২০২৫ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই শুধু মানুষই সুন্দর
১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১১
॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার একটি বিশ্বনন্দিত পুরস্কার, যা প্রতি বছর এক বা একাধিক লেখক তথা সাহিত্যিককে দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরীয় লেখক সাহিত্যিক (László Krasznahorkai) লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাবান এ পুরস্কারের জন্য তাঁকে মনোনীত করার কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি বলেছে, তার সৃষ্টিকর্ম আকর্ষণীয় ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, যা অ্যাপোক্যালিপ্টিক (Master of the apocalypse) মহাপ্রলয়ের ভয়ের মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
৭১ বছর বয়সী ক্রাসনাহোরকাইকে ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে গত ৯ অক্টোবর বুধবার দ্য সুইডিশ একাডেমি। ক্রাসনাহোরকাই হাঙ্গেরির নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত দ্বিতীয় সাহিত্যিক। এর আগে ২০০২ সালে দেশটির ইমরে কারতেস মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কার পান। ক্রাসনাহোরকাই পাঁচটি উপন্যাস লিখেছেন। এছাড়া লিখেছেন অনেক ছোটগল্প, প্রবন্ধ। তিনি নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্য সংকলন ‘সেইবো দেয়ার বিলো’-এর জন্য সাহিত্যে ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেছেন হাঙ্গেরিয়ান এই লেখক। গল্পের এই সংকলনে রয়েছে ১৭টি গল্প, যা এক বিশেষ বিন্যাসে সাজানো হয়েছে। গল্পগুলোতে এমন এক জগতের সৌন্দর্য ও শিল্পের স্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যে জগৎ দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং এটির সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় না। ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রধানত জার্মানিতে পরিচিত। দেশটিতে তিনি দীর্ঘসময় বসবাস করেছেন। হাঙ্গেরিতে তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবিত লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের চারটি উপন্যাসকে তার প্রধান কাজ বলে বিবেচনা করেছে নোবেল কমিটি। উপন্যাসগুলো হচ্ছে: ‘সাটানট্যাঙ্গো’ বা Satantango, ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’ বা The melancholy of resistance, ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ বা War and War এবং ‘ব্যারন ওনকহেইমস হোমকামিং’ বা Baron Wenckheim’s Homecoming। অবশ্য ক্রাসনাহোরকাই নিজে এই চারটি উপন্যাসকে তার জীবনের একটিমাত্র বই বলে মনে করেন। এ উপন্যাসে কৌতুকপূর্ণ আবার হতাশাবাদী কল্পকাহিনী থেকে যেন স্বীকৃতভাবে এক অন্তর্মুখী সংগীত নির্গত হয়। তার উপন্যাসগুলো এক আবেশি প্রবৃত্তি দ্বারা অভিভূত বেকেটিয়ান আবেগের ইঙ্গিত দেয়। ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাসের বাক্য দীর্ঘ। কিন্তু মহাকাব্যিক। অনেক সময় মনোলোগের মতো মনে হয়। রয়েছে আচমকা রাক্ষসী ত্বরণ, তীব্রতার অসাধারণ লাফ ও চেতনার অত্যাশ্চর্য বিচ্যুতি। লাসলো ক্রাসনাহোরকাই বিষয় হিসেবে বেছে নেন সেই কালো নদীর মতো বহমান অন্ধকারকে যা ঘটবেই কিন্তু প্রহসনের মতো মানুষের সেটা দেখা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এই অন্ধকারের ভেতর আলোর ফুল ফোটানোও যেন তারই কাজ। একটা উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টা পরিষ্কার হবে। যেমন লাসলোর ফিকশনের এক চরিত্রের বিখ্যাত উক্তি: ‘বেঁচে থাকা সুন্দর নয়। মরে যাওয়াও সুন্দর নয়। এমনকি জীবনও সুন্দর নয়। শুধু মানুষই সুন্দর’। ডাস্টিন ইলিংওয়ার্থ প্যারিস রিভিউতে তাঁর ব্যাপারে লিখেছেন, লাসলো ক্রাসনাহোরকাইর অবসেশন গোপন জিনিসের প্রতি, যেগুলো মানুষের জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক। লাসলো ক্রাসনাহোরকাই দ্য প্যারিস রিভিউকে তার ‘আর্ট অব ফিকশন’ সাক্ষাৎকারে আরও বলেছেন, ‘আমি হাজারবার বলেছি যে, আমি সব সময় কেবল একটি বই লিখতে চেয়েছিলাম। আমি প্রথমটিতে সন্তুষ্ট ছিলাম না। সে কারণেই আমি দ্বিতীয়টি লিখেছিলাম। আমি দ্বিতীয়টিতে সন্তুষ্ট ছিলাম না, তাই আমি তৃতীয়টি লিখেছিলাম ইত্যাদি। এখন ব্যারনের (চরিত্রের নাম) সঙ্গে আমি গল্পটি শেষ করতে পারি। এই উপন্যাস দিয়ে আমি প্রমাণ করতে পারি যে আমি সত্যিই আমার জীবনে কেবল একটি বই লিখেছি।’
সুইডিশ একাডেমি বলেছে, ‘তিনি এই পুরস্কার পেয়েছেন তার চিত্তাকর্ষক ও দূরদর্শী সৃজনকর্মের জন্য। যা মহাপ্রলয়ের ভয়াবহতার মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে পুনর্জীবিত করে। তিনি মধ্য ইউরোপীয় সাহিত্যের একজন মহাকাব্যিক লেখক। তার রচনা ফ্রাঞ্জ কাফকা এবং টমাস বার্নহার্ডের রচনার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে।’ তিনি জার্মানির পটভূমিকায় লেখা Herscht 07769 বা ‘হার্শট ০৭৭৬৯’ বইয়ের জন্য এ পুরস্কার লাভ করেন। যে উপন্যাসটি ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
Herscht 07769 : লাসলো ক্রাসনাহোরকাই এর জার্মান ভাষার উপন্যাস ‘হার্শট ০৭৭৬৯’ সম্পর্কে নোবেল কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি জার্মান সমাজের অস্থিরতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এই উপন্যাসের গল্প এগিয়েছে জার্মানির ছোট্ট শহর থুরিঙ্গেনের সামাজিক অরাজকতা, হত্যা আর জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে বিপর্যস্ত জীবনের নানান ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। এটি তুলে ধরেছে সহিংসতা ও সৌন্দর্যের অসম্ভব মিলনের গল্প। এছাড়া কোভিড মহামািীর ঠিক আগে দেশটির সামাজিক অস্থিরতার চিত্র সেখানে ফুটিয়ে তুলেছেন ক্রাসনাহোরকাইর। তার সাহিত্যের মূল দিকগুলো হলো মানবজীবনের অস্থিরতা, নৈতিক পতন, এবং মহাপ্রলয়ের ভয়ের মধ্যে শিল্পের শক্তিকে তুলে ধরা। তার রচনায় প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ও গ্রামীণ পটভূমি, জটিল দার্শনিক বিষয়বস্তু এবং একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেখা যায়। তিনি তার দীর্ঘ, জটিল বাক্য এবং একধারার বর্ণনার জন্য পরিচিত, যা তার উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
Satantango বা ‘সাটানটাঙ্গো’: উপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই ১৯৫৪ সালের ৫ জানুয়ারি রোমানিয়ান সীমান্তের কাছে দক্ষিণ-পূর্ব হাঙ্গেরির ছোট শহর গিউলায় জন্মগ্রহণ করেন। একই রকম প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা তার প্রথম উপন্যাস Satantango বা ‘সাটানটাঙ্গো’র পটভূমি। যা ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসটি হাঙ্গেরির সাহিত্য মহলে ব্যাপক জনপ্রিয় লাভ করে এবং হাঙ্গেরির সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নোবেল