সুখ
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১১
॥ সাইদুর রহমান ॥
সোহানা ভাবে, সারা দিন সে কতো কাজে ব্যস্ত থাকে। সব কাজ নিজের হাতে করে। নিজের কাজ নিজে করার মাঝেও সুখ আছে, শান্তি আছে, আনন্দ আছে। সে আল্লাহর কাছে দোয়া করে সে যেন সুস্থ থেকে সমস্ত কাজ করে যেতে পারে।
সে গুন গুন করে গান গায়, আমার গৌরব শুধু এই আমার চেয়ে সুখী কেউ নেই। হাসতে পারি আমি, কাঁদতে পারি আমি…।
সে ভাবে হয়তো আমার অভাব আছে, কিন্তু সেটার মাঝে সুখ আছে। যদি পৃথিবীতে সবকিছুই পাওয়া যেত, তাহলে তো সেখানে সুখ থাকত না। কিছু পাওয়া, কিছু না পাওয়া, কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা- এটার মাঝেই তো প্রকৃত সুখ।
সোহানা অবাক হয়ে ভাবতে থাকে, সুখ আসলে কী। তার মনে হয়-
সুখ হলো ভালোবাসা, তৃপ্তি এবং আনন্দের একটি মানবিক অনুভূতি, যা মনের একটি ইতিবাচক অবস্থাকে বোঝায়। এটি কেবল ক্ষণস্থায়ী আনন্দ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি, মনের শান্তি এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি। সুখের সংজ্ঞা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং এটি অর্থ-সম্পদ বা বাহ্যিক উপকরণের ওপর নির্ভর করে না, বরং মানসিকতা, সম্পর্ক এবং জীবনের উদ্দেশ্য পূরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
সুখ হলো মনের একটি ইতিবাচক অবস্থা, যা আনন্দ ও তৃপ্তি দ্বারা পূর্ণ থাকে।
এটি ক্ষণস্থায়ী আনন্দের বিপরীত, যা একটি গভীর ও স্থায়ী স্বস্তির অনুভূতিকে বোঝায়।
সুখের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারণ এটি কারো জন্য অন্যদের সাহায্য করা হতে পারে, আবার কারো জন্য নিজের লক্ষ্য পূরণ করা।
সুখকে প্রায়ই শুধু আনন্দ বা মজার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু এটি তার চেয়েও গভীর।
অর্থ-সম্পদ বা দামি জিনিসপত্র সবসময় সুখের নিশ্চয়তা দেয় না; বরং এটি একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক ধারণা।
সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করা, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের সাথে সময় কাটানো সুখ বাড়াতে সাহায্য করে।
নিজের চাহিদা ও ইচ্ছাগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেগুলোকে বাস্তবসম্মতভাবে পূরণ করার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
নিঃস্বার্থভাবে অন্যদের সাহায্য করা এবং ভালো কাজ করাও সুখের একটি উৎস।
নিজের জন্য সময় বের করা এবং নিজেকে ভালোবাসা ও যত্নের মাধ্যমে সুখী রাখা জরুরি।
দুঃখ-সুখের সংমিশ্রণে মানুষের জীবন। সোহানা অবাক হয়ে ভাবে, আল্লাহ কতই না মহৎ। তার বিধান কতই না সুন্দর। সত্যিই আমি… বলতে গিয়ে ভেতরে ভেতরে কেঁদে ফেলে সে।
একজন পুরুষ বাইরে ব্যস্ত। সারা দিন খাটুনির পর সে যা ইনকাম করে, তার থেকে পরিবারের খরচ চলে।
নারী খুশি হয়ে প্রিয়জনের জন্য ভালোবেসে ঘর সাজায়। মনের মাধুরী দিয়ে জীবন-সংসার সাজায়। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছাড়ে সোহানা। স্বামীর জন্য নাশতা বানায়। দুপুরের খাবার রেডি করে।
শাহেদ চলে যাওয়ার পর অন্য কাজে মনোযোগী হয় সে। ঘরদোর পরিষ্কার করে। শাশুড়িকে রান্নায় সাহায্য করে।
সন্ধ্যার পর স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে। এ সময়টা কত যে মধুর। অপেক্ষার সময়টাতে নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে তোলে সে। এ সাজ যেন নববধূর সাজ। যেন প্রতিদিনই বিয়ে হচ্ছে তার। আর প্রতিটি রাতই ঠিক যেন বাসর রাত।
মনে মনে সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করে সে। শুকরিয়া জানায় তাঁর দরবারে।
ও বউ শুনছ?
জ্বি আম্মা, আসছি।
হাসিমুখে পাশে এসে দাঁড়ায় সোহানা। তার শাশুড়ির কাছে এক মহিলা দাঁড়ানো।
তাকে চেন?
জ্বি আনোয়ার ভাইয়ের…। ভাবী ভালো আছেন।
আর ভালো থাকা!
তোমার সাথে কী যেন আলাপ করবে। তাকে বৈঠকখানায় নিয়ে যাও।
জ্বি মা।
আসুন ভাবী।
আনোয়ারের স্ত্রী মাথা নিচু করে তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে।
স্বপ্না টিভি দেখছে।
সোহানা অনুরোধ করে বলে, ভলিউম কমাতে।
সোফায় বসতে বসতে সোহানা বলল, কী জানতে চান বলুন?
