ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ পরিবার
১৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:৫৩
॥ এইচ এম জোবায়ের ॥
সমাজজীবন মানবসভ্যতার অন্যতম মৌলিক কাঠামো। আর সমাজের ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হলো পরিবার। পরিবার শুধু রক্তসম্পর্কিত মানুষের সমষ্টি নয়; এটি বিশ্বাস, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্ব, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। ইসলাম পরিবার ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে এবং সুনির্মিত পারিবারিক কাঠামোর মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণ সমাজ ও জাতি গঠনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পরিবারের ভিত্তি : বিবাহ ও দায়িত্ববোধ
ইসলামে পরিবার শুরু হয় বৈধ বিবাহের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “এবং তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন- যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা রূম : ২১)। এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য শুধু দাম্পত্য সম্পর্ক নয়; বরং ভালোবাসা, শান্তি এবং পরস্পরের প্রতি দয়া প্রতিষ্ঠা। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “বিবাহ আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (বুখারি ও মুসলিম)।
অতএব ইসলামে পরিবার গঠন একটি ইবাদত, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানবিক পরিপূর্ণতা অর্জনের মাধ্যম।
আদর্শ পরিবারের মূল স্তম্ভসমূহ
ইমান ও তাকওয়া
ইমান ও আল্লাহভীতি ছাড়া পরিবারের বন্ধন দৃঢ় ও পবিত্র থাকে না। পরিবারের প্রতিটি কার্যক্রম হালাল-হারামের সীমারেখার মধ্যে পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। কুরআনে আল্লাহ বলেন,ম “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।” (সূরা তাহরীম : ৬)। অর্থাৎ অভিভাবকদের দায়িত্ব শুধু খাদ্য-বস্ত্র, চিকিৎসা-বাসস্থান প্রদান নয়; বরং পরিবারকে ঈমান ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করা। বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে এ বিষয়ের গুরুত্ব বিবেকবান মাত্রই অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। পিতা-মাতা তাদের জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কলিজার টুকরা সন্তানকে তিলে তিলে বড় করেছেন, তাদের হাতেই অনেক বাবা-মা নির্দয়ভাবে খুন হচ্ছেন! নিষ্ঠুরভাবে আহত হচ্ছেন! বাড়িঘরছাড়া হচ্ছেন! এর একটাই কারণ, তা হচ্ছে- সন্তানকে চাহিবামাত্র সবকিছু দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া হয়নি।
ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সম্মান
ইসলামে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে- মহব্বত (ভালোবাসা), রহমত (দয়া) এবং সাকিনাহ (প্রশান্তি)। নবী করিম (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সে-ই শ্রেষ্ঠ, যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ।” (তিরমিযী)। অর্থাৎ সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্ব ঘরে আচরণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। জীবনসঙ্গীর সাক্ষীই চূড়ান্ত সাক্ষী। স্বামী-স্ত্রী একে-অপরের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন। তেমনি সন্তানরাও বাবা-মায়ের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে ধারণা রাখে। সুতরাং এ মধুর সম্পর্ককে পূর্ণতা দিতে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সম্মানবোধ প্রয়োজন।
ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্ব বণ্টন
