ভোরের আকাশে ভেসে উঠছে হিমালয়ের অপরূপ কাঞ্চনজঙ্ঘা


৬ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৪১

আসাদুজ্জমান আসাদ, পঞ্চগড় : ভোরের আকাশে যখন আলোর আভা ফুটে ওঠে, ঠিক তখনই উত্তর দিকে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে হিমালয়ের অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যের প্রথম আলোরশ্মি পড়তেই শুভ্র বরফে আচ্ছাদিত এ পর্বতের চূড়াগুলো সোনালি, কমলা, হলুদ, লাল আর সাদা রঙের দ্যুতিতে ঝলমল করে ওঠে। মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় অপরূপ মাদকতা, যা দেখলে পর্যটকদের হৃদয় ভরে ওঠে। কাঞ্চনজঙ্ঘার পশ্চিমে তামুর নদী, উত্তরে লহনাক চু নদী। এছাড়া জংসং শৃঙ্গ এবং পূর্ব দিকে তিস্তা নদী প্রবাহিত। যারা মেঘের নানা রং দেখে আনন্দ-উল্লাসে আগ্রহী, তারা যেতে পারেন কাঞ্চনজঙ্ঘায়। এটি মনোমুগ্ধকর ও দৃষ্টিনন্দন শুভ্র অপরূপ পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম এবং ভয়ংকর পর্বতশৃঙ্গ। কাঞ্চনজঙ্ঘাকে নান্দনিকতার বিশেষ মাত্রা বলা হয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা ভারতের সিকিম রাজ্যের সাথে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। হিমালয় পর্বতের এ অংশটিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা বলা হয়।
কথা হয় দর্শনার্থী আহসান হাবিব জিনান, ইমরান, সাকিব, পলক, আল মাহমুদ, তনু, নুর, নবীন এবং ফাহিম আদনানের সাথে। তারা ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী বিভাগের ছাত্র। জিনান বলেন, ‘প্রভুর সৃষ্টি অপরূপ, যা অতি সুন্দরভাবে সাজানো। কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোমুগ্ধকর ও মনোরম দৃশ্য দেখতে পেরেছি। আমরা মুগ্ধ। প্রাণটা ভরে উঠেছে’।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো বাংলাদেশ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান। তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোটি মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। এ ঐতিহ্যবাহী ডাকবাংলো থেকে পর্বতের হাসির ঝিলিক যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। যা সমতল ভূমি থেকে প্রায় ২০ মিটার উঁচু। এ স্থানটি ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে এক আকর্ষণীয় স্পট।
শেরপা তেনজিংয়ের লেখা বই ‘ম্যান অব এভারেস্ট’ অনুযায়ী কাঞ্চনজঙ্ঘা নামের অর্থ বরফের পঞ্চরত। এ পাঁচটি চূড়া থেকেই এ নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিটি চূড়ার উচ্চতা ৮ হাজার ৪৫০ মিটার। দুটি নেপালে আর বাকি তিনটি ভারতের উত্তর সিকিম ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত। ভারতের দার্জিলিং, কালিস্পং কিংবা টাইগার হিল থেকে পর্যটকটরা এ দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান। তবে বাংলার মাটিতে বসে তেঁতুলিয়া থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার সবচেয়ে স্বচ্ছ রূপ ধরা দেয়। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এ সৌন্দর্য উপভোগের সেরা সময়। কেবল কাঞ্চনজঙ্ঘাই নয়, পঞ্চগড়ে রয়েছে বৈচিত্র্যময়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এখানে করতোয়া, মহানন্দা, ডাহুকসহ প্রায় ৩৩ নদী প্রবাহিত। নদী থেকে সংগৃহীত নুড়িপাথরের স্তূপ যেন ছোট পাহাড়ের মতো দৃশ্য তৈরি করে। জেলাটির সমতল ভূমি সবুজ চা-পাতার চাদরে ঢাকা, যা কৃষি ও অর্থনীতির জন্য উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।
পঞ্চগড়ের ভিতড়গড়ে রয়েছে কামরূপ রাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ। মোগল আমলের দুর্গ ও দীঘি। রয়েছে আটোয়ারী কেল্লা, বারো আউলিয়ার মাজার, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, গোলকধাম এবং এশিয়া মহাদেশে একমাত্র পাথরের তৈরি ‘পঞ্চগড় রক্স মিউজিয়াম’। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করছে। তেঁতুলিয়া উপজেলার জিরো পয়েন্টে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরটি ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পাশাপাশি পর্যটকের প্রাণ সঞ্চার করেছে এ বন্দরটি। ফলে পঞ্চগড়ের পর্যটন খাত দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। নতুনভাবে পিকনিক স্পট, আবাসিক হোটেল, মোটেল, পুরনো স্থাপনা সংস্কারের কাজ চলছে নিয়মিত। কাঞ্চনজঙ্ঘার ঝলমলে হাসি আর পঞ্চগড়ের ঐতিহ্য মিলিয়ে এ জেলা আজ দেশের অন্যতম পযটনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। প্রকৃতিপ্রেমী ও ইতিহাস অনুসন্ধানী যে কারো জন্য পঞ্চগড় হতে পারে অনন্য গন্তব্য।