ভারতের রাজ্যে রাজ্যে মুসলিম নির্যাতন


৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৪

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষের বসবাস ভারতে। শতকরা ২০ শতাংশ মুসলিম, যদিও রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে মুসলিমদের সংখ্যা কম দেখানো হয়। প্রায় হাজার বছর ধরে শাসনক্ষমতায় আসীন ছিল মুসলিমরা। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরও ভারতের রাজনীতি ও শাসনক্ষমতায় মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য অবস্থান ছিল। কিন্তু মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে ক্রমান্বয়ে মুসলিমদের প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিগত দুই দশক ধরে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ও সরকারের আমলে মুসলিম নির্যাতন চরম আকারে ধারণ করে। কাশ্মীর থেকে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু আর মহারাষ্ট্র থেকে আসাম মেঘালয় পর্যন্ত প্রতিটি রাজ্যেই মুসলিমদের উপর নির্যাতন চলছে।
আসামে এখন ভোটার তালিকা হালনাগাদ চলছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, ওই ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময়ে বিজেপি কর্মীদের তিনি নির্দেশ দিয়েছেনÑ যাতে তারা সন্দেহজনক বিদেশিদের (মুসলিমদের বিদেশি আখ্যায়িত করে) বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে গুচ্ছ গুচ্ছ ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দেয়। ইতোমধ্যেই বিজেপি কর্মীরা পাঁচ লাখ ফর্ম জমা করেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ভারতে ভোটার তালিকায় কারও নাম নিয়ে যে কেউই ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন। যদিও আপত্তি তোলার জন্য গুচ্ছ গুচ্ছ ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দেওয়ার নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন আসামের কংগ্রেস নেতৃত্ব। হিমন্ত বলেন ‘আমাদের কাছে ভোট চুরি মানে আমরা কিছু মিঞা ভোট চুরি করতে চাইছি। আদর্শ ব্যবস্থা সেটাই হত যদি তাদের আসামে ভোট দেওয়ার অনুমতি না দিয়ে বাংলাদেশে দেওয়া হত।’ তার এই নেতিবাচক পদক্ষেপের পর হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলমান ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন চলাকালীন নোটিশ পাচ্ছেন এবং হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। অন্য একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ‘মিঞাঁ মুসলমানদের’ উচিত আসামে নয়, বাংলাদেশে গিয়ে ভোট দেওয়া। অন্যদিকে ঢাকায় আসামের যে মুসলিম নারী সাকিনা বেগমকে খুঁজে পেয়েছিল বিবিসি বাংলা, তিনি কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমান নন, আসামেরই আদি বাসিন্দা তার পরিবার। তাকেও মি. বিশ্বশর্মার সরকার সীমান্ত পার করিয়ে দিয়েছিল। ‘আমরা নিশ্চিত করছি যেন তারা আসামে ভোট না দিতে পারে’, মন্তব্য হিমন্ত বিশ্বশর্মার। তিনি আরও বলেছেন, ‘যেকোনোভাবে যেন মিঞা মুসলমানদের উত্ত্যক্ত করা হয়, যাতে তারা আসাম ছেড়ে চলে যায়।’ তিনি এ-ও বলেছেন, তারা যে মিঞা মুসলমানদের বিরুদ্ধে, তা নিয়ে তাদের কোনো লুকোছাপা নেই। উল্লেখ্য, ভারতে মিঞা শব্দটি আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলা একটি ‘কটু কথা’, যার অর্থ ধরে নেওয়া হয় যে তারা বাংলাদেশি। হিমন্ত শর্মার এ ধরনের অনৈতিক, নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এবং মন্তব্য ভারতীয় আইনের প্রতি ধৃষ্টতা প্রদর্শন এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের শামিল। তবে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাকে গ্রেফতার বা তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি যেটি প্রমাণ করে মুসলিমদের অধিকার হরণ, হেনস্তা, নির্যাতন, হত্যা, রাহাজানি ইত্যাদিতে রাষ্ট্রীয় সায় রয়েছে যেটি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে চলমান।
মুসলিম সমাজে আতঙ্ক : সমাজকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টদের মতে, ভোট বা যেকোনো ইস্যু তৈরির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের লক্ষ্যেই খ্বু পরিকল্পনা করে ভারতে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি বা নির্যাতন হয়। দিল্লির কাছে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ। সেখানকার একটি হিন্দু মন্দিরে ঢুকে পানি খাওয়ার অপরাধে বারো-তেরো বছরের আসিফ, বাবার নাম হাবিব- এটা শোনার পর হিন্দুরা বেধড়ক মারতে থাকে। যার ভিডিও দেখে গোটা দেশ শিউরে উঠেছিল, সেই আসিফ পরে বিবিসিকে জানায়, শুধু মুসলিম হওয়ার জন্যই তাকে সেদিন ওভাবে মার খেতে হয়েছিল। জোর করে মুসলিমদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হয়, কেটে দেওয়া হয় লম্বা দাড়ি। উত্তর ভারতের আগ্রা শহরের একটি সুপরিচিত স্কুল থেকে একটি মুসলমান বালক অপমান ও ক্ষোভে রক্তবর্ণ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। ‘আমার সহপাঠীরা আমাকে পাকিস্তানি সন্ত্রাসী বলে ডাকে,’ নয় বছর বয়সী ছেলেটি তার মা লেখক এবং কাউন্সিলর রীমা আহমেদকে জানায়। তিনি বলেন, দিনটির কথা এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে। ক্লাসে তার সহপাঠীরা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে ‘তার দিকে ইশারা দিয়ে বলে, ‘ও একটা পাকিস্তানি সন্ত্রাসী। ওকে মেরে ফেল!’ ভারতে যে মুসলিম নিধন চলছে তা বিশ্ব মানবাধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করছে। বিশ্ববাসীকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
মুসলিম গণহত্যার ষড়যন্ত্র : প্রায় ৩ হাজার বছর আগে ফেরাউন, মূসা (আ.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মায়ের পেট থেকে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুদের হত্যা করে যে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিল, এই যুগের অসভ্য বর্বর উগ্র ভারতীয় হিন্দুরা সেই নারকীয়তাকেও হার মানিয়েছে। ভারতে মুসলিম শিশুরা মায়ের পেটের ভেতরও নিরাপদ না। শুধু শিশু কেন মুসলিম নারীরাই ভারতে সবচেয়ে অনিরাপদ! গুজরাট, ভারতের সর্বপশ্চিমে অবস্থিত একটি রাজ্য। ২০০২-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি—গুজরাটের ঝঅইঅজগঅঞও ঊঢচজঊঝঝ নামের একটি ট্রেনে হামলার ঘটনায় কোন প্রমাণ ছাড়াই মুসলমানদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অথচ পরবর্তীতে ‘নতুন নানাভাতি’ তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে আসে যে, ভারতের মুসলমানদের ওপর হামলা চালানোর পূর্ব-ষড়যন্ত্র হিসেবেই এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সাজানো হয়, যা উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসীরা করেছিল এবং সেটি তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশেই হয়েছিল। এই অজুহাতে মাসখানেক ধরে সাম্প্রদায়িক উগ্র জঝঝসহ হিন্দু সন্ত্রাসীরা মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। শুরু হয় দাঙ্গা। মুসলিমদের ব্যাসায়িক প্রতিষ্ঠান, বাড়ি পুড়িয়ে এবং শত শত মুসলিম নারীকে গণধর্ষণের পর পুড়িয়ে মারা হয়েছে। শিশুদেরকেও তারা ছাড় দেয়নি। ফেরাউনের নারকীয়তাকে হারমানিয়ে গণহত্যাকারী সরকার আজও বহাল তবিয়তে থাকা মানে ভারতবাসীর বিবেকের মৃত্যু ঘটেছে।
মুসলিম গণহত্যার নির্মমতা : বাবুভাই প্যাটেল, সকলের কাছে পরিচিত উপনাম বাবু বজরঙ্গি হিসেবে। গুজরাটে মুসলিম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম এই নরপশু এমনই এক বর্বর পিশাচ যে কিনা কাউসার বানু নামের এক ৯ মাসের গর্ভবতী মায়ের ফিটাসকে (ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগপর্যন্ত শিশুদের ফিটাস বলে) পেট কেটে বের করে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল। সে ছুরির ফলা দিয়ে পেট কেটে ফিটাসকে বের করে আগুনে ফেলে দেয়। তীব্র মুসলিমবিরোধী এই নরাধমের ইচ্ছা ভারত থেকে মুসলিমদের সম্পূর্ণ ধবংস করে দেয়া। তেহেলকার ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক ২০০৭ সালে গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে তার একটি সাক্ষাৎকার ধারণ করে। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় ‘নারোদা পাতিয়া গণহত্যা’ (আহমেদাবাদ এলাকায়) চালাতে সে কীভাবে হিন্দুদের সংঘবদ্ধ করেছিল, সেই ঐতিহাসিক সাক্ষৎকারে হিন্দুত্ববাদী বজরঙ্গি অতি আনন্দের সাথে তা বর্ণনা করে। বর্ণনা করে কীভাবে সে ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বহু মুসলমানকে আগুনে পুড়িয়ে ও তলোয়ারে কেটে হত্যা করে। সাক্ষৎকারের কিছু অংশÑ ‘কেটে টুকরা করা, পুড়িয়ে দেয়া, আগুন ধরানো অনেক কিছুই করা হলো, অনেক কিছুই। আসলে আমরা মুসলমানদের আগুনে পুড়াতেই বেশি পছন্দ করি, কারণ এই জারজরা তাদের দেহ মৃত্যুর পর চিতায় পোড়াতে চায় না।’ আমার শুধু একটি ইচ্ছা,…শুধু একটি শেষ ইচ্ছা…আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হোক,.. আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হলেও তা গ্রাহ্য করব না…তবে আমাকে ফাঁসিতে দেওয়ার আগে মাত্র দুইদিন সময় দেয়া হোক, আমি জুহাপুরা (মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা) চলে যাব। সেখানে ৭-৮ লাখ লোক বাস করে। আমি তাদের শেষ করব…কমকরে হলেও তো সেখানে আমার ২৫-৫০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা উচিত।’ গণহত্যার পর থানায় মামলার নথিতে লেখা হয়, এক গর্ভবতী মুসলিম মহিলার পেট চিরে আমি ৯ মাসের ভ্রুণকে বের করেছি, নিক্ষেপ করেছি আগুনে। আসলে আমি তাদেরকে দেখিয়েছি, দেখ! আমাদের বিরোধিতার শাস্তি কী। একজনকেও ছাড়া যাবে না। এমনকি তোদের ভূমিষ্ট হতেও দেয়া যাবে না। আমি বলেছি, যদি মহিলাও হয়…, যদি শিশু হয় তবু তাদের কেটে ফেল…চিরে ফেল…টুকরো করে ফেল…আগুনে পোড়াও সকল মুসলমানদের। আমাদের অনেকে তাদের ঘরবাড়ি লুট করতে অযথা সময় নষ্ট করছিল। আমি বলেছি, অযথা এ কাজ না করে তাদের কাউকে বাঁচতে দিও না, এরপর সবই তো আমাদের। আমরা দল বেঁধে বেঁধে মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঘুরছিলাম। প্রত্যেকেই মুসলমান মারছিল অতি উন্মাদনার সাথে।…আমরা এসআরপি (স্টেট রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) ক্যাম্পের পাশেই এই গণহত্যা চালাই।…আসলে একসাথে ‘মুসলমান মারতে এত্ত মজা লাগে না….সাহেব, আসলে তাদের মারার পর আমার নিজেকে রানা প্রতাপ বা মহেন্দ্র প্রতাপের মতো (মুসলিম নিধনকারী রাজা) মনে হয়েছে। এতদিন শুধু তাদের নাম শুনেছি, কিন্তু সেই দিন আমি তাই করলাম…’ এটা ছিল একটি অপকর্মের নমুনা মাত্র। মুসলিমদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে মুসলিম নারীদের গণধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আইয়্যামে জাহিলিয়াতেও হয়তো মানুষ এরকম অসভ্যতা, বর্বরতা, নির্মম, পাষণ্ড খুনিকে দেখেনি। যে সরকারের সহায়তায় এ ধরনের জঘন্য পৈশাচিক কর্মকাণ্ড ঘটছে বিশ্ববাসীর এখন কর্তব্য তার শাস্তি নিশ্চিত করা।
দাঙ্গা না ঠেকাতে মোদির নির্দেশ : তথ্যমতে ভারতের গুজরাট রাজ্যে ২০০২ সালে মুসলিমবিরোধী এই দাঙ্গায় অন্তত ৫০০০ মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন। গুজরাট দাঙ্গায় দাঙ্গাকারীদের না ঠেকাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল। ২০০২ সালের দাঙ্গার সময় মুসলিম মহিলারা পুলিশের কাছে তাদের ইজ্জত রক্ষার আবেদন জানালে পুলিশ বলেছিল, ‘তোমাদের তো মেরেই ফেলবে। তার আগে ইজ্জত থাকলো কি চলে গেল তাতে কি?’ এমনকি তলোয়ার হাতে দাঙ্গাকারীরা গর্ভবতী মুসলিম নারীদের পেট ফেঁড়ে ভ্রুণ বের করে তা তরবারির আগায় বিদ্ধ করে নারকীয় উল্লাস প্রকাশ করেছে বলেও সে সময় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা ঐ দাঙ্গায় অন্তত ৪০০ মুসলিম মহিলাকে ধর্ষণ করেছে। তারা তাদের গণধর্ষণ করে, লাঠি, ছুরি ইত্যাদি দিয়ে যৌনাঙ্গে আঘাত করে। তাদের স্তন, জরায়ু কেটে দেয় এবং তাদের যোনিপথে রড প্রবেশ করানো হয়। তাদের অধিকাংশকেই টুকরো টুকরো কেটে ফেলা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। ২৫০-৩০০ নারীকে খুন করা হয়। উগ্রবাদী হিন্দু সন্ত্রাসীরা ৫৬৩টি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। বেসরকারি জরিপ বলেছে, এই ধ্বংসলীলায় ক্ষতির পরিমাণ তিন হাজার আটশ কোটি টাকা প্রায়। মুসলমানবিরোধী দাঙ্গা চলাকালে গুজরাটের প্রধান নগরী আহমেদাবাদের একটি আবাসিক এলাকায় ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুলবার্গ হাউজিং সোসাইটি গণহত্যার শিকার হন সাবেক কংগ্রেস সাংসদ এহসান জাফরিসহ ৬৯ জন মুসলিম। তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে শহীদ করা হয়। ২০০২ সালের ১ মার্চ ওডি গ্রামে এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ির মুসলিম বাসিন্দা একটি তিনতলা বাড়িতে আশ্রয় নিলে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দুরা। সরকারের দায়িত্ব যেকোনো ধরনের সহিংসতা রোধ অথচ সেই সরকার যখন দাঙ্গা রোধ না করতে নির্দেশ দেয় সেই দেশে আর সভ্যতা থাকে কীভাবে?
অনুতপ্ত নন মোদি : নরেন্দ্র মোদি ২০০২ সালের মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার জন্য অনুতপ্ত নন বলে ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তাকে বহনকারী মোটরগাড়ি কোনো কুকুর ছানাকে চাপা দিলে সেজন্য দুঃখ অনুভব করবেন, তিনি কিন্তু মুসলিম হত্যার জন্য নয়! বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ সব কথা বলেছেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর উগ্রবাদী এ নেতা। একটি ট্রাইব্যুনালের হিসাবে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ওই গণহত্যা পর্বে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ মানুষকে। সেই দাঙ্গা সৃষ্টিকারী আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী এটি বিশ্বমানবতা এবং ভারতবাসীর জন্য লজ্জাজনক অধ্যায়।
ফিরে আসছে দাঙ্গার স্মৃতি : পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের যে মুজফফরনগর ও শামলিতে দাঙ্গায় শত শত মুসলিম ঘরছাড়া হয়েছিলেন, সেখানেও হালে আবার ফিরে এসেছে সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। ‘মকতুব’ নামে একটি এনজিও-র হয়ে সেখানে দাঙ্গাপীড়িতদের মধ্যে বহুদিন ধরে কাজ করছেন রাবিহা আবদুররহিম। সেই রাবিহা বিবিসিকে জানান, মুসলিম ছেলেদের মারধর করে বা মেয়েদের হেনস্তা করে তার ভিডিও তুলে রাখার ঘটনা সেখানে ঘটছে। হিন্দু বড় বড় জমায়েত বা মহাপঞ্চায়েত ডেকে সেই সব নির্যাতন উদযাপন করছেন, মুসলিমদের প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ‘আজ এদেশে মুসলিম মেয়েরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই… যে কোনো দিন তারা খুন হতে পারে, ক্যামেরার সামনে ধর্ষিতা হতে পারে বা জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারে – স্রেফ তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য।’ হিন্দু বা মুসলিম যেই হোক দাঙ্গা ফিরে আসা কারো কাম্য নয়।
উত্তর প্রদেশে নির্যাতন: সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা লোকজন মেরে অজ্ঞান করে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল প্রবীণ কাজিম আহমেদকেও। লম্বা দাড়ি আর টুপি দেখে তাকে নিশানা করেছিল হামলাকারীরা। কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে ফেরা মি. আহমেদ পরে বলেন, ‘আলিগড়ের বাসের জন্য যখন অপেক্ষা করছিলাম- তখন ওই গাড়িটি এগিয়ে এসে আমায় লিফট দিতে চায়।’ কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথের আমলে উত্তরপ্রদেশে এ ধরনের ঘটনা এখন এতটাই ডালভাত হয়ে গেছে যে মিডিয়ায়ও এসব খবর ঠাঁই পায় না বললেই চলে। উত্তর প্রদেশে মুসলিম নির্যাতন যেন একটা নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী চলছে, একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করছে – বিবিসিকে বলেছিলেন আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্রনেত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট আফরিন ফতিমা। আর দিল্লিতে সুপরিচিত লেখিকা ও অ্যাক্টিভিস্ট ফারাহ নাকভি-রও বিন্দুমাত্র সংশয় নেই, উত্তরপ্রদেশে যা ঘটছে, সেটাও করা হচ্ছে নির্বাচনকে মাথায় রেখেই। ফারাহ নাকভি বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে বিজেপি তাদের পুরনো খেলা মুসলিম নির্যাতনে ফিরে আসে- কারণ ওই রাজ্যে সুশাসন দিতে তারা চরম ব্যর্থ।’ ভারত ৭০০ বছর মুসলিম শাসনাধীনে ছিল আজ সেই দেশ মুসলিমহীন করার হীন ষড়যন্ত্র করছে বিজেপি সরকার যেটি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পেহেলগাও নৃশংসতা : ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পেহেলগায়ে গত ২২ এপ্রিল ২০২৫ বন্দুকধারীদের হামলার পর মুসলিম হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ, ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর সর্বত্র বৃদ্ধি পেয়েছে । জানা যায় ২২ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৫ ভারতজুড়ে ৬৪টি ঘৃণামূলক বক্তব্য নথিভুক্ত করেছে ইন্ডিয়া হেট ল্যাব (আইএইচএল)। সর্বোচ্চসংখ্যক ঘৃণামূলক বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে মহারাষ্ট্রে। এসকল বক্তব্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ডব্লিউএইচপি), আন্তঃরাষ্ট্রীয় হিন্দু পরিষদ (এএইচপি), রাষ্ট্রীয় বজরং দল (আরভিডি), হিন্দু জনজাগৃত সমিতি, সকল হিন্দু সমাজ, হিন্দু রাষ্ট্র সেনা এবং হিন্দু রাষ্ট্র দলসহ হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে মুসলিমদের লক্ষ করে ঘৃণা ও ভয় দেখানোর জন্য ভারতব্যাপী সমন্বিত প্রচারণা চালানো হয়।