পরিবারের প্রতিটি সদস্যের রয়েছে নির্দিষ্ট অধিকার ও দায়িত্ব। ইসলাম পুরুষকে পরিবারের দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে নেতৃত্ব মানে আধিপত্য নয়, বরং ন্যায় ও দায়িত্বপূর্ণ অভিভাবকত্ব। কুরআনে বলা হয়েছে, “পুরুষরা নারীদের রক্ষণাবেক্ষণকারী ও দায়িত্বশীল।” (সূরা নিসা : ৩৪)। অন্যদিকে নবী (সা.) বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং প্রত্যেকে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জবাবদিহি করবে।” (বুখারি)। এখানে বোঝানো হয়েছে, পুরুষ ও নারী উভয়ের দায়িত্ব আছে এবং উভয়েই জবাবদিহি করবে।
সন্তান লালন-পালন ও চরিত্র গঠন
ইসলাম শুধু সন্তান জন্মদান নয়, বরং তাদের নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে এসেছে, “তোমরা সন্তানদের শিক্ষা দাও- প্রথমে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (হাকিম)। এছাড়া বলা হয়েছে, “একজন বাবা তার সন্তানকে যে সর্বোত্তম জিনিস দিতে পারে, তা হলোÑ উত্তম শিক্ষা ও উত্তম চরিত্র।” (তিরমিযী)। সন্তানের মধ্যে ঈমান, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, সততা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীলতা তৈরি করা ইসলামী পরিবারের প্রধান লক্ষ্য। ইসলামী সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র হবে পরিবার। ব্যবহারিক জীবনের পরতে পরতে ইসলামী সংস্কৃতির সুবাস ছড়িয়ে পড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলামের নীতি-আদর্শের ব্যাপারে হবে আপসহীন। চরিত্র হবে নিষ্কলুষ, হযরত ইউসুফ (আ.)-এর মতো।
আখলাক ও যোগাযোগের সংস্কৃতি
পরিবারে প্রতিদিনের কথাবার্তা ও আচরণ সামাজিক চরিত্র গঠনে জরুরি। খারাপ ভাষা, অপমান, রূঢ়তা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “মুমিন এমন নয় যে সে গালাগালি করবে, অভিশাপ দেবে, অশ্লীল কথা বলবে বা অশালীন আচরণ করবে।” (তিরমিযী)। ভালো আচার-আচরণ, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতা পরিবারে শান্তি বজায় রাখে। অপরের মতামত শ্রবণ এবং যুক্তিযুক্ত হলে মেনে নেওয়ার দীক্ষা সন্তানগণ পরিবার থেকে শিখবে। অসামাজিক এবং আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে তাদের সামাজিকতা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে। প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে থাকবে সজাগ-সচেতন।
নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা
ইসলাম নারীকে পরিবার ও সমাজে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। আদর্শ পরিবারে নারী হচ্ছেন- মর্যাদাবান সদস্য, শিক্ষা ও সম্পত্তির অধিকারী, সন্তানের শিক্ষার মূল স্থপতি, পরম শ্রদ্ধার অধিকারী। নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করে।’ (তিরমিযী)। আর কুরআন নির্দেশ দেয়, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করো।’ (সূরা নিসা : ১৯)। আজ নারীরা রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত এবং মিল-কারখানা কোথাও নিরাপদ নয়। যাদের কারণে নারীরা নিরাপদ নয়, তারাও তো কোনো না কোনো পরিবারের সন্তান, তাই না? সুতরাং ছেলে সন্তানদের নারীর মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে শৈশব-কৈশোর থেকেই সুশিক্ষা দিতে হবে।
বয়স্ক ও অভিভাবকদের সেবা
