কবি ফররুখ আহমদের কাব্যনাট্য নৌফেল ও হাতেম : একটি পর্যালোচনা


২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২২

॥ অধ্যাপক আশরাফ জামান ॥
॥ এক ॥
প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মিশরে থিয়েটারের সূত্রপাত হয়। পরে গ্রীকদের দ্বারা তা পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়।
উৎধসধ শব্দটির মূলে গ্রীক শব্দ উৎধবস আর মূল শব্দের অর্থ হলো ঞড় উড় করা। নাটক মানে নড়াচড়া করা, অঙ্গ চালনা করা বা কিছু করা। নাটক মানবজীবনের কথা উচ্চারণ করে। নাটক হলো মানবসমাজের দর্পণ।
দৃশ্য কাব্য ও শ্রব্য কাব্যের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চের সাহায্যে গতিমান মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরে।
পাক-ভারত সংস্কৃত নাটক ও অতি প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বখ্যাত গ্লোব থিয়েটারের সান্নিধ্য আলোকে এদেশে নাটক ও নাম কিতনা। সেকশপিয়ার বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার।
রাশিয়ান পরিব্রাজক হেবোসিম শেবেডফ এ দেশে প্রথম কলকাতায় এ জরা স্ট্রিটে বেঙ্গলি থিয়েটার নাম দিয়ে ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করেন। তিনি বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়ে এ নাটকে অভিনয় করান। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে তাকে অল্প দিন পরে দেশত্যাগ করে যেতে হয়।
কলকাতায় হিন্দু বাবুরা হিন্দু থিয়েটার নামক নাটক গোষ্ঠী তৈরি করে এবং তাতে ইংরেজি নাটক মঞ্চস্থ করে। দর্শকদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে বাংলা নাটক অভিনীত হয়ে থাকে।
বাংলা সাহিত্যে প্রথমদিকের নাট্যকারদের মধ্যে ছিলেন রামনারায়ণ তর্করত্ন, অমর্ত্য লাল বসু, গিরিষ চন্দ্র ঘোষ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ।
বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ, কৃষ্ণকুমারী, পদ্মাবতী নাটকগুলো কলকাতার দর্শক মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ সময় দীনাবন্ধু মিত্রের সরকারের কোপানলে পড়ে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
মাইকেলের একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়োশালিকের ঘাড়ে রো প্রহসন দুটিও সমাজের বাস্তবচিত্র প্রস্ফুটিত হওয়ায় জনপ্রিয়তা লাভ করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যের সকল শাখায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। নাটক রচনার দিক থেকেও তার কালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। নাট্যকার হিসেবে সাফল্য লাভ করেছেন। তিনি কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, সাংকেতিক নাটক ইত্যাদি রচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও নাটক-নাটিকা, কিশোর নাটিকা মিলিয়ে একুশটি ছোট-বড় গ্রন্থ রচনা করেছেন। অবশ্য তার লেখা সবগুলো পাওয়া যায় না।
॥ দুই ॥
কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) পরবর্তী যুগের অন্যতম কবি হিসেবে আমরা ফররুখ আহমদকে (১৮১৮-১৯৭৪) পাই। তিনি নজরুলের মতো সাহিত্যের নানা দিকে লেখনী ধারণ করেছেন। যদিও তিনি কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত।
আরব্য উপন্যাসের বিখ্যাত কাহিনী নিয়ে কবি ফররুখ আহমদ ‘নৌফেল ও হাতেম’ নামে একটি কাব্যনাট্য রচনা করেছেন। ১৯৬১ সালে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীবৃন্দ নাটকটি মঞ্চস্থ করেন এবং নাট্যামোদীদের দ্বারা তা উচ্চ প্রশংসিত হয়। ইতোপূর্বে মাহেনও পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পায় এবং ১৯৬১ সালে জুন মাসে পাকিস্তান লেখক সংঘের পক্ষে ড. কাজী মোতাহার হোসেন তা প্রকাশ করেন।
ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ নৌফেল ও হাতেম নাটকটিতে ইয়েমেনের শাহজাদা হাতেমকে মানবতাবাদী চরিত্র ও প্রতীক রূপে গ্রহণ করেছেন। হাতেমকে আদর্শবাদী, ন্যায়পরায়ণ, পরোপকারী, সেবাব্রতী, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ও মহৎ মানবতাবাদীরূপে চিত্রিত করেছেন। অন্যদিকে নৌফেলকে ঈর্ষাপরায়ণ অত্যাচারী, অহঙ্কারী বাদশাহর প্রতীকে চিত্রিত করেছেন। বিজয় দেখিয়েছেন মানবতার মুক্তি, দেখিয়েছেন ইনসাফের।
নাটকের সংক্ষিপ্ত কাহিনী হলো : ক্ষমতা অহঙ্কারী, অত্যাচারী, খ্যাতির অভিলাষী বাদশাহ নৌফেল ইয়েমেনের শাহজাদা মহৎপ্রাণ, সেবাব্রতী, পরোপকারী ও মানবতাবাদী হাতেম আযীর বিপুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে হাতেমের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। তার খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। হাতেমের শিরñেদের জন্য বিপুল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেন। পুরস্কারের আশায় এক বৃদ্ধ ও দরিদ্র কাঠুরে হাতেমকে নিয়ে নৌফেলের দরবারে হাজির হয়। হাতেম স্বেচ্ছায় কাঠুরিয়াকে নিজের শির দিতে নৌফেলের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের পুরস্কার লাভের ব্যবস্থা করে দিতে চায়। তার সারা জীবনের দরিদ্রতা তাতে ঘুচবে। সাধারণ মানুষের ঔদার্যের খবর শুনে ঈর্ষাতুর হলেও অন্যের জন্য জীবনদান করার এ মহানুভবতার ওপর ঈর্ষাকাতর থাকতে পারেন না অত্যাচারী বাদশাহ নৌফেল। তার হৃদয় মনে কঠিন বরফ গলে পানি হয়ে যায়। নত হয়ে পড়ে তার শির হাতেমের কাছে। তাই তিনি গলায় ছুরি নয়, গলায় বিজয়ের মালা মানবতার মুকুট পরিয়ে দেন।
একসময় হাতেমকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে বাদশাহ নৌফেল নিজের দানের কথা ঘোষণা দেন।
খাজাঞ্চিখানার দ্বারা খুলে দাও। প্রার্থী আছে যত
যত রাহী সর্বহারা, অনাথ এতিম
অথবা সাফেল যত নিয়ে যাক নিজ প্রয়োজনে।
(নৌফেল)
শাহজাদা হাতেমকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে নৌফেল ঘোষণা দেন তার উজির সেনাদলের উদ্দেশে :
অতর্কিতে হানা দিয়ে তাকে
বন্দী করে নেব, আর রেখে দেব জিন্দানে
শেষ করে যাব তার শেষ সম্ভাবনা আমার।
(নৌফেল)
নৌফেলের হুকুম পেয়ে তার উজির ঘোষণা করে : তায়ীপুত্র হাতেমের দেশে
রাত্র শেষে যেতে হবে। লুটে নিতে হবে তার তখত
কেননা সে খ্যাতিমান এ পৃথিবী ভালোবাসে তাকে।
(উজির)
সেখানে হাতেম নৌফেলের ঈর্ষপরায়ণতার বিন্দুমাত্র বিভ্রান্ত হয় না। মানবতার উপকারের ব্যাপারে সহযোগিতা চাইলে সে তাই করবে। হাতেম বলে :
দাতার সুখ্যাতিই নাম? অর্থহীন। সেবাব্রতী প্রাণ
আল্লাহর বান্দাকে চায় ভালোবেসে মেটাবে পিপাসা।
আশার সর্বস্ব যদি চায় আজ নৌফেল তাহলে
সবকিছু ছেড়ে দিয়ে যাব তার দূরদেশান্তরে
(হাতেম)
বাদশাহ নৌফেলের হত্যার নির্দেশ শুনে হাতেম ভীত নয়, ভীত জনসাধারণ, এজন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আশঙ্কাগ্রস্ত।
হায়াত দারাজ হোক হাতেমের
দোয়া করি প্রতি রাত্রে। সবচেয়ে কঠিন সময়ে দুর্ভিক্ষে দুর্দিনে, দুঃখে দাঁড়ানো সে পাশে
(বুদ্ধ)
হাতেমের খ্যাতির দ্রুতি ঈর্ষত্তুর হিংসুটে স্বঘোষিত
শত্রু যে বাদশাহ নৌফেল
তার প্রতি হাতেমের বিদ্বেষ নেই। বরং তার প্রতি রয়েছে সহানুভূতি। শ্রদ্ধ। তাই হাতেম বলে :
নানা অসম্ভব
রাজলিপ্সা তার। জানি সে দারাজ দিল, মুক্ত মন
সর্বস্ব বিলাতে পারে অনায়াসে।
নৌফেলের সৈন্যেরা হাতেমকে হন্যে হয়ে খুঁজে তাকে বন্দী করার জন্য। বাদশাহর ঘোষিত পুরস্কারের অর্থ ফেলে একটা কাঠুরে পরিবারের অভাব দুঃখ ঘুচে যাবে কাজেই বৃদ্ধ হাতেমকে নিয়ে যাচ্ছে অরণ্য বিজন পথ ধরে। নৌফেলের দরবারে পৌঁছে যখন হাতেম তার পরিচয় দিল বাদশাহর কাছে, তখন তা ছিল না বিশ্বাসযোগ্যতা বরং নৌফেলের মনে হলো তা পরিহাসমূলক। নৌফেল বলেন,
কাঠুরিয়া এই বৃদ্ধ। জয়ীফ অস্থি চর্মসর
তোমাকে করেছে বন্দী! একী পরিহাস?
হাতেম জবাবে বলে :
মিথ্যা নয়
নয় পরিহাস। আমাকে করেছে বন্দী এই বৃদ্ধ
দুঃখের জিঞ্জিরে। তোমার ঘোষণা তুমি পূর্ণ করো।
নৌফেল।
হাতেমের প্রতি ঈর্ষা-বিদ্বেষ-ঘৃণা হীনভবতার প্রকাশ নৌফেলের বুকে চেপে থাকা জগদ্দল পাথরটা সরে গিয়ে ফল্গুধারা বয়ে গেল মুহূর্তে।
নৌফেল তখন বলে :
যে মানুষ প্রাণ দিয়ে করে বিশ্বের কল্যাণ
মাখলুকের বুকে তার দুনিয়া জাহানে
যায় যে বিপুল মানবজীবনে অথবা মৃত্যু পরে
যে মনের শাহজাদা। ক্ষমা করো শত্রুতা আমার
নিজের ভুল বুঝতে শেষ পর্যন্ত নৌফেল নিজের
মাতার বাদশাহী মুকুট হাতেম তায়ীর মাথায় পরিয়ে দেন।
॥ তিন ॥
হাতেম তায়ীর আদর্শবাদিতা নৌফেলের চরিত্র এবং চিন্তা-চেতনাকে বদলে দিয়েছে। বাদশাহর হাজার সৈন্য-সামন্ত একজন হাতেমকে পরিবর্তন করতে পারেনি। একজন মাত্র আদর্শবাদী লোক শক্তিশালী এক স্বৈরাচার শাসকের মনমানসিকতার পরিবর্তন এক বিরাট ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিসর্জন কাব্যনাট্যে আদর্শবাদী গোবিন্দ মানিক্যের কাছে পুরোহিত রঘুপতির সাময়িক পরাজয় ঘটেছে যেন তেমনি। তবে সেখানে রঘুপতি পরাজয় মেনে নেননি, নিজের আদর্শ থেকে এখানে নৌফেল মেনে নিয়েছে। সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেছে শাহজাদা হাতেমের কাছে।
কবি ফররুখ আহমদ ছাত্র জীবনে পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। আন্দোলনে ছিলেন তখনকার লাখো ছাত্র-জনতার স্লোগান ছিল লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।
কবি ফররুখ আহমদ রচিত নৌফেল ও হাতেম একটি সার্থক কাব্যনাট্য। এর আবেদন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অক্ষুণ্ন থাকবে। কবির রচিত হাতেম তায়ী মহাকাব্যের বিশালতাকে সংক্ষিপ্তসারভাবে যারা কম সময়ের মধ্যে পেতে চান, তারা এ থেকে সেই রস আস্বাদন করতে পারবেন। ব্যস্ততাময় সময়ের মধ্যে এক নিমেষের গল্প হিসেবে আস্বাদন করতে পারেন।