নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ হাইকোর্টে
১৭ মার্চ ২০২৬ ১০:৫০
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগণনায় কারচুপি, ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং, ঘষামাজা, স্বাক্ষরবিহীন ফল প্রকাশসহ নানা অভিযোগে হাইকোর্টের ট্রাইব্যুনালে চ্যালেঞ্জ দায়েরের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। সর্বশেষ ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৪টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছেন প্রার্থীরা। এর মাঝে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ঢাকা-১৩ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন রিকশা প্রতীকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রমুখ। ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন ডকুমেন্টস উপস্থাপনের পর আদালত ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সামগ্রী হেফাজতের আদেশ দিয়েছেন।
বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। ভোটারগণ সারাদেশে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যা সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। কিন্তু প্রদেয় ভোটগণনায় বিতর্ক, ফলাফল শিট তৈরিতে ঘষামাজা, প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরবিহীন ফল তৈরিসহ নানা জালিয়াতির অভিযোগ উঠে।
নির্বাচনের পর থেকে একের পর এক কারচুপির অভিযোগ আসায় ১৯ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে একটি একক বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৪৯ ধারা অনুযায়ী নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘নির্বাচনী’ আবেদনপত্র শুনানির জন্য এই নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। সংসদ সদস্যদের গেজেট জারির ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ১২ মার্চ পর্যন্ত মোট ৩৪টি আসনের প্রার্থীরা তাদের আসনে নানা কারচুপি বিষয়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছেন। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি ফলাফল চ্যালেঞ্জ এসেছে ঢাকার আসনগুলো থেকে। ফলাফল চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে ঢাকা-৪, ৫, ৬, ৭, ১০, ১১, ১৩ ও ১৬ আসনের। অভিযোগকারীদের মাঝে বেশিরভাগই বিএনপি প্রার্থী। এখন পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থীরা মোট ২২টি আসনে কারচুপির অভিযোগ করেছেন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ১৩টি আসনে।
খুলনা-৫ আসনের ১১টি কেন্দ্রে ভোটগণনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ভোটে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেন। এ আসনে তিনি দাঁড়িপাল্লার প্রতীকে নির্বাচন করে বিএনপির মোহাম্মদ আলী আসগার লবির নিকট পরাজিত হন। হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের অভিযোগে তিনি বলেন, ডুমুরিয়া-ফুলতলা আসনের মোট ১৫০টি ভোটকেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী লবির মোট প্রাপ্ত ভোট এক লক্ষ আটচল্লিশ হাজার আটশো চুয়ান্ন। তার (দাঁড়িপাল্লার) প্রাপ্ত ভোট এক লক্ষ ছেচল্লিশ হাজার দুইশ’ ছেচল্লিশ। অর্থাৎ মাত্র ২৬০৪ ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। অথচ ১১টি কেন্দ্রে ভোটগণনায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে মর্মে তিনি ট্রাইব্যুনালে ডকুমেন্টস উপস্থাপন করেন। এছাড়া ৯টি কেন্দ্রের ফলাফলে পোলিং এজেন্ট বা প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর নেই মর্মে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। যে কেন্দ্রগুলোর ফলাফলে পোলিং এজেন্ট বা প্রিসাইডিং অফিসারের কোনো স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি, সেগুলো হলোÑ শেখ আমজাদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটারা এবং আটারা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গিলাতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানিয়াপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উপজেলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বসুন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চুকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাঞ্চনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সেনপাড়া বাহারুল উলুম দাখিল মাদরাসা।
পিরোজপুর-২ আসনের ১৩টি কেন্দ্রে ভোটগণনায় জামায়াতের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়।
হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে পিরোজপুর-২ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী শামীম সাঈদী ডকুমেন্টস উপস্থাপন করে বলেন, নেছারাবাদ উপজেলার বেশিরভাগ কেন্দ্র থেকে আমাদের পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দেয়া হয়। এর মাঝে ১৩টি কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণার সময়ও জামায়াতের পোলিং এজেন্টদের থাকতে দেয়া হয়নি। এর মাঝে পাইলট স্কুল কেন্দ্রে পরিদর্শনে গেলে বিএনপি প্রার্থীর অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী জামায়াত প্রার্থীর ওপর হামলা চালায়। এসব হামলার ভিডিও নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের দেয়া হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। এর মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে ২১টি কেন্দ্রের ফলাফলে সংশ্লিষ্টদের কোনো স্বাক্ষরই নেই। এ আসনে বিএনপির সাথে তার ভোটের পার্থক্য ছিল মাত্র ৮ হাজার ২৮৮। সার্বিক বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাইকোট এ আসনের নির্বাচনী সরঞ্জামাদি কোর্টের হেফাজতে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বরগুনা-২ আসনে ব্যাপক ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ
ট্রাইব্যুনালের অপর একটি অভিযোগে বরগুনা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদ তার আসনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করেন। এ আসনে তিনি ভোট পান ৮৫ হাজার ২৪৭। বিএনপি প্রার্থী পান ৯০ হাজার ৬৪৩। অর্থাৎ মাত্র ৫ হাজার ৩৯৬ ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। জামায়াত প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ডকুমেন্টসে অভিযোগ করেন, প্রকাশিত ফলাফলে ২২টি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট বা প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরই ছিল না। এছাড়া ১৫টি কেন্দ্রে ব্যাপক জাল ভোট এবং আরো ৭টি কেন্দ্রে ভোটগণনায় ব্যাপক অনিয়ম করা হয়।
যে ২২টি কেন্দ্রের ফলাফলে পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নেই, সেগুলো হলো- ১নং পূর্ব বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২নং বেতাগী সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯নং বিবিচিনি দেশান্তরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৬নং দক্ষিণ বেতাগী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৭নং উত্তর হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রমুখ।
একইভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন ঢাকা-১৩ আসনের জামায়াত নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। এ আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপির ববি হাজ্জাজ।
তার আগে মাওলানা মামুনুল হক ঢাকা-১৩ আসনের ভোটগণনায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ভোটগণনার দিন দিবাগত রাতে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভবনে অভিযোগ দিতে যান। সে সময় অভিযোগের বিষয়ে মামুনুল হক জানান, ঢাকা-১৩ আসনে ৯ জন প্রার্থী। ব্যালটের এক পাশে ৫ জন প্রার্থীর নাম, অন্য পাশে চারজন প্রার্থীর নাম। আমার নাম বাম দিকে, সবার নিচে। নামের পাশের ঘর খালি থাকায় অনেক ভোটার ভুলক্রমে ফাঁকা জায়গায় সিল বসায়। সেই ব্যালটগুলো বাতিল করা হয়েছে।
খেলাফত মজলিসের আমীর বলেন, ঢাকা-৮ আসনে আমার মতো একই রকম বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের নাম ব্যালটে থাকায় সেখানেও কিছু সিল ফাঁকা জায়গায় পড়ে। কিন্তু সেসব ভোট মির্জা আব্বাসের নামে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু তার আসনে এ ব্যালটগুলো বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়া ঢাকার আসনগুলোর মাঝে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের ১১ দলীয় জোট প্রার্থী নাহিদ ইসলামের বিজয়ের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছেন বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম। অন্যদিকে বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়াই করে ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আব্দুল বাতেনের কাছে ৩ হাজার ৩৬১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তিনিও এ ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে কারচুপির অভিযোগ দেন ট্রাইব্যুনালে।
ঢাকার মোট ৮টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করা হয়। এর মাঝে জামায়াতে ইসলামী করে ৪টি এবং বিএনপি করে বাকি ৪টি আসন নিয়ে। জামায়াত ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট যে ৪টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে সেগুলো হলো- ঢাকা-৬, ৭, ১০ এবং ঢাকা-১৩। আর বিএনপি যে ৪টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছে, সেগুলো হলো- ঢাকা-৪, ৫, ১১ এবং ঢাকা ১৬।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির জসীম উদ্দীন আহমেদ ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আসনটিতে এলডিপি প্রধান অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক ৭৫ হাজার ৪৬ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। উক্ত আসনে ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে ওমর ফারুকের করা নির্বাচনী আবেদনটি করেন বলে জানান তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, আমরা সমস্ত ডকুমেন্টস আদালতে উপস্থাপন করেছি। আদালত শুনানির জন্য আগামী ৬ জুন দিন রেখেছেন ।
জামায়াত যেসব আসনে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছে
১২ মার্চ পর্যন্ত জামায়াত এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোট মোট ১৪টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছে। এগুলো হলো- খুলনা-৫, পিরোজপুর-২, বরগুনা-২, লালমনিরহাট-১ ও ২, নারায়ণগঞ্জ-২ ও ৩, কক্সবাজার-৪, ঢাকা-৬, ৭, ১০, ১৩ এবং চট্টগ্রাম-১৪ ।
বিএনপি যেসব আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছে
দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামী প্রথমদিকে বিভিন্ন আসন ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার পরপরই বিএনপিও বিভিন্ন আসনে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়। বিএনপির চ্যালেঞ্জ করা আসনগুলো হলো- ঢাকা ৪, ৫, ১১ ও ১৬, চাঁদপুর-৪, শেরপুর-১, ময়মনসিংহ-১ ও ২, পাবনা-৩ ও ৪, রাজশাহী-১ ও ৪, গাইবান্ধা-৪ ও ৫, সিরাজগঞ্জ-৪, কুমিল্লা-১১, রংপুর-৪ ও ৬, কুড়িগ্রাম-২, মাদারীপুর-১, নীলফামারী-২ এবং কুষ্টিয়া-৪ ।
জানা গেছে, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে ফলাফল নিয়ে চ্যালেঞ্চের শুনানি বাড়তে থাকায় আরো একটি অতিরিক্ত নির্বাচনী বেঞ্চ গঠন করা হচ্ছে।
এদিকে সার্বিক বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু সোনার বাংলাকে বলেন, এসব মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উচ্চ আদালত শুনানি করলে আশা করা যায় দ্রুত রেজাল্ট পাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, এসব মামলার সবরকমের ডকুমেন্টস এবং তথ্যাদি দেয়া আছে।