অন্যায়ভাবে হত্যার শিকার পরিবারগুলো ন্যায়বিচার চায়
২০ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:০০
সোনার বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে শহীদতনয় আলী আহমাদ মাবরুর বলেছেন, আমি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটা ছোট্ট দাবি জানাতে চাই- অন্তর্বর্তী সরকার যেমন অতীতের বিভিন্ন কালিমা মোচনের কাজ করছেন, আর্থিক দুর্নীতিসহ অনেক অন্যায়ের প্রতিকার করছেন। তেমনি মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে যে ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ বিচারের মাধ্যমে যে মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিচারগুলো পুনরায় শুরু করেন। যেন অন্যায়ের শিকার হওয়া পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পায়। তা নিশ্চিত করার জন্য বস্তুনিষ্ঠ উদ্যোগ নেবেন বলে আমি আশা করি।
সোনার বাংলা : আপনি শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সন্তান, বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আলী আহমাদ মাবরুর : আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করার অনুরোধ করছি এবং কথা বলবার সুযোগ দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আপনি যে প্রশ্নটা করেছেন, আমার অনুভূতি মূল্যায়ন কী? প্রথম কথা হচ্ছে সন্তান হিসেবে তো আমার বাবাকে নিয়ে আমি খুবই স্বস্তিবোধ করি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে, তিনি আমাকে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সন্তান হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।
একটা সময় ছিল যখন আমার বাবা জীবিত ছিলেন এবং নানা ধরনের দায়িত্ব পালন করতেন, তখন আমি তো মানুষের কাছে ভালোবাসা পেয়েছি, আদর পেয়েছি। তখন এরকম একটা পরিস্থিতি ছিলো। এরপরে যখন ২০১০ সালের পরে তিনি আটক হলেন। কারাগারে গেলেন। আমি মানুষের কাছে যখন যেতাম, তখন যার
ইনসেট
শহীদতনয় আলী আহমাদ মাবরুর। তিনি এখন স্বনামেই পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি একজন পুরোদস্তুর লেখক এবং অনুবাদক। বিশ্ববিখ্যাত অনেক লেখকের; বিশেষ করে ইসলামী চিন্তাবিদের বইগুলো তিনি অনুবাদ করে তুলে দিচ্ছেন বাংলা ভাষার পাঠকদের হাতে।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা আজ তার মুখোমুখি হয়েছে, তিনি শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সন্তান এ পরিচয়ের কারণেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শহীদ সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর তাকে এবং তার সাথে একই রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। শহীদতনয় আলী আহমাদ মাবরুর সেই স্মৃতি এবং বাবার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন সোনার বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হারুন ইবনে শাহাদাত
সাথে দেখা হতো আমি বলব যে, আমি বেশ সহানুভূতি পেয়েছি। মানুষজনের আগ্রহ ছিল, তিনি এবং তার সাথে যারা আটক ছিলেন, তাদের ব্যাপারে মানুষের কৌতূহল ছিল। আমার সাথে তাদের দেখা হলে জানতে চাইতেন, আমার বাবা এবং অন্যরা কেমন আছেন? পরবর্তীতে ২০১৫ সালে যখন তার ফাঁসি কার্যকর হলো, এরপর থেকে আমি যেখানেই যাই, যখনই যাই, আমাকে বিভিন্ন প্রোগ্রামে যেতে হয়, আমি বলব যে, আমি খুবই সম্মানিত হই। সবাই আমাকে সম্মান এবং মূল্যায়ন করেন। এজন্য আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের অনেক বেশি সম্মানের অধিকারী করেছেন। শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সন্তান হিসেবে আমি গর্বিত।
সোনার বাংলা : আপনার দাদা মাওলানা আবদুল আলী একজন বিশিষ্ট আলেম ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। বাবা শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও। উত্তাধিকারের সেই ধারায় আপনার চোখে দেশের রাজনীতি কতটা স্বচ্ছ?
