারা চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। সালাম শব্দের অর্থ শান্তি। অর্থাৎ মুমিনরা যে জাহেলদের সাথে জাহালাত বা মূর্খতায় লিপ্ত হয় না শুধু তাই নয়; বরং তারা তাদের বলেÑ ‘তোমাদের সালাম’। মুফাসসিরীনগণ এর কয়েকটি মত ব্যক্ত করেছেন-
(ক) মূর্খরা যখন মূর্খতাসুলভ শব্দ দ্বারা মুমিনদের অসৌজন্যমূলক সম্বোধন করে, তখন মুমিনরা তাদের সালাম দিয়ে চলে যায়। এখানে ইসলামের শুভেচ্ছা বাণী ‘সালাম’ অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তারা বলে, তোমাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ শান্তি বর্ষিত হোক। যেমন- আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন : ‘আর যখন তারা কোনো অনর্থক কথা শুনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, আমাদের কাজের ফল আমরা পাব এবং তোমরা পাবে তোমাদের কাজের ফল। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা জাহেলদের সাথে বাগবিতণ্ডায় জড়িত হতে চাই না।’ [সূরা আল-কাসাস : ৫৫]।
(খ) হযরত মুজাহিদ ও মুকাতিল (র.)-এর মত অনুযায়ী এখানে সালাম শব্দের অর্থ নিরাপদ থাকা, যা ‘তাসলীম’ থেকে উদ্ভৃত, অর্থ হলো তারা মূর্খদের কথার জবাবে নিরাপদ কথা বলে, যাতে ঝগড়া বেধে না যায় এবং অন্যেরাও কষ্ট না পায়। এ দ্বারা বোঝা যায়, মুমিন ঝগড়াটে হবে না, হবে শান্তিপ্রিয় এবং শান্তিদায়ক। যেমনÑ আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন : ‘তারা রাগ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাপরায়ণ, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ [সূরা আলে-ইমরান : ১৩৪]।
(গ) কারো কারো মতে এখানে সালাম শব্দের অর্থ হলো, মুমিনরা নিজেরা শক্তি, যুক্তি এবং সমর্থ থাকা সত্ত্বেও জাহেলদের কথা সহ্য করে। পাল্টা জবাব দিয়ে ঝগড়া ফাসাদ বাধায় না এবং তাদের আক্রমণ করার পরিবর্তে ক্ষমা করে। সাথে সাথে তারা সালাম বা শান্তিরক্ষার জন্য সালাম শব্দ বলে মূর্খদের শান্তি পথ অšে¦ষণ করা ও শান্ত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ব্যাখ্যা দ্বারা মুমিন চরিত্রের যে অনুপম বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে, তা হলো, মুমিন ধৈর্যশীল হবার সাথে সাথে শত্রু-মিত্র সকলের জন্য হয় কল্যাণকামী, হিতাকাক্সক্ষী ও পরোপকারী। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন : ‘ক্ষমাশীলতা অবলম্বন কর, সৎকাজের আদেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের এড়িয়ে চল।’ [সূরা আল-আরাফ: ১৯৯]। আল-হাদীসে এ সর্ম্পকে আলোচনা করা হয়েছে : ‘হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে ব্যক্তি বীর নয় যে কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে জয় লাভ করে; বরং প্রকৃত বীর হলো সে যে ক্রোধের সময় নিজেকে সংবরণ করতে পারে। [বুখারী-মুসলিম]।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ রাত কাটায় আল্লাহর ইবাদতে : এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের রাতের জীবনের দৃশ্য বর্ণনা করেছেন। রহমানের বান্দারা আমোদ-ফুর্তি, আড্ডা, নাচ-গান বা অর্থহীন বাজে কাজের মধ্যে দিয়ে তাদের রাত অতিবাহিত করে না। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে অথবা একাকী নিভৃতে সুযোগ পেয়ে কোনো অন্যায় বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় না। আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তারা আল্লাহর ইবাদতে রাত কাটিয়ে দেয়। আয়াতে তাদের দুটি অবস্থা বলা হয়েছে। সেজদারত অবস্থা এবং কিয়াম বা দণ্ডায়মান অবস্থা। দুটি অবস্থাই মূলত নামাজের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ তারা রাতের বেলায় আল্লাহর সামনে কখনো সেজদায় লুটিয়ে পড়ে আবার কখনো অনুগত গোলামের মতো ভয়ে জড়সড় হয়ে দণ্ডায়মান থেকে নামাজ আদায় করে।
