ইকনা কানাডার বুকে একটি মাইল ফলক সংগঠন
২৮ জুলাই ২০২৬ ১৮:৫৯
টরন্টো থেকে হিমালয়ান উপমহাদেশের শিক্ষিত মুসলিম ছেলেরা এখন সারা দুনিয়ার আনাচে কানাচে নানা ভাবে প্রতিষ্ঠিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার হিন্দুস্তান ভাগ হয়ে একভাগ ভারত, পাকিস্তান, আর অন্য গুলো মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল আর শ্রীলংকা নামে থাকলো। স্বাধীনতার এই নব পরশ উত্তর পরিবেশে পাকিস্তান (তখন বাংলাদেশও পূর্বপাকিস্তান হিসেবে পাকিস্তানের অংশ ছিল) থেকে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে বেশ কিছু শিক্ষিত তরুণ আমেরিকা আর কানাডাতে আসেন। তাদের মাঝে তিন শ্রেণীর ছাত্র ছিল। এক: পুরোপুরি সেক্যুলার তথা নাস্তিক যারা বস্তুবাদী হিসেবে ধর্মকর্ম ছেড়ে আত্মপরিচয় বিসর্জন করেছিল। দ্বিতীয় দলটি ছিল মৌসুমী মুসলিম। যারা শুধুমাত্র ঈদ, শবেবরাত ইত্যাদি আচার অনুষ্ঠানে হাজির থাকতেন আর নিজেদের মুসলিম পরিচয় বহন করতেন। তৃতীয় আরেকটি অতি ছোট গ্রুপ ছিল যারা এই আমেরিকা আর কানাডার মাটিতে ইসলামের দাওয়াহ প্রচার করতে সংগঠন,সংস্থা, মসজিদ আর মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং এখনো করে যাচ্ছেন।

ইকনা কানাডার সিভিক এগেংজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান খালিদ সাইফূল্লাহ এবং ইকনা স্বারভোরো শাখার ভাইস প্রসিডেন্ট ফজল মুহাম্মদ
আমেরিকার ইমিগ্রেশন ছাত্রদের প্রথম সংগঠন : Muslim Students Association (MSA). এই সংগঠনের ব্যানারে তখন সীমিত সংখক মুসলিম ছাত্র দাওয়াহ এবং নিজেদের মাঝে STUDY সার্কেল চালু করে। মূলত আমেরিকাতে লেখাপড়া করতে আসা ইসলামী আন্দোলনের ছাত্র কর্মীগণ এই সংগঠন গড়ে তোলেন। ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৬৮ সাল থেকে এই ধরণের দাওয়াতী মজলিস ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে থাকে।তখন এর নাম ছিল হালাকা আহবাব ইসলামী মানে সার্কেল অব মুসলিম ফ্রেন্ড। আমেরিকার CITY OF WISCONSIN এ কনভেনশন শুরুর মাধ্যমে এই সংগঠনের নাম ISLAMIC CIRCLE OF NORTH AMERICA (ICNA) করা হয়। এর আগে মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদী থেকে অনুমোদন নেন তালাত সুলতান, ১৯৬৭ সালে। উনারা সাতজন নিউ ইয়র্ক শহরে একটি সাপ্তাহিক মজলিসে একটি ইসলামী সংগঠন গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে ইকনার প্রথম কনভেনশন শুরু হয়। এরপরের বছর ১৯৭৭ সালে আমেরিকার নিউজার্সি শহরে ইকনা কনভেনশনে এই সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয় এবং তখন থেকে আমেরিকা আর কানাডা উভয় দেশে একই সংগঠনের ছায়াতলে ইকনা নামে কাজ করতে থাকে। এরপর ইকনা কানাডা ১৯৯৭ সালে কানাডাতে চ্যারিটি সংগঠন হিসেবে অনুমতি লাভ করে এবং একই বছর ইকনা কানাডা শাখার সভাপতি জনাহ শাহাবুদ্দীন যিনি কানাডার মন্ট্রিয়লে বসবাস করেন;উনি উনার পেনশন প্রাপ্ত নিজের তহবিল থেকে ইকনা কানাডার ওকবিল হেড কোয়াটার্স কেনার জন্যে দশ হাজার ডলার দান করেন। সাত একর আয়তনের এই জায়গাটি একটি ফার্ম হাউজ ছিল। বর্তমানে এটি ইকনা কানাডার কেন্দ্রীয় দফতর। ইকনা এখানে একটি ফুলটাইম হাইস্কুল এবং একটি মসজিদ পরিচালনা করে আসছে। এছাড়াও ইকনার সকল প্রকার ঘরোয়া তারবীয়াহ ক্লাশগুলো এখান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইকনা কানাডা ইকনা ইউএসএ র অধীনে ইকনা কানাডা শাখা নামে কাজ করছিল। কিন্তু আমেরিকার সেই সময়ের অভ্যন্তরীণ একলা চলার সরকারী পলিসির কারণে ২০০৫ সালে ইকনা কানাডা আলাদা