আলী আহমাদ মাবরুর : আপনি যেহেতু আমার তিন পুরুষের কথা বললেন, আমার দাদাজান মাওলানা আবদুল আলী সাহেব ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ মেয়াদে জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনীত হয়ে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতাকে পরাজিত করে এমপিএ বলতে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (Member of Provincial Assembly) নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল ছিলেন। আমার দাদাজান ফরিদপুরে স্থানীয় কোর্ট মসজিদের ইমাম ছিলেন। ফরিদপুর জেলার তৎকালীন মূল ঈদের নামাজের যে জামাত হতো, সেটার তিনি ইমামতি করতেন। আমি তাকে পাইনি। কারণ আমার জন্মের বেশ আগে ১৯৭৪ সালে উনি হজে গিয়ে ইন্তেকাল করেছেন। উনার দাফন হয়েছে মক্কার প্রসিদ্ধ কবরস্থান জান্নাতুল মোয়াল্লায়। সর্বজনীন একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সবার কাছেই তার একটা ভিন্নরকমের সম্মানজনক অবস্থান ছিল। ফরিদপুর জেলা মিউজিয়ামে ছবিসহ তাঁর স্মৃতিফলক আছে। ফরিদপুর শহরে আমাদের বাড়ির সামনের যে রাস্তা, সেটির নাম আমার দাদার নামে। সরকারিভাবে এটি করা হয়েছে।
আমার বাবা তার পরের প্রজন্ম। তিনি তৎকালীন ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ঐ সংগঠনের প্রাদেশিক সভাপতি ছিলেন। ছাত্রজীবন শেষে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। এ সময় তিনি দীর্ঘসময় জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। বলা যায়, তিনি ঢাকা মহানগীতে সবচেয়ে বেশি সময় সার্ভিস দিয়েছেন। এরপর তিনি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছিলেন। এরপর তিনি শাহাদাতের পূর্ব পর্যন্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন, আমি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে খুব কাছ থেকে অনেক কিছুই দেখেছি। আমার আব্বা এরশাদের আমলেও কারাগারে গেছেন। ১৯৯৬ সালে কারাগারে গিয়েছিলেন। ২০০১-এ-ও তিনি কারাগারে গেছেন। ঐ সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ডিটেনশনে দিয়ে প্রথমে এক মাসের, পরে আরো দুই মাসের বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে কারাগারে নেয়া হতো এবং রাখা হতো। এরপর উনারা বের হয়ে আসতেন। কিন্তু এ পরিবেশটা আমি বলব নষ্ট হয়ে গেল বিগত সাড়ে ১৫ বছরে। শেখ হাসিনার যে ফ্যাসিবাদী শাসন আমল, এখানে প্রতিপক্ষকে আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জায়গায় থাকেনি। একবারে নিশ্চিহ্ন করার জায়গায় চলে গেছে। আ’লীগ প্রতিপক্ষকে একেবারে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করলো, এটা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তৃণমূল পর্যন্ত মহিলা-শিশুদের, এ নির্মমতা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তারপর ধরুন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এসবই আওয়ামী লীগের অবদান। রাজনৈতিক পরিবেশ, বাংলাদেশে আর সুষ্ঠু নেই। আপনি একজন সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে খেয়াল করেছেন, এখন যে আওয়ামী লীগ নেই, তারপরও পরিবেশটা কিন্তু সহজে আর আগের মতো হচ্ছে না। এখনো যেভাবে অনেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের কথাবার্তা Body language ইতিবাচক রাজনীতির সাথে যায় না। আওয়ামী লীগের নষ্ট করা রাজনৈতিক কালচার থেকে কিন্তু সহজেই মুক্তি মিলছে না। এখনো কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কিছু কিছু নেতা এমনভাবে কথা বলছেন, যা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষা না, শত্রুতার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ যে পচনের কালচারটা শুরু করেছে, সেটার রেশ এখনো আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আমি জানি না, আর কতদিন এ অসুস্থ রাজনীতির ফলাফল আমাদের ভোগ করতে হবে।
সোনার বাংলা: তাহলে আমরা এককথায় বলতে পারি, বাংলাদেশের রাজনীতি অস্বচ্ছ?
আলী আহমাদ মাবরুর : অস্বচ্ছ এবং অসুস্থ।
সোনার বাংলা : রাজনীতির দর্শনগত অস্বচ্ছতার জন্যই কি আপনার বাবাকে জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে?
আলী আহমাদ মাবরুর : আমি বলব, আমার বাবা এবং তার সহকর্মীদের অপরাধ তো এটুকু- তারা এ দেশে ইসলাম কায়েম করতে চেয়েছিলেন। এটা সর্বজনবিদিত যে, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ইসলাম কায়েম করতে চায়। যারা ইসলাম পছন্দ করেন না, তারা তাদের মাথাব্যথার কারণ ছিলো। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ দিয়ে; বিশেষ করে বাংলাদেশে যেটা হয়, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি অথবা ব্যক্তিগত নানা ধরনের দুরাচার। এমন কোনো অভিযোগ যেহেতু তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিরুদ্ধে দিতে পারেন নাই। তাই হিসাব করে দেখেছে, এদের এভাবেই শায়েস্তা করতে হবে। তাই তারা ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালের মাধ্যমে তাদের জুডিশিয়ালি হত্যা করেছে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো বিচার বিভাগের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বাস্তবায়ন করেছে। অস্বচ্ছ ও অসুস্থ রাজনীতির বিরুদ্ধে আমার বাবা ও তার সহকর্মীদের আদর্শবাদী রাজনীতির কারণেই তাদের ভিকটিম করা হয়েছে।
সোনার বাংলা : শহীদ আলী আহসান মুজাহিদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনার চোখে তিনি কতটা সফল?
আলী আহমাদ মাবরুর : আমার বাবা একজন মানুষ ছিলেন। সফলতা-বিফলতা নিয়েই একজন মানুষ। তবে আমি মনে করি, আমার বাবা রাজনীতিবিদ হিসেবে অত্যন্ত সফল একজন মানুষ। আমার বাবার যারা আদর্শিক শত্রু, তারও বলতে পারবে না তার বিরুদ্ধে কোনো Financial irregularities (আর্থিক অনিময়), দুর্নীতির কোনো Allegation (অভিযোগ) আছে। আপনি জানেন যে, তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ বাংলাদেশ। যে দেশের দুর্নীতিতে বার বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির আছে। এরকম একটা দেশে রাজনীতি করেছেন, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো Allegation (অভিযোগ) নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি নিজেও ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, আমার পেটে এক টাকা হারাম ঢোকেনি। এ সময় এমন কথা বলা আমি মনে করি কঠিন। একটা সাহসের ব্যাপার, Confidence (আত্মবিশ্বাস)-এর ব্যাপার। আমি বলব যে, উনি জ্ঞানত দেশের ক্ষতি চেয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। মানুষ যেহেতু ভবিষ্যৎ দেখতে পারে না, তাই মানুষের চিন্তার জায়গায় সীমাবদ্ধতা আছে। এটা সব আমলে, সবার ক্ষেত্রেই এ বিষয়টা থাকে। তার সিদ্ধান্ত সময়ের আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে বুঝতে হয়, বোঝা যায়। কিন্তু উনি কখনো দেশের ক্ষতি চেয়ে, দেশের অমঙ্গল চেয়ে কিছু করেছেন, আমার এমন মনে হয় না। এই জায়গাটাতে আমি তাকে সফল বলি। আর একটা কথা হচ্ছে, সততা, নৈতিকতা এবং দেশকে ভালোবাসা যদি আমরা রাজনীতির মূলমন্ত্র বলি, তাহলে আমি অবশ্যই বলব, তিনি একজন সফল রাজনীতিবিদ। রাজনীতিতে উনার ইতিবাচক অবদান স্বীকার করতেই হবে। উনি সবসময় দেশের স্বার্থবিরোধী অথবা প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের কাছে পণবন্দি হয়ে থাকা, অথবা কালচারাল আগ্রাসন অথবা আমাদের দেশের মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার যে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বিরুদ্ধে তিনি এবং তার দল কথা বলেছেন। তার অবস্থান ছিলো সবসময়ই ইতিবাচক ও ইসলামের পক্ষে। দেশের পক্ষে। দেশের মানুষের কল্যাণে। আমি তার অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
সোনার বাংলা : আজকে তার প্রতিপক্ষ অনেক রাজনীতিবিদই যারা একসময় মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন, তারা স্বীকার করছেন, উনারা যা চল্লিশ বছর আগে বুঝেছিলেন, তা তারা আজ বুঝতে পারছেন…
আলী আহমাদ মাবরুর : একটা কথা আছে, Time is the best healer. সময় অনেক ক্ষত সারিয়ে দেয়। একটা সময় সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন মানুষ সত্যটা বুঝতে পারে। Positive এবং Constructive রাজনীতির চর্চা যত বাড়বে, তত মানুষ বুঝতে পারবে, উনাদের অবস্থান যে দেশের স্বার্থে ছিলো। দেশের কল্যাণেই যে উনারা ভূমিকা নিয়েছিলেন, আমি মনে করি, মানুষ অলরেডি বুঝেছে। একটা জিনিস দেখেন, উনার বিরুদ্ধে বিচারকাজ পরিচালনা করেছেন অথবা অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন, আমি আমার জায়গা থেকে বলতে পারি- আমার প্রত্যাশার চেয়েও আগে আমি তাদের করুণ পরিণতি দেখতে পাচ্ছি। আমি যেহেতু কুরআন-হাদীসের চর্চা করি আমি বিশ্বাস করি, সবাই তাদের অপকর্মের প্রতিফল পাবে। তবে তা এত আগে পাবে… আমি আশা করিনি। আমি আমার জীবদ্দশায় তা দেখতে পাবো। যেখানে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দেখেন, তাদের কীভাবে হেনস্তা হতে হচ্ছে। দুনিয়ায় বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। তাদের নানা ধরনের দুরাচার (অপকর্ম) মানুষের সামনে প্রকাশিত হচ্ছে। আমি মনে করি, এতে করে মানুষ বুঝবে যে মানুষগুলোকে অন্যায় অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তাদের অবস্থান যে সঠিক ছিলো। তারা যে ভালো মানুষ ছিলেন, দিন দিন তা আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সোনার বাংলা : তাকে গ্রেফতার এবং সাজানো মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সেই দুঃসহ সময়গুলো আপনার ও আপনার পরিবার কীভাবে কাটিয়েছেন?
