নীরব ঘাতক থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৭
॥ হামিম উল কবির ॥
নীরব ঘাতক থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ। হরমোনজনিত এ রোগ বাংলাদেশে এখনো যথাযথ মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। সাধারণ মানুষের মধ্যে অসচেতনতা এবং রোগটির চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা কম থাকায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগটিতে ভুগছেন মানুষ। মানবশরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবোলিজম), শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ এমনকি মানসিক অবস্থার ওপর থাইরয়েড হরমোনের প্রভাব রয়েছে। এই থাইরয়েড আসে নীরবে, নিঃশব্দে। শরীরের ক্ষতি করে থাকে সেই নীরবেই। ভুক্তভোগী প্রথমে বুঝতেই পারে না যে সে একটি গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় থাইরয়েডের সমস্যা একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। থাইরয়েড থেকে ক্যান্সার হতে পারে। গলায় গাঁট, কোনো কিছু গিলতে সমস্যা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হলে এ রোগটি হতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি কী?
থাইরয়েড গলার সামনে, কণ্ঠনালির নিচে অবস্থিত একটি প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থি (ব্যবচ্ছেদ করা হলে এবং যন্ত্র দিয়ে ছবি তুললে প্রজাপতির আকৃতি আসে)। এটি মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসরণ করে। একটি ট্রাইওথাইরোনাইন বা বহুল পরিচিত টি৩ হরমোন। অন্যটি থাইরোক্সিন বা টি৪ হরমোন নামে পরিচিত। এ হরমোনগুলো শরীরের প্রতিটি কোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিংসৃত থাইরয়েড স্টিমোলেটিং হরমোন বা টিএসএইচ দিয়ে। এ হরমোনগুলোর ভারসাম্য মানুষকে সুস্থ রাখে।
থাইরয়েড ভারসাম্যহীন হলে কী রোগ হয়?
থাইরয়েড রোগ সাধারণত তিনটি প্রধান কারণে হয়ে থাকে। একটি হলো- হাইপোথাইরয়েডিজম, অন্যটি হাইপারথাইরওয়েডিজম এবং তিন নম্বরটি গয়টার বা থাইরয়েড নডিউল। হাইপোথাইরয়েডিজম রোগটি হলে থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে। বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক সাজেদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা এ হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগ।
তিনি বলেন, হাইপোথাইরয়েডিজম হলে শরীরের ওজন বেড়ে যায়, ঠাণ্ডা সহ্য হয় না এ রোগীদের। কোষ্ঠ্যকাঠিন্যে ভোগে এরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম ভাব থাকে সবসময়। ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, চুল পড়ে যেতে থাকে, নারীদের অনিয়মিত মাসিক থেকে বন্ধ্যাত্ব হয়। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া প্রবণতা এদের অনেক বেশি, বিষণ্নতায় ভোগেন প্রায়ই। এসব লক্ষণকে মানুষ বয়স, স্ট্রেস বা সাধারণ দুর্বলতা মনে করে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। অথবা এটাকে কোনো রোগ বলেই মনে করে না। আবার হাইপারথাইরয়েডিজম হলে থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করে। এটা হাইপোথাইরয়েডিজমের বিপরীত অবস্থা। থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ করলে হঠাৎ ওজন কমে যায়, বুক ধড়ফড় করে, অতিরিক্ত ঘাম হয়। এ ধরনের রোগীর গরম সহ্য হয় না, হাতে কাঁপুনি হয়, অস্থিরতা দেখা দেয়, ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। সবচেয়ে মারাত্মক যে সমস্যাটি সৃষ্টি হয়, সেটা হলো- হাইপারথাইরয়েডিজম হলে চোখ বড় হয়ে যেতে পারে। বিষণ্নতা ও বুক ধড়ফড় করলে অনেক সময় ভুল চিকিৎসার শিকার হন রোগীরা। চিকিৎসক তাড়াহুড়া করে মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে পারেন অথবা হার্টের চিকিৎসা দিতে পারেন। এটা দৃশ্যত হার্ট অথবা মানসিক রোগের লক্ষণ হলেও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের চোখ এড়াবে না। তিনি ঠিকই থাইরয়েড গ্রন্থির অবস্থা জানার জন্য টি৩, টি৪ এবং টিএসএইচ পরীক্ষা করাবেন। গয়টার ও থাইরয়েড নডিউলের সমস্যা হলেও থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসা নিতে হয়। থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে গেলে অথবা গলার সামনে গাঁট তৈরি হলে সে অবস্থাকে গয়টার বলা হয়। বেশিরভাগ নডিউল ক্ষতিকর না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা ক্যান্সারের ঝুঁকি বহন করে।
থাইরয়েড রোগের কারণ?
থাইরয়েড রোগের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। আয়োডিনের অভাব হলে বা আয়োডিন অতিরিক্ত হয়ে গেলে থাইরয়েডের সমস্যা হয়ে থাকে। আয়োডিনের সমস্যা না থাকলেও অটোইমিউন রোগের কারণেও এমন হতে পারে। আবার বংশগত কারণেও থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থা ও প্রসবোত্তর কোনো পরিবর্তন হলেও হতে পারে। এর বাইরে অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হলে, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় থাইরয়েডের সমস্যা হয়। অথবা বিকিরণ এক্সপোজারের কারণে অর্থাৎ কোনো কারণে শরীরে বিকিরণ জাতীয় কোনো কিছু নিতে হলে যেমন এক্স-রে জাতীয় কোনো পরীক্ষা অথবা কর্মস্থলে বিকিরণজনিত কোনো কাজ অব্যাহতভাবে করতে থাকলে এর প্রতিক্রিয়া শরীরে নানা সমস্যা তৈরি করে। এর প্রতিক্রিয়ায় থাইরয়েড গ্রন্থির পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ একটি নীরব ঘাতক
থাইরয়েড রোগ গ্রন্থির রোগ একটি নীরব ঘাতক। কারণ এ গ্রন্থিতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে এর লক্ষণ প্রকাশ পায় ধীরে ধীরে। স্পষ্ট ব্যথা বা তীব্র সমস্যা শুরুতে রোগীর থাকে না, ধীরে ধীরে বাড়ে। এটাকে রোগই মনে হয় না প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে চিকিৎসকের কাছে যেতে রোগীর সময় লাগে অথবা দেরিতে গিয়ে থাকেন। কিন্তু বিপজ্জনক কথাটি হলো- থাইরয়েড গ্রন্থির রোগটি যখন ধরা পড়ে, তখন শরীরের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের হাইপোথাইরয়েডিজমে হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর অথবা ব্রেইন স্ট্রোক হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে অথবা অকালে গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে। শিশুদের হলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে থাকে।
রোগটি শনাক্ত করতে যে পরীক্ষাগুলো করতে হয়
টিএসএইচ ছাড়া ফ্রি টি৩ ও ফ্রি টি৪, থাইরওয়েড অ্যান্টিবডি টেস্ট, আল্ট্রাসাউন্ড অব থাইরয়েড। এগুলোতে শনাক্ত না হলে চিকিৎসক প্রয়োজনে ফ্রি নিডিল অ্যাসপিরিশেন সাইটোলজি বা এফএনএসি টেস্ট করাতে পারেন। সহজ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ শনাক্ত করা সম্ভব, কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই যেমন বুঝতেই পারেন না, তেমনি অবহেলার কারণে চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলে পরীক্ষাগুলো করাতে পারেন না বলে রোগ শনাক্তও হয় না। বাংলাদেশে হরমোনোলজি চিকিৎসার ইতিহাস খুব বেশিদিন হয়নি। এমনকি এ রোগে হাতেগোনা অল্প কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। আগে মেডিসিনের চিকিৎসকরাই ভরসা ছিলেন রোগ সাড়াতে। বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি এবং কিছু মেডিকেল কলেজে হরমোনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স করানো হচ্ছে বলে শতাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসা বিষয়ক তথ্য
অধ্যাপক সাজেদুর রহমান বলেন, রোগটি কখনো নির্মূল হয় না, তবে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা যায়। তবে সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগীকে ভুগতেই হয়। সেজন্য সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পারা একটি ব্যাপার। হাইপোথাইরোডিজম চিকিৎসায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট মাত্রায় থাইরোক্সিন নামক ওষুধ সেবন করতে হয়। চিকিৎসক অ্যান্টিথাইরয়েড অথবা রেডিওএক্টিভ আয়োডিন থেরাপি নেয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। প্রয়োজনে সার্জারি বা অপারেশনেও যেতে হতে পারে। রোগটি যেহেতু পুরোপুরি সুস্থ হবার নয়, সে কারণে ধৈর্য ধরে চিকিৎসা নিতে হয় বলে আজীবন চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ফলোআপ করতে হবে সুস্থ থাকার জন্য। ওষুধ খেয়ে সুস্থ জীবনযাপন করা যায় কোনো সমস্যা হয় না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন পদ্ধতি
লবণের ব্যাপারে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো নিয়মিত আয়োডিনযুক্ত লবণ খেয়ে যেতে হবে। বাজারে ব্যবহৃত খোলা লবণ খাওয়া যাবে না। কারণ খোলা লবণে আয়োডিন মেশানো হয় না। প্যাকেটযুক্ত অনুমোদিত লবণে আয়োডিন মেশানো থাকে। লবণে আয়োডিন মেশানো বাধ্যতামূলক। সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। অতিরিক্ত ট্রেস বা মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে কোনো ধরনের হরমোন বা হারবাল ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না।
বাংলাদেশে থাইরয়েডের বাস্তবতা
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে থাইরয়েড রোগের হার তুলনামূলক বেশি। পুরুষের তুলনায় বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে থাইরয়েড রোগ ৫৮ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকাল, গর্ভাবস্থা, প্রসবোত্তর সময় এবং মেনোপজের সময় হরমোনগত সমস্যায় নারীদের মধ্যে থাইরয়েডের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সন্তান ধারণে ব্যর্থতা, মাসিকে অতিরিক্ত রক্তপাতে থাইরয়েড রোগ বেড়ে যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড থাকলে গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে, সময়ের আগে সন্তান জন্ম হয়ে যেতে পারে, আবার প্রি-একলাম্পশিয়া হয়ে খিঁচুনি হতে পারে। এজন্য গর্ভাবস্থায় গাইনিকোলজিস্ট থাইরয়েডের পরীক্ষা দিলে পরীক্ষাগুলো করিয়ে চিকিৎসককে দেখাতে হবে। এ ধরনের সমস্যায় অবশ্যই হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে আয়োডিনের ঘাটতি বেশি, সে কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে বেশি ভুগতে দেখা যায়। একটা সময় ছিল গ্রামের মানুষের মধ্যে প্রচুর ঘ্যাগ রোগ হতো। ঘ্যাগ হলে গলা স্থায়ীভাবে ফুলে যেত। লবণে আয়োডিন মেশানোর কারণে ঘ্যাগের পরিমাণ কমেছে, কিন্তু এটা ছাড়া অন্যান্য থাইরয়েড সমস্যা রয়েই গেছে। এটা হয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে। গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আয়োডিনের ঘাটতি আর শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে এ রোগটি হয়ে থাকে অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে। জীবনযাত্রার অনিয়মের কারণে এ রোগটি মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে থাইরয়েড রোগকে মানসিক রোগ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। ফলে যথাযথ চিকিৎসা হয় না। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হওয়ায় রোগের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। একটি নীরব ঘাতক হিসেবে চিকিৎসকরা এ রোগটিকে চিহ্নিত করে থাকেন। জীবনযাপন প্রণালীর পরিবর্তন, সঠিক সময়ে খাবার গ্রহণ, সঠিক সময়ে ঘুমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে রোগটি প্রতিরোধ করা যায়। বেশি রাত জাগার অভ্যাস করলে থাইরয়েডসহ আরো অন্যান্য রোগ বাসা বাধতে পারে। অন্যদিকে রোগটি চিহ্নিত হলে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ ও চিকিৎসকের ফলোআপে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব বলে মনে করেন ডা. নুসরাত সুলতানা। শিশুদের থাইরয়েড রোগ হলে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে থাকে। অন্যদিকে জন্মগত থাইরয়েডিজম থাকলে শারীরিক বিকাশ ও মানসিক বিকাশ ভারসাম্যপূর্ণভাবে হয় না।