আর্থিক খাতে বিদেশি শক্তির থাবা


৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:৪৭

সরকারি-বেসরকারি লেনদেন, আর্থিক তথ্য ও গোপনীয় বিষয়ের তথ্য চলে যাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে
দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা

॥ উসমান ফারুক॥
দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, বিমা ও প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির মধ্যে তাৎক্ষণিক চব্বিশ ঘণ্টা অনলাইনে অর্থ লেনদেন করতে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম ইনক্লুসিভ ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস) তৈরি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েকবার এ প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে। এর মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং থেকে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে তাৎক্ষণিক কম খরচে অর্থ লেনদেন করা যাবে। উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, আইআইপিএস তৈরিতে যুক্ত হচ্ছে যুক্তারষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গেটস ফাউন্ডেশন। এ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত বিকাশ এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ৭০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে। এর আগে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলেও তাতে যোগ দেয়নি বিকাশ। সেই বিকাশে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান গেটস ফাউন্ডেশন এখন নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে। বিদেশি এ প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন গভর্নর ও সাবেক আইএমএফ কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুর। এর ফলে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিদেশি শক্তির থাবা বিস্তারের সুযোগ তৈরি হলো। এ যেন খাল কেটে কুমির আনার মতো অবস্থা আর্থিক খাতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেন এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হবে। এতে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত লেনদেন তথ্য ও পরিচয় বিদেশি শক্তির কাছে চলে যাবে। গোপন তথ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে যেকোনো সময়ে। শত্রুপক্ষ যেকোনো সময়ে বিপদে ফেলতে পারে আর্থিক খাতকে। বিদেশি শক্তির কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যন্ত। বাংলাদেশে এনজিও প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হয় ব্র্যাংক ব্যাংক। ব্র্যাক ও ব্র্যাক ব্যাংক উভয় প্রতিষ্ঠানেই গেটস ফাউন্ডেশনের বিনিয়োগ রয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে গেটস ফাউন্ডেশন। এভাবে ধীরে ধীরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বলয় বাড়ানোর পথে চলেছে গভর্নর। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে দেশীয় মেধাবীদের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক মানের প্ল্যাটফর্ম বানানো সম্ভব। দেশের বড় কয়েকটি ব্যাংকের সফটওয়্যার বাংলাদেশের মেধাবীরাই বানিয়ে নির্বিঘ্নে বছরের পর বছর সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
আইআইপিএস কী
সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক হিসাবধারীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক চব্বিশ ঘণ্টা আন্তঃলেনদেন করতে নির্মাণ হতে যাওয়া প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে আইআইপিএস। এর মাধ্যমে ছোট থেকে বড় যেকোনো পরিমাণের অর্থ লেনদেন করা যাবে।
এটি চালু হলে পান দোকান থেকে রিকশাওয়ালার ভাড়া পর্যন্ত তাৎক্ষণিক কিউআর কোড স্ক্যান করে লেনদেন করা যাবে মুহূর্তের মধ্যে। খরচও কম হবে বর্তমানের তুলনায় নামকাওয়াস্তে। অনলাইন লেনদেন বাড়ানো ও কাগুজে টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনতে এমন চেষ্টা দীর্ঘদিনের।
এটি করতে এর আগে বিনিময় নামক একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠানটি মূল মালিকের পরিচয় গোপন করে সেই প্ল্যাটফর্মটি নির্মাণ করেছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি অনিয়ম হওয়ায় প্ল্যাটফর্মটি সচল করা যায়নি। প্রথম দিন সার্ভার চলার পরপরই তা পুরো সিস্টেমকে অকার্যকর করে দেয়।
গত বছরের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সেই প্রকল্প পুরোটাই বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেয়ার পর আহসান এইচ মনসুর আরো এক ধাপ এগিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম করার উদ্যোগ নেন।
আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বিদেশি শক্তির হাতে
নতুন করে আইআইপিএস প্ল্যাটফর্ম বানাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গেটস ফাউন্ডেশনকে দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশে গেটস ফাউন্ডেশনের সহযেগী প্রতিষ্ঠান ‘মোজোলুপ’র সঙ্গে চুক্তিও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনেকটা মিডিয়া আড়াল করে ও গোপনীয়তার সঙ্গে এ চুক্তিটি করেছেন গভর্নর।
এ চুক্তির আলোকে পুরো প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে দিবে গেটস ফাউন্ডেশন। এর পুরো নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা থাকবে মোজোলুপের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর একটি সেবা ফি দিবে তাদের। বিষয়টি এমন বাংলাদেশের অনলাইন লেনদেনের কাজটি তারা করে দিবে বার্ষিক চার্জের বিনিময়ে।
দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারি ও বেসরকারি সব লেনদেন গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্বও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। নতুন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের পর সব তথ্য চলে যাবে গেটস ফাউন্ডেশনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে।
গোপনীয়ভাবে চুক্তি
রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো প্রকার প্রচার ও জনমত গ্রহণ ছাড়াই। এমনকি গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে অনলাইনে। চুক্তি করার পরে তা একটি অনুষ্ঠানে জানানো হয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এক সেমিনারে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, নিরাপত্তার কারণে চুক্তিটি অনলাইনে করা হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার ঝুঁকিটি কোথায়, তা স্পষ্ট করেননি। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এত বড় সিদ্ধান্তটি তিনি গোপনেই সেরেছেন।
নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে বিদেশিদের কাছে
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের আর্থিক লেনদেন তথ্য চলে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এতে বিনিয়োগ করলেও বিদেশি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তার নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছেই থাকছে। এ প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে, তারও কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগেও নগদ অর্থের লেনদেন কমিয়ে আনতে মোবাইল ব্যাংকিং, বিনিময় ব্যবস্থা ও সর্বশেষ কিউআর কোড এনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অনলাইনে লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিং ছাড়া কোনোটিই সফলতা দেখা যায়নি। এমনকি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতাদের মধ্যে আন্তঃলেনদেন করতে চলতি বছরে ‘ইন্টারঅপারেবল’ পেমেন্ট সিস্টেম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইন্টারঅপারেবল লেনদেন সিস্টেমে নিজেদের সম্পৃক্ত করেনি গেটস ফাইন্ডেশনের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ। এর কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি বিকাশ ও গেটস ফাউন্ডেশন। এখন সেই গেটস ফাউন্ডেশন আলাদা করে পেমেন্ট সিস্টেম স্থাপন করে ভাড়া দিতে চাইছে বাংলাদেশের কাছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, এটা তো পুরোটাই টেকনিক্যাল বিষয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে তা খোলাসা করে সবার সামনে উপস্থাপন করা। এটি না করলে আমিসহ কেউ তো তা জানতে পারবে না। সেটা না হলে কীভাবে মানুষ বুঝবে নিরাপত্তা কতটুকু আছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ৭০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে বিকাশ। সেই বিকাশ কেন ইন্টারঅপারেবল সিস্টেমে সম্পৃক্ত হলো না- এমন প্রশ্নে এক সেমিনারে গেটস ফাউন্ডেশনের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নে গেটস ফাউন্ডেশনের ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমসের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড স্নিগ্ধা আলী বলেন, গেটস ফাউন্ডেশন শুধু অর্থায়ন করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাগত বিষয়ে ও নীতিনির্ধারণীতে হস্তক্ষেপ করে না। বিকাশ হয়তো ব্যবসায়িকভাবে দেখেছে এটি লাভজনক হবে না। তাই তারা প্লাটফর্মটিতে অংশ নেয়নি।
সাইবার বিশেষজ্ঞ শামসুজ্জামান বলেন, যেকোনো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এজন্য নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ থাকায় কোনো ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরাও জানতে পারবে। তারা দেখতে পারবে কোন দেশের সঙ্গে, কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার কী পরিমাণ লেনদেন করছে। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জড়িত।
বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা আছে এরকম প্রতিষ্ঠান তৈরি করার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কয়েকটি বড় ব্যাংক দেশিয় মেধাবীদের দিয়ে নিজেরা সফটওয়্যার তৈরি করে নিয়েছে। তাদের এখনো কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়নি। সরকার চাইলে তাদেরকে দিয়েও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রকাশ্যে ও গোপনে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে লেনদেন করে। এ লেনদেন তথ্য সরকারের গোপীনতার সঙ্গে জড়িত। এখন বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে আর্থিক লেনদেনের তথ্য থাকলে তা পরবর্তীতে কোনো বিপদ ও নিরাপত্তা সমস্যা তৈরিতে শত্রু পক্ষ ব্যবহার করতে পারে। ভিন্ন দেশের বদলে দেশিয় সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের দিয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা যেতে পারে। বাংলাদেশের আইটি খাত এখন অনেকটা শক্তিশালী হয়েছে। তাতে লেনদেন ব্যবস্থার পুরো নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের কাছে থাকবে। অপরদিকে আর্থিক খাতেও বিদেশি শক্তির থাবার শঙ্কাও মুছে যাবে।