ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ৬ ফেব্রুয়ারি
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪৪
সোনার বাংলা রিপোর্ট : ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তাদের এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য (Theme), ‘মেধা, সততা ও দেশপ্রেমে গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করে অনেক বাধা এবং রক্তরাঙা পথ পাড়ি দিয়ে আজ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ও হল ছাত্র সংসদ (ডাকসু), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চাকসু), গণবিশ্ববিদ্যালয় (গকসু)সহ ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত প্রত্যেকটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন আজ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
১৯৭১ সালে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় আধিপত্য। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সহযোগিতার বয়ানে তরুণদের ওপর চাপিয়ে দেয় তাদের পৌত্তলিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মাদকের নীল ছোবল এবং সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিপেক্ষতার নামে শয়তানি মতবাদ। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের তুলনামূলক রাজনীতির অধ্যাপক ভøাদিমির তিসমানেনু (Vladimir Tismaneanu)-এর ভাষায়, The Devil in History: Communism, Fascism.
সামাজিক ন্যায়বিচার, ইনসাফ, মানবিক মর্যাদা আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের ওপর একদলীয় বাকশালী দুঃশাসন চাপিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ। দেশের প্রথম স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম করেন শেখ মুজিবুর রহমান। দুঃশাসন থেকে মুক্তির প্রেরণায় একজন ছাত্র-তরুণের একটি অংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে আরেক শয়তানের ফাঁদে পড়ে (এ বক্তব্য প্রতিবেদকের নয়, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের তুলনামূলক রাজনীতির অধ্যাপক ভøাদিমির তিসমানেনু)। স্বৈরশাসক ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিবের করুণ পরিণতির পর দেশের মানুষের মাঝে কিছু স্বস্তি ফিরে এলেও দিগভ্রান্ত ছাত্র-তরুণরা ছুটতে থাকে আলোকিত আদর্শের সন্ধানে এমন এক ক্রান্তিকালে এদেশের একদল সন্ধানী তরুণ ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রাচ্যের অক্সফোডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে সমবেত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আলোর বাতিঘর ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’। তৎকালীন তরুণ ছাত্রনেতা মীর কাসেম আলীকে সভাপতি এবং মো. আবদুল বারীকে সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব দেয়া হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার আগে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা ছিলেন মীর কাসেম আলী (শহীদ), মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (শহীদ), একে মুহাম্মদ আলী (রাহিমাহুল্লাহ), বাশারাত হোসেন ও এনামুল হক মঞ্জু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক ছিলেন ড. আবুদল বারী (যুক্তরাজ্য প্রবাসী), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক ছিলেন শাহজাহান খান।
তাদের এ আলোকিত আদর্শের পথ আগলে দাঁড়ায় অন্ধকারের পূজারি শয়তানি মতবাদের দেশিয় ও আন্তর্জাতিক চক্র। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠার বছরই প্রথম আঘাত আসে বাম ও সেক্যুলারদের পক্ষ থেকে ১৯৭৭ সালের ২৮ আগস্ট। ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইসলামী পরিবেশ নিশ্চিত করতে গণসংযোগ ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করার সময় আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর দোসর ছাত্র নামধারী গুণ্ডা বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হন বর্তমান বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সাবেক সহ-সভাপতি এফবিসিসিআই, তৎকালীন শিবির নেতা আবুল কাসেম হায়দার, জামায়াতে ইসলামীর আন্তর্জাতিক বিভাগের সদস্য নওশাদ আলী ফরহাদ, মরহুম রেজাউল করিম শফিক, মেধাবী ছাত্রনেতা আবদুল আউয়াল।
কোনো সন্ত্রাসী হামলায় তারা থেমে যায়নি। বাম-সেক্যুলার ছাত্র সংগঠনগুলোর রক্তচক্ষু ও বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে চলে ইসলামী ছাত্রশিবির। মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। দলে দলে তারা ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেয়।
১৯৮২ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপক সমর্থন দেখে আধিপত্যবাদী শক্তির দোসরদের মাথা গরম হয়ে যায়। তারা যে কোনো মূল্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিজয় ঠেকাতে হত্যা ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। ১৯৮২ সালের ২১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত দিন। দিনটি ছিলো সেই সময়ের ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিন।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত এনাম-কাদের পরিষদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল। নির্বাচন প্রচারণার শেষ দিনে প্যানেলের সমর্থনে ক্যাম্পাসে বিশাল মিছিল বের হয়। এই মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন সাইমুমের শিল্পীরা । তারা দেশাত্ববোধক ও উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করছিলেন।
মিছিলটি অগ্রসর হয়ে এফ রহমান হলের সামনে পৌঁছালে ছাত্র ইউনিয়ন ও জাসদ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করেই গ্রেনেড ও বোমা হামলা চালায়। মুহূর্তেই ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বোমার আঘাতে চিরতরে পা হারান সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর দুই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিল্পী ওস্তাদ তাফাজ্জল হোসাইন খান ও আজীজ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ)। সাইমুমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কবি মতিউর রহমান মল্লিক (রাহিমাহুল্লাহ), সাবেক পরিচালক আকরাম মুজাহিদসহ প্রায় ৪০জন আহত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর কমিউনিস্ট বাম ও সেক্যুলার ফ্যাসিবাদী অপশক্তি রক্তপিপাসা মেটাতে প্রাচ্যের ক্যামব্রিজখ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা করে ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ। এদিনটি ইসলামী ছাত্রশিবিরের শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৮২ সালের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর শহীদ সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব ও জাব্বারের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্রশিবিরের যাত্রা শুরুর পর বাংলাদেশে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলায়ের মতিহার চত্বরে ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শাহাদাতবরণকারী শহীদ সাব্বির আহমদ। এ ঘটনায় এই দিন আরো শাহাদাতবরণ করেন আবদুল হামিদ, আইয়ুব আলী, আবদুল জাব্বার। শাহাদাতের এই পথ ধরে এ পর্যন্ত ২৩৪ জন শাহাদাতবরণ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। উল্লেখ্য, এ সংখ্যার বাইরে আছেন ৩৬ জুলাই বিপ্লবের শহীদরা।
রক্তাক্ত এই পথে কাফেলার অগ্রযাত্রা আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী অপশক্তির হত্যা সন্ত্রাস ও শয়তান হায়েনার রক্তচক্ষুতে একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি, ইনশাআল্লাহ হবেও না। কিয়ামত পর্যন্ত কেউ বন্ধ করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। ২০২৪-এর ১ আগস্ট নিষিদ্ধ ঘোষণার পর আরো শতগুণ বেগে গর্জে উঠেছিল এই মিছিল। এর মাত্র ৪ দিন পরই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা।
কবি আল মাহমুদের ভাষায়, ‘আমাদের ভয় দেখিয়ে শয়তান নিজেই অন্ধকারে পালিয়ে যায়।/আমাদের মুখয়বয়ে আগামী ঊষার উদয়কালের নরম আলোর ঝলকানি।/আমাদের মিছিল ভয় ও ধ্বংসের মধ্যে বিশ্রাম নেয়নি, নেবে না।/আমাদের পতাকায় কালেমা তাইয়্যেবা,/আমাদের এই বাণী কাউকে কোনদিন থামতে দেয়নি/আমরাও থামবো না।’