ইসলাম বয়স্ক পিতা-মাতার সেবাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে এবং তাদের সাথে কোমল আচরণকে ফরজ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের ‘উফ’ বলো না… তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩)। এ শিক্ষা পারিবারিক শ্রদ্ধা ও মানবিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। বৃদ্ধ বয়সে মূলত মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। তখন অপরের প্রতি মানুষ নির্ভরশীল হয়ে যায়। এমতাবস্থায় বৃদ্ধ মাতা-পিতার প্রতি যদি সন্তানরা মানবিক আচরণ বা ইহসান করে, তবে তা পরবর্তী জেনারেশনের জন্য সুশিক্ষার কারণ হয়। তারাও ভবিষ্যতে তাদের পিতা-মাতার প্রতি কোমল আচরণ করবে।
সংযম ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য
আদর্শ পরিবারে অপচয়, বিলাসিতা ও হারাম সম্পদ নিষিদ্ধ। কুরআনের সতর্কবার্তা ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সূরা ইসরা : ২৭)। পরিবারে হালাল উপার্জন, সঞ্চয়, দান-সাদাকা ও পরকালের জবাবদিহির চিন্তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি করে। বিপথে-কুপথে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। ইসলাম অল্পে তুষ্টিতা শেখায়। সমাজের অধিকাংশ পরিবারকে অন্যের দেখাদেখি গাড়ি, বাড়ি, জমি, প্লট-ফ্ল্যাট ইত্যাদির পেছনে ছুটতে দেখা যায়। কিন্তু ইসলামী পরিবার এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারা তাদের সামর্থ্যরে বাইরে কোনো অতিরিক্ত চাপ মাথায় নেয় না এবং সেই অতিরিক্ত চাপ বাস্তবায়নের পথেও ব্যতি-ব্যস্ত হয় না। সুতরাং তাদের পক্ষে অন্যায় পথ অবলম্বন বা অবৈধ আয়ের রাস্তায় হাঁটার প্রশ্নই ওঠে না।
সমস্যা সমাধান ও ধৈর্য
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ আসতেই পারে, কিন্তু ইসলাম সমাধানের দিকনির্দেশনা দেয় পারস্পরিক আলোচনা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, সালিশ ও পারিবারিক মীমাংসা বৈঠকের মাধ্যমে। (সূরা নিসা : ৩৫)। চিৎকার-চেঁচামেচি, অভিশাপ, সহিংসতা বা অবমাননা ইসলাম অনুমোদন করে না। অনেক সময় ছোট-খাটো ঘটনা থেকে বড় সমস্যার উদ্ভব হয়। সেক্ষেত্রে কেউই বাড়াবাড়ি করবেন না। প্রতি কথায় উত্তর করবেন না। এক প্রসঙ্গে দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকবেন না। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করবেন অথবা ঝগড়ার মজলিস থেকে উঠে বাসার বাইরে চলে গিয়ে অন্য কাজে মনোযোগী হবেন। কখনোবা কুরআন তেলাওয়াত করতে বসে যাবেন। মনোমালিন্য বা ঝগড়ার কোনো বিষয়কে দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াবেন না। রাতের পরিতৃপ্ত ঘুম যেন সকল বিরোধ নিষ্পত্তি করে দেয়। প্রতি প্রত্যুষে যেন শুরু হয় একেকটি নতুন-নিষ্পাপ জীবন।
আদর্শ পরিবারের বহুমাত্রিক সুফল
একটি ইসলামী পরিবার থেকে পরিশুদ্ধ নৈতিকতা, সুশিক্ষিত সন্তান, স্থিতিশীল সমাজ, শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র এবং পরকালীন সফলতা অর্জিত হয়। পরিবার শক্তিশালী হলে সমাজ শক্তিশালী হয়; সমাজ শক্তিশালী হলে রাষ্ট্র নিরাপদ হয়। মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ পরিবার হলো ঈমান ও তাকওয়ায় পরিপূর্ণ সমাজের একটি ক্ষুদ্রতম ইউনিট, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সম্মানের ভিত্তিতে গঠিত হয়। পরিবারটি ন্যায়পন্থা অবলম্বন, দায়িত্ব পালন ও বণ্টন এবং সহযোগিতায় দৃঢ় হয়। এভাবে মানবসভ্যতার সূতিকাগার একেকটি পরিবার চরিত্রবান ও শিক্ষিত সন্তান গড়ার কেন্দ্রে পরিণত হবে। সবকিছুকে সহজ করে দেবে ইসলামিক প্যারেন্টিং জ্ঞান, ধৈর্য, সংযম ও শান্তির যথাযথ প্রশিক্ষণ। এ ধরনের পরিবারে শুধু জাগতিক উন্নতি নয়; বরং আখিরাতের সফলতাও নিশ্চিত হয়। তাই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার গঠন ও পরিচালনা করা প্রতিটি মুসলিমের একান্ত দায়িত্ব।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক।