স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৪
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের রক্ত দেয়া এবং চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে অনেক গ্যাপ। আমরা যে জন্য রক্ত দিলাম- আমরা কেন তা পেলাম না, তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। জীবনের মূল্য, সময়ের মূল্য অনেক। যা চলে যায়- তা কিন্তু আর ফিরে আসে না। তাই এবার আমরা আর পেছনে তাকাবো না, সামনে এগোতে চাই। ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অনেক কিছু দেখলাম, পর্যবেক্ষণ করলাম, সব দলের নেতারা সাধারণ জনগণের কথা বলে ক্ষমতায় গিয়ে আত্মকেন্দ্রিক, দলীয়কেন্দ্রিক হয়ে যায়। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের মতো লোকও একনায়ক হয়ে বাকশাল কায়েম করে বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্র ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। তার দশা কী হয়েছিল, আপনারা দেখেছেন। আমরা এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না।
এ দেশের মানুষ স্বাধীনচেতা, আবেগপ্রবণ। নিজের কথা চিন্তা না করে দেশের জন্য জীবন দিতে দ্বিধাবোধ করে না। তাই তো ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনে ২০০০ ছাত্র-জনতা জীবন দিল, ৩০ হাজার ছাত্র-জনতা আহত হলো, পঙ্গু হলো, হাত-পা হারিয়ে এখনো জীবনের সাথে লড়ে যাচ্ছে। আমরা যারা এ আন্দোলনে প্রত্যক্ষ শরিক ছিলাম, জেলে ছিলাম আর যারা এ আন্দোলনের সাথে নেই বলে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, দমন-নিপীড়ন প্রকারান্তরে সমর্থন করেছেন আজ তারাই বড় বড় কথা বলছেন। শহীদ জিয়ার গড়া বিএনপিকে পথ হারাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্যাকেট খেয়ে যারা গত ১৬ বছর নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করেছেন, তারাই এখন আন্দোলনের শরিক ছাত্র-জনতার বিরোধী কথা বলতে দ্বিধাবোধ করছেন না।
যদিও এ দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা শহীদ ও আহতদের মূল্যায়ন করে ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির প্যানেলকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে ছাত্র-জনতার কিছুটা হলেও ঋণ পরিশোধ করেছে। আবার ছাত্রশিবির প্যানেল নির্বাচিত হয়েই গতানুগতিক ছাত্র সংসদ না চালিয়ে ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেছে, যা ৫৫ বছরের ছাত্র সংসদের কাজ অতিক্রম করে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-অভিভাবকদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গা করে নিয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা স্বাধীনভাবে তাদের পড়াশোনার পরিবেশ পাচ্ছে। মাদকদ্রব্য পরিত্যাগ, ফাও খাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলের পরিবেশের আমূল পরিবর্তন করেছে ছাত্রশিবির প্যানেলের ছাত্র সংসদগুলো। শিক্ষকও ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেলের নির্বাচিত সদস্যরা দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ আশানুরূপ উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। লোকে বলতে শুরু করেছে, এমন চরিত্রের লোকদের নেতৃত্বই তো দেশের সব জায়গায় প্রত্যাশা। যারা সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত জীবনযাপন করে এবং সে অনুসারে তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করে তাদের জন্য যেমন ভুক্তভোগীরা দোয়া করছে, অন্যদিকে মহান আল্লাহর সাহায্যও তাদের জন্য উন্মুক্ত। দেশের শাসনভার যদি এ সমস্ত সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত লোকদের ঘাড়ে পড়ে, তবে দেশের অবস্থাও ভালো হতে বাধ্য। আমাদের এ সমতলভূমির দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। পরাধীনতার গ্লানি আর আমাদের ছুঁতে পারবে না।
