জাতির জাগরণে ইতিহাস ও একজন ইতিহাসবিদ
২১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২২
॥ আনিসুর রহমান এরশাদ ॥
আবু মহামেদ হবিবুল্লাহের মতো ইতিহাসনির্ভর গবেষকরা বাঙালি মুসলমান পরিচয়ের গভীরতা তুলে না ধরলে আজ আমরা নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড় অনেকটাই ভুল বুঝতাম। তার ইতিহাস এ বাংলার সমাজের এমন যৌথ স্মৃতি- যাতে এ জাতি তার ইতিহাসের ভেতরেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস জানা কোনো বিলাসিতা নয়; রাষ্ট্রের নৈতিকতা, সমাজের দিকনির্দেশনা ও মানুষের মনন গঠনের মৌলিক শর্ত পূরণ করে। আর যে জাতি নিজের অতীত ভুলে যায়, সে জাতি একদিন নিজের বর্তমানও চিনতে পারে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
দুই খণ্ডের হিস্ট্রি অব বেঙ্গলে তিনি জাতির মানসপটে বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, আবেগ নয়; যুক্তি দেখিয়েছেন, বিভাজন নয়; ইতিহাস দেখিয়েছেন, কুতর্ক নয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেও সেই ধরনের ইতিহাসচর্চা আরও জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এখানে ইতিহাসকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত করা, আবেগনির্ভর ব্যাখ্যা ও পক্ষপাতমূলক বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে ইতিহাস বোঝার চেষ্টা কিংবা ইতিহাসকে পরিহার করে বর্তমান রাজনীতি বোঝার প্রবণতা- এসবই সমাজকে বিভ্রান্ত করছে, সমাজকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অথচ ইতিহাসই সেই আয়না, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের ভুল, শক্তি, দুর্বলতা, সংকট ও সম্ভাবনা খুঁজে পেতে পারি।
হবিবুল্লাহ ছিলেন এমন ধরনের ইতিহাস-সচেতন বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও গবেষক, যিনি জাতির দূরদর্শিতা তৈরি করেছেন। তার লিখিত ইতিহাস কেবল অতীতের দলিল নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, চলার পথরেখা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিশালী ভিত্তি। সেসব ইতিহাস জানার প্রয়োজনীয়তা তখনই স্পষ্ট হয়, যখন আমরা দেখি- যে জাতি নিজের অতীত ভুলে যায়, সে জাতি বারবার একই ভুল পুনরাবৃত্তি করে। আমরা যখন নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হই, তখন শুধু সাংস্কৃতিক সংকট নয়; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিকভাবে এক ধরনের দিকভ্রান্তি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত জাতির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়।
জাতির জাগরণ, উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে হবিবুল্লাহ এর মতো ইতিহাস সচেতন এমন ব্যক্তিত্ব খুব বেশি দেখা যায় না। তার ইতিহাস অনুসন্ধান জাতিকে আত্মবিশ্বাস দেয়, পরিচয় দেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেয়। বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশ, আরব বণিকদের আগমন, পরমতসহিষ্ণুতা, কিংবা পলাশীর পর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও নতুন সাংস্কৃতিক উত্থান- এসবই আজকের বাংলাদেশকে বোঝার ভিত্তি। ইতিহাস জানা মানে শুধু ঘটনাপঞ্জি মুখস্থ করা নয়; ইতিহাস জানা মানে নিজের শিকড় জানা। তার ইতিহাস আমাদের শেখায়, আমরা কোথা থেকে এসেছি। আমাদের সমাজ কীভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। কোন ভুল অতীতে অস্থিরতা তৈরি করেছিল। কোন সংস্কৃতি, মূল্যবোধ বা দর্শন আমাদের মানসকে পরিণত করেছে।
অনেকের ধারণা, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তির শুরু সুলতানি আমল বা সুফি আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, তারও আগে আরব বণিকদের আগমন, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং তাদের স্বভাবগত উদারতা বাংলার মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এর মধ্য দিয়েই আমাদের সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা, যুক্তিবাদ এবং নানা মত গ্রহণের সাংস্কৃতিক বীজ রোপিত হয়। এ পরস্পরবিরোধী ধারণা বা ব্যাখ্যা দেখায়- ইতিহাস জানলে আমরা নিজেদের ভুল ধারণা সংশোধন করতে পারি, সামাজিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে বুঝতে পারি।
একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে তার মতো মানুষ আরও দরকার- যারা শুধু সাহসী নয়, ইতিহাসসমৃদ্ধ। ইতিহাস ছাড়া সমাজের মানসগঠন অসম্পূর্ণ থাকে। পলাশীর বিপর্যয়ের পর বাংলার মুসলমান সমাজে যে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’ ঘটেছিল- এটি না জানলে আজকের বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত বা বাঙালি মুসলমান পরিচয়ের বিকাশ কীভাবে সম্ভব হলো, তা বোঝাই যেত না। একটি জাতির সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা, সংস্কৃতি সবকিছুই ইতিহাসে সংরক্ষিত থাকে। এ ইতিহাস আমাদের শেখায়- কোন সিদ্ধান্ত জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে, কোন ভুল জাতিকে পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, কোন মূল্যবোধ আমাদের চরিত্র গঠন করেছে এবং কোন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সৃজনশীল করেছে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসই বলে, যে জাতি ইতিহাস ভুলে যায়, তারা বারবার অন্ধকারে হারিয়ে যায়। ইতিহাস ভুললে সেই জাতি পরিচয় ও দিক হারায়, পূর্বের ভুলের পুনরাবৃত্তির করে, সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব দেখা দেয় এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব প্রকট হয়। তখন একটি প্রশ্ন বার বার সামনে আসে, “আমরা আসলে কারা?” পরিচয় সংকট যত বাড়ে, বিভাজন তত বাড়ে। ইতিহাস ভুলে গেলে মানুষ জানতেই পারে না, তারা কে, কী থেকে এসেছে, কী তাদের শক্তি, কী তাদের দুর্বলতা। এর ফলে সংস্কৃতিতে দ্বন্দ্ব, সমাজে বিভক্তি, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
কখনো ধর্মীয় বিভক্তি, কখনো ভাষাগত দ্বন্দ্ব, কখনো রাজনৈতিক মেরুকরণ সবই ইতিহাস বিস্মরণের ফল। ইতিহাস ভুলে যাওয়া মানে ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া। এর ফলে রাজনীতিতে অগণতান্ত্রিক প্রবণতা বাড়ে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়, দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ ভুলগুলো অতীতেও জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, ভবিষ্যতেও করবেÑ যদি ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা না নেই।
ইতিহাসহীন জাতির সংস্কৃতি স্থির থাকে না। তারা কখনো বাহ্যিক প্রভাবকে অন্ধভাবে অনুকরণ করে, কখনো নিজেদের মৌলিকতাকে অপমান করে। ফলে সাহিত্য, সংগীত, শিল্প, ভাষা সব ক্ষেত্রেই মৌলবোধ হারিয়ে যায়। ইতিহাস সমাজকে রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দেয়। ইতিহাস না জানলে মানুষ নেতৃত্ব বেছে নিতে ভুল করে, ক্ষমতার অপব্যবহার চিনতে পারে না, রাষ্ট্রের স্বার্থ কোথায়, তা বুঝতে পারে না। এ কারণে বলা হয়, ইতিহাস ভুলে যাওয়া জাতি নিজের ভবিষ্যৎকে জুয়ার টেবিলে রেখে দেয়।
যে জাতি নিজের ইতিহাস বিকৃত করে বা ভুলে যায়, ইতিহাসভ্রষ্ট সেই জাতির পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। যে জাতি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না, সে একই ভুল বার বার করে। নেতৃত্ব নির্বাচন, রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক ন্যায়বিচার সব ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। ইতিহাসহীন জাতি কল্পনার ওপর দাঁড়ায়। তত্ত্ব, জ্ঞান, বিশ্লেষণ সব দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন আবেগ সিদ্ধান্ত চালায়, যুক্তি নয়। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব অনিবার্য হয়ে পড়ে।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গঠনে ইতিহাসের ভূমিকা অপরিসীম। ইতিহাস বর্তমানকে ব্যাখ্যা করে এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেয়। আরব বণিকদের পরমতসহিষ্ণুতা আজকের সংস্কৃতির মধ্যে এখনও প্রতিফলিত। সুলতানি আমলে গড়ে ওঠা প্রাদেশিক স্বাতন্ত্র্যবোধ আমাদের রাজনৈতিক চরিত্রকে প্রভাবিত করেছে। পলাশীর পর যে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’ হয়েছিল- তার কারণেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মুসলমান সমাজে গভীর অনুরাগ জন্মেছে। এ ইতিহাস না জানলে আমরা বুঝতে পারতাম না, আজকের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি কোন ধারায় তৈরি, কোন মানসিকতা কোথা থেকে এসেছে।
ইতিহাস শুধু অতীতের ব্যাখ্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের নকশা। ধরা যাক, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের প্রাদেশিক আত্মচেতনা, আরব-ফার্সি প্রভাব, কিংবা গ্রামভিত্তিক নতুন সাংস্কৃতিক উত্থান এসবই আজকের বাংলাদেশের সামাজিক গঠন বোঝার চাবিকাঠি। আজ যে আমরা ধর্মীয় বৈচিত্র্য, ভাষাগত গর্ব, বাঙালি পরিচয় এবং রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস- এসব নিয়ে আলোচনা করি, তার সমস্ত শেকড় অতীতে রোপিত।
ইতিহাস ভবিষ্যতের পথ দেখায়। যে জাতি ইতিহাসকে ভালো বোঝে, তারা সংকটে আবেগ নয়, যুক্তিকে প্রাধান্য দেয়। জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতির অগ্রগতিতে যৌক্তিক পরিকল্পনা করে। বিভাজন নয়, সংহতি সৃষ্টি করে। বিপরীতে, ইতিহাস অজানা সমাজ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভাসমান হয়ে পড়ে। আজকের বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে সত্য ইতিহাসই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তাই ইতিহাসের আলোয় দাঁড়িয়ে নিজেদের দেখা, আজকের সময়ের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ইতিহাসের বই আজও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। জাতির জাগরণ, উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে ইতিহাস সচেতন এমন ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব অনেক। জাতি গঠনের প্রতিটি পর্যায়ে কিছু মানুষ থাকে যারা দিকদর্শন দেয়, চিন্তা উৎপাদন করে, জনগণের মধ্যে যুক্তিবাদ ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। এরা সাধারণত ইতিহাসবিদ, গবেষক, দার্শনিক, লেখক ওজ্ঞাননির্ভর নীতিনির্ধারক; তারা ইতিহাসের আলো ধরে সমাজকে এগিয়ে নেন।
