জীবনের পাঠশালা
১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৬
॥ ফারহানা সিদ্দিক ॥
রাফি ছেলেটি খুব চঞ্চল আর হাসি-খুশি। বয়স মাত্র ৯ বছর। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওর সারাটা দিন কাটে পড়াশোনা, খেলাধুলা আর বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড়ে। কিন্তু মনের ভেতরটা তুলোর মতো নরম, তাই ভুল করলে ওর খুব কষ্ট হয়।
একদিন বিকেলে খেলা শেষে বাড়িতে ফিরে এসে হাত-পা ধুতে লাগে। খেলার উত্তেজনা তখনো ওর মনে, তাই ট্যাপ বন্ধ না করেই ঘরে চলে যায়। শীতল পানি ফোঁটায় ফোঁটায় নয়, সরু ধারায় বয়ে যাচ্ছিল। আর বাগানের শুকনো মাটি দ্রুত শুষে নিচ্ছিল।
বাগানটি ঘরের সামনেই। আর পানির ট্যাপটিও বাগানেই ছিল। দাদু বারান্দায় বসে এই কাজটা দেখলেন। তিনি শান্তস্বরে ডাকলেন, ‘রাফি!’
রাফি মাথা নিচু করে দাদুর সামনে দাঁড়াল, ওর বুকের ভেতরটা ধুকধুক করছিল। ও বুঝল, কিছু একটা ভুল হয়েছে মনে হয়। ‘হ্যাঁ দাদু, কী হয়েছে?’
দাদু মৃদু হেসে কাঁধে হাত রাখলেন। সেই হাসিতে ছিল ভালোবাসা। তিনি বললেন, ‘দাদুভাই, বাগানে যে পানি নষ্ট হচ্ছে, সেটা কি দেখেছ?’
রাফি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে ভাবছিল, দাদু বুঝি বকা দেবেন। কিন্তু দাদু আবার বললেন, ‘দাদুভাই আমার, মনে রেখো, প্রিয় নবীজি সা. বলেছেন, ‘অতিরিক্ত পানি নষ্ট করো না, যদিও তুমি প্রবহমান নদীর ধারে থাক।’ (ইবনে মাজাহ)।
রাফির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ও অবাক হয়ে দেখল, অল্প একটু পানি নষ্ট করাও আল্লাহর কাছে কত বড় অপরাধ। দাদুর কথা শুনে মনে মনে এক ধরনের অনুশোচনা বোধ তৈরি হয়। সে দ্রুত পায়ে গিয়ে কলটি বন্ধ করে। কল থেকে যখন শেষ ফোঁটাটি মাটিতে পড়ল, তখন অনুভব করল, সে শুধু একটি কল বন্ধ করেনি, বরং একটি ভুল থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে। সেই মুহূর্তে এক অজানা শান্তি তার মনকে ভরে দেয়। ও বুঝল, আল্লাহর কোনো নিয়ামতই অপচয় করা যাবে না।
কয়েকদিন পর, রাফি দাদুর সঙ্গে বাজারে যায়। বাজারের সবুজাভ শাকসবজি আর নানা রঙের ফলের মনমাতানো গন্ধে তার মন নেচে ওঠে। এক দোকানে থরে থরে সাজানো ছিল আঙুরের থোকা। ঝুড়িতে থাকা রসালো আঙুরগুলো দেখে রাফির জিভে জল আসে।
দাদু অন্যমনষ্ক হয়ে ফল কিনছিলেন। রাফি চারপাশে একবার তাকিয়ে ঝট করে একটি আঙুর মুখে পুরে ফেলে। দাদুর চোখ দুটি ছিল তীক্ষè। দাদু বিষয়টি খেয়াল করলেন।
দাদু বললেন, ‘রাফি, মনে রেখো, প্রিয় নবীজি সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)।
ওর বুকটা ধড়াস করে ওঠে। আঙুরটি মুখে তিতো হয়ে গেল। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে ওর মনে হলো, মাটির ভেতরে সে মিশে যেতে পারলে ভালো হতো। দাদুর সামনে এই লজ্জার চেয়ে বড় শাস্তি আর কিছু হতে পারে না।
সে সঙ্গে সঙ্গে দাদুর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে এবং দোকানদারকে জানায় যে সে একটি আঙুর খেয়েছে। দাদু কিছু আঙুর কিনলেন আর রাফির জন্য দোকানদারের কাছে ক্ষমা চাইলেন। দোকানদার হেসে বলল, ‘থাক চাচা, সামান্য একটি আঙুর!’
কিন্তু রাফি বুঝতে পারছিল, এই সামান্য ভুলের কী বিশাল শিক্ষা। সে অনুভব করল, অন্যের জিনিস তার মালিককে না বলে নিতে বা খেতে নেই। এতে অনেক বড় পাপ হয়।
আরেক দিন, রাফি ওর বন্ধু সাইফের সাথে খেলতে গিয়ে রেগে যায়। খেলাটি ছিল দৌড় প্রতিযোগিতা, আর রাফি হেরে গিয়েছিল। সাইফ হাসতে হাসতে বলল, ‘তুই হেরে গেছিস!’
