জ্বালানি তেল সংকট তীব্র হচ্ছে, অনেক পাম্পেই সরবরাহ নেই


২৬ মার্চ ২০২৬ ২১:২২

কিছু পাম্পে জ্বালানি থাকলেও দীর্ঘ লাইন-ভোগান্তি
সংকটের শঙ্কায় মানুষ বেশি জ্বালানি কিনছে, বলছে সরকার

স্টাফ রিপোর্টার : ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলার পর চলমান সংঘাতের জেরে তীব্র জ্বালানি তেল সংকটে পড়েছে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও। যদিও সরকারের তরফ থেকে সংকটের কথা সরাসরি স্বীকার করা হচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে দেশের অনেক পাম্পেই পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল নেই। তরলীকৃত গ্যাসও নেই অনেক পাম্পে। গত ২৫ মার্চ বুধবার দুপুরে এ প্রতিবেদন লেখার আগে সকালে রাজধানীর একাধিক পাম্পে ঘুরে কোথায়ও পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু পাম্পে জ্বালানি থাকলেও দীর্ঘ লাইন দিতে হচ্ছে। জ¦ালানি তেল সংকটের কারণে রাজধানীতে মোটরসাইকেল ও গণপরিবহন কম লক্ষ করা গেছে। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন।
গত ২৪ মার্চ মঙ্গলবার ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই জরুরি অবস্থা জারি করেন। মূলত তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতেই এ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর প্রভাবে গত তিন সপ্তাহে দেশটিতে কয়েক দফায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। বর্তমানে ফিলিপাইনের বাজারে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই পরিস্থিতিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ‘আসন্ন বিপদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র।
বাংলাদেশেও জ্বালানি আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এই নৌরুট ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ প্রায় বন্ধ, ফলে এখানেও সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল ও অকটেনের সংকটের কারণে পাম্প বন্ধ দেখা যায়। কোনো কোনো পাম্পে ‘পেট্রোল অকটেন শেষ’ লেখা কাগজ ঝুঁলিয়ে রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ না আসায় দেশে তেল সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও কোথাও নিশ্চয়তা মিলছে, কোথাও মিলছে না। ফলে এপ্রিলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত তাদের হাতে ১৪ দিনের ডিজেল মজুদ ছিল। সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কায় মানুষ আগেভাগেই ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল কিনে রাখতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম গণমাধ্যমকে বলছেন, দেশে এখনো জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়নি। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ এসেছে, আরও কয়েকটি আসার কথা রয়েছে। এপ্রিল মাসের আমদানি সূচিও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকেও পরিশোধিত ডিজেল কেনা হবে। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখা হচ্ছে, তবে আতঙ্কে অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল কিনছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে জ্বালানি তেল ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন; এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেশি। তাই ডিজেলের বাজারে চাপ বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিপিসির তথ্যানুযায়ী, দেশে ডিজেল সংরক্ষণের মোট সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। গত ২৪ মার্চ মঙ্গলবার পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য মজুদ ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। এই মজুদ দিয়ে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুদ আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। পেট্রোলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে মজুদ রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন সরবরাহ বজায় রাখা যাবে। আর ফার্নেস তেলের মজুদ রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর জেট ফুয়েলের মজুদ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৩ দিন সরবরাহ চালানো যাবে। কেরোসিনের মজুদ ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুদ আছে প্রায় দেড় হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ আছে। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন শোধনক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুদ দিয়ে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি স্বাভাবিক থাকলে এই মজুদ ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট। কিন্তু জাহাজ আসতে দেরি হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং আতঙ্কে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।