জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৩
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জেল-জুলুম, নির্যাতন, আয়নাঘর, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফাঁসি, বহু মায়ের বুক খালি, সন্তানকে এতিম করে পিতার জীবনদান ও স্ত্রীকে বিধবা করে দেশপ্রেমিক অকুতোভয় সাহসী সন্তানদের রক্তদানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও তার কিছু দোসর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। জনগণের বিজয়ের ফল হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের নিকট প্রশ্ন রাখতে চাই- সেদিন সংবিধানের কোন ধারাবলে গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল?
সেদিন গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হতো না, শেখ হাসিনাই ক্ষমতায় থেকে যেতেন। জুলাই সনদও হতো না এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনও হতো না।
যারা জুলাই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তারা মূলত গণঅভ্যুত্থানকেই অস্বীকার করছেন। তারা গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাটুকু নেবেন আর অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত স্পিরিটকে অস্বীকার করবেন- এ দ্বৈততা জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাজনীতিতে এ দ্বৈতনীতি যারা গ্রহণ করেছেন, তারা রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছেন। অতীতে যখনই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে না করে আদালতে টেনে নেয়া হয়েছে, তখনই রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। রাজনৈতিক বিষয়সমূহ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করবেন- এটাই গণতন্ত্রের দাবি। স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারা অগ্রাহ্য করে রাজনৈতিক ইস্যুসমূহ আদালতে টেনে নিয়ে আদালতকেও বিতর্কিত করা হয়। এটা ফ্যাসিবাদী পথের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ। যে ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, জনগণ তার সমাধান করে দিয়েছে।
জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেন। এখানে নানা কৌশল অবলম্বন করে জনগণের রায়কে পরিবর্তন করে ভিন্ন ব্যক্তিকে বিজয়ী করে ক্ষমতায় বসানোর ফ্যাসিবাদ যুগের ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে দেশকে আরেকটি বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্মরণ রাখা উচিত, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলসমূহ অংশগ্রহণ করেছিল। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সেদিন আওয়ামী লীগকে অস্বাভাবিকভাবে বিজয়ী করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ টু-থার্ড মেজরিটি নিয়ে সরকার গঠন করে প্রথমেই তার ক্ষমতায় আসার সিঁড়ি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে আদালতের দোহাই দিয়ে বাতিল করে দেয়। এখান থেকেই রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয় এবং নির্বাচন ব্যবস্থার কবর রচিত হয়।
আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে ফ্যাসিবাদের চরিত্র ধারণ করে। এ পথই তাকে পতনের মোহনায় নিয়ে যায়।
ঠিক একই পথ অনুসরণ করছে বিএনপি। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ফলাফল পালটে দিয়ে সরকার গঠন করলো বিএনপি।
ক্ষমতায় আসার সিঁড়ি জুলাই সনদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে তা নিয়ে যাওয়া হলো আদালতে। এখন হয়তো তারা বলবেন বিষয়টি সাব-জুডিস। তাই এ বিষয়ে আলোচনা করা যাবে না। আদালতের পথ অনেক লম্বা। তাদের পরিকল্পনা হলো এভাবেই জুলাই সনদ ও গণভোটকে অকার্যকর করে ফেলা।
এ অপরিণামদর্শী চিন্তার ভয়াবহতা নিয়ে তারা একটুও ভাবেনি। বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বলছে, বিএনপি জুলাই সনদ ও গণভোটকে সম্মান দেখিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যতই টালবাহানা বা সময়ক্ষেপণ করুক না কেন, তা তাদের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের দিকেই নিয়ে যাবে। এবার গণঅভ্যুত্থান নয়, গণবিস্ফোরণ তথা গণবিপ্লব হবে। এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
১. ছাত্র, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজ তাদের বুকের রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদের কবল থেকে দেশটাকে উদ্ধার করেছে। বাংলাদেশের জনগণ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। সংস্কার, গণহত্যার বিচার অতঃপর নির্বাচন- এ তিনটি বিষয় সামনে রেখে জনগণ ঐক্যবদ্ধ থেকেছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংস্কার কমিশন, ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও শক্তিসমূহ দীর্ঘ আলোচনার পর রাষ্ট্রের সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে ঐকমত্য হয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। জুলাই সনদকে আইনগত ভিত্তি দেয়ার লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে সকলেই একমত হন। সেজন্যই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি একটি আদেশ জারি করেন। তার ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং হ্যাঁ বিজয়ী হয়। জনগণের রায়ই হচ্ছে চূড়ান্ত। নানা মতলবি ব্যাখ্যার কূটচালে তা আদালতে টেনে নিয়ে সরকার জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জনগণ এ অবাঞ্ছিত কূটকৌশল কখনো মেনে নেবে না।
২. ছাত্র, তরুণ, যুবসমাজ নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের আবেগের ওপর আঘাত করা হয়েছে। যুবসমাজ তা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করবে না।
৩. ইতোমধ্যেই দলীয়করণের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে দলীয় লোকদের বসানোর পুরনো পদ্ধতি জনগণ মেনে নেবে না।