হবিবুল্লাহর উদাহরণ ধরা যেতে পারে- তিনি ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন আবেগ দিয়ে নয়; বাস্তবতা, তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখান। তিনি দেখিয়েছেন বাংলার মুসলমান সমাজ কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ওসব নয়; বরং আরবদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ, গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে অভিজাতদের একাত্মবোধ, পলাশীর পর সাংস্কৃতিক ঝাঁকুনি- এসবের সমন্বয়ে বাঙালি মুসলমান পরিচয় গড়ে উঠেছে। এ ধরনের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ না থাকলে আমরা আজও ভুল ধারণা নিয়ে নিজেদের বিচার করতাম।
হবিবুল্লাহ সুফিদের আগমনের কয়েকশ বছর আগেই পেয়েছেন পরমতসহিষ্ণুতার খুঁটি। তাঁর মতো ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিত্ব সবসময় জরুরি। তিনি বিভাজন নয়, সংহতির পথ দেখান। তিনি সংস্কৃতি সম্মিলিতভাবে কিভাবে তৈরি হয়েছে তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্যের চর্চা শেখান। ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিত্ব না থাকলে সমাজে কুতর্ক, গুজব, উত্তেজনা ও বিদ্বেষ বাড়ে; অর্থহীন তর্ক বাড়ে।
হবিবুল্লাহর বিশ্লেষণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলামতের চেয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাই প্রাধান্য পেয়েছে। জাতির জাগরণে সেসব ইতিহাসের ভূমিকা খুবই অমূল্য। যেসব ইতিহাস সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। আর যে সমাজ সত্যকে হারায়, সে সমাজ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে না। হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত বাঙালি সংস্কৃতি তাই একজন ইতিহাসবিদ ছাড়া ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ইতিহাসই জাতির জন্য সবচেয়ে টেকসই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি। ইতিহাস ছাড়া রাষ্ট্র যেন কম্পাসহীন নৌকা যেকোনো ঝড়ে নিমজ্জিত হতে পারে। ইতিহাস ছাড়া সত্য নির্ণয় অসম্ভব, পরিচয় নির্ধারণ অসম্পূর্ণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং জাতি হয়ে ওঠে দিকহারা।
পলাশীর বিপর্যয়কে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’ বলে হবিবুল্লাহ যা শিখিয়েছেন, সেই ইতিহাস আমাদের শেখায় বস্তুনিষ্ঠ হতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মূল্যায়ন করতে, সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা কারণগুলো বুঝতে। আজ যখন সমাজে ধর্ম, সংস্কৃতি বা পরিচয়কে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়, তখন আরও জরুরি হয়ে পড়ে সত্য ইতিহাস জানা। ইতিহাসকে অবহেলা করা মানে নিজের অস্তিত্বকে অবহেলা করা। যে জাতি ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎকেও হারায়। তাই জাতি গঠনের প্রতিটি পর্যায়ে ইতিহাসচর্চা, গবেষণা এবং ইতিহাসনির্ভর ব্যক্তিত্ব তৈরি করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আমাদের উচিত, ইতিহাসের আলোয় দাঁড়িয়ে নিজেদের দেখা, নিজেদের ভুল বুঝে সংশোধন করা, এবং ভবিষ্যতের দিকে নিশ্চিত পা বাড়ানো। কারণ ইতিহাসই সেই আয়না, যেখানে জাতির মুখচ্ছবি সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।
বঙ্গভঙ্গের পর রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রভাব নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ‘মুসলমানের দান যুক্ত হয়েই বাঙালি সংস্কৃতি সর্বাঙ্গীণ পুষ্টতা লাভ করবে।’ ইতিহাস কোনো অতীতের গল্প নয়; এটি একটি জাতির আত্মার আয়না। আমরা ইতিহাসকে যত জানব, ততই বুঝব আমাদের ভুল, শক্তি, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পথ। ইতিহাস ভ্রষ্ট জাতি কখনো টেকসই অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। তাই জাতির জাগরণ, উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য ইতিহাস সচেতন মানুষ গড়ে তোলা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। হবিবুল্লাহর মতো ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন একটি জাতির সংস্কৃতি কেবল এক সম্প্রদায়ের নয়, একক উৎসের নয়; মিলিত অবদানে ও সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক সত্তা। এ দৃষ্টিভঙ্গি আজ আরও প্রয়োজন, কারণ বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে ইতিহাসই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।