আনোয়ারের স্ত্রী স্বপ্নার দিকে তাকায়।
ও বুঝতে পারবে না।
আনোয়ারের স্ত্রী মনমরা হয়ে বলল, সারা জীবন আমি কষ্ট করে গেলাম। তবু এ সংসারে সুখ পেলাম না। মানুষটা এত বদমেজাজি, কথায় কথায় গায়ে হাত তোলে।
সে কি পাগল!
না, পাগল নয়।
তাহলে?
কোনো কিছু বলা যায় না তার সাথে।
আনোয়ার ভাই তো সারা দিন বাইরে থাকে?
হুম।
তবুও এত দ্বন্দ্ব কেন?
এটাই তো বুঝতে পারি না। কেন এত ঝামেলা হয়।
সোহানা বলল, ভালোবাসাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সাংসারিক বন্ধন তৈরি করে। ভালোবাসা একে অপরের প্রতি মায়া-মমতা ছাড়া জীবন সুখী হতে পারে না। দুজনের প্রতি দুজনেরই মিল-মহব্বত থাকতে হবে।
ও শুধু মা-বোনের কথা শোনে।
সোহানা এবার আইডিয়া করে বের করে, এটাই প্রধান কারণ।
কোনো মা সন্তানের অমঙ্গল চান না। বোন তার ভাইয়ের খারাপ চায় না।
পুত্রবধূ ও ভাবীর তো চায়।
কী করে বুঝলেন?
বোঝা যায় গো ভাবী। সব বুঝতে পারবেন। মাত্রই তো বিয়ে হয়েছে।
সোহানা মৃদু হাসে।
পুরো সংসারটা আপনার হয়ে গেছে।
রাগের মাথায় কারো সাথে তর্ক করতে যাবেন না। ভুলেও শাশুড়ির ভুল ধরবেন না।
মা-বোন সম্পর্কে কারো কাছে নালিশ করবেন না। বিশেষ করে আপনার স্বামীর কাছে। তাদের সুনাম করবেন।
কী বলেন?
হুম! ভাইয়ের ওপর জোর করবেন না। তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। সে আসলে কী চায়। তার ভালোলাগা, মন্দলাগা বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখুন। আপনার স্বামীর পছন্দকে গুরুত্ব দিন। জোর করে হঠাৎ কোনো কিছু পাল্টে ফেলার চেষ্টা করবেন না।
মনে রাখবেন, আরোপিত কোনো কিছুই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এতে সংসারের সুখ-শান্তি নষ্ট হয়। তাই সবকিছুর মধ্যে সংযত ভাব আনুন।
কিন্তু ভাবী, সে তো প্রথম প্রথম খুব ভালো ছিল।
প্রেমের শুরু আর শেষ একই রকম নয়। স্বামী যেমন আপনার আপন। তেমনি তার বাবা-মা, ভাই-বোনকেও আপন ভাবতে হবে।
বাইরে থেকে আসার সাথে সাথে ভাইকে সালাম দিন। সালামের মূল অর্থ দোয়া। এতে সে ভাববে আপনি তাকে অনেক শ্রদ্ধা করেন।
নেতিবাচক কথা এড়িয়ে চলুন। তার পছন্দকে গুরুত্ব দিন।
কৃতজ্ঞ থাকুন।
সবুর করুন।
তুলনা করবেন না।
নিজের মধ্যে যা আছে, তা নিয়ে খুশি থাকুন।
অন্যের ভালো কিছুর সাথে নিজের তুলনা না করা। আপনার যা আছে, অন্যের কাছে তা স্বপ্নের মতো। তাই নিজের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করুন।
সোহানা ইশারাই তাকে চা খেতে বলে নিজেও চায়ের কাপে চুমুক দেয়।
সোহানা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমার শাশুড়ির কথা। তিনি কতো ভালো। বউমা গল্প করছেন আর তাকে চা এনে দিলেন।
না, মানে।
আপনার চিন্তা সঠিক। সত্যিই আমার শাশুড়ি ভালো। এই যে আপনি চলে যাবেন।
হুম।
আমি সন্ধ্যার সব কাজ সেরে নিজেকে সুন্দর করে সাজাব। যেন সদ্য বিবাহিত নারী। আমার শাশুড়ির সাথে একটু টিভি দেখব। শুধু টিভি দেখার উদ্দেশে তার কাছে বসা নয়।
তবে?
তার জীবনের গল্প শুনব। তারপর আমার নরম হাতে তার পা টিপে দেব। তার সাথে মিশে যাব। সৃষ্টির শুরুতে মাটি আর মানুষ মিশে একাকার ছিল। আমি তার পায়ে হাত রাখব। তিনি আমার মাথায় হাত রাখবেন। এর চেয়ে সুন্দর সম্পর্ক আর হয় না। আমি যখন তার কাছে বার বার আবেগ নিয়ে হাজির হব। তিনি বিবেকের সাথে ভাববেন।
পুরুষ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই কঠিন। আর এই কঠিন কাজটাই একজন নারী যুগের পর যুগ করে থাকেন।
যদি আপনি তাকে হ্যাপি রাখতে পারেন, তবে তরকারিতে লবণ কম হওয়া, খাবারে কম পড়া এসব নিয়ে সে মাথা ঘামাবে না। এতো সময় কই তার।
তার মন এবং মর্জি আপনাকে বুঝতে হবে। সে কীসে সুখ অনুভব করে। সেটা চিহ্নিত করতে হবে। তার সুখকে প্রাধান্য দিতে হবে।