আলী আহমাদ মাবরুর : এ স্মৃতিচারণগুলো আমাদের জন্য আসলে কঠিন ও কষ্টকর। তবে যতটুকু বলতে পারি, তা হলো উনাদের প্রথমে আটক করা হয় ২০১০ সালের ২৯ জুন ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হানা সংক্রান্ত মামলায়। পরের দিন ঐ মামলায় তাদের জামিন দেয়া হয়। কিন্তু এক রাতেই উনাদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা দাঁড় করানো হয়। সেই মামলাগুলোয় উনারা; বিশেষ করে আমি আমার আব্বার কথা বলতে পারি, একটানা ২৭ দিন ডিবি অফিসে রিমান্ডে ছিলেন। আমার মনে পড়ে, সেটা ছিলো একটা কঠিন সময়। প্রথম যেদিন আব্বাকে রিমান্ডে নেয়া হয়, ঐদিন একসাথে টানা ৯ দিন (অথচ একসাথে তিন দিনের বেশি রিমান্ড নেয়ার নিয়ম নেই) রিমান্ডে নিয়েছিলো। রিমান্ডে নিয়ে যেহেতু আমাদের মাঝে স্বাভাবিক কিছু ভীতি কাজ করে। আর এ বয়সের একজন মানুষকে একটানা ৯ দিনের রিমান্ড আমরা খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু উনি খুব স্বাভাবিক ছিলেন। উনাকে যতবারই রিমান্ড শেষে কোর্টে নিয়ে আসা হতো, উনি কখনো নিজের কষ্টের কথা বলতেন না। ঐ যে আপনি বললেন, অনেক মানুষ তখন মজলুম ছিলেন ভিতরে (কারাগারে)। তাদের ব্যাপারে উনি মেসেজ দিতেন। ওকে খুব কষ্ট দিচ্ছে, ওকে এখান থেকে ছাড়ানো বা সরানোর চেষ্টা করা দরকার।
এটা আমি উনার শেষ দিন পর্যন্ত দেখেছি। ‘আমি কেমন আছি’ (নিজকে নিয়ে চিন্তা) কখনো আমি তার মধ্যে দেখিনি। উনার পুরো চিন্তাই ছিল সংগঠন নিয়ে। সংগঠন কীভাবে ভালো করা যায়। এর মধ্যে আমাদের কঠিন সময় কেটেছে ২০১৩ সালে যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, আওয়ামী লীগের সহায়তায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘মব’ শাহবাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঐ সময় আমাদের জন্য কঠিন এক পরিস্থিতি ছিল এবং আমাদের তখন চলাফেরা করাটাও কঠিন ছিল। শাহবাগের আশপাশ দিয়ে আমরা কোর্টে আসতাম, যা আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল। এরপর যখন ট্রাইব্যুনালে রায় দেয়ার আগে আমরা প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেখা করার সুযোগ পেতাম। রায়ের পর তা কমে গেল এক মাস বা আরো বেশি সময় পরপর দেখা করা যেত। ঐ সময়ের একটি স্মৃতি এখনো আমার চোখে ভাসে, ব্যথায় বুকটা ভেঙ্গে যায়। সেই স্মৃতিটা হলো, যেদিন তাকে ফাঁসির রায়ের পর আমি প্রথম কয়েদির পোশাকে দেখি, পুরান ঢাকার বর্তমান পরিত্যক্ত কারাগারে। এর আগে তো স্বাভাবিক পোশাক পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা দেখেছি। সেদিন আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম তিনি কয়েদির পোশাক পরে আসছেন। কারণ তখন আমাদের ছোট জানালার মতো ফুঁটো দিয়ে সাক্ষাতের ব্যবস্থা ছিলো। কাছে গিয়ে দেখার সুযোগ দেয়নি।
এ স্মৃতি আমাকে আজও কাঁদায়। এরকম কষ্ট তো আরো অনেক আছে। একেকটা আলাদা লেবেলের কষ্ট। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা তার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের পরের Generation (প্রজন্ম); বিশেষ করে আমার সন্তানরা। তারা তো দাদার সাহচর্য পায়নি। এটা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার আফসোস আছে। কারণ আমার দুই ছেলে। আমার ছোট ছেলেকে আব্বা দেখেননি। বড় ছেলেকে আব্বা তিন মাস রেখে গেছেন। সেই ছেলে এখন ক্লাস ফোরে পড়ে। তারা আমার আব্বার আদর-সোহাগ পায়নি। আমার আম্মা বিধবা হয়েছেন ২০১৫ সালে, কিন্তু এ ধরনেরই একটি একাকিত্ব জীবনযাপন করছেন তারও অনেক আগে থেকে। এগুলো চিন্তা করলে খুবই কষ্ট হয়। একটি পরিবারের মূল অভিভাবক যখন একটি লম্বা সময় কারাগারে থাকে, তখন তার অভাব আসলে ঐ ব্যক্তিতে আর সীমাবদ্ধ থাকে না। আসলে গোটা পরিবারই তছনছ হয়ে যায়। হাসিনার আগের সরকারের আমলে তাদের কারাগারে তিন মাস রাখা হতো। এবার পাঁচ বছর পর আমরা তার লাশ পেয়েছি। রাজনীতির গোটা ব্যবস্থাই ওলট-পালট করে ফেলেছে।
