সামসুল আলমসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সব নিয়োগ বাতিল করতে হবে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
২৮ জুলাই ২০২৬ ১৫:৩১
২৮ জুলাই দুপুরে আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মিযা গোলাম পরওয়ার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নির্বাচন কমিশন একটি অতি সংবেদনশীল ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার মূল ভিত্তিই হলো শতভাগ নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতি সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে মো. সামসুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সামসুল আলম বিএনপির একটি নির্দিষ্ট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এমন একজন সক্রিয় রাজনীতিককে নির্বাচন কমিশনের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়া অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি চরম প্রতারণা। এ ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অবিলম্বে মো. সামসুল আলমের বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ বাতিল এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক সংস্থায় সর্বজনগ্রাহ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
মঙ্গলবার ২৮ জুলাই দুপুরে রাজধানীর মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির ৩১ দফায় ঘোষিত স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকীর্ণ দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। অথচ বাস্তবে দেশবাসী দেখতে পাচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ নয়, সবার আগে বিএনপি’। বর্তমানে এই নীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, যা জাতির সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান সংস্কার এবং দলীয়করণের অবসানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন করপোরেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি-
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জনাব রাশেদুল হককে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে, বিএনপির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ টি এম আবদুল বারী ড্যানীকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের-এর চেয়ারম্যান হিসেবে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য মো. সামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে, বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেককে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন এর চেয়ারম্যান হিসেবে, বিএনপির সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলামকে (টিপু) বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট -এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে, বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর চেয়ারম্যান হিসেবে, বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন এর চেয়ারম্যান হিসেবে, যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি (দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. কামরুজ্জামানকে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হিসেবে, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাউদ্দিন সরকারকে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন এর মহাপরিচালক হিসেবে, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে (সুরুজ) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন এর চেয়ারম্যান হিসেবে, যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাকির হোসেনকে (সিদ্দিকী) বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এর চেয়ারম্যান হিসেবে ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে বাংলাদেশ জুট করপোরেশন-এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষ বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাশা ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জনগণের দেওয়া গণরায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে করা অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পরিবর্তে সংবিধানের আলোকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের উচিত স্থানীয় সরকার পরিচালনা করা। একই সঙ্গে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ বৃদ্ধি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ও সরকারি সম্পদের বণ্টনেও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠছে, যা সুশাসন ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে সমতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণ বন্ধ, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া নিয়োগ বাতিল, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, জনগণের অধিকার, সুশাসন এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলমান থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, এডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান।