আসন বণ্টন নিয়ে শরিকদের সঙ্গে বিএনপির টানাপোড়েন


৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৩৮

॥ জামশেদ মেহদী ॥
ঢাকা থেকে বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর। অন্যদিকে ঢাকা থেকে খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট। সব জায়গায়ই বিএনপি নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। ঢাকায় পুরানা পল্টন, মতিঝিল, ফকিরাপুল যেখানেই যাবেন সর্বত্র ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। কিন্তু একটি পোস্টারও দেখবেন না, যেখানে প্রার্থী বলছেন যে, আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। তার পরিবর্তে দেশব্যাপী হাজার হাজার পোস্টার। পোস্টারের ছবি এবং কথাও মোটামুটি এক। ওপরে কমপক্ষে ৩টি ছবি। শহীদ জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। কালিয়াকৈর, গোড়াইসহ দু-একটি জায়গায় দেখলাম, বিএনপির ঐ ৩ নেতার ছবি ছাড়াও আরেকটি ছবি দেওয়া হয়েছে। সেটি হলো, ডা. জুবায়দা রহমানের। আর নিচে বড় করে একটি ছবি। ছবির কথা হলো, অমুক ভাইকে আগামী নির্বাচনে এমপি হিসেবে দেখতে চাই। এই এক কথা সব পোস্টারে। এর অর্থ হলো, প্রার্থী নির্বাচন এখনো ফাইনাল হয়নি। তাই এমপি হতে আগ্রহী প্রার্থীরা এসব পোস্টারের মাধ্যমে হাইকমান্ডকে অনুরোধ করছেন। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, এসব পোস্টারের মাধ্যমে হাইকমান্ডের ওপরে একটি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে দেশের অন্যসব রাজনৈতিক দলের চেয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত। জামায়াতের কোনো প্রার্থী বলেন না যে, আমাকে নমিনেশন দিন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরেজমিন জরিপ ও পর্যবেক্ষণ করে যাচাই করেন, সেখানে জামায়াতের কোন ব্যক্তি সবচেয়ে সৎ, যোগ্য এবং কার নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা আছে। এটি শুধু নির্বাচনের ক্ষেত্রেই নয়। দলের অভ্যন্তরে কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কেউ বলবেন না যে, আমাকে অমুক পদে নির্বাচন করুন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই ঠিক করেন, কাকে কোন পদে নির্বাচন করলে জামায়াতের আদর্শ, অর্থাৎ আল্লাহর আইন এবং সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বেশি।
জামায়াতের তরফ থেকে আমার জানামতে এখনো কোথাও ভোট চেয়ে কোনো পোস্টার বা ব্যানার টাঙানো হয়নি। জামায়াত পত্রপত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক, ৩০০ আসনেই প্রার্থী মোটামুটি ফাইনালাইজ করেছে। কিন্তু নির্বাচনী জোট গঠনের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে না। ইতোমধ্যে দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, প্রয়োজনে নির্বাচনী জোট গঠনের জন্য জামায়াত ১০০ আসন ছেড়ে দিতে রাজি আছে। তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি যে, যদি ১০০টি আসন জোটসঙ্গীদের ছেড়ে দিতে হয়, তাহলে এর মধ্যে যে ৩০০ জনকে প্রার্থী হিসেবে সিলেক্ট করার চিন্তাভাবনা করা হয়েছে, তাদের ভেতর থেকে অন্তত ১০০ জনকে ড্রপ করতে হবে। বাইরের লোকজন জানেন না যে, যদি ১০০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীকে ড্রপ করতে হয়, তাহলে ঐ ১০০ জন সম্ভাব্য প্রার্থী হাসিমুখে সেটি মেনে নেবেন। কারণ তারা তো এমপি হওয়ার জন্য কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি। দল তাদের উপযুক্ত মনে করলে প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্দেশ দেবে। তারা সেই নির্দেশ তামিল করবেন। তারা নিজেরা কোনো আবেদন করবেন না।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে প্রার্থী হওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। একটি এলাকায় যদি ৫-৬ ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার জন্য আগ্রহী থাকেন, তাহলে শুরু হয়ে যায় হাইকমান্ডের সাথে নানারকম দেনদরবার। ক্ষেত্রবিশেষে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মারামারিও হয়। একাধিক ক্ষেত্রে খুনাখুনিও হয়েছে। এটিই জামায়াত এবং অন্যান্য দলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার মাপকাঠি।
সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, এই প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে যেমন উপদলীয় কোন্দল হচ্ছে, তেমনি সমমনাদের সাথে আসন ভাগাভাগি নিয়েও বিএনপির অভ্যন্তরে টানাপড়েন চলছে।
আওয়ামী লীগ আমলে যখন সব দল শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন করছিলো, আন্দোলনের কারণে যখন বিএনপি অন্যান্য দলকে নিয়ে এক বা একাধিক সমমনা জোট গঠন করেছিলো, তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিভিন্ন ওয়াদা করেছিলেন। বলেছিলেন যে, ভবিষ্যতে আওয়ামী সরকারের পতন হলে বিএনপি সমমনাদের নিয়ে শুধু নির্বাচনই করবে না, তাদের নিয়ে এক সাথে সরকারও গঠন করবে।
শেখ হাসিনাও নেই, আওয়ামী সরকারও নেই। শুধু দেশে নেই তাই নয়, তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ঐ দিকে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে যে, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্বাভাবিকভাবেই এখন বিএনপির জোট শরিকরা আসন ভাগাভাগি চাচ্ছে- এ অবস্থা দেখে বিএনপি হাইকমান্ড তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চেয়েছে। এ তালিকা নিয়েই শুরু হয়েছে টানাপড়েন। এখন ৫৩টি রাজনৈতিক দল দাবি করছে, তারা বিগত দিনগুলোয় বছরের পর বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্বে আওয়ামীবিরোধী আন্দোলন করেছে। এখন যদি প্রতিদল থেকে দুটি করেও আসন বিএনপিকে ছাড়তে হয়, তাহলে তাদের ছাড়তে হবে ১০৬টি আসন। এটি কোনো অবস্থাতেই বিএনপির পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বিএনপি চাচ্ছে যে, আগামী নির্বাচনে তাদের সমমনা দলগুলো ছাড়াই বিএনপি যেন এককভাবে জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনের জয়লাভ করতে পারে।
দুই-তৃতীয়াংশ মানে হলো অন্তত ২০০ আসন। ২০০ আসনে জয়লাভ করতে হলে অন্তত ২৫০ আসনে দলীয় প্রার্থী অর্থাৎ বিএনপিকে প্রার্থী দিতে হবে। বিএনপির মধ্যে শীর্ষনেতৃবৃন্দের মাথায় এ ধারণাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে যে, দল হিসেবে শুধুমাত্র মাথা গুনলে চলবে না। যাদের জন্য বিএনপি তাদের আসন ছেড়ে দেবে, তাদের জয়লাভের সম্ভাবনা থাকতে হবে শতকরা ১০০ ভাগ। কিন্তু বিএনপি দেখতে পাচ্ছে যে, সমমনাদের মধ্যে অপরিচিত প্রার্থী তো দূরের কথা, অনেক নেতাও তাদের এলাকায় তেমন পরিচিত নন। ইংরেজি ডেইলি স্টার এ সম্পর্কে গত ৫ অক্টোবর রোববার প্রথম পৃষ্ঠায় ডাবল কলামে একটি সংবাদ ছেপেছে। সংবাদটির শিরোনাম, ‘BNP’s seat-sharing math stirs unease among allies’ বঙ্গানুবাদ : বিএনপির আসন ভাগাভাগির অঙ্ক মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। খবরের ইনসেটে বলা হয়েছে, মিত্রদের কাছে আসন ছেড়ে দেওয়াটা বিএনপির জন্য কঠিন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নিজ দলের প্রার্থীরা নমিনেশন না পাওয়ায় তারা ক্রুদ্ধ। তাদের শান্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার একইভাবে যেসব খবর বেরিয়ে আসছে, সেসব খবর থেকে শরিকরা বুঝতে পারছেন যে, তাদের মধ্যে কোন কোন আসন বিএনপি ছাড়বে না। এ অবস্থা শরিকদের মধ্যেও প্রবল হতাশার সৃষ্টি করেছে।
একটি নয়, দুটি নয়, অসংখ্য নির্বাচনী এলাকায় দেখা যাচ্ছে, বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী এবং জোটের সম্ভাব্য প্রার্থী সমান্তরালভাবে গণসংযোগ শুরু করেছেন। অনেক জেলায় তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির প্রার্থীর লোকজন ছোট ছোট জোটসঙ্গী প্রার্থী বা স্থানীয় নেতাদের মারধরও করছে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো যুক্ত হয়েছে আরপিওতে প্রস্তাবিত সংশোধন। সংশোধনীতে বলা হয়েছে যে, নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দল অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীকে প্রার্থী হতে পারবেন না। উদাহরণস্বরূপ, মনে করুন গণসংহতি আন্দোলনের কোনো নেতা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবেন না। আরপিওর এ সংশোধনীটি এখনো প্রস্তাব আকারেই আছে। বিএনপি তদবির করছে, সংশোধনীটি যেন সিদ্ধান্ত আকারে না আসে। এলে তাদের জোটের ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
জোটসঙ্গীদের জন্য আরেকটি বিষয় খুব পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। সেটি হলো, এ পর্যন্ত জোটসঙ্গীদের মধ্য থেকে নাকি অন্তত ২৫ জনের ইন্টারভিউ নিয়েছে বিএনপি। বিএনপি ভয় করছে যে, জোটসঙ্গীদের খুশি করতে গিয়ে এমন সব আসন তাদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে, যেখানে জোটসঙ্গীর প্রার্থীর কোনো জনপ্রিয়তাই নেই।
ডেইলি স্টারে ঝিনাইদহ-২ আসনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এখানে বিএনপির জেলা সভাপতি আব্দুল মজিদ এবং গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান উভয়েই নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। আব্দুল মজিদ বলেন, যদি রাশেদ খানকে এই আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বিএনপি নির্ঘাত এ আসনটি হারাবে।
ইংরেজি এই দৈনিকটিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবেক এমপি আব্দুল খালেক নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তার পাশাপাশি গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জোনায়েদ সাকিও প্রচারণা চালাচ্ছেন। আব্দুল খালেক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, এ এলাকায় জোনায়েদ সাকির সমর্থন এতই কম যে, বিএনপির সমর্থন ছাড়া তার জয়লাভের সম্ভাবনা শূন্য।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান এবং বিএনপির মিত্র ১২ দলীয় জোট প্রধান এহসানুল হুদা এবং বিএনপির মুজিবুর রহমান নির্বাচনী তৎপরতা চালাচ্ছেন। এখানে এহসানুল হুদা যদি নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করেন, তাহলে তিনি জামানত হারাবেন।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী হলেন হাসান মামুন। পক্ষান্তরে এই আসনটি চান গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর। মামুন বলেন যে, এ আসনটি যদি নূরকে দেওয়া হয়, তাহলে অবশ্যম্ভাবীরূপে তিনি পরাস্ত হবেন। গত জুন মাসে বিএনপি এবং নূরের দলের মধ্যে এখানে মারামারিও হয়েছে। সেই মারামারিতে নূরের দলের ৩০ সদস্য আহত হয়েছেন।
বলা হয়েছে যে, অন্তত ২ ডজন অর্থাৎ এ ধরনের ২৪টি আসন রয়েছে। যেখানে বিএনপির প্রার্থীকে নমিনেশন না দিয়ে যদি সমমনা জোটের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে এ ২৪টি আসনই বিএনপি হারাবে।
বিএনপির এ সমস্যাটি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের এক ঘোষণায়। গত শুক্রবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন যে, বৃহত্তর নির্বাচনী জোট গঠনের স্বার্থে এবং ইসলামী দলসমূহের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনে জামায়াত ১০০টি আসনে ছাড় দিতে প্রস্তুত।
জামায়াত নেতার এ ঘোষণা বিএনপির অনেক মিত্রের মধ্যেই অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তারা ভাবতে শুরু করেছেন যে, যদি বিএনপি তাদের আসন ছেড়ে না দেয়, তাহলে তারা জামায়াতের জোটে যাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- তারা যেতে চাইলেই কি জামায়াত তাদের গ্রহণ করবে? নেহাত নমিনেশন লাভের জন্য কেউ যদি জামায়াত জোটে আসতে চান, তাহলে নমিনেশনের শিকা তার ভাগ্যে নাও ছিঁড়তে পারে।
Email:jamshedmehdi15@gmail.com