সোনার বাংলা : মৃত্যু অনিবার্য সত্য, শাহাদাতের মৃত্যু গর্বের এবং সৌভাগ্যের। কিন্তু তারপরও কথায় আছে, ‘যার যায় সেই কষ্টটা বুঝে’- এ কথাটি আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
আলী আহমাদ মাবরুর : আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি এজন্য যে, আমার Maturity হওয়ার পর; বিশেষ করে এসএসসি গণ্ডি পার হওয়ার পর থেকে আমি আমার বাবার ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। ২০০০ সালে নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোট গঠন এবং তিনি নির্বাচন না করলেও নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত ভোটকেন্দ্রিক যে ব্যস্ততা, সে সময় আমি তার সাথে সারা দেশে সফর করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এ নির্বাচনে চারদলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেল। এরপর উনি মন্ত্রী হলেন। মন্ত্রিত্বের পুরো পাঁচ বছর আমি উনার সাথে থাকার সুযোগ পেয়েছি। এরপর ২৮ অক্টোবর মেয়াদ পূর্ণ হলো। ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে উনি মাদারীপুরের শিবচরে নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যদিও ঐ নির্বাচনটি হয়নি। সেই নির্বাচনেও আমি তার পাশে ছিলাম। এরপর ১/১১ হলো, ঘরোয়া রাজনীতি নিষিদ্ধ হলো। ঐ সময় উনার পত্রিকায় উনি নিয়মিত সময় দিতেন। সেই উনার ইংরেজি পত্রিকাসহ অন্যান্য যে Initiative (উদ্যোগগুলো) ছিলো, তাতে তার সাথে সময় দিতে পেরেছি। এরপর ২০১০ সালে যে মামলাগুলো হলো, উনি আটকের পর প্রায় ৩০টির ওপরে মামলা। আমি মামলাগুলোর কেস ম্যানেজার ছিলাম। ট্রাইব্যুনালে মামলায় আমাদের মাত্র একজনকে Defense সাক্ষী দেয়ার সুযোগ দিয়েছিল, সেটা আমি ছিলাম। আল্লাহই হয়তো আমার সাথে ওনার লিঙ্কটা এভাবে করেছিলেন। ওনার লাশও কিন্তু আমি গ্রহণ করেছি। আমার Maturity হওয়ার পর থেকে আব্বার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাশে থাকা এবং সাথে আমার সৌভাগ্য, আবার কষ্টেরও। শেষ দিনের ঘটনাটাও এরকম, আমি আমাদের উবভবহংব আইনজীবীদের অফিসে ছিলাম, তখনই আমি জানতে পারলাম যে বাসায় জানানো হয়েছে, তাদের সাথে শেষ সাক্ষাতের কথা। আপনার মনে থাকার কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একমাত্র উদাহরণ একসাথে দুজন ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়া হয়। আমার আব্বা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আমরা দুই পরিবারই জেলখানায় রওনা দিলাম। আমাদের বাসা দূরে উত্তরায়, উনাদের বাসা ধানমন্ডি। উনারা আমাদের আগে পৌঁছে গেলেন। উনারা সাক্ষাৎ করতে চলে গেলেন। এরপর আমরা আসলাম। কারাগারে প্রবেশ করলাম আমার মনে পড়ে রাত ১১টার দিকে। আমরা আমার বাবাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছি। আমরা দেখলাম, উনি গভীরভাবে ঘুমাচ্ছেন। আমরা ভাবলাম, এটা কীভাবে সম্ভব? উনি আমাদের প্রথমেই যে কথাটি বললেন, উনাকে জেলখানা কর্তৃপক্ষ জানায়নি যে, আজ রাতেই তার ফাঁসি হবে।
উনি বলেন, একজন মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলা যে আজ রাতেই তার ফাঁসি হবে এবং পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ- এটা কত বড় জুলুম। এরপর আমরা তার সাথে সব কথাবার্তা বললাম। উনি তো রেডিওতে খবর পাচ্ছিলেন, মৃত্যু পরোয়ানা বের হওয়া আরও অন্যান্য ফরমালিটিস থাকে, বিষয়গুলো জানতে পারছিলেন। ওনার যে জিনিসপত্র কাপড়-চোপড় ছিলো সবগুলো দেখলাম সুন্দর করে সাজানো। ওগুলো উনি আমাদের কাছে দিতে চাইলেন, কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ জানালো, আমরা তো চেক না করে দিতে পারব না। আমরা যারা তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম, সবার সাথে কথা বললেন, সবাইকে সম্বোধন করলেন, সালাম দিলেন। সবার জন্য আলাদা আলাদা কথা বললেন। তারপর আমাদের সাথে যেভাবে কথা বললেন, এটাকে আমি কথা বলব না, এ একটা ভাষণ ছিল। তিনি উচ্চকণ্ঠে একটি ভাষণ দিয়েছেন, যেভাবে জনসভায় কথা বলেন। নাহ মাদুহু রাসূলিহিল কারীম.. বলে কথা শুরু করেছেন। পুরো ভাষেণে উনি বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ওনার সাথে কী কী হয়েছে। সব বলেছেন। এ পুরো স্মৃতিটা আমাকে কষ্ট দেয়। এরপর তো আমরা জানাজা পড়ার জন্য রওনা দিলাম। আমরা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। ট্র্যাজেডিটা হলো, তিনি তো তখন জীবিত। তারপর রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে ওনার লাশ রিসিভ করলাম। আমার মনে আছে, আমার হাতে ওনারও রক্তের স্পর্শ লাগলো। রক্ত তখনো গরম। পুরো কফিন ভরা রক্ত। প্রশাসনের চাপ এখনই জানাজা পড়ে কবর দিতে হবে। ফজরের ওয়াক্ত হয়নি। আজান দেয়নি। অনেক অনুরোধ করে ফজরের নামাজের পর জানাজা পড়লাম। সে এক কঠিন পরিস্থিতি, যা মনে করলে খুবই কষ্ট হয়।
সোনার বাংলা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে আপনার পরিবারের সম্পর্ক- আপনার বাবার শাহাদাতের আগের এবং পরের কীভাবে দেখেন?
আলী আহমাদ মাবরুর : আলহামদুলিল্লাহ। প্রথম কথা হলো, আমি আমার আব্বার কথা দিয়েই শুরু করি, আমার আব্বা সবসময় বলতেন, ‘বাংলাদেশের এ জমিনে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত। উনি নাম ধরে ধরে ছাত্রশিবিরের কথা, মহিলা জামায়াতের কথা, ছাত্রী সংস্থার কথা, আইনজীবীদের কথা বলেছেন। আইনজীবীদের কাছে তার কৃতজ্ঞতার কথা বলেছেন। আমি এভাবে বলব, জামায়াতে ইসলামী আমরা যতগুলো আইনি প্রক্রিয়া করেছি, সবগুলোর মূল সহায়ক শক্তি ছিলো সংগঠন। আমরা যে আইনি লড়াই করেছি। আইনজীবীদের পারিশ্রমিকসহ যাবতীয় খরচ সংগঠন বহন করেছে। সংগঠন বলতে আমি যদি বিশেষভাবে বলি, আমাদের সকল নেতা-কর্মী-তৃণমূল সবার কাছে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা আসলে অপরিসীম ত্যাগ করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা নিয়মিত এয়ানতের বাইরে অনেক বছর পর্যন্ত জরুরি ফান্ডে বাড়তি টাকা দিয়েছেন। এজন্য মামলা পরিচালনাসহ বিভিন্ন কাজ সংগঠন সহজে করতে পেরেছে। আব্বার শাহাদাতের দিন আমাদের গাড়ি দিয়েছেন, যেহেতু আমাদের গাড়ি নেই, তাই দ্রুত পৌঁছাতে পেরেছি। এর আগে মামলা সংক্রান্ত কাজে বিগত বারো বছর আমাদের যানবাহন দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। কারাগারে যাওয়া থেকে শাহাদাতের দিন এবং এখন পর্যন্ত সংগঠন আমাদের এবং আমাদের পরিবারের পাশে আছেন। নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত তো আমাদের সংগঠন ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে ছিলো। এরপরও আমাদের দায়িত্বশীলরা যে যখনই পেরেছেন, আমাদের বাসায় গিয়েছেন। বিশেষ করে ঈদে তারা আমাদের বাসায় গিয়েছেন। বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমান সেক্রেটারি জেনারেল থাকা অবস্থায় গিয়েছেন, আমীর হওয়ার পরও গিয়েছেন। সাবেক আমীর মকবুল আহমাদ সাহেব গিয়েছেন। নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সাহেব, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাহেব, মাওলানা আবদুল হালিম ভাই, রফিকুল ইসলাম খান ভাই, জুবায়ের ভাই, আকন্দ ভাই, বুলবুল ভাই, সেলিম ভাইসহ শীর্ষনেতারা সেই সঙ্কটকালীন সময়েও আমাদের বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। এখনো নিয়মিত খোঁজখবর নেন। আমরা যদি চাই এখনো যেকোনো সময় জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতার কাছে যেতে পারি খুব সহজে। সংগঠনের সাথে আমাদের গভীর সম্পর্ক যদি বলেন আছে, ছিলো এবং থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
সোনার বাংলা : ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর দেশে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সুফল পেতে করণীয় কী?