জন্মগতভাবেই আমাদের দেশের মানুষ মানবদরদি ও পরোপকারী। আমাদের নেতারা যদি সর্বক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিয়ে জনগণের স্বার্থে জনগণের জন্য কাজ করার উদ্যোগ নেয়, তবে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা বানাতে বেশি সময় লাগবে না।
জামায়াতের উদ্যোগে দেশের সর্বস্তরে বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ পলিসি সামিট-২৬’ হয়ে গেল। নির্বাচনে জয়ী হলে জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। যা দেশি-বিদেশি বুদ্ধিজীবী ঐ কূটনীতিক, আজনীতিবিদ, সচেতন নাগরিক ও মিত্রদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে দেশে একটি স্বৈরাচারমুক্ত পরিবেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। সাথে সাথে কিছু লোক রাতারাতি ১৬ বছরের স্বৈরাচারের অত্যাচার-অনাচার ভুলতে বসেছে। যেনতেনভাবে ক্ষমতার মসনদে বসার স্বপ্ন দেখছে। বিএনপিকে নতুন স্বৈরতন্ত্রের দিকে নেয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। ত্যাগী নেতারা পেছনে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বেগম জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে জামায়াত-শিবিরকে তার আস্থার মানুষ হিসেবে গণ্য করতো। জোট সরকারের সময় জামায়াতের দুজন মন্ত্রী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় সততার সাথে চালিয়ে বেগম জিয়ার আস্থার মানুষ হিসেবে প্রমাণ রেখেছেন। তারপরও দুর্নীতির রানি তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। মহান আল্লাহও তাকে এর মূল্যায়ন হিসেবে পরাধীনতার জালে পরবাসী বানিয়েছেন। ফাঁসির রায় নিয়ে এখন মোদি দাদার কৃপায় জীবনযাপন করছেন, যা দেশের জন্য লজ্জাকর।
দেশ আগামীতে সুখী-সমৃদ্ধশালী করার যে সুযোগ এসেছে, তাতে বাধা সৃষ্টিতে রত বিএনপির কিছু পতিত সরকারের প্যাকেট খাওয়া নেতা, তারা হঠাৎ করেই জামায়াত-শিবিরকে তাদের প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টা করছে। সত্য-মিথ্যার জালে আবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আওয়ামী বয়ানে পুরাতন কেচ্ছা-কাহিনী বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পাঁয়তারা করছে। জনগণ আর ফ্যাসিস্ট হাসিনার বয়ান বিএনপি নেতাদের মুখে মানবে না। তাইতো ছাত্রশিবিরকে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দিয়েছে।
হঠাৎ করেই তারেক জিয়ার বয়ানে জামায়াত-শিবিরকে গুপ্ত-সুপ্ত সংগঠনের ট্যাগ লাগানোর চেষ্টায় দেখা যাচ্ছে। তারেক জিয়াকে মনে রাখতে হবে- কারো দয়ায় তার বাবা-মা এদেশের শাসনভার চালাননি। আজকেও তাকে কেউ বাইর থেকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে না। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ধারাবাহিকতায়ই দেশের সচেতন ছাত্র-জনতা আগামীতে তাদের নেতা বানাবে; দেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ বানানোর জন্য। তারেক জিয়াকে মনে রাখতে হবে- ছাত্র-জনতার বিপ্লব না হলে ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ হতো না। তার মায়ের জানাযায়ও শরিক হতে পারতেন না। তাই ছাত্র-জনতার বিপ্লব আত্মস্থ করেই আগামীতে বাংলাদেশ গড়তে হবে। কোনো ষড়যন্ত্র দেশি বা বিদেশি হোক, ছাত্র-জনতা মেনে নেবে না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ঘোষিত জুলাই সনদের ওপর গণভোট এবং সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে একটি জনদরদি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজে দেশের সব দল-মত ধর্মীয় বিশ্বাসী লোকদের এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ যাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবে, তারা সরকার গঠন করবে। বাকিরা বিরোধীদলে থেকে দেশের ভালো কাজের জন্য সহযোগিতা করবে। দেশের জন্য ভালো সমালোচনা করবে। আমরা আর দেশে শত্রুভাবাপন্ন সরকারি ও বিরোধীদল দেখতে চাই না। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, বিএনপির কিছু বড় নেতা গণভোটকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন। আবার তাদের মুখপাত্র নজরুল ইসলাম সাহেব গণভোটের পক্ষে বলছেন। তারেক জিয়াকে দল সাজাতে দলের মধ্যে চেইন অব কমান্ড ফেরাতে হবে দেশের স্বার্থেই।
জামায়াত-জোট ইতোমধ্যেই গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের জন্য দলীয়ভাবে ৩০০ আসনে সৎ-যোগ্য নেতা বাছাই করে মনোনয়ন দিয়েছে। তারা জনগণকে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সব পদক্ষেপ নিয়েছে। জামায়াত ইতোমধ্যেই ১১ দলীয় নির্বাচন সমঝোতা দলিল স্বাক্ষর করেছে। যদিও দেশের একটি দল, যারা কোনোদিন একটি এলাকায়ও ভোটে জিতে পারেনি। মানে চরমোনাইর নেতারা। ইতোমধ্যেই তারা এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের সচেতন জনগণ মেনে নেয়নি। গত কয়েকদিন ঢাকা ও মফস্বলে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ছাত্র-জনতায় রিকশাওয়ালা, পান বিক্রেতা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সবাই দেশকে একটি ভালো দেশে পরিণত করার জন্য গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন করার জন্য অধিক আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছে। গ্রাম থেকে শহর-বন্দরে একশ্রেণির নেতাকর্মী চাঁদাবাজি, দখলবাজি করে গত দেড় বছরে জনগণকে অতিষ্ঠ করে ফেলেছে। ভাবটা দেখে মনে হয়েছে ফ্যাসিস্টরা নবউদ্যমে ফিরে এসেছে। ছাত্র-জনতা এর প্রতিকার চায়। জনগণ এবার সৎ, যোগ্য, জনদরদি নেতাদেরই তাদের নেতা বানাতে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত নেতা তারা যে দলেরই হোক, ছাত্র-জনতা তাদেরই বেছে নেবে। এলাকার হিন্দুদের সাথেও আমার কথা হয়েছে। তারাও এবার মাওলানা মতিউর রহমন নিজামীকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয়ার বদলা নেবে, তার যোগ্য ছেলে ব্যারিস্টার নাজিম মোমেনকে বিপুল ভোটে জয়ী করে সংসদে পাঠাবে, ইনশাআল্লাহ।
তাই বলবো, নির্বাচন কমিশনকে এবং সরকারকে দলমুক্ত হয়ে আপনারা ভালো কাজের আদেশ, মন্দ কাজের প্রতিরোধের ব্যবস্থা করে জাতির কাছে অমর হয়ে থাকার প্রতিজ্ঞা করুন। গ্রামের মেম্বার থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট সবাইকে জবাবদিহিমূলক চিন্তা করে ভালো মানুষের দেশ করার কাজে সহযোগিতার হাত বাড়ান। দুনিয়ায়ও আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে, আবার আমাদের মহান আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করতে হবে। তার কাছে কোনো কিছুই লুকানো যাবে না।
ইতোমধ্যেই জামায়াত জোট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। তাই জনতার কাম্য ‘হ্যাঁ’ ভোট ও সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোট প্রার্থীদেরকেই ভোট দিয়ে সংসদে পাঠানোর জন্য, যাতে আগামীর বাংলাদেশ হয় সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের।
দুনিয়ায় যারা জনগণের বিপক্ষে কাজ করেছে, তারা কিন্তু আজ পরবাসী বা জেলে ভুগছে। আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। লুট করা টাকা ফেরাতেও চেষ্টা চলছে। আমরা সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করতে চাই। তোষামোদের নীতি ত্যাগ করে সরকারকে ভালো পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর জন্য যুবসমাজকে আহ্বান জানাতে চাই। আর লোভ-লালসা নয়, জনতার কাতারে নেমে আসুন। দুনিয়া ও আখিরাতের ভালোর জন্য কাজ করি। আমরা মরে গেলে যেন জনগণ আমাদের থুথু না দেয়। আমাদের জন্য দোয়া করে, সেই কাজ করেই মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সা. বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব তোমাদের দায়িত্বের হিসাব দুনিয়া ও আখিরাতে দিতে হবে। আমাদের প্রস্তুতি কাম্য।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]