৪. ঋণখেলাপিদের কৌশলে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানোর যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা পূর্বের সরকারের অর্থ পাচার ও ব্যাংক লোপাটের বীভৎস চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।
৫. ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং দলীয়ভাবে তা ধামাচাপা দেয়ার ঘটনা বিএনপিকে পূর্বসূরিদের পথেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
৬. গণতান্ত্রিক ধারার বিচ্যুতি ঘটিয়ে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরিবর্তে প্রশাসক বসানোর অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিএনপিকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
৭. বিভিন্ন স্থানে স্বৈরাচারের দোসরদের সাথে সখ্য, কারাগার থেকে আসামিদের মুক্তিদান, কোথাও কোথাও ফুল দিয়ে তাদের বরণ করে নেয়ার দৃশ্য জনগণকে আহত করেছে, যা বিএনপির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তুষ্টি তৈরি করবে।
৮. দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, বাড়িঘর-দোকান ভাঙচুর কোথাও তালা লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করবে।
৯. বিএনপি আওয়ামী লীগের বয়ান যত বেশি উচ্চারণ করবে, ততই তারা জনপ্রিয়তা হারাবে।
১০. দেশের অর্থনীতিতে স্থিতাবস্থা, বাণিজ্য, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন-বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিরোধ সর্বোপরি অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্তি লাভ করার পরপরই এক হাজার কোটি টাকা বিএনপি নেতার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ব্যাংককে প্রদান জনগণকে এই মেসেজই দিচ্ছে যে চিহ্নিত ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক লিপ্সা পূরণের জন্যই পছন্দের লোককে বাংলাদেশ ব্যাংকে বসানো হয়েছে।
১১. নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও নারীদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে অঙ্গীকারবদ্ধ বিএনপি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদানের জন্য কোনো নারী খুঁজে পায়নি। অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করে বিএনপির এ সিদ্ধান্ত জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে নারীকে অ্যাভয়েড করার কী কারণ থাকতে পারে। এর পেছনে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে?
১২. বিভিন্ন দলের নেতাদের মন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগের তরিকা অবলম্বনের যে নীতি প্রদর্শন করেছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে নাটাই অন্য কারো হাতে রয়েছে।
১৩. বিএনপি জামায়াতকে সংসদে ডেপুটি স্পিকার অফার করেছে। অথচ এটা তো সংবিধানে নেই। এটা জুলাই সনদে আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইনিয়ে-বিনিয়ে ‘গুড উইল’ থেকে ডেপুটি স্পিকারের পদটি অফার করে মনে হয় এক মহা রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছেন।
জামায়াতে ইসলামী এ দুরভিসন্ধিমূলক প্রস্তাবটি সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দিয়েছে, জুলাই সনদে বর্ণিত সকল বিষয়ের বাস্তবায়ন ব্যতীত এর বাইরে তারা কোনো পৃথক বিষয়কে গ্রহণ করবে না। উনারা ভেবেছিলেন, জামায়াত হয়তো কালক্ষেপণ না করে ঝুলন্ত মুলা ধরার জন্য এগিয়ে আসবে। সালাহউদ্দিন সাহেবরা জামায়াতের নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক আদর্শ সম্পর্কে এখনো অজ্ঞই রয়ে গেলেন।
১৪. ১৯৬৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের ৪০০টি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো শাসকই জনগণের সেন্টিমেন্টের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। প্রত্যেকের শুরুটা হয়েছিল কৃত্রিম ও সাজানো ছকে জনগণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতা দখল করার মাধ্যমে অতঃপর ক্রমান্বয়ে জনরোষের শিকার হয়ে পতনের শেষ প্রান্তে উপনীত হওয়া।
১৫. বলা হয়ে থাকে মিডিয়া সন্ত্রাস, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও ডিপস্টেটের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। হয়তো ভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদ পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আরেকটি শ্রেণির কথা আসেনি। সে শ্রেণিটি ২৬৯ বছর পূর্বে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলাকে হারিয়ে দিয়েছিল। সেখানে ছিল মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভরা।
আজকেও মীর জাফর ও তার দোসররা রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত দলকে ‘মেইন স্ট্রিমে’ আসতে দেয়নি। যারা শপথ পড়েছিলেন সকল কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে তারা দায়িত্ব পালন করবেন, সেই শপথ ভঙ্গ করে যারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা ও বেইমানি করেছে, তাদের পরিণতি মীর জারফ ও তাদের দোসরদের মতোই হবে।
১৬. বিশ্বাসঘাতকদের আত্মস্বীকৃত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বক্তব্যের দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, একটি নীলনকশার মাধ্যমে বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই পছন্দের শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। যার কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তাদের এত অনীহা।
১৭. যারা জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার আদেশকে সংবিধানে নেই বলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা গণঅভ্যুত্থান মানেন না। তাদের উচিত গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে যিনি যে অবস্থানে ছিলেন, সেখানে চলে যাওয়া।
বিএনপি যদি মনে করে, কোনো বিশেষ মহল বা দলের সাথে সমঝোতা করে তাদের প্রণীত ছক অনুযায়ী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা সরকার চালাবে, তাহলে তারা ভুল করবে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।
লেখক : কলামিস্ট, জননেতা।