বিএনপি নেতার জুতাপেটার পর নারী শিক্ষককে বহিষ্কার
২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:১৪
স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে বিএনপি নেতার শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আবার বিএনপি নেতার হাতে জুতাপেটা হওয়ার পর শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন হীরাকে কলেজ থেকে বরখাস্ত করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। এমন ঘটনা দেশের নারী সমাজের জন্য অসম্মানের ও ঝুঁকিপূর্ণ বলেও সমালোচনা হচ্ছে। তাছাড়া ভুক্তভোগীর সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মানহানির ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি আবারো জাতির সামনে এলো। একই সঙ্গে বিচারহীনতার নতুন সংস্কৃতির নজির তৈরি হলো। রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঢুকে ভাঙচুর ও একজন শিক্ষিকার সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবারের ওই ঘটনার পর ২৪ এপ্রিল শুক্রবার সকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিএনপি এসব ঘটনায় যে দায়সারা বা কূটকৌশলের বহিষ্কার খেলা খেলে তাও আবার প্রমাণ হলো। কারণ ইতোপূর্বে নানা অপরাধে যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের আবার দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।
সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত ওই ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার দৃশ্য পাশে থেকে ভিডিও করতে থাকেন শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন। ভিডিও করতে নিষেধ করলে আলিয়া খাতুনের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে আলিয়া খাতুন বিএনপি নেতা শাহাদ আলীকে নিজের বাড়ির কাজের লোক ছিল দাবি করে গালে থাপ্পড় মারেন। এ সময় বিএনপি নেতা শাহাদ আলী পায়ের স্যান্ডেল খুলে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করতে থাকেন। একপর্যায়ে আলিয়ার চুল ধরে মাথা টেবিলের ওপর রেখে পেটান। সেখানে উপস্থিত অন্য নেতাকর্মীরা শিক্ষিকাকে জুতা মারতে পাশ থেকে মার মার বলে চিৎকার করে সমর্থন দেন।
মারধরের শিকার কলেজ শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন দাবি করেন, তারা প্রতি মাসে দল ধরে আসে চাঁদাবাজি করতে। প্রতিবাদ জানাতেই ভিডিও করছিলাম। তখন তিনি আমার দিকে তেড়ে আসেন। তখন তাকে থাপ্পড় দিলে তিনি আমাকে জুতা দিয়ে মারতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা গণমাধ্যমকে জানান, প্রথম দফার এই মারামারির কিছুক্ষণ পর দুপুরে বিএনপি নেতা আকবর, জয়নাল, আফাজের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী আবারও কলেজে যান। তারা অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও আলিয়াকে মারধর ও রক্তাক্ত জখম করে কলেজে ভাঙচুর চালায়। এতে অন্তত ৫ জন শিক্ষক আহত হন। গুরুতর আহত আব্দুর রাজ্জাক ও আলিয়াকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মাউশি কর্তৃক বরখাস্ত হওয়ার পর সামাজিকমাধ্যমে এক ভিডিও বার্তা দেন শিক্ষিকা আলিয়া খাতুন হীরা। তিনি ভিডিওতে ঘটনা ও কলেজের অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় ও ঘটনা তুলে ধরেন। হীরা দাবি করেন, তিনি বিএনপি পরিবারের মেয়ে হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ আমলে কোনো প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাননি। তার সাবজেক্টটি সরকারি করা হয়নি, অবহেলা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনার পেছনে বড় ঘটনা আছে, যা তিনি পরে জানাবেন বলে ভিডিওতে উল্লেখ করেন। এর আগে কাউকে তার সম্পর্কে অপপ্রচার না চালানোর অনুরোধ জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমি সত্যটি তুলে ধরবো। আমি ভদ্র পরিবারের মেয়ে, কেউ যেন নোংরাভাবে অপপ্রচার চালাবেন না, ব্রিফিং করে তুলে ধরবো। কলেজটি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি আওয়ামী লীগের কার্যালয় বানানো হয়েছিল, কোনো একাডেমিক কার্যক্রম ছিল না। সাবেক অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক দুর্গাপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে এনামুল হক দায়িত্ব নেয়ার পেছনে বড় ধরনের চক্রান্ত, বড় একটি ইস্যু ছিল বলে ও উল্লেখ করেন হীরা। তার সিনিয়র রায়হান মজিদকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে বাদ দিয়ে চেয়ারে বসেছেন এনামুল হক। এর পেছনেও অনেক স্বার্থ জড়িয়ে আছে, যা তিনি তুলে ধরবেন। পরে সরকারি কলেজ হিসেবে বর্তমান বিসিএস ক্যাডার অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেন। এটাই তাদের সমস্যা, তাদের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটেছে। কলেজের অনেক অর্থ সম্পদ ও জমাজমির হিসাব পাওয়া যায়নি- এ ধরনের অনেক বিষয় আছে।
জানা যায়, কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নির্যাতনের শিকার আলিয়া খাতুনের বাবা। প্রতিষ্ঠানটির অনেক সম্পত্তি রয়েছে, যা নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের দখল ও প্রভাব বিস্তারে দ্বন্দ্ব চলছিল। এমন বিষয়ে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করা বিএনপি নেতার বক্তব্যেও উঠে এসেছে। এদিকে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। দলটির পক্ষ থেকে গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার বিবৃতি দেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঢুকে চাঁদা দাবি, শিক্ষিকাকে ন্যক্কারজনকভাবে জুতাপেটা, কলেজ অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের মারধর ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা আকবর আলী ও তার সঙ্গীয় সন্ত্রাসীদল কর্তৃক এই সন্ত্রাসী ঘটনা অগ্রহণযোগ্য ও ক্ষমার অযোগ্য এবং চরম উদ্বেগজনক। আমি এ হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, জাতি গড়ার কারিগর হলেন শিক্ষক সমাজ। তাদের সম্মান ও মর্যাদা সর্বোচ্চ। এ সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে গোটা শিক্ষক সমাজকে অপমান করা হয়েছে। কলেজে পরীক্ষা চলাকালীন এমন হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশকে নষ্ট করা হয়েছে। বিএনপির সন্ত্রাসীরা সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা করছে, যা চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের জনপ্রত্যাশার পরিপন্থী।
এডভোকেট জুবায়ের আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে সন্ত্রাসীদের হামলা ও ভাঙচুর করার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার বহিঃপ্রকাশ। এতে করে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাকে মারধরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিতার কারণ ক্ষতিয়ে দেখা, বিএনপির সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী হামলায় আহত শিক্ষকদের যথাযথ চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।