আলী আহমাদ মাবরুর : আলহামদুলিল্লাহ। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের একটি পরিবর্তিত এবং আমাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। এখানে দুটি দৃষ্টিতে কথা বলা দরকার প্রথমত, আমাদের মনে রাখা দরকার ২০১০ সালের পর থেকে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে অনেক ত্যাগ-কুরবানি করেছেন। আমরা আগামীতে কী করতে পারব বা দিতে পারব, তার আগে আমাদের সবার আগে যারা ত্যাগ ও কুরবানি করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করাটা জরুরি। আমাদের মনে হচ্ছে, আমাদের ফোকাসটা বেশি সামনের দিকে চলে গেছে। আমরা বিগত ১৫ বছরে যাদের হারালাম, আমি শুধু জীবন দেয়া বলছি না, জীবন দেওয়া বলেন, গুম বলেন, চাকরি হারানো বলেন- অসংখ্য মানুষ ছিলো, যারা বাড়িঘরে থাকতে পারেননি। তারা ঢাকা শহরে এসে রিকশা চালিয়েছেন, বাইক চালিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ পাটক্ষেতে, ধানক্ষেতে রাত্রিযাপন করেছেন। বছরের পর বছর বাড়ি যেতে পারেননি। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমাদের যে নৈতিক অবস্থান, যার কারণে আমাদের দায়িত্বশীলরা জীবন দিয়েছেন। সেই নৈতিক অবস্থানকে আরো সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করা উচিত। সেই আদর্শিক বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা উচিত। এখন আমি বলব, আওয়ামী লীগ যেহেতু বিগত ১৫ বছরে মানুষের মন-মগজ থেকে ইসলামকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করছিলো। ৫ আগস্টের পর যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাই ইসলামকে ব্যাপকভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। ব্যাপকভাবে দাওয়াতি কাজ করতে হবে। এ তিনটি বিষয় সামনে রেখে আগামী নির্বাচনের জন্য বড় আকারের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। সাথে সাথে আমরা যে আদর্শের কথা বলছি, যে মানুষগুলোর কুরবানির কথা বললাম, সবার জন্য যেন একটা ভালো রিটার্ন যেন আমরা পাই। এরকম যেন না হয়, আমরা পেছনের জিনিসগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম ফোকাস দিচ্ছি। তাহলে যেটা হয়, অনুকূল পরিবেশ আসার পর যারা মজলুম ছিলো, তাদের মধ্যে আবার হতাশা চলে যেন না আসে। এজন্য আমি বলি যে, তাদের সাথে নিয়ে তাদের জায়গাগুলো এড্রেস করে তারপরও জনগণকে কী দেয়া উচিত, এ ধরনের বয়ানে গিয়ে ইসলামকে যদি আমরা উপস্থাপন করি। আরো ব্যাপকভাবে মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমরা জুলাই বিপ্লবের ইতিবাচক একটা সুফল পাব, ইনশাআল্লাহ।
সোনার বাংলা : বিচারের নাটক সাজিয়ে আপনার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। এটিএম আজহারুল ইসলাম খালাস পাওয়ার পর এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক নেই? আপনি কী এর প্রতিকার কিংবা ক্ষতিপূরণ মামলা করবেন?