‘রাত কাটায় সেজদারত এবং দণ্ডায়মান অবস্থায়’ উক্তির মানে এ নয়, তারা সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত মোটেই ঘুমায় না, শুধু নামাজই পড়তে থাকে; বরং এর অর্থ হলো, তারা যেমন গুনাহর কাজে রাত কাটায় না, তেমনি আঘোর ঘুম বা বিশ্রাম না হলেই নয়, ততটুকু বিশ্রাম তো তাদের নিতেই হবে। তবে তারা সারা রাত ঘুমিয়ে কাটায় না, প্রয়োজন পরিমাণ বিশ্রামের পরই আরাম পরিত্যাগ করে উঠে পড়ে, নামাজসহ বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে বাকি রাতটুকু অতিবাহিত করে। যেমন- ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের পার্শ্বে বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যায় (বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না, উঠে পড়ে), নিজেদের পালনকর্তাকে ডাকতে থাকে ভয়ে ও আশায়। চোখ জুড়ানো কী কী প্রতিদান লুকায়িত রয়েছে এসব লোকদের জন্য তা কেউ জানে না।’ [সূরা সাজদা : ১৬]।
আল্লাহ তায়ালা যেসব মুত্তাকির জন্য জান্নাত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিয়েছেন তাদের গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো : ‘তারা শেষ রাতে জেগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।’ [সূরা আলে-ইমরান : ১৭]। আল-হাদীসে এ সর্ম্পকে আলোচনা করা হয়েছে : ‘আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ফরজ নামাজের পরে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ [মুসলিম]। ‘হযরত আবু উমামা বাহিলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) কোন দোয়া সবচেয়ে তাড়াতাড়ি কবুল হয়? তিনি বললেন, রাতের শেষার্ধের মধ্যভাগের দোয়া এবং ফরজ নামাজের পরের দোয়া।’ [আত-তিরমিযি]।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ আযাব থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করে : এ দুটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের আর একটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তা হচ্ছে দিন ও রাতের জীবনে যথাসাধ্য আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে নিয়োজিত থাকার পরও তারা সব সময় আখিরাতের আযাবের ভয়ে ভীত থাকে। নিজেদের নেক আমলকে তারা আখিরাতের আযাব থেকে বাঁচার জন্য কখনো যথেষ্ট মনে করে না। কারণ তারা জানে, শুধুমাত্র নেক আমল দ্বারাই কেউ জান্নাতে যেতে পারে না। তাই কাতরকণ্ঠে তাদের জাহান্নামের আযাব থেকে দূরে রাখার জন্য মুনাজাত করতে থাকে। কাকুতি-মিনতিভরা আবেদন পেশ করতে থাকে সর্বনাশা আবাসস্থল যন্ত্রণাদায়ক জাহান্নাম খেকে বাঁচার জন্য। দিন ও রাতের ইবাদত তাদের মধ্যে কোনো অংহকার বা নির্ভয়তার সৃষ্টি করে না; বরং আল্লাহর আযাবের ভয়ে তারা ভীত থাকে এবং বলেন ‘হে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে দূরে রাখুন।’ যেমন তারা বলেন, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নফসের ওপর জুলুম করে ফেলেছি, এখন তুমি যদি ক্ষমা না কর, রহমত না কর, তা হলে তো আমরা অবশ্য অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব।’ [সূরা আল-আরাফ : ২৩]। তারা আরো বলেন, ‘হে জান্নাত এবং জাহান্নামের সৃষ্টিকর্তা, আমরা তোমার কাছে জান্নাত চাই এবং তোমার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নাম থেকে।’
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ অপচয় করে না, তারা কৃপণও নয় : আল্লাহ তায়ালা ‘রহমানের বান্দা’ মুমিনদের কয়েকটি গুণাবলি উল্লেখ করে ৬৭ নম্বর আয়াতে কারীমায় বলেন : ‘এবং তারা যখন ব্যয় করে তখন অপচয় করে না এবং কার্পন্যও করে না।’ এ আয়াতে ‘লাম-ইয়াছরিফু’ (তারা অপচয় করে না) বলা হয়েছে। এর শাব্দিক অর্থ-সীমা অতিক্রম করা। শরীয়তের পরিভাষায়- অবৈধ বা গুনাহর কাজে অর্থ ব্যয় করাকে ইছরাফ বা অপচয় বলে; যদিও তা একটি পয়সাও হয়। এ আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর পছন্দনীয় বান্দাদের ব্যয় নীতি তুলে ধরেছেন। ব্যয় মধ্যপন্থা অবলম্বন তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কারণ অপচয় ও কৃপণতা উভয়ই আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), মুজাহিদ, কাতাদাহ, ইবনে জুরাইয (র.)সহ অনেক মুফাসসির বলেন, বৈধ অনুমোদিত কাজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করাও অপচয়। কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করাও আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার শামিল। বৈধ বা ভালো কাজে ব্যয় করাও অপচয়, যদি তা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না হয়ে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়। আল্লাহ তায়ালা অপচয় হারাম করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘কিছুতেই অপচয় করো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই; আর শয়তান নিজ পালনকর্তার প্রতি অতিমাত্রায় অকৃতজ্ঞ।’ [সূরা বনি ইসরাঈল : ২৬-২৭]। তাই বিলাসিতা, হারাম উপায়ে চিত্তবিনোদনের যে কোনো উপকরণ, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন উপলক্ষে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অঢেল খরচ করা যেমন অপচয়, তেমনি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে জনকল্যাণমূলক কাজে খরচ করাও অপচয়।
আলোচ্য ৬৭ নম্বর আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘ওয়ালাম ইক্বতুরু’ (এবং তারা কার্পণ্যও করে না), ‘ইক্বতুরু’ এর শাব্দিক অর্থ ব্যয়ে ক্রটি ও কার্পণ্য করা। শরীয়তের পরিভাষায় যেসব কাজে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা.) ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে কম ব্যয় করা বা ব্যয় না করা। তাই নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের ও নিজ পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ না করা বা প্রয়োজনের তুলনায় কম খরচ করা যেমন কৃপণতা, তেমনি অন্যান্য ভালো কাজে খরচ না করা বা কম খরচ করাও কৃপণতা। আল্লাহ তায়ালা কৃপণতা হারাম করেছেন। ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি তোমার হাত ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখো না, আবার তা সম্পূর্ণরূপে খুলেও দিও না (মুক্তহস্তে অপচয়কারী হয়ো না), তা হলে তুমি তিরস্কৃত এবং নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।’ [সূরা বনি ইসরাঈল : ২৯]। রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন, ‘ব্যয় করতে গিয়ে যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সে কখনো অভাবগ্রস্থ হয় না। [মুসনাদে আহমাদ]। রহমানের পছন্দনীয় বান্দারা বিয়ে-শাদীসহ বিভিন্ন উৎসবে যেমন অঢেল ছড়াছড়ি দেখিয়ে নিজের প্রাচুর্যেও প্রদর্শনী করে না, তেমনি জীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক তথা যাবতীয় দায়িত্ব পালনে সামর্থ্য থাকার শর্তে প্রয়োজনের তুলনায় কমও খরচ করে না। রাসূলে করীম (সা.) আরও বলেন, ‘ব্যয় করতে গিয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।’ [আহমদ, তাবারানী]
ষষ্ঠ-সপ্তম ও অষ্টম বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ আল্লাহর সাথে শিরক করে না, অন্যায়ভাবে হত্যা করে না, ব্যভিচার করে না : সূরা অল-ফুরকানের ৬৮তম আয়াতে করীমায় তিনটি মারাত্মক কবীরা গুনাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনরা এগুলো থেকে বিরত থাকে। তৎকালীন আরবের মুশরিক সমাজে পাপাচারের যে স্রোত প্রবাহিত ছিল, তার মধ্যে এ তিনটি ঘৃণ্য কাজে কম বেশি প্রায় সবাই জড়িত ছিল। আল্লাহ সাথে শিকর, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা এবং ব্যভিচার ছিল সে সমাজে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। তাওহীদ বিশ্বাস স্থাপন করার পরে রাসূলে করীম (সা.)-এর অনুসারী মুমিনগণ এসব থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকেন। পবিত্র কুরআন মজিদে এ সব গুনাহের যেমন নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হচ্ছিল, তেমনি রাসূল (সা.) নিজেও এ কাজগুলোর ভয়াবহ শাস্তি-সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক করেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত, ‘আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ কী? তিনি বললেন, কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা অথচ তিনি প্রত্যেক প্রাণীর স্রষ্টা। আমি বললাম, এ তো নিশ্চয়ই ভীষণ গুনাহ, এরপর কী? তিনি বললেন, তোমার সন্তান তোমার সাথে আহার করবে, এ আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা। আমি বললাম, এরপর কোনোটি? তিনি বললেন, তোমার প্রতিবেশির স্ত্রীর সাথে যেনা করা।’ [বুখারী- মুসলিম]।
আল্লাহ ও রাসূলের এহেন নিষেধাজ্ঞার ফলে তারা এ কাজগুলো থেকে এমনভাবে পবিত্র থাকেন, যাতে এটা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়ে যায়। ফলে এ ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায়, শিরক, মানুষ হত্যা এবং জেনায় নিমজ্জিত সমাজে যে কয়টি লোক এসব কাজ থেকে বিরত হয়েছে, তারা রহমানের বান্দা। রহমানের বান্দারা এসব কাজে জড়িত নয়। যারা এসব কাজে জড়িত, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাদের শাস্তিদানের ঘোষণা দিয়েছেন। সূরা অল-ফুরকানের আলোচ্য ৬৯নং আয়াতে কারীমায় কিয়ামতের দিনে এসব পাপীর শাস্তি বর্ধিত করে দেয়া এবং জাহান্নামের আযাবে চিরস্থায়ীভাবে লাঞ্ছিত অবস্থায় থাকার ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, শিরক, অন্যায়ভাবে হত্যা এবং জেনার জন্য শাস্তি বর্ধিত করে দেয়া এবং চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হওয়ার ঘোষণা কাফের-মুশরিকদের জন্য প্রযোজ্য।
সূরা অল-ফুরকানের আলোচ্য ৭০ নম্বর আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তবে তারা ছাড়া, যারা (ওইসব গুহানের পরে) তাওবা করেছে এবং ঈমান এনে নেক আমল করতে থেকেছে। এ লোকদের গুনাহগুলো আল্লাহ নেকীতে পরিবর্তিত করে দেবেন, আর তিনি বড়ই ক্ষমাশীলও দয়াবান।’ ইমাম কুরতুবী (র.)সহ বিভিন্ন মুফাসসিরের মতে, এ আয়াতে শুধুমাত্র কাফের মুশরিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে। স্মরণ রাখতে হবে, ওইসব কঠিন গুনাহ ক্ষমা করা এবং গুনাহ নেকীতে পরিবর্তিত করে দেওয়ার জন্য অবশ্যই যথার্থ তাওবা, শিরকমুক্ত ঈমান এবং নেক আমল অব্যাহত রাখার শর্ত পূরণ করতে হবে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে এক বৃদ্ধের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। বৃদ্ধ এসে রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিবেদন করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সারা জীবন তো পাপের মধ্যেই কেটে গেলে। এমন কোনো পাপ নেই যা আমি করিনি। আমার পাপ যদি দুনিয়ার সব মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেই, তবে তাদের সবাইকে পাপের সাগরে ডুবিয়ে দেবে। এখন কি আমার ক্ষমার কোনো পথ আছে? রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ? বৃদ্ধ বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো এলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। রাসূল রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যাও আল্লাহ তোমার পাপ নেকীতে পরিণত করে দেবেন। বৃদ্ধ বলল, আমার সকল পাপই কী তিনি ক্ষমা করে দেবেন? রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তোমার সব পাপ তোমার সব অপরাধই তিনি ক্ষমা করে দেবেন। [ইবনে কাসীর]।
সূরা অল-ফুরকানের আলোচ্য ৭১ নম্বর আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তওবা করে নেক আমল করে, সে তো আল্লাহর দিকে ফিরে আসে যেমন ফিরে আসা উচিত।’ এ আয়াতে কারীমা আগের আয়াতের মতোই তাওবা সম্পর্কিত। পার্থক্য পূর্ববর্তী আয়াতে তাওবা ও নেক আমলের সাথে ঈমান আনার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু এ আয়াতে শুধু তাওবা ও নেক আমলের কথা বলা হয়েছে, ঈমানের কথা বলা হয়নি। এ দ্বারা বোঝা যায়, এ আয়াত ঈমানদার পাপীদের তাওবার ব্যাপারে প্রযোজ্য। কারণ তাদের ঈমান আনার কথা বলা হয়নি। ঈমানদার হওয়া অবস্থায় অসাবধানতায় অথবা শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে যারা পাপের কাজ করে ফেলেছে, এ আয়াতে তাদের তাবার ব্যাপারে বলা হয়েছে। তারা তাওবা করে আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে এলে যার কাছে ফিরে আসা উচিত তাঁর কাছেই ফিরে আসে। অর্থাৎ তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা- এটা তাদের সঠিক কাজ।
নবম বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ মিথ্যার সাক্ষী হয় না : তিনটি মারাত্মক গুনাহ থেকে বিরত থাকা রহমানের প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। এরপর সেসব গুনাহের শাস্তি ও তা থেকে তাওবার আলোচনার পরে আল্লাহ তায়ালা পুনরায় মুমিনদের গুণ-বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিচ্ছেন। ৭২তম আয়াতের ওই অংশটুকুর দুই ধরনের অর্থ হতে পরে : তারা মিথ্যার সাক্ষ্য দেয় না অথবা তারা মিথ্যা প্রত্যক্ষ করে না। অর্থাৎ জেনে-শুনে প্রকৃত সত্যের বিপরীত কোনো সাক্ষ্য তারা দেয় না। এটা মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মিথ্যা সাক্ষ্যদান একটি অতি বড় জঘন্য কবীরা গুনাহ। এতে উপর্যুপরি কয়েকটি মারাত্মক গুনাহ সংঘটিত হয়। যার মধ্যে অবশ্যম্ভাবী একটি হল মিথ্যা বলা। এ মিথ্যা বলাই অনেক বড় ভয়ংকর গুনাহ। যে ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলে, ‘আল্লাহ তায়ালা অপব্যয়ী মিথ্যাবাদীকে হেদায়াত করেন না।’ [সূরা আল-মুমিন : ২৮]। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘তোমরা মিথ্যা থেকে আত্মসংবরণ করো।’ [সূরা আল-হজ : ৩০]।
মিথ্যা সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে মিথ্যা বলার জঘন্য গুনাহসহ আর কয়েকটি গুনাহ একাধারে সংঘটিত হয়। যেমন-এর দ্বারা যার বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে তার হক নষ্ট করার দ্বারা তার প্রতি জুলুম করা হচ্ছে। অন্যদিকে যার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া হচ্ছে, তার জন্য বৈধ সাব্যস্ত করে তার প্রতি জুলুম করা হচ্ছে হারাম। যে হারামের জন্য সে জাহান্নামের উপযোগী হচ্ছে। মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারা কোনো নিষিদ্ধ সম্পদ, প্রাণ বা ইজ্জত-সম্মানের ওপর অন্যের হস্তক্ষেপ বৈধ করে দেয়া হয়। এজন্যই রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মিথ্যা সাক্ষ্যদান শিরকের সমান। [আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ।] নবী কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, কিয়ামতের দিন মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার জন্য জাহান্নামের ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত সে পা নাড়াতে পারবে না। [ইবনে মাজাহ]।
