ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

ফেনীতে বিএনপি ও জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থীর লড়াই


৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:১৩

একেএম আবদুর রহীম, ফেনী : পূর্বাঞ্চলের জেলা ফেনী রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন। এর একটি আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বরাবর নির্বাচন আসছিলেন। এবার মনোনয়নপত্র জমা দিলেও গত ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার তিনি মারা যান। তবে বিকল্প দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা বহু আগে থেকেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। স্ব-স্ব নির্বাচনী এলাকার গ্রাম গ্রামান্তরে ছুটেছেন তারা। প্রতিটা ওয়ার্ডে, ইউনিয়ন পর্যায়ে, উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচনী সমাবেশ বহু আগেই শেষ করে এখন উঠান বৈঠক, ঘরে ঘরে প্রার্থী এবং প্রার্থীর কর্মীরা ভোটারদের সাথে সাক্ষাৎ করছেন, কুশল বিনিময় করছেন। ভোটারদের মুখে মুখে ফিরছে যে, সব দল সব মার্কা দেখেছি এবার দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিব। তারা দুর্নীতি করবে না, টাকা পাচার করবে না, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করবে না।
এছাড়া জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের যে কাজটি সবচেয়ে প্রশংসিত, কাজগুলো হলো প্রত্যেকেই প্রতিটি সামাজিক কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের নির্বাচনী এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সংস্কার, সেতু ও কালভার্ট মেরামত, কাঠের ও মজবুত বাঁশের সাঁকো তৈরি, বিয়েতে সহযোগিতা, দাফনে সহযোগিতা, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, জুলাই বিপ্লবের আহত ও নিহতদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে হেন কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ড নেই, যেখানে তারা নেই। নিরলস ও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তারা মানুষের পাশে থেকে সহায়তা করে গেছেন এবং যাচ্ছেন। ঐসব মানুষ মূল্যায়ন করছে।
অসহায় মানুষ সহায়তা করার ব্যাপারে তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে, প্রচার না চালিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে জামায়াত ও শিবির এবং তাদের সকল পার্শ্ব সংগঠন ২০২৪-এর ভয়াবহ বন্যার সময় প্রায় ৫৫ কোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করেছেন। এ অর্থ জামায়াতের দেশি-বিদেশি কর্মী-সমর্থক শুভাকাক্সক্ষীরা দিয়েছেন। তারই একটি ইতিবাচক ফল আসন্ন নির্বাচনে পাবেন বলে অভিজ্ঞ মহল আশা করছেন।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ফেনীর আসনগুলোয় জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী দিলেও বিএনপিতে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র সংগ্রহের চিত্র দেখা গেছে।
ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) : গত ২১ ডিসেম্বর রোববার বিকেলে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু তালেবসহ স্থানীয় নেতারা। তবে বেগম জিয়ার অসুস্থতা ও আইনি জটিলতার কথা মাথায় রেখে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন এবং উভয় মনোনয়ন ফরম গত ২৯ ডিসেম্বর জমা দেয়া হয়েছে। কার্যত মৃত্যুজনিত কারণে খালেদা জিয়ার মনোনয়ন ফরম বাতিল হয়ে যাবে।
অন্যদিকে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কাজী গোলাম কিবরিয়াও প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
ফেনী-২ (সদর) : ফেনী সদর আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি। এছাড়া দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মশিউর রহমান বিপ্লব। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী এখানে একক প্রার্থী হিসেবে সংগঠনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞাকে মনোনীত করেছিল। তবে ১১ দলীয় আসন সমঝোতার কারণে তাকে নির্বাচন থেকে সড়ে আসতে হয়। ১১ দলীয় আসন সমঝোতার ভিত্তিতে এ আসনে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের একরামুল হক ভূঞা নির্বাচনী প্রচারে ছিলেন।
ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) : এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট দুই নেতা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং আব্দুল লতিফ জনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। পাশাপাশি জেলা বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান রিপন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফরম নিয়েছিলেন। তবে মনোনয়ন জমাদানের শেষ দিন গত ২৯ ডিসেম্বর সোমবার এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন। এ আসনেও জামায়াত তাদের একক প্রার্থী হিসেবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিককে মনোনীত করেছে। তিনি গত ২৯ ডিসেম্বর নিজের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। প্রার্থীদের মধ্যে আরো রয়েছেন জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ ও ইসলামী আন্দোলনের মো. সাইফ উদ্দিন।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক ফেনীর তিন আসনে মোট ৩৫ জন প্রার্থী গত সোমবার ২৯ ডিসেম্বর স্ব-স্ব মনোনয়নপত্র রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মনিরা হকের নিকট জমা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ৪৮ জন। এর মধ্যে ফেনী-১ আসনে জমা দিয়েছেন ১০ জন, ফেনী-২ আসনে ১৪ জন ও ফেনী-৩ আসনে ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে টিপসইযুক্ত মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ১৭ ঘণ্টা পর বেগম জিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় বিএনপির প্রার্থী বেগম জিয়াসহ বিএনপির তিন প্রার্থীকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ইসি।