প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে বিব্রত সরকার


২৫ জুন ২০২৬ ১০:০৪

স্টাফ রিপোর্টার : স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ। বাড়ি প্রধানমন্ত্রীর এলাকা বগুড়ায়। অত্যন্ত প্রভাবশালী তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার তিনি মন্ত্রণালয়েও বেশ প্রভাব খাটান। মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিদ্ধান্ত পাল্টে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি যে প্রভাবশালী, তা একটি সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে বলেছেন। সম্প্রতি একের পর এক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন তিনি। তার নিজ জেলা বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায় নবগঠিত চারটি ইউনিয়নের মধ্যে চারটির নামকরণ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। নামগুলো স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের দুই ছেলে ও তার পৈতৃক বাড়ি ও এক প্রবাসী ভাজিতির নামে করায় এ সমালোচনা চলছে। এ নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘এটা মিরাকল।’ তবে প্রশাসন বলছে, ‘গঠিত কমিটি গণশুনানি শেষে জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করলে গেজেট প্রকাশ হয়।’ অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় তীব্র সমালোচনার পর দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করতে জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তার নানা কাণ্ডে বিব্রতবোধ করছে সরকারের শীর্ষমহল।
দুই সন্তান, ভাজিতি ও নিজের বংশের নামে ৪টি ইউনিয়নের নামকরণের পর নিজের নামে একটি স্কুলের নামকরণের প্রস্তাব করে সমালোচনার মুখে পড়েন এই প্রতিমন্ত্রী। এবার আলোচিত এই প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে গ্রেফতার করা হয়েছে স্থানীয় ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে (৪০)। তাকে গাজীপুর জেলার গাছা থানার বোর্ড বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত এই সাংবাদিককে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অবশ্য আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন। পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারের পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। এর জেরে গত ১৫ জুন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এবং ‘দি নিউ নেশন’ পত্রিকার উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি তানভীর আলম রিমন বাদী হয়ে বগুড়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। মামলার আরজিতে পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশকসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়।
এদিকে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে একটি বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাব অনুযায়ী, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নতুন নাম রাখা হতে পারে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ (বেসরকারি মাধ্যমিক শাখা-১) গত ৯ জুন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো চিঠিতে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও মতামত দিতে নির্দেশ দেয়। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শন করে নাম পরিবর্তনের যৌক্তিকতা যাচাই করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রমজান আলী তদন্ত শেষে নাম পরিবর্তনের পক্ষে সুপারিশ করে ১৭ জুন প্রতিবেদন জমা দেন। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি স্থানীয়দের জমির ওপর গড়ে ওঠে। তবে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি স্থানীয় অনেকের কাছে অজানা। কেউ কেউ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অবশ্য পরে সমালোচনার মুখে নাম পরিবর্তন না করতে সংশ্লিষ্ট দফতরে ডিও লেটার পাঠান প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে প্রতিমন্ত্রীর নিজ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় ‘মীরবাড়ী’ নামে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় গঠিত নতুন তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ এবং ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের দুই ছেলে ও পৈতৃক বাড়ির নামে তিন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। স্থানীয় এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, শুধু ছেলেদের নামে নয়, লন্ডনে থাকা ভাতিজির নামেও