একাত্তরের আওয়ামী বয়ানের জাবর কেটে চব্বিশ-চেতনাকে ধামাচাপা!


১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৪

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে আবারো সেই পুরনো কৌশল, যা প্রকৃতপক্ষে অপকৌশল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি আসলে ‘আওয়ামী বয়ান’ হিসেবে বহুল পরিচিত। এখন তার চর্চার জাবর কেটে চললে মূলত চব্বিশ-চেতনাকেই ধামাচাপা দেয়া হবে। আকারে-ইঙ্গিতে সেই প্রয়াসই চলছে কিনা, সেটা নিয়ে কানাঘুষা হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
একজন রাজনীতিক একটি বড় দলের প্রতি ইঙ্গিত করে এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের একপেশে বয়ান তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ সমার্থক বানিয়ে ফেলেছে দলটি। ফলে জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনেক সময় মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপাদানেও চড়াও হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধকে ধর্মের বিপরীতে যারাই দাঁড় করাতে চায়, তারা এসব প্রবণতা তৈরির জন্য দায়ী।’
‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ’ বা ‘বিপক্ষ’ বয়ানটা আওয়ামী অভিধানে জন্মলাভ করেছে। বাস্তবে এরকম কিছুই নাই। এ দেশে জন্ম, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট থাকা মানে সে এ দেশের অস্তিত্ব, সংবিধান আর আইন মেনে নাগরিক। অর্থাৎ এরা বাংলাদেশপন্থী। এখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ আবার কি? এটা একটা টাউটারি শব্দ।
আরেকজন বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলে বলেন, স্বাধীনতার পরপরই যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা কী কারণে তৎকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা করেননি? পরে একেক সরকারের শাসনামলে নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হয়েছে। এসব নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে গোপন রাজনীতি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত নিজেদের পকেটে নিয়ে জাতির মধ্যে একটি বিভাজনের রাজনীতি করা হয়েছে। এটি ছিল খুবই সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশল।
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দবন্ধটি নতুন করে বাজার পেতে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এর মাত্রাতিরিক্ত অপপ্রয়োগের কারণে অধিকাংশ মানুষের কাছে শব্দযুগলটি এখন বমি উদ্রেককারী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পতিত সরকারের মতলববাজির কারণে নিরীহ শব্দ দুটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বাণিজ্য হচ্ছে বিগত রেজিমের একটি বড় বাণিজ্য।
কী ছিল সেই বয়ানে
আওয়ামী বয়ান ছিল মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম, ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন প্রভৃতি। বিপরীতে ইসলামপন্থী দলগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ ও প্রতিপক্ষ হিসেবে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়। এমনকি জিয়াউর রহমানের মতো একজন মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক ও বীরোত্তম খেতাবপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডারকে পর্যন্ত পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন- এটি ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু যখন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচিত হলো, সেই ঘোষণাপত্রে মিথ্যা একটা বয়ান জুড়ে দেয়া হলো। বলা হলো, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।’ পরবর্তী সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনীতে মুজিবের নামে একটি তথাকথিত ঘোষণা ছাপিয়ে দেয়া হলো।
এদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার তাদের বিকৃত ভাষ্য স্কুলের পাঠ্যবইয়েও অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রকাশিত ও সরবরাহকৃত পাঠ্যপুস্তকগুলো পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়, পাঠ্যপুস্তকগুলোয় এখনো ফ্যাসিস্ট আওয়ামী বয়ান ও ইতিহাস বিকৃতি বহাল রাখা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নবম-দশম শ্রেণির ‘পৌরনীতি ও নাগরিকতা’ বইয়ের ‘গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন ব্যবস্থা’ শীর্ষক সপ্তম অধ্যায়ে গণহত্যাকারী ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংসকারী আওয়ামী লীগকে দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। বইটির একই অধ্যায়ে বিএনপি সম্পর্কেও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে সাবেক সেনাপ্রধান উল্লেখ করে জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে সামরিক শাসনামল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিতর্কের মুখে অনলাইন ভার্সনে এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হলেও অনেক মুদ্রিত বইয়ে আওয়ামী বয়ান বহাল রয়ে গেছে। এখন দাবি উঠেছে, বাংলাদেশে গণহত্যাকারী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বয়ান অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। সেইসঙ্গে চব্বিশের ছাত্র-নাগরিক গণঅভ্যুত্থানের পরও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের যে বা যারা পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের নামে আওয়ামী বয়ানকে প্রচারে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই বয়ান কি চলবে?
যারা আওয়ামী লীগের রচিত ও পঠিত ভাষ্য নিয়ে ভোটের মাঠে নামতে চাচ্ছেন, তারা কি নিশ্চিত যে চব্বিশ জুলাই-পরবর্তী নতুন পথ খুঁজে নিতে উদগ্রীব সাধারণ মানুষ এ ভাষ্যের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাবে? এখন যদি এ আওয়ামী বয়ান বর্তমান সময়ে কেউ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসহ পুরোটাই মেনে নিতে হবে। কেননা আওয়ামী লীগের প্রদত্ত বয়ান কেবল ইসলামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি- জিয়ার বিরুদ্ধেও হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষ চান অতীতের বিভাজনমূলক বক্তব্য ও স্লোগান পরিত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের নিজস্ব চেতনা এবং চব্বিশের আধিপত্যবাদবিরোধী ধারাকে সমুন্নত ও সুসংহত করার মাধ্যমে ঐক্যের বুনিয়াদ গড়ে তুলতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী বয়ান রচিত হয়েছে প্রধানত ভারতের অনুকূলে। যাতে এর ওপর ভিত্তি করে ভারতের মদদে আওয়ামী লীগকে চিরকাল ক্ষমতায় রাখা যায়। এতে কেবল আওয়ামী লীগের লাভ তো ছিলই, ভারতেরও বিনা পরিশ্রমে বাংলাদেশকে ‘দুধেল গাই’ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগ এবং ভারত এ শব্দগুলো একাকার করে ফেলা হয় এবং এগুলো লীগের একচেটিয়া অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এসব কিছুই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে প্যাকেজ করা হয় এবং এর বাইরে অন্য কোনো চিন্তা করার অবকাশ রাখা হয়নি। এর বাইরে কোনো বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া হলে সেটা ‘পাকিস্তানি ভাবনা’ বলে আখ্যায়িত হতো। শুধু তাই নয়, তাদের পাকিস্তান চলে যেতে বলা হতো।
অপরদিকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়নে নামকাওয়াস্তে নেয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখিয়ে লুটপাট করা হয়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। মূলত ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করে হরিলুটের এসব ঘটনা ঘটেছে।
নতুন সময়ের ডাক
দেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকলেও তাদের সমমনা বামেরা আছে, আছে তাদের ক্ষমতার সঙ্গী জাতীয় পার্টি। এখন এরাই এ আওয়ামী বয়ান অক্ষত রাখার দায়িত্ব পালন করে যাবে। এখন নির্বাচনে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কৌশল হিসেবে কেউ যদি ঐ বয়ানই এস্তেমাল করতে চায়, তাহলে সেটা বাজার পাওয়া দূরে থাক ভোটারদের নিন্দা কুড়ানো ছাড়া আর কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। ইতোমধ্যে একটি বড় দলের শীর্ষ একজন নেতার মুখ থেকে ডাস্টবিনের তলায় আটকে থাকা আবর্জনা টেনে বের করে সেগুলো নিক্ষেপ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেগুলো অন্যের গায়ে লাগার আগেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
একাত্তরের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ভারতের সহযোগিতা করেছিল বটে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে দুই ভাগে ভাগ করে পূর্বাংশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়া। এর কাজ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও মাত্র চার বছরের মধ্যে পঁচাত্তরে গিয়ে ভারতীয় প্রকল্প ভেস্তে যায়। অতঃপর প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে জাতি ভারতের আধিপত্যের কবল থেকে উদ্ধার পায়। আর এ কারণেই জিয়া ছিলেন তাদের চক্ষুশূল। ২০০৮ সালে ভারত আবারো সুযোগ নেয় এবং সেনাপ্রভাবিত ও পরিচালিত সরকারের সাথে আঁতাত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে।
সেই শুরু। অতঃপর চলতে থাকে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন। প্রথমেই রাষ্ট্রের গৌরব সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের প্রক্রিয়া চলে। পিলখানা ম্যাসাকার ছিল তার সূচনা। পরে ‘মানবতাবিরোধী’ ট্রাইবুনাল ব্যবহার করে দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতৃবৃন্দকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এবং কারাগারে আটকে রেখে হত্যা করা হয়। এজন্য কাজে লাগানো হয় জাতিকে বিভক্তকারী নানা স্লোগান। আর এ বিভক্তিকে ব্যবহার করে সর্বত্র অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। একে ব্যবহার করে ব্যাংক দখল, বিদেশে টাকা পাচার, উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা মেরে দেয়া ইত্যাদি অপকর্মে। এ অবস্থা চলতে থাকে শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী মিথ্যা বয়ানের রাজনীতির কবর রচিত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগের তৈরি প্রতিটি বয়ানকে ডাস্টবিন ছুড়ে মেরেছে। কিন্তু ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে সেই আওয়ামী বয়ানকে ধারণ করেই রাজনীতি করতে হবে কেন?
একাত্তর নিয়ে আওয়ামী মিথ্যা বয়ানের রাজনীতির কবর রচিত হয়েছে জুলাই অভুত্থানে। এ প্রজন্ম আওয়ামী লীগের তৈরি প্রতিটি বয়ানকে ডাস্টবিনে ছুড়ে মেরেছে। কিন্তু ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে আওয়ামী বয়ানকে ধারণ করেই রাজনীতি করতে হবে- এমন দেউলিয়াত্বের কোনো জবাব নেই!
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কেউ বিসর্জন দিচ্ছে না। এটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের উত্তরসূরি। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের রাজনীতির বিরোধী। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ আর মুজিববাদ এক জিনিস নয়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি বাংলাদেশে থাকা উচিত ছিল না। কিন্তু সেই অতীতমুখী রাজনীতিই বাংলাদেশের প্রধান বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। তবে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে পাশার দান উল্টে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী অনেক ব্যক্তিত্বই এখন নতুন পথরেখায় চলতে চাচ্ছেন। যার কিছু নমুনা ইতোমধ্যে দেখা গেছে। এটি এখনকার রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়ে রূপান্তরিত হতে চলেছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের ডুগডুগি আর কেউ পছন্দ করতে পারছে না বলেই প্রতীয়মান হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি এখনো কেনো কোনো বিদেশি প্রভুর ওপর নির্ভরশীল থাকবে? দুর্নীতি আজো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের আইন ও সমাজব্যবস্থা এখনো দুর্নীতি, অনিয়ম, অবিচার ও স্বজনপ্রীতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি। স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বহু আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ নামক যে বিষবাষ্প আমদানি করা হলো, তা কোনোক্রমেই কোটি কোটি সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া ছিল না। অথচ তাদের প্রত্যাশা বা চাওয়ার কোনো মূল্যায়ন করা হলো না। এখানেই মুক্তিযুদ্ধের মূল স্টেকদের ছেঁটে ফেলা হলো। বিদেশি প্রভুর হস্তক্ষেপের কারণে সংবিধানকে বলপূর্বক নাস্তিক্য ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কল্যাণে নিয়োজিত করলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন দেশ প্রকৃত মুক্তির পথ হারাল। মুক্ত-স্বাধীন সত্তা ত্যাগ করে ভারতীয় গোলামির জিঞ্জির পরলো।
শেষ কথা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যখন দেশের মানুষ তার মৌলিক অধিকারের জন্য হাজার হাজার মানুষকে রক্ত দিয়ে রিজিম চেঞ্জ করতে বাধ্য হয়, তখন একাত্তরের বয়ান হাজির করে ‘স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ ন্যারেটিভ’ বর্তমান বাস্তবতায় আদৌ সেটি দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কি-না?
বিগত সরকারের ১৬ বছরের শাসনকালে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের যে বয়ান তৈরি করেছে, সেটার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো মিল নেই। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা কখনো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কিংবা চেতনা ছিল না। যারা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের চর্চিত বয়ানই আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছিলেন মূলত তাদের উচিত ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিতরে পুরো জাতিকে একত্রিত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করা। কিন্তু উল্টো এ চেতনার বাণিজ্যকরণ করে জাতিকে বিভক্ত করে ফায়দা লোটার কাজ চলে।
এখন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হবে একটাই- পুরো জাতিই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী বলে কিছু নেই। হ্যাঁ, যদি কেউ দেশবিরোধী কোনো অপরাধ করে, তবে তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে। অপরদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতি অনমনীয় থাকার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের অঙ্গীকার যাদের আছে, তাদের যেকোনো অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ থাকার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। এখন লক্ষ্য হতে হবে এমন বাংলাদেশ আর কখনোই অন্য কোনো দেশের আধিপত্যের থাবার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। নিজেদের রাজনৈতিক ঐক্য, সামাজিক সংস্কার ও অর্থনীতির বুনিয়াদ মজবুত করতে হবে। আর নিয়মিত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। এটিই হবে জুলাই-আগস্টের সফল অভ্যুত্থানের মূল চেতনা।