ইন্ডিয়া হেট ল্যাব (আইএইচএল)-এর প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, উত্তরপ্রদেশে একজন মুসলমানকে কুড়াল দিয়ে নৃশংস হামলা করার পর হামলাকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকে পেহেলগায়ে ছাব্বিশজন নিহত হয়েছে, তোদেরও ছাব্বিশজনকে হত্যা করা হবে। আর মিজোরাম বিমানবন্দর থেকে বাংলাভাষী (মুসলমান) দুই আমেরিকান নাগরিককে আটক এবং ত্রিপুরায় গরু নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তিন মুসলিম যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
পেহেলগায়ের হামলায় ২৬ জন নিহত হয়। এই ঘটনায় ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করছে। একতরফাভাবে পাকিস্তানের সাথে পানি চুক্তি প্রত্যাহার, পাকিস্তানের সকল নিউজ চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ করেছে। ঘটনা যে বা যারাই ঘটিয়ে থাকুক না কেন, নির্যাতিত হচ্ছে ভারতের মুসলমানগণ। হামলার পর গত ৪ মে রোববার রাতে নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। কাশ্মীরের ২ হাজারেরও বেশি মুসলমানকে আটক করেছে। হামলায় জড়িত সন্দেহে বুলডোজার দিয়ে অনেকের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-কারখানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে আগ্রাতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোরক্ষক দল ১ মে দুজন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। কট্টর হিন্দুরা প্রকাশ্যে আরো ঘোষণা করছে পেহেলগায়ের ২৬ জন হত্যার প্রতিশোধ নিতে ২ হাজার ৬০০ মুসলমানকে হত্যা করা হবে। তবে যুদ্ধবাজ বিজেপি সরকারের পেহেলগাও কার্ডের মাধ্যমে সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিপুল পরাজয়ে একটি চরম শিক্ষা হয়েছে।
মহারাষ্ট্র নাগপুরে ভারতের এক সময়ের মুসলিম শাসক সম্রাট আওরঙ্গজেবের কবর গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মহারাষ্ট্রে মার্চ মাসে তারাবির নামাজের সময়ে উগ্রবাদী হিন্দু বিজেপি কর্মীরা প্রশাসনের সহায়তায় মসজিদের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর হামলা করে। মার্চ ২০২৫ এর (১২-১৭) মাঝামাঝি সময়ে হিন্দুদের হোলি খেলা বা দোলযাত্রার দিনে বিশেষ করে ১৪ মার্চ জুমার দিনে নামাজ চলাকালীন মসজিদে হামলা করে মুসল্লিদের মারধর করে ও মসজিদগুলো ভাঙচুর করে। ঐদিন মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডে এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভুমে হোলির মিছিল থেকে অনেক মসজিদে আক্রমণ করা হয়। তাতে মসজিদের ইমামসহ অনেক মুসল্লি আহত হয়। এসকল এলাকা থেকে পুলিশ ২২ জন মুসলমানকে আটক করে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভুমের সাঁইথিয়া অঞ্চলেও জুমার নামাজে উগ্রবাদী বিজেপির কর্মীরা মসজিদে আক্রমণ করে। ভারতের সর্বত্র যে মুসলিম নির্যাতন চলছে তা বিশ্ব দরবারে ভারত সরকারের অগ্রহণযোগ্যতাই বৃদ্ধি করছে।
রাষ্ট্রীয় ঘৃণা-বিদ্বেষ সামাজিক রূপে : ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের ২০ কোটিরও বেশি মুসলমানের জীবন আরো অশান্ত হয়ে পড়েছে। মুসলিম সন্দেহে গরু ব্যবসায়ীদের হত্যা করা হয়েছে। মুসলমান ব্যবসায়ীদের টার্গেট করা হচ্ছে, তাদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট করা হচ্ছে। ওয়াক্ফ আইনের বাতিলের পর মসজিদ, মাদরাসা ও কবরস্থানগুলোকে টার্গেট করে ভেঙে দেয়া হচ্ছে। ‘বিয়িং মুসলিম ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ের লেখক জিয়া উস সালাম বলেন, ‘ভারতের মুসলমান জনগোষ্ঠী যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়েছে, তারা নিজের দেশেই অদৃশ্য সংখ্যালঘু।’
সূত্র : আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, সাউদি গেজেট, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, এএফপি, বিবিসি।
এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com