আয়াতে কারীমায় উল্লেখিত ‘ইয়াশহাদুনা’ শব্দটির আরেকটি অর্থ হয় দেখা, প্রত্যক্ষ করা। এ অর্থ অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবে- তারা মিথ্যা প্রত্যক্ষ করে না। এখানে মিথ্যা অর্থ-সকল বাতিল ও অকল্যাণকর খারাপ আমল। তাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা হল শিরক ও কুফর, তারপর অন্যান্য পাপাচার। মুমিনরা এগুলো প্রত্যেক্ষ করে না, অর্থাৎ এসব গুনাহের কাজের বৈঠক বা মজলিসসমূহে উপস্থিত হয়ে তারা এগুলো দেখে না, এতে অংশ গ্রহণ করে না, এর স্বাদ আস্বাদন করে না, এর সাথে জড়িত থাকে না, এর সাহায্য-সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতার ধারে-কাছেও যায় না। মুমিনরা আল্লাহর নিষিদ্ধ যে কোনো ধরনের বৈঠক এড়িয়ে চলে। মুফাসসিরদের ভাষায়- এসব বৈঠক হলো মুশরিকদের আনন্দ উৎসব, মেলা, পার্বন, গান-বাজনার মসলিস, নির্লজ্জতা ও নাচ গানের আসর, মদ্যপান করা ও করানোর আড্ডাখানা ইত্যাদি। তাই বলা হয়, শরীয়ত নিষিদ্ধ সকল আনন্দ মেলা, গান-বাজনা, নৃত্য, নাটক, যাত্রা থিয়েটার ফিল্ম ইত্যাদি বৈঠকসমূহে উপস্থিত না হওয়া এবং এগুলো না দেখা মুমিনগণের বৈশিষ্ট্য।
দশম বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ অর্থহীন কাজ থেকে দূরে থাকে : মুমিনরা বাজে, অর্থহীন, ফালতু কাজ নিজে যেমন করে না, তেমনি ঘটনাক্রমে কোনো খারাপ বা বাজে কাজের মজলিসের কাছাকাছি এসে গেলে সেখান থেকে ভদ্রতা বজায় রেখে চলে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) একদিন কোনো উপলক্ষে বাজে মজলিসের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে যান। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পেরে বললেন, ইবন মাসউদ কারীম অর্থাৎ ভদ্র হয়ে গেছে। তারপর তিনি এ আয়াত (ফুরকান-৭২) তিলাওয়াত করেন। যাতে অনর্থক মজলিসের নিকট দিয়ে গমনকালে ভদ্র সম্ভ্রান্ত লোকের মতো চলে যাবার নির্দেশ রয়েছে। [ইবনে কাসীর]। কোনো ভদ্র-সম্ভ্রান্ত নেককার লোকের পক্ষে এটাই শোভনীয় যে উপকারিতা নেই এমন ফালতু কোনো সমাবেশ থেকে সে নিজেকে সযত্নে দূরে রাখবে। বাজে কাজের মহড়ায় অংশ গ্রহণ করবে না। তবে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার যে দায়িত্ব মুমিনের ওপর রয়েছে তা নিয়ম-পদ্ধতি অনুযায়ী পালণ করতে হবে। হৈ-হট্টগোল বা মূর্খতাসুলভ গণ্ডগোল সৃষ্টি করাও ঠিক হবে না। তাই রহমানের অনুগত বান্দারা কোনো বাজে মজলিস অতক্রিমকালে ভদ্রলোকের মতো তা পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
একাদশ বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ আল্লাহর আয়াতের ব্যাপারে গভীরভাবে মনোযোগী : রহমানের বান্দারা আল্লাহর আয়াত দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। যখন তাদের আল্লাহর আয়াত শোনানো হয়, তখন মনোযোগের সাথে তা শ্রবণ করে। তাতে তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং তারা সে আয়াতের উপদেশ অনুযায়ী আমলও করে। তাদের অবস্থা এমন নয়, আল্লাহর আয়াত দেখানো হয়েছে, কিন্তু তারা তা দেখেও না দেখার মতো হয়ে থাকে। যেমন অন্ধকে কিছু দেখানো না দেখানো ফলাফলের দিক দিয়ে সমান। আল্লাহর আয়াত শোনানো হয়েছে, কিন্তু তারা তা শুনেও না শোনার মতো চলে যায়। যেমন বধিরকে কিছু শোনানো এবং না শোনানো ফলাফলের দিক দিয়ে সমান। কুরআন থেকে যারা হেদায়াত গ্রহণ করে না তাদের অবস্থা এমন অন্ধ ও বধিরসদৃশ। উপদেশ তাদের কোনো কাজে আসে না। তারা তা গ্রহণ করে না বরং আল্লাহর আয়াত থেকে মুখ ও মন ফিরিয়ে রাখে। মুমিনদের অবস্থা সেরূপ নয়। তারা তাদের শ্রবণশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আল্লাহর আয়াত গ্রহণ করে এবং তার ওপর চিন্তা-ভাবনা করে। শুধু শুনেই ক্ষান্ত থাকে না, নিজেদের বাস্তব জীবনে তার ওপর যথাযথভাবে আমল করে। এটি রহমানের বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
দ্বাদশ বৈশিষ্ট্য : মুমিনগণ পরিবার-পরিজনের কল্যাণ কামনায় তৎপর থাকে : আল্লাহ তায়ালা ‘রহমানের বান্দা’ মুমিনদের কয়েকটি মৌলিক গুণাবলি উল্লেখ করে ৭৪ নম্বর আয়াতে কারীমায় বলেন, ‘এবং তারা দোয়া করতে থাকে হে আমাদের রব, আমাদের নিজ নিজ স্বামী বা স্ত্রীদের এবং সন্তানদের আমাদের জন্য চক্ষু শীতলকারী বানাও এবং আমাদের পরহেযগার লোকদের জন্য ইমাম বা আদর্শস্বরূপ বানাও।’ মুমিনরা শুধুমাত্র নিজের নেক আমল নিয়েই ব্যস্ত থাকে না। তারা নিজ পরিবার-পরিজনের দোজাহানের কল্যাণ কামনায়ও তৎপর থাকে। নিজ পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব পালনের জন্য যা করা দরকার, তা করে এবং তাদের দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণের জন্য সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রবের কাছে দোয়াও করতে থাকে। তাদের আমাদের চক্ষু শীতলকারী বানাওÑ এ কথার মর্ম হলো, তাদের আমল-আখলাক যেন ভাল হয়, তারা যেন আল্লাহর অনুগত হয়, তারা যেন দোজাহানে সফলকাম হয়। তাদের আল্লাহর আনুগত্যে মশগুল দেখতে পেলেই আমরা তাদের ব্যাপারে প্রশান্তি অনুভব করব। আমাদের মন প্রাণ জুড়িয়ে যাবে।
‘আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম বানাও’- এ কথার অর্থ হলো, আমাদের মুত্তাকি লোকদের জন্য আদর্শ বানাও, আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের আমল-আখলাক যেন এমন হয়, যা মুত্তাকিদের জন্য অনুসারণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। অর্থাৎ আমাদের এমন উন্নতমানের তাকওয়া দান কর যাতে অন্য মুত্তাকিদের জন্য তা শিক্ষণীয় এবং আমরা যে, নেক কাজে তথা তাকওয়া পরহেজগারিতে সকলের অগ্রগামী হতে পারি, যাতে আমাদের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় নেক আমল আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। রহমানের প্রিয় বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করে সূরা আল-ফুরকানে শেষ তিনটি আয়াতে কারীমায় রাব্বুল আলামিন জানিয়ে দিয়েছেন, এরকম বান্দাদের জন্য তিনি অনুগ্রহ করে কি পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। সে পুরস্কার হল জান্নাত। রহমানের প্রিয় বান্দারা জান্নাতে চিরস্থায়ী সম্মান, মর্যাদা ও উত্তম বাসগৃহ লাভ করবে, যেহেতু তারা সবর করেছিল। তাদের সবর বা ধৈর্যের প্রতিদানস্বরূপ সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাদের জান্নাতের বাসগৃহ দান করবেন। কারণ ‘সবর’ বা ধৈর্য ব্যতীত উল্লেখিত বারটি গুণের কোনো একটি গুণও অর্জন করা সম্ভব নয়।
সমাপনী : আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা হিসেবে আমদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে রব হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর পছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের চলাফেরা, ওঠাবসা, লেনদেন তথা যাবতীয় কার্যকলাপে সবার সাথে বিনয়ী হতে হবে, নম্রতা অবলম্বন করতে হবে। কারো মূর্খতাপ্রসূত ঝগড়া, গালি, ঔদ্ধত্য ও দম্ভপূর্ণ উক্তি, অশালীন বাগবিতণ্ডার জবাবে অনুরূপ সৌজন্যবর্জিত, অভদ্র উক্তি বা আচরণ করা যাবে না; বরং রাগ ও কষ্ট হজম করে মূর্খদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে নিজেকে হেফাযত করতে হবে। আত্মিক ও রুহানী শক্তি বৃদ্ধির জন্য যথাসাধ্য দিনে ও রাতে ইবাদতে মশগুল হতে হবে। আল্লাহর আযাব ও গযবের ভয়ে ভীত হয়ে কারত কণ্ঠে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে অপচয় ও কৃপণতা পরিহার করতে হবে। শিরক, অন্যায় হত্যা এবং জিনাসহ যাবতীয় কবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করে নিতে হবে। যাবতীয় অনর্থক ক্রিয়াকর্ম, পাপাচার ও শরীয়ত গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। কায়মনোবাক্যে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ ও হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ আয়াতে কারীমাগুলোর আলোকে এ সকল গুণাবলি অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমিন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাঁথিয়া, পাবনা।