সাইফের কথা শুনে রাফির মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। হাত মুঠি হয়ে আসে। সাইফকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় মাটিতে। তারপর দৌড়ে পালিয়ে আসে দাদুর কাছে। এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘দাদু, আমি রেগে গিয়েছিলাম, সাইফকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি।’
দাদু ভালোবাসা ভরা চোখে ওর দিকে তাকালেন। তিনি রাফির হাত ধরে টেনে কাছে বসালেন আর বললেন-‘রাফি, দাদুভাই আমার। প্রিয় নবীজি সা. বলেছেন, ‘শক্তিমান সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়; বরং শক্তিমান সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
দাদুর শান্ত কণ্ঠস্বর রাফির রাগকে এক শীতল পানির মতো নিভিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, আসল শক্তি শরীরের নয়, বরং মনের ভেতরের। সে খুশি হয়ে বলল, ‘তাহলে আমি শক্তিমান হতে চাই দাদু! আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখব।’ এরপর সে দৌড়ে গিয়ে সাইফের কাছে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চায়।
সপ্তাহখানেক পর রাফি ওর আরেক বন্ধুর সাথে বাজারে যাচ্ছিল। ওরা এক অসহায় ভিক্ষুককে পথের ধারে বসে থাকতে দেখে। সেটা দেখে ওর বন্ধু ভিক্ষুককে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দেয়।
রাফির মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে দৌড়ে দাদুর কাছে চলে আসে। দাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মনে রেখো দাদুভাই, নবীজি সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আল্লাহ তার হাতে যত চুল আছে, তত সওয়াব লিখে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ)।
দাদু আরও বললেন, ‘ভিক্ষুক বা অসহায় মানুষের জন্য আমাদের মনে দয়া থাকা উচিত। রাসূল সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ দয়াবানদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর বাসিন্দাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (তিরমিযী)।
সুবহানাল্লাহ! কত সুন্দর করে বুঝিয়েছেন আমার মানবতার নবী, মায়ার নবী, দয়ার নবী।
রাফি দ্রুত ওর বন্ধুর কাছে ফিরে গেল। বন্ধুকে বুঝিয়ে বলল, ‘আমাদের এমন মানুষের প্রতি দয়া দেখানো উচিত।’ সে নিজের পকেট থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বের করে ভিক্ষুককে দেয়। ভিক্ষুকের মুখে ফুটে ওঠা হাসি দেখে রাফির মনে এক অনাবিল আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দয়া দেখানো কত বড় ইবাদত।
এভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল। রাফি প্রতিদিন দাদুর জ্ঞানের বাগান থেকে নতুন কিছু শিখত। পানি অপচয় না করা, সদ্ভাবে চলা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, এতিম-দরিদ্রের প্রতি মমতা রাখা- সবকিছুই দাদু তাকে হাদিসের আলোকে শিখিয়ে দিচ্ছিলেন। রাফি তার বন্ধুদেরও এই শিক্ষাগুলো দিতে শুরু করল।
এক সন্ধ্যায় দাদু রাফিকে কাছে ডেকে বললেন, ‘রাফি, আমার দাদুভাই- মনে রেখো, রাসূল সা.-এর পুরো জীবনটাই আমাদের জন্য শিক্ষার আলো। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন- আল্লাহকে ভয় করতে, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে, মিথ্যা না বলতে, আমানত রক্ষা করতে আর সবসময় সৎপথে থাকতে। যে পথ সুমহান পথ। নবীজি সা. ছিলেন আলোকবর্তিকা। তিনি ছিলেন মানবতার শান্তির প্রতীক, মুক্তির প্রতীক, রাহমাতুল্লিল আলামিন। যিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জীবনের পাঠশালা। সবার শিক্ষক তিনি।’
রাফি উজ্জ্বল চোখে উৎসুক হয়ে দাদুর দিকে তাকাল। ওর মনে হলো, সে আজ শুধু কিছু কথা শোনেনি, বরং জীবনের পথ খুঁজে পেয়েছে। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘দাদু, আমি নবিজি সা.-এর পথেই চলতে চাই। আমি জীবনের প্রতিটি কাজে তাঁর শিক্ষা আঁকড়ে ধরব।’
দাদু আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন, ‘হে আল্লাহ! আমার এই নাতিকে রাসূল সা.-এর সুন্নাহর পথে চলার তৌফিক দিন। ওকে সকল প্রকার বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন।’
রাতের আকাশে তারারা জ্বলজ্বল করে উঠল। জোনাকিরা মিটিমিটি আলো জ্বালে। রাফির মনেও যেন হাজারো তারার আলো জ্বলে উঠল। সে প্রতিজ্ঞা করল- সে আর ভুল করবে না। আর যদি ভুল হয়ও, তবু সে দাদুর শেখানো পথেই ফিরে আসবে। চলবে দয়ার নবী, মায়ার নবীর জীবনের পাঠশালা অনুযায়ী। যে পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহু।