হাজীরা জাতিকে সতর্ক করুন


২৭ জুন ২০২৬ ১১:৫০

॥ জাফর আহমাদ ॥
হে আল্লাহর মেহমানগণ! আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম মিল্লাতের নেতা, মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম আ.-এর ডাকে আল্লাহর ঘর তথা বায়তুল্লাহ, ওয়াদিল মুকাদ্দাস বা পবিত্র উপত্যকা মক্কা-মদিনায় বেশ কিছুদিন বেরিয়ে এলেন। আল্লাহর মেহমানদারীর অনেক কিছুই সেখানে উপভোগ করেছেন। দীন-দুনিয়ার কল্যাণের অনেক নমুনা সেখানে দেখে এসেছেন। আরাফাতের বিশাল ময়দানে মানবতার নবী সা. তাঁর শেষ বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমার এ কথাগুলো পরবর্তী বা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের কাছে পৌঁছে দিও। হতে পারে তারা তোমাদের চেয়ে অধিকতর দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিবে।
হে আল্লাহর মেহমানগণ! এখন বলুন, আপনি আপনার পরিবার, আপনার সমাজ, আপনার দেশ ও জাতির জন্য কি পয়গাম বা বার্তা নিয়ে এলেন? যদি নিয়ে এসে থাকেন, তাহলে কোনো প্রকার দ্বিধা-সংকোচ নয়, সকল প্রকার জড়তা ছাড়াই আপনার পরিবার, সমাজ ও জাতির সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং হযরত ইবরাহিম আ.-এর মতো সগর্বে ঘোষণা দিন যে, হে আমার পরিবার! হে আমার সমাজ! হে আমার জাতি! তোমরা আজ যা করছো আমি সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র সেই প্রভুর দিকে ফিরে যাচ্ছি যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, যার সাথে কোনো শরিক নেই, আসমান জমিনে একমাত্র তাঁর রাজত্বই চলবে। আমি আরো ঘোষণা করছি, সৃষ্টি যার হুকুম চলবে তাঁর। কারণ হজে তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে আমি আল্লাহর কাছে সেই কথাই বলে এসেছি। আমি বলে এসেছি, “আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোন শরিক নাই। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই এবং রাজত্ব তোমারই তোমার কোনো শরিক নেই।” অতএব, হে আমার জাতি! আল্লাহর মেহমানদারীর সময়টাতে একবার-দু’বার নয়, শতবার হাজার বার এই কথা বলে এসেছি। বলে এসেছি রাজত্ব ও হুকুমাত একমাত্র তোমারই চলবে। পুরো চল্লিশটি দিন সেই ওয়াদাই তো করে এলাম। আর প্রকৃত সত্য তো এটাই যে, তাঁর সৃষ্ট জমিনে অন্যের হুকুমাত তো কখনো চলতে পারে না। অর্থাৎ সৃষ্টি যার, আইনও চলবে তাঁর।
সুতরাং হে আমার পরিবার! হে আমার সমাজ! হে আমার জাতি! আমি নিমকহারামী করতে পারি না। যদি এমনটি করি তবে আমি একই সাথে ওয়াদাভঙ্গকারী মোনাফিক, মিথ্যাবাদী ও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। বায়তুল্লাহর চারদিকে আমার তাওয়াফের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আমার সকল কিছুই তথা আমার জীবনাচরণ এই ঘরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হবে। আজ থেকে আমার জীবনে পরিবর্তনের একটা সূচনা সৃষ্টি হবে। আমার আরো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি দেশে গিয়ে আমার রাজনীতি, আমার সমাজনীতি ও আমার অর্থনীতি তথা আমার সমাজ ও রাষ্ট্রকে এ ঘরের দিকে ফিরিয়ে আনার আমৃত্যু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো। এজন্য যদি আমার জান আমার মাল ও আমার পরিবার হুমকীর সম্মুখীন হয় তাতে কোনো আপস ও পরোয়া কোনোটিই করবো না। যেমনটি করেননি জাতির পিতা ও নেতা ইবরাহিম আ.। তিনি যখন সত্যের আলোর সন্ধান পেলেন, তখন নিজ জাতি ও পরিবারকে উদাত্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেনÑ “তোমরা যাদের আল্লাহর শরিক বলে মনে কর, তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।” তিনি আরো বলেন, ‘আমি সব দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বিশেষভাবে কেবল সেই মহান সত্তাকেই ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য নির্র্দিষ্ট করলাম, যিনি সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের মধ্যে শামিল নই।’ যেমন আপস করেননি উহুদের ময়দানে শায়িত সাইয়েদুশ শুহাদা বীর আমির হামযাসহ ৭০ জন সাহাবী রাজিআল্লাহু আনহুম, যেমন সামান্যতম পিছপা হননি জান্নাতুল বাকীতে শায়িত লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরাম। যেমনটি জীবন-মরণ সংকটেও সামান্যতম হত্যেদ্যম হননি গারে সওরে আশ্রয় নেয়া সারোয়ারে আলম ও তাঁর সাথী। মক্কার রাজা-বাদশা, ধনদৌলত ও সুন্দরী নারীর প্রলোভন যাঁর লোভকে উসকে দিতে পারেরি মক্কার কাফের সরদাররা। নিজ জাতির চরম বিরোধিতার মুখে মদীনায় হিজরত করে হলেও আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করে পৃথিবীবাসীর সামনে তার সুফল তিনি দেখিয়ে গেছেন। সুতরাং হে আমার জাতি! তোমরা যদি তোমাদের ভুল কর্মনীতি থেকে ফিরে না আসো, তাহলে আমি তোমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে কাবার মালিক মহান প্রভুর দিকে ফিরে যাচ্ছি। গত ৪০-৪৫ দিন কাবার চারপাশে তওয়াফ করার সময় বার বার প্রভুর কাছে এই ওয়াদাই করে এসেছি।
হে আমার জাতি! খানায়ে কা’বা পুনর্নির্মাণকারী হযরত ইবরাহিম আ. এটিকে প্রথম দিন থেকেই বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গণ্য করেছেন। প্রাচীণ এ ঘরের তাওয়াফের সময় মুসলিম মিল্লাতের সেই নেতার কথা খুব বেশি করে মনে পড়েছে। তিনি জানতেন, তাঁর পরিবারসহ গোটা সমাজ ও পরিবেশ; এমনকি রাষ্ট্র শক্তি শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি যে তাওহীদের সন্ধান পেয়েছেন এরা তা মানবে না। বরং এজন্য তাঁকে কঠিন নির্যাতন ও শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। তবু তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে উঠে দাঁড়ালেন। রাত-দিন তিনি কেবল একটি চিন্তাই করতে থাকলেন, দুনিয়ার মানুষকে অসংখ্য মিথ্যা রবের গোলামির নাগপাশ হতে মুক্ত করে কীভাবে এক আল্লাহর বান্দায় পরিণত করা যায়। তিনি প্রথমে নিজের পিতাকে, নিজের খান্দানকে, নিজের জাতিকে; এমনকি রাজাকে পর্যন্ত শিরক থেকে বিরত থাকতে এবং তাওহীদের আকিদা কবুল করতে দাওয়াত দিলেন। এর ফলে তিনি একদিকে একা; অপরদিকে গোটা দেশ ও জাতি তাঁর মোকাবিলায় এক সারিতে এসে দাঁড়ালো। কিন্ত এর পরও হতোদ্যম হননি, তার মুখ অবসন্ন হয়নি। তখন সিদ্ধান্ত হলো আগুনে পুড়িয়ে মারার। তাতেও তিনি বিরত হলেন না। বরং এ কাজের জন্য লেলিহান অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে পছন্দ করলেন। মূল কুরবানিতে অবতীর্ণ হওয়ার এটা ছিল তাঁর বিশেষ কুরবানি। সুতরাং আমাদেরও যেকোনো পরিবেশে শিরক উচ্ছেদ ও তাওহীদের দাওয়াত দানের জন্য দাঁড়াতে হবে। সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকতে পারে। এগুলোর গলায় ছুরি চালাতে হবে।
হে আমার জাতি! আমি আমার বাস্তবচক্ষে দেখে এসেছি আল্লাহর কয়েকটি আইনের সুফল। যেমন : এক. চুরির শাস্তি আইন : সেটি সৌদিতে আজো বলবৎ থাকায় কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তায়, মাঠে ময়দানে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। উল্লেখ্য, সৌদিতে কারো বাড়িতে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কোনো গ্যারেজ নেই, অথচ কোনো গাড়ির ছোট্ট একটি যন্ত্রাংশও চুরি হয় না। দুই. কিসাস বা হত্যার আইন- পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে খুন-খুনিতে নিহতের হার সৌদির তুলনায় অনেক বেশি। সৌদিতে এ সংখ্যা খুবই নগণ্য। কারণ সৌদিতে আজো কুরআনের কিসাস আইনটি বলবৎ রয়েছে। তিন. জেনা, ব্যভিচার, নারী হাইজ্যাক-এর ঘটনাও এখানে কম কম। কারণ সেখানে আল কুরআন ও হাদীসের আলোকে রজম আইনটি বলবৎ রয়েছে। চার আল কুরআন বলছে ‘নিশ্চয় সালাত মানুষকে ফাহেশা ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।” সালাতের আজান হওয়ার সাথে সমস্ত দোকান পাঠ বন্ধ হয়ে যায়, সকলেই সালাতের পানে ছুটে চলে। অর্থাৎ সেখানে এখনো সালাত কায়েম রয়েছে। ফলে রাস্তাঘাটে, বাজার ও মার্কেটে আমাদের দেশের মতো বেলিল্লাপনা নেই, দোকান বা কোনো প্রতিষ্ঠানে আমাদের দেশের মতো কোন গান-বাজনা বাজছে না। ২-১ জন নারী রাস্তা ঘাটে পাওয়া গেলেও অত্যন্ত শালীনতার সাথে পথ চলছে, কেউ তাদের উত্যক্ত করছে না।
এছাড়া সেখানে সামাজিক পরিবেশ আমাদের তুলনায় আনেক সুস্থ। রান্তাঘাটে সন্ত্রাস, বেলিল্লাপনা, ছিনতাই ও খুন-খারাবি নেই বললে চলে। কারণ হলো, ক্রমাগত আল্লাহর ২-১টি হুকুম বলবৎ থাকায় সেখানে অন্যান্য অপকর্ম থেকে মানুষ পবিত্র থাকে। যেহেতু সালাত মানুষকে ফাহেশা কাজ থেকে বিরত রাখে। সেহেতু সেখানকার মানুষ খারাপকে ঘৃণা করে। কারণ সেখানে সালাত পুরোপুরি কায়েম আছে। এটি সালাতের সুফল। সুতরাং হে আমার জাতি! আমি সরাসরি কাবাকে সামনে রেখে কাবার মালিকের বরাবর সালাত পড়ে আমার এই উপলব্ধি হয়েছে যে, আমি খারাপের সাথে কখনো আপস করবো না।
হে আমার জাতি! আল-কুরআন এমনই একটি সমাজ কায়েম করতে চায়। আমি পবিত্র হজ থেকে সেই শিক্ষাই নিয়ে এসেছি। এখানে অন্যদের শাসন চলতে দেয়া মানে নিজেকে তাগুতের হাতে ছেড়ে দেয়া, তাগুতের সাথে আপস করা অথবা পুরোপুরি তাগুতের অনুসরণ করা, পক্ষান্তরে আল্লাহকে ছেড়ে দেয়া, আল্লাহর সাথে অন্যদের শরিক করা। যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যদের শাসন ব্যবস্থা মেনে নেই, তবে আমার সালাত, আমার রোজা, আমার জাকাত ও হজ কি কাজে আসবে?
হে আমার জাতি! আমি আবারো ঘোষণা করছি, আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুম, অন্য কারো পথ ও মত মানি না। আজ থেকে আমি সব পরিহার আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবো। তোমরাও আমার সাথে শরিক হও। হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাকো, আমি তোমার মেহমানদারীতে যে পয়গাম নিয়ে এসেছিলাম তা আমি আমার জাতির কাছে পৌঁছে দিয়েছি। যাতে আমার জাতি আমাকে তোমার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারে। আমাকে তুমি কবুল করো।