আলী আহমাদ মাবরুর : ক্ষতিপূরণ বলে তো আসলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় আছে বলে মনে হয়। আমি এ বিষয়ে একটু পরে যাই। প্রথমত, আমি আমার একার কথা বলছি না, আমার মতো আরো যে পরিবারগুলো আছে, আমাদের মূল দাবি- আমরা মনে করি, এটা ছাড়া তো আমাদের বলার বা চাওয়ার নাই। আমরা চাই- তাদের যেভাবে অপমান-অপদস্থ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায়গুলো হয়েছে, যে জুলুমগুলো হয়েছে, তার একটা প্রতিকার হোক। এ ব্যাপারে আমরা এবং আরো যারা ভিকটিম পরিবার আছে, তাদের মধ্যে কোনো শিথিলতা বা ভিন্ন মানসিকতা নাই। দ্বিতীয় কথা হলো, আইনের কথা, শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের কথা। তিনি যখন দেশে ফিরলেন, তখন তিনি খুবই অসুস্থ ছিলেন। এরপরও তিনি আমাদের সাথে বসেছিলেন। তিনি আইনগত বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে বসেছিলেন, শুধু জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সন্তানদের সাথে নয়, যেখানে বিএনপি নেতা আবদুল আলীম ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলেরা ছিলেন। সবাইকে নিয়ে তিনি একটা মিটিং করেছিলেন।
এটার কী সুরাহা করা যায়, এ নিয়ে তিনি একটি পর্যালোচনা করে তিনি একটা পর্যবেক্ষণ দিয়ে গেছেন এবং আইনজীবীরা সেটা নিয়ে কাজ করছেন। এখন আপনি যে রেফারেন্স দিলেন, এটিএম আজহারুল ইসলামের- এটা নিয়ে আমরা যে সমস্যায় পড়েছি, তা হলো এর পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। ওনার সংক্ষিপ্ত রায়ে যে পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোকে আমরা ইতিবাচক মনে করছি। সেখানে ইতিবাচক অনেক কিছু আছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় না আসার কারণে আমরা আসলে বুঝতে পারছি না, কোন কোন প্রেক্ষাপটে আমাদের আসলে কাজ করার সুযোগ আছে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আইনজীবীরা যখন গ্রিন সিগন্যাল দেবেন যে, এখন আইনগত এই দিক বিবেচনায় কিছু করার সুযোগ আছে, তাহলে অবশ্যই আমরা চাইবো, ন্যায়বিচার হোক, আমাদের মামলাগুলো আবার চালু করা হোক।
এ সুযোগে আমি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটা ছোট্ট দাবি জানাতে চাই, অন্তর্বর্তী সরকার যেমন অতীতের বিভিন্ন কালিমা মোচনের কাজ করছেন, আর্থিক দুর্নীতিসহ অনেক অন্যায়ের প্রতিকার করছেন। তেমনি মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে যে ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ বিচারে যে মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিচারগুলো যেন ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করার জন্য বস্তুনিষ্ঠ উদ্যোগ নিবেন বলে আমি আশা করি।
সোনার বাংলা : আপনার বাবার কোন স্মৃতি আপনার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে?
আলী আহমাদ মাবরুর : সন্তান হিসেবে তো বাবার সাথে অনেক স্মৃতিই জড়িত রয়েছে। তবে আমার মোটাদাগে দু-একটা স্মৃতির কথাই বলি, এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার লান্সে পানি জমেছিলো। আমার মনে আছে, উনি নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে একাধিকবার এক্স-রে করছিলেন। উনার শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও উনি নিজে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন। উনি আমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ডাক্তারের কাছে যে বিবরণ তুলে ধরতেন, ডাক্তাররা খুব অবাক হতেন। কারণ সাধারণত মায়েরা এভাবে সন্তানের অসুস্থতার বিবরণ দিতে পারেন। এরপর আমি যেটা বলতে চাই, আমার বাবা তখন মন্ত্রী। আমি মাস্টার্স করছি, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতাযাতে খুব সমস্যা হতো। আর্থিকভাবে খুব কষ্টে ছিলাম। আমি তখন বাবাকে বললাম, একটা চাকরি হলে সুবিধা হতো। বাবা তখন বললেন, দৈনিক সংগ্রামে লোক নেয়া হবে। তুমি যদি পরীক্ষা (ইন্টারভিউ) দিয়ে টিকতে পারো, চাকরি করতে পারো। আল্লাহর রহমতে পরীক্ষায় আমি ভালো করেছিলাম, মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার, পাঁচ হাজার পাঁচশত টাকার বেতনে দৈনিক সংগ্রামে যোগদান করলাম। তারপরও আমার চলতে কষ্ট হতো। কারণ আমার ক্যাম্পাস ছিলো গুলশানে। তখন আমি বাড়তি আয়ের জন্য দৈনিক সংগ্রামের বিভিন্ন ফিচার পাতায় নিয়মিত লিখতে শুরু করলাম। আমি তখন প্রচুর লিখতাম। আমার মনে আছে, চলমান বিশ্ব, স্বাস্থ্য পাতাসহ যত পাতা আছে, লিখতাম। আমার লেখাগুলো যখন প্রকাশিত হতো আমার আব্বা আমার লেখাগুলো কেঁচি দিয়ে নিজ হাতে কেটে সংরক্ষণ করতেন। সবাইকে দেখাতেন। দেখ আমার মাবরুরের লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমার কষ্ট এখন আমার অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে। আমি একজন লেখক। কিন্তু আব্বার হাতে একটি বইও তুলে দিতে পারিনি। কারণ তখন কোনো বই প্রকাশিত হয়নি।
সোনার বাংলা : শহীদরা মৃত্যুবরণ করেন না- আল্লাহ বলেছেন। তিনি অবশ্যই আপনার ভালো এ কাজগুলো দেখছেন।
আলী আহমাদ মাবরুর : আমার জন্য সান্ত্বনা এটিই।
সোনার বাংলা : কষ্ট করে সোনার বাংলার জন্য সময় দেয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ।
আলী আহমাদ মাবরুর : আপনি একজন সিনিয়র সাংবাদিক হয়ে আমার সাক্ষাৎকার নিলেন এজন্য আপনাকে এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।