স্বতন্ত্র স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে এবং ইকনা কানাডার প্রথম ফেডারেল প্রসিডেন্ট হন জনাব ফাকির বেগ। এরপর পর্যায় ক্রমে ইকনা কানাডার ফেডারেল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রহমত শাহ, ড. ইকবাল করীম মাসুদ নদভী, মাওলানা ইবরাহীম মালাবারী, আবদুল ওয়াদুদ, তাহির আলভী, তাহির ইজাজ এবং বর্তমানে ইকনা কানাডার ফেডারেল প্রসিডেন্ট হলেন উসামা লাবীব। উল্লেখ যে সংবিধান অনুযায়ী ইকনা কানাডার নেতারা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং পরপর দুই সেশন দায়িত্ব পালনের পর অটোমেটিকভাবে দায়িত্ব শেষ করেন এবং নতুন লিডারশীপ নির্বাচিত করেন। বর্তমানে সারা কানাডাতে ইকনার পুরুষ এমজিএ প্রায় চারশতএবং মহিলা এমজিএ অনুরূপ। কানাডাতে ইকনার আঠারোটি পুরুষ শাখা রয়েছে। নারীদের শাখাও আছে অনেক। যেহেতু ইকনার নারীগণ কর্মজীবী সংখ্যায় কম সেহেতু ইকনার মহিলা শাখা গুলোতে কাজের পরিধি অনেক বেশী। কানাডার সীমিত আয়ের মানুষের জন্যে ইকনা কানাডার অনেক গুলো ফুড ব্যাংক রয়েছে। যেখান থেকে গরীব,অসহায় এবং রিফুজী মানুষের জন্য চাল,ডাল, তেল, গোশত সহ দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। মূল দাওয়াহ সংগঠন ইকনার অধীনে ইকনা রিলিফ (ওজঈ) ত্রাণ বিতরণেও কাজ করে থাকে। ইকনা রিলিফ বিশ্বের বত্রিশটি দেশে জরুরী রিলিফ দিয়ে থাকে। ২০২৫ সালে ইকনা কানাডার রিলিফ ফান্ডে চল্লিশ মিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হয়েছে।
কানাডার বিভিন্ন শহরে ইকনা পরিচালিত বেশ কিছু মসজিদ ও মাদ্রাসা রয়েছে। অমুসলিমদের যাঝে কাজ করার জন্যে আলাদা দাওয়াহ ইউনিট রয়েছে। কানাডার আগামী নতুন জেনারেশনের মাঝে কাজের জন্যে ইকনা যুবক-যুবতী এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে আলাদা আলাদা উইং ইউনিটে কাজ করে থাকে। ছোট ছোট বাচ্চাদের মাঝেও ইকনা কাজ করে যাচ্ছে।
ইকনা পরিচালিত কয়েকটি বিভাগ হলো,Young Muslims (YM) Girls & Boys. ICNA Sisters, Muslim Youth Network (MYN), Muslim Children of North America (MCNA),Al Falah Masjid, Al Falah Islamic School। ইকনা হাসপাতাল এবং জেলখানাতেও ভিজিট করে দাওয়াহ কাজ করে থাকে। এছাড়াও Summer Camp, Youth Leadership Trainning Camp এবং সিনিয়র সিটিজেনদের মাঝে ইকনা কাজ করে থাকে। ইকনা কানাডা সারা দেশে সিভিক এংগেজমেন্ট উইং এর মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।
বর্তমানে এই কমিটির চেয়ারম্যান খালিদ সাইফুল্লাহ খান। ইকনা কানাডার প্রায় সবাই উচ্চ শিক্ষিত। ইকনা কানাডার জনশক্তি অধ্যাপনা, একাউন্টেট, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি এক্সপার্ট, আলেম ও মাওলানা এবং একটি অংশ মাঝারী পূজির ব্যবসায়ে জড়িত। কানাডার মহানগর টরন্টোতে প্রতিবছর ইকনা কানাডার দুই দিন ব্যাপী বার্ষিক কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কনভেনশনে প্রায় দুইদিনে আট থেকে দশ হাজার ডেলিগেট হাজির থাকে। স্থানীয় আলেমদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইকনা কনভেনশনে ওয়াজ করে থাকেন।দূরত্বের কারণে ২০২৬ সালে এই প্রথম ইকনা কানাডা আলাদা ভাবে ভাংকুভার ইকনা কনভেনশন আয়োজন করেছে। হিমলয়ান উপমহাদেশের হিন্দুস্তান,পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, নেপাল, আরাকানের মুসলিমগণ এই সংগঠনে কাজ করে থাকেন। পাশাপাশি তানজানিয়া, সুদান এবং ত্রিনিদাদ সহ ক্যারাবিয়ান দেশেরও কিছু কিছু মুসলিম এইসংগঠনে কাজ করে যাচ্ছেন। ২৬ শে জুলাই ২০২৬