জুলাই সনদ ঘোষণা, জামায়াতের নিবন্ধন ফেরত, হাদির শাহাদাতবরণ
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৫
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ২০২৫ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঘটনাবহুল বছর। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে নানা চ্যালেঞ্জ ও একের পর এক ঘটা নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায় সমাপ্ত বছরের দিনপঞ্জি। রাজনৈতিক উত্তাপ, শেখ হাসিনার বিচার, ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা এবং সর্বশেষ বছরের শেষ দিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপত্র ওসমান হাদির প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি ও তার মৃত্যু পুরো জাতিকে শোকে মুহ্যমান করে। একইভাবে শেষদিকে পরবর্তী নির্বাচনী মেরুকরণ জাতিকে করে আশান্বিত।
কারাবন্দী এটিএম আজহারের মুক্তিলাভ
আওয়ামী লীগের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম গত ২৮ মে কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ২২ আগস্ট আওয়ামী লীগের পেটোয়া বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। পরে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায় বাতিল করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এটিএম আজহারুল ইসলামের মুক্তি উপলক্ষে ঘটনার দিন শাহবাগ চত্বরে জড়ো হয় হাজার হাজার সাধারণ ছাত্র-জনতা। এ সময় তাকে ব্যাপক গণসংবর্ধনা দেয়া হয়।
প্রতীকসহ নিবন্ধন ফিরে পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে যেসব বড় বড় অপকর্ম করেছিল আওয়ামী লীগ। তার মাঝে একটি হলো বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা। ২০২৫-এর জুনে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অফিসিয়ালি প্রতীকসহ নিবন্ধন ফিরে পায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
১ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সর্বসম্মত রায়ে জামায়াতকে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাসহ নিবন্ধন ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। পরবর্তীতে ৪ জুন নির্বাচন কমিশন ওই রায়ের আলোকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২৪ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে তা বাস্তবায়ন করে।
২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ঘোষণা করেছিল। ২০০৯ সালের একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে এ আদেশ দেয়।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। এই দিন দুপুরে রাজধানী ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ী এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে এক ভয়াবহ এবং হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। এ মর্মান্তিক ঘটনায় বহু কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং ১৬৫ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং অসংখ্য শিশু-কিশোরের মৃত্যু পুরো জাতিকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করে।
ঘটনার দিন দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে যখন মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের প্রাথমিক শাখার ক্লাস চলছিল, তখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান সরাসরি ‘হায়দার আলী’ নামক একটি দোতলা ভবনের নিচতলায় আছড়ে পড়ে। বিমানটি ঢাকার কুর্মিটোলাস্থ এ কে খন্দকার ঘাঁটি থেকে দুপুর ১টা ৬ মিনিটে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করেছিল। উড্ডয়নের মাত্র ১২ মিনিটের মাথায় যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হয় এটি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় আগুন ধরে যায় এবং ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্লাস চলছিল।
ভয়াবহ এ ঘটনার পর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যাসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছিল। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের বেশিরভাগই শিশু।
গোপালগঞ্জ তাণ্ডব : ১৭ জুলাই গোপালগঞ্জে সহিংসতায় চারজন নিহত এবং ৪৫ জন পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ প্রায় অর্ধশতাধিক আহত হয়। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন কারফিউ জারি করে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১-৩০ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে মাসব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেয়া পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে ১৬ জুলাই ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে বেলা ১১টায় গোপালগঞ্জ পৌর উন্মুক্ত মঞ্চে জাতীয় নাগরিক পার্টি এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। এতে জঙ্গি আওয়ামী নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। জাতীয় নাগরিক পার্টির পদযাত্রা ও সমাবেশ কর্মসূচি বানচাল করতে তাদের হামলা থেকে সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। ১৭ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় উচ্ছৃঙ্খল জনতা হামলা করে নিহত ৪ জনের মরদেহ পোস্টমর্টেম করতে না দিয়ে জেলা হাসপাতাল থেকে জোরপূর্বক নিয়ে যায়।
ডাকসু, চাকসু নির্বাচনে শিবিরের বিজয় : বছরের অন্যতম উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ১০ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দেয়া ফলাফলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বিশাল জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ প্রার্থীরা। সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ছাড়াও এই প্যানেল ১২টি সম্পাদক পদের মধ্যে ৯টিতেই জয় লাভ করে তারা।
ভিপি পদে শিবিরের মো. আবু সাদিক কায়েম ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জিএস পদে শিবিরের ঢাবি শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। এজিএস পদে শিবিরের মুহা. মহিউদ্দিন খান জয়ী হয়েছেন ১১ হাজার ৭৭২ ভোটে। নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়ে। শিবির-সমর্থিত প্রার্থীদের এই নিরঙ্কুশ জয়কে ক্যাম্পাসে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। এর মাধ্যমে প্রায় ৫ দশকেরও বেশি সময় পর ডাকসু’র নেতৃত্ব ফিরে পায় সংগঠনটি।
৪৪ বছর পর চাকসুর নেতৃত্বে ফিরল ছাত্রশিবির
দীর্ঘ ৪৪ বছর পর আবারও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) নেতৃত্বে ফিরে ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোটের’ প্রার্থীরা ভিপি-জিএসসহ ২৪টি পদে নির্বাচিত হয়। অক্টোবর ১৫ ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
রাকসুতে ভিপি, এজিএসসহ ২০টি পদে শিবিরজয়ী
অক্টোবরের ১৭ তারিখ অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ভিপি ও এজিএসসহ ২৩টি পদের ২০টিতেই জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। সেখানে অধিকাংশ পদে জয়ী হয়েছে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। রাকসুতেও এর ধারাবাহিকতা দেখা গেল।
জুলাই সনদ : বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সনদ- যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রস্তাবসমূহ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং বাংলাদেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে। এ সনদে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটিকে সংবিধান সংস্কার হিসেবেও অভিহিত করা হয়।
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং সেই সুপারিশসমূহ বিবেচনা-গ্রহণের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাত সদস্যের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়; কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। কমিশন তিন দফায় মোট ৭২ দিন রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে আলোচনা চালায়। কমিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। প্রথম পর্যায়ের আলোচনায় উত্থাপিত ১৬৬টি বিষয়ে ৬৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়, পরবর্তী পর্যায়ে আরও আলোচনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়Ñ এ ধাপভিত্তিক আলোচনার সময়সূচি ও সারাংশ জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সনদে মোট ২৮টি প্রতিশ্রুতি আছে।
২০২৫ সালের ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানান, ২০২৫ সালে জুলাই মাসের সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ‘জুলাই সনদ’ প্রস্তুত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।
গণহত্যায় শেখ হাসিনা-কামালের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা ছিল ২০২৫ সালের অন্যতম আলোচিত বিষয়। জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিচারের জন্য শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন, তার নিজের গড়া সেই আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় এ রায়ে দেশব্যাপী উৎসুক জনতা মিষ্টি বিতরণ করে ও শুকরিয়া আদায় করে।
দীর্ঘ কয়েক মাসের টানা সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল ক্ষমতাচ্যুৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে জুলাই গণহত্যায় মানবতাবিরোধী মামলায় মৃত্যুদণ্ডের এ রায় দেন। পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে এ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা ও কামাল উভয়কে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর একই মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধানের বিচারের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাস থেকে রায় ঘোষণার কার্যক্রমটি সরাসরি টিভিতে সম্প্রচার করা হয়। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দমনে এক হাজার ৪০০ জনকে হত্যা ও ২৫ হাজার মানুষকে অঙ্গহানির উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’সহ মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে। পাঁচটি অভিযোগ হলো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় প্রকাশ্যে ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা।
ঢাকায় তীব্র ভূমিকম্প
২১ নভেম্বর দেশের ইতিহাসে ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে কাঁপে ঢাকা শহর। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে। ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতেও। দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয় সারা দেশের মানুষ। ঘটনার দিন শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে নরসিংদীর মাধবদীতে এ ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। ৫ দশমিক ৭ মাত্রার মাঝারি এ ভূমিকম্পকে স্মরণকালের মধ্যে কম্পনের তীব্রতার দিক থেকে নজিরবিহীন বলছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ বহু প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় কমিশন। জাতির উদ্দেশে ভাষণে এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। ভাষণে একই দিনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনেরও ঘোষণা দিয়েছেন সিইসি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
২০২৫ সালটি ছিল ভারত-বাংলাদেশের মাঝে চরম উত্তেজনার বছর। জুলাই গণঅভ্যুথানে বাংলাদেশ হতে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় প্রদান এবং পরবর্তীতে জুলাইযোদ্ধা শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকারীদের আশ্রয় প্রদানে সম্পর্ক আরো অবনতি হয়।
অন্যদিকে ভারতীয় হিন্দু জঙ্গিদের দিল্লি-আগরতলাসহ বিভিন্ন দূতাবাসে হামলাকে কেন্দ্র করে এ সম্পর্ক চরম আকার ধারণ করে। সম্প্রতি ডিসেম্বরে নজিরবিহীনভাবে দিল্লির নিরাপদ কূটনৈতিক জোনের বাংলাদেশ হাউসের গেটে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায় একদল উগ্রপন্থি। তারা চাণক্যপুুরির একের পর এক নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে একেবারে রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের সামনে (সড়কের ডিভাইডারে) গিয়ে অবস্থান নেয় এবং হাইকমিশনারের বাসভবন লক্ষ করে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় তারা হাইকমিশনারকে উদ্দেশ করে উচ্চৈঃস্বরে গালমন্দ এবং নানা হুমকিও দেয়। এ ঘটনার সময় বাসভবনে থাকা বাংলাদেশ দূত এবং তার পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। তারা হিন্দু রাষ্ট্রসেনার ব্যানারে একদল উগ্রপন্থি বাংলাদেশ হাউসের মূল ফটকে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারদের মধ্যে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের মতো ভয়াবহ সন্ত্রাসীরা নতুন করে ভারতে আশ্রয় পাওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আরো চিড় ধরে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির হত্যাচেষ্টায় সন্দেহভাজনরা যাতে ভারতে পালাতে না পারে, সে বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের এমন পাল্টাপাল্টি হাইকমিশনারকে তলবের বিষয়টি কেবলই নিরাপত্তা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হবেÑ এটা নিয়ে আমরা প্রতিবেশীদের উপদেশ চাই না। এ সরকার অত্যন্ত ভালো পরিবেশে একটি নির্বাচন আয়োজন করতে চায়, যা গত ১৫ বছর ছিল না। তিনি আরও বলেন, ‘এখন ভারত এটা নিয়ে আমাদের উপদেশ দিচ্ছে, এটাকে আমি অগ্রহণযোগ্য মনে করি। কারণ গত প্রহসনের নির্বাচনগুলোয় তারা কোনো শব্দ করেনি। এখন আমরা যখন একটি ভালো নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি, তখন তারা নসিহত করছে। এটা অগ্রহণযোগ্য।’
জুলাইযোদ্ধা ওসমান হাদির জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের সাত দিন
১২ ডিসেম্বর বাদ জুমা শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের চোখে তিনি এক লড়াকু যোদ্ধা। ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত সাত দিনে তাঁর জীবন-মৃত্যুর লড়াইসহ অন্য ঘটনাবলি পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো।
১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ছিলেন ওসমান হাদি। ফকিরাপুলের দিক (পূর্ব) থেকে তাঁরা পশ্চিমে বিজয়নগরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁদের পেছন থেকে অনুসরণ করছিল একটি মোটরসাইকেল। দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে রিকশা চলন্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তি ওসমান হাদিকে গুলি করে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওসমান হাদির খুনিকে গ্রেফতার করা যায়নি।
তারেক জিয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতির এই পালাবদলকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাভার করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।
দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের পর আওয়ামী লীগের পতনের পর তার আসার পথ সুগম হয়। তার ফেরা উপলক্ষে বিবিসি, রয়টার্স, আল-জাজিরা, সিএনএন, দ্য ডন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী ভারতের শীর্ষস্থানীয় আন্তজাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরটিকে প্রধান শিরোনাম করে। তারেক রহমানের ঢাকায় অবতরণ থেকে শুরু করে জনসমাবেশে ভাষণ, পুরো ঘটনাপ্রবাহের ওপর আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যম তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি (লাইভ) সংবাদ প্রচার করে। রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় তাকে বিশাল সংবর্ধনা দেয় বিএনপি।
খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে ইন্তেকাল করেন। তিনি ২৩ নভেম্বর ফুসফুসের সংক্রমণ ও অন্যান্য জটিলতা নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ হন এবং তখন থেকেই তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। যদিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন এবং এর আগেও বহুবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন এবং মে মাসে দেশে ফিরে আসার পর থেকে নিয়মিত হাসপাতালে চেকআপে ছিলেন।