কমিটি বলেছে, উপন্যাসটিতে কমিউনিজম পতনের ঠিক আগের হাঙ্গেরির গ্রামীণ অঞ্চলের পরিত্যক্ত সমবায় খামারে নিঃস্ব একদল বাসিন্দার জীবন অত্যন্ত দুর্দান্ত ভাষায় চিত্রিত হয়েছে। ক্রাসনাহোরকাইয়ের বেশ কয়েকটি উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘সাটানটাঙ্গো’ এবং দ্য ভার্কমেইস্টার হারমোনিজ। তার উপন্যাসগুলো থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন হাঙ্গেরির খ্যাতিমান পরিচালক বেলা তার। ফলে এটিকে লেখকের যুগান্তকারী রচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। উপন্যাসে শক্তিশালী ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় কমিউনিজমের পতনের ঠিক আগে হাঙ্গেরিয়ান গ্রামাঞ্চলে পরিত্যক্ত যৌথ খামারে বসবাসকারী এক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিত্র তুলে ধরা হয়। কাহিনীতে নীরবতা এবং প্রত্যাশার রাজত্ব বিরাজ করছিল। উপন্যাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইরিমিয়াস এবং তার বন্ধু পেট্রিনা। যাদের সবাই মৃত বলে বিশ্বাস করত। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা একদিন উপস্থিত হন। ফলে সেখানে অপেক্ষারত বাসিন্দাদের কাছে তাদের দুজনকে আশার বার্তাবাহক বা শেষ বিচারের বার্তাবাহক বলে মনে হয়। বইয়ের কাহিনীতে এ বিষয়ে প্রতারণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা প্রতারক ইরিমিয়াসের মধ্যে নানা রকম ভান বা ছলচাতুরী লক্ষ করা যায়। ফলে তাদের প্রতারণার কাছে সবাই বন্দি হয়ে পড়ে। যে কারণে উপন্যাসের প্রত্যেকেই একটি অলৌকিক ঘটনার জন্য অপেক্ষা করেন। সবার মনেই একটি আশা জন্ম নেয়, ‘আমি এটির জন্য অপেক্ষা করব, না হলে জিনিসটি মিস করব।’ বিখ্যাত এই উপন্যাসটি পরিচালক বেলা টারের সহযোগিতায় ১৯৯৪ সালে চলচ্চিত্রে পরিণত হয়েছিল।
The melancholy of resistance বা ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’: আমেরিকান সমালোচক সুসান সনট্যাগ সমসাময়িক সাহিত্যের (Master of the apocalypse) বা ‘রহস্যোদ্ঘাটনের গুরু’ হিসেবে ভূষিত করেন লাসলো ক্রাসনাহোরকাইকে। লেখকের দ্বিতীয় বই ‘অ্যাজ এলেনাল্লাস মেলানকোলিয়াজা’ (১৯৮৯); যার ইংরেজি অনুবাদ The melancholy of resistance বা ‘দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স’ (১৯৯৮) পড়ার পর তিনি এ সিদ্ধান্তে আসেন। এ উপন্যাসে কার্পেথিয়ান উপত্যকায় অবস্থিত হাঙ্গেরির একটি ছোট শহরে চিত্রিত ভয়ানক কল্পকাহিনীতে নাটকীয়তা বেড়ে ওঠে। দ্য মেলানকোলি অব রেজিসট্যান্স-এ ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের চিত্র আঁকা হয়েছে। পাহাড়ে অবস্থিত একটি ছোট শহর কার্পাথিয়ানে প্রবেশ করে একটি প্রেতাত্মাসদৃশ সার্কাসদল, যার মূল আকর্ষণ একটি বিশাল তিমির মৃতদেহ। এই উদ্ভট এবং আশঙ্কাজনক ঘটনা শহরের ভেতর নানারকম ধ্বংসাত্মক শক্তিকে উসকে দেয়। সহিংসতা, অরাজকতা এবং সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা শহরটিকে নিয়ে যায় স্বৈরাচারী অভ্যুত্থানের দ্বারপ্রান্তে। লেখক চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নৃশংস দ্বন্দ্ব, যা থেকে কেউই মুক্ত নয়।
‘ব্যারন ভেঙ্কহেইম’স হোমকামিং’ বা Baron Wenckheim’s Homecoming: তবে লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের অপর উপন্যাস ‘হাবারু এস হাবারু’ (১৯৯৯); ইংরেজি অনুবাদ ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ারে’ (২০০৬) তৃতীয় উপন্যাসে এসে লেখক পাঠকের মনোযোগ বেছেন হাঙ্গেরির সীমানা থেকে বাইরে সরিয়ে নেন। ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার নামের উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন সাধারণ আর্কাইভ কর্মচারী। যিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে নিউইয়র্কে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই উপন্যাসের ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছে লেখকের উপন্যাস ‘ব্যারন ভেঙ্কহেইম’স হোমকামিং’ বা Baron Wenckheim’s Homecoming (২০১৬ সালে প্রকাশিত, ইংরেজি অনুবাদ ২০১৯)। উপন্যাসটির চরিত্রটি তার মাতৃভূমিতে (হাঙ্গেরি) ফিরছে। জুয়ার আসক্তিতে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এক জমিদার বহু বছর আর্জেন্টিনায় কাটিয়ে হাঙ্গেরিতে ফিরে আসছে শৈশবের প্রেমকে খুঁজতে। তবে তার সফরসঙ্গী ‘দান্তে’ একটি ছলনাময় চরিত্র। দান্তে তাকে বিপথে নিয়ে যায়। তার ফিরে আসার খবরে গ্রামের বাসিন্দারা একটি স্বাগত কুচকাওয়াজের পরিকল্পনা করে। কারণ কী? কারণ হলো, তার কাছে পাওনাদারেরা যেসব পেত, সেসব পুনরুদ্ধারের জন্য চাপ প্রয়োগ করা। খুব প্রকাশ্যে চলতে থাকে এই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের কাজ। কিন্তু গোপন বিষয় হচ্ছে ব্যারনকে শাস্তি দেওয়া। এ বিষয়ে আমলা এবং গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি এমনকি অপরাধী বাইকার ও প্রতারকেরা পর্যন্ত একজোট হয়ে যায়। ব্যারনকে দেওয়া হবে অভ্যর্থনা, কিন্তু সে লাজুক এবং ভেতরে ভেতরে ভয় পায়। মৃত্যুর মতো ভয়। কারণ, তাকে কেন এসব দেওয়া হবে? সে তো কেউকেটা ধরনের কেউ নয়। সে অতি সাধারণ সব হারানো মানুষ।
এদিকে সবকিছু তো আর পরিকল্পনামাফিক চলে না, তাই দেখা যায়, আত্মরক্ষার জন্য বাইকার গ্যাংয়ের এক সদস্য এক লেফটেন্যান্টকে গুলি করার পর সেই সন্ন্যাসী বা অধ্যাপক বা শেওলাবিশেষজ্ঞ বা সুশীল প্রথমে মৃত্যুর ভান করেন এবং পরে শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। উপন্যাস থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হওয়ার আগে তিনি একটি চূড়ান্ত উন্মত্ত মনোলোগে পরিবেশন করেন উন্মাদনার প্রস্থান সংগীত। সে তার পুরোনো প্রেয়সী মারিকাকে খুঁজতে থাকে। যে তাকে বহু বহু আগে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই শহরে একটি পরিত্যক্ত কুঁড়েঘরে এই সন্ন্যাসী থাকেন। তিনি আবার অধ্যাপক হিসেবেও পরিচিত। এবং তিনি সমাজে পরিচিত শেওলাবিশেষজ্ঞ হিসেবেও। তাকে কেন শেওলাবিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখানো হলো, প্রশ্ন জাগতে পারে। উত্তর হচ্ছে, ব্যারনের জীবন তো নদীতে ভেসে যাওয়া শেওলার মতোই। সন্ন্যাসী ব্যারন সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত দেবেন। যদিও সন্ন্যাসী, তবু সুশীল গোত্রের।
‘চিন্তাকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা বৃথা’; তিনি বলেন, ‘চিন্তার কোনো ফলাফলে পৌঁছানো থেকে ক্রমাগত নিজেদের বিরত রাখতে আমাদের ধারাবাহিক, ভয়ংকর, ভয়াবহ, কঠোর মনোযোগ আবশ্যক।’ উপন্যাসে শেওলাবিশেষজ্ঞ চরিত্রটি মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠায় অসীমের ধারণা, সংস্কৃতির জন্ম হিসেবে ভয়, নাস্তিকতার কাপুরুষতা ও মানবিক বিভ্রমের ব্যাপকতার ওপর প্রজ্ঞাপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এবং কিছুই স্থির নয়, কিছুই আবদ্ধ নয়, কিছুই ধরা যায় না। সবকিছুই আঁকড়ে ধরতে গেলে তা পিছলে যায়।’
উপন্যাসের এ পর্যায়ে দেখা যায়, ব্যারনের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে শহরের মানুষেরা যে পরিকল্পনা করেছিল, একসময় বুঝতে পারে যে সেটা করে আদৌ ব্যারনের কাছ থেকে তেমন কিছুই পাওয়া যাবে না। কারণ ব্যারন সব খুইয়ে এসেছে। সে একটা জুয়ারি। ব্যারনের কাছে মনে হয়, তার পুরোনো শহরেও আর কিছুই নেই আগের মতো। সেই একই রেলস্টেশন, প্রধান রাস্তা, হাসপাতাল, দুর্গ বা চ্যাটো সবই আগের মতো জরাজীর্ণ, ক্লিশে এবং অদ্ভুতভাবে একই জায়গায় যেন দাঁড়িয়ে আছে। ব্যারনের সঙ্গে পুরোনো প্রেমিকা মারিকার দেখা হয়। ব্যারন যেন চিনতেই পারছে না। মারিকাও যেন মারিকা নেই। অন্য কেউ। ব্যারন বিব্রত বোধ করে। মারিকা বলে, ‘কী ভাবছ আমায় দেখে?’ ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাসে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা অনিশ্চিত। ‘ব্যারন ওনকহেইমস হোমকামিং’-এ আমরা দেখি, প্রতিটি চরিত্র যেন পৃথিবীর শেষ নাগরিক যারা নিজেদের অস্তিত্বের বোঝা টেনে নিয়ে চলছে এক অনন্ত ক্লান্তির ভেতর।
ব্যারন নিরুত্তর। অবশেষে একধরনের আধ্যাত্মিক পরীক্ষার সামনে যেন দাঁড়ায়। ব্যারন মনে করে, তার এ সময় কি বেঁচে থাকা উচিত নাকি নিজেকে ধ্বংস করা উচিত? বনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া রেলপথ ধরে সে হাঁটতে থাকে। চাঁদের আলোয় তাকে ঘোরগ্রস্ত মানুষ মনে হয়। লেখক ক্রাসনাহোরকাই এখানে যেন দস্তয়েভস্কি দ্বারা প্রভাবিত। দেখা যায়, ব্যারন তার শেষ মুহূর্তে ভাগ্যের সঙ্গে বিরোধিতা করে এমন এক কারামাজভের ক্ষিপ্ত মহিমা অর্জন করে। যে কারামাজভকে আমরা দেখি, ফিওদর দস্তয়েভস্কির লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’ এ। উপন্যাসের শেষে সেই একই সর্বনাশের শঙ্কা। যেখানে একজন ব্যক্তি যিনি খ্রিষ্টবিরোধী হতে পারেন বা নাও পারেন, তিনি শহর ও এর জঘন্য বাসিন্দাদের পুড়িয়ে ফেলার জন্য এক নির্মম অগ্নিকাণ্ডের কল্পনা করেন। মোটামুটি এই হচ্ছে উপন্যাসের সারসংক্ষেপ। বোকা মেয়র, দুষ্ট ও আবেগপ্রবণ নেতা, প্রতারক শিল্পী দান্তে, পোপের একটি ক্যামিও এসব তো রয়েছেই। এ উপন্যাস সমসাময়িক সাহিত্যের অন্যতম সেরা কৃতিত্ব। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে সাহিত্যমোদীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এই উপন্যাসে লাসলো ক্রাসনাহোরকাই মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর, অবসন্ন প্রতিধ্বনি লিখে রাখেন। তার লেখার ভেতর দিয়ে ভেসে উঠে সভ্যতার পতনের কণ্ঠস্বর, যেখানে মানুষ কেবল এক অনন্ত ঘূর্ণির মধ্যে আবর্তিত হয় আলো আর অন্ধকারের, পাপ আর মুক্তির, বেঁচে থাকা আর ধ্বংসের মাঝখানে। ক্রাসনাহোরকাইয়ের ভাষা এখানে কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং নিজেই এক অভিজ্ঞতা যেন বাক্যগুলো পড়তে পড়তে পাঠকও সেই পচে যাওয়া শহরের কর্দমাক্ত রাস্তায় হাঁটতে থাকে, ব্যারনের মতোই হারানো কিছুর খোঁজে, যার অস্তিত্ব হয়তো কখনোই ছিল না। তাঁর বর্ণনা একদিকে প্রলাপময়, আবার অন্যদিকে এক আধ্যাত্মিক স্থিতি বহন করে যেন বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সৃষ্টির লুকোনো শৃঙ্খলাকে। বেকেটের পর থেকে যে অস্তিত্ববাদী শূন্যতার উত্তরাধিকার সাহিত্য টেনে এনেছে, ক্রাসনাহোরকাই সেটাকে পুনরায় নতুন আঙ্গিকে প্রাণ দেন এক হাঙ্গেরীয় নিঃসঙ্গতা ও ইউরোপীয় বিভ্রান্তির মিশেলে। এই উপন্যাস, এবং প্রকৃতপক্ষে তাঁর সমগ্র রচনাজীবন পাঠককে কোনো সান্ত্বনা দেয় না, বরং এক গভীর আত্মসমীক্ষার দিকে ঠেলে দেয়। ‘ব্যারন ওনকহেইমস হোমকামিং’ শেষ হয় আগুনে, ধ্বংসে, কিন্তু সেই ধ্বংসই যেন নতুন এক শুরু, যেমন করে শেওলার ভেতর থেকেও জন্ম নেয় সবুজের ইঙ্গিত। মানুষের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস এই যে, সব নষ্টের পরেও সৌন্দর্য অবশিষ্ট থাকে। হয়তো সেই কারণেই তিনি বলেছেন, ‘বেঁচে থাকা সুন্দর নয়, জীবনও সুন্দর নয়, শুধু মানুষই সুন্দর।’ লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের এই বিশ্বাসই তাকে আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের অনন্যতম কণ্ঠে পরিণত করেছে।
তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ২০০৩ সালের উপন্যাস ‘এ মাউন্টেন টু দ্য নর্থ, এ লেক টু দ্য সাউথ, পাথস টু দ্য ওয়েস্ট, এ রিভার টু দ্য ইস্ট’। উপন্যাসটি জাপানের কিয়োটোর রহস্যময় কাহিনীকে কাব্যিক সৌন্দর্যে তুলে ধরেছে। যেখানে সেইবো নামের এক দেবী এমন একটি বাগান পাহারা দেন; যেখানে প্রতি তিন হাজার বছর পর অমরত্বের ফল ধরে।
লেখক বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটিতে ছয় মাস অতিথি অধ্যাপক ছিলেন। বর্তমানে হাঙ্গেরির একটি পাহাড়ে নির্জনে বসবাস করছেন। ১৯৯০ সালে তার প্রথম স্ত্রী আনিকো পেলিহের সঙ্গে বিয়েবিচ্ছেদ হয়। ১৯৯৭ সালে ডোরা কোপসানিকে বিয়ে করেন। যিনি একজন সাইনোলজিস্ট এবং গ্রাফিক ডিজাইনার। তার তিনটি সন্তানÑকাটা, অ্যাগনেস এবং পান্নি। তিনি ২০১৫ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার জেতেন। লাসলো ক্রাসনাহোরকাই অর্জন করা পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৫ সালের ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং ২০১৩ সালের সেরা অনূদিত বই পুরস্কার (ফিকশন) তার প্রথম উপন্যাস সাটানট্যাঙ্গোর জন্য। এ ছাড়া ১৯৯৩ সালে দ্য মেলানকলি অব রেজিস্ট্যান্স-এর জন্য ক্রাসনাহোরকাই জার্মান বেস্টেনলিস্টে পুরস্কার পান। ক্রাসনাহোরকাইরের সর্বশেষ ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস জস্মলে ওদাভান পাঠককে আবার হাঙ্গেরিতে ফিরিয়ে নেয়। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ৯১ বছর বয়সী আঙ্কল জোজসি কাদা সিংহাসনের গোপন দাবিদার, কিন্তু তিনি বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে থাকতে মরিয়া চেষ্টা চালি যান।
তিনি একজন মন্ত্রমুগ্ধকর লেখক বার্তা সংস্থা এফপিএফকে জানিয়েছেন, ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাসের ইংরেজি ভাষার অনুবাদক কবি জর্জ সির্তেস। তার কথায়, ‘তিনি আপনাকে এমনভাবে আকৃষ্ট করেন যে তিনি যে জগতের চিত্র আঁকেন, তা বারবার আপনার ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয়, যতক্ষণ না তা আপনার নিজের শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে।’ সমালোচকদের জন্য কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হলেও ক্রাসনাহোরকাই একবার নিজের লেখার শৈলীকে বর্ণনা করেছিলেন ‘পাগলামির সীমা পর্যন্ত বাস্তবতার পরীক্ষা’ হিসেবে। দীর্ঘ বাক্য ও কম অনুচ্ছেদ ব্যবহারের জন্য লেখককে অনেক সময় ‘অতি মনোযোগী’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। লেখক : সাংবাদিক, গ্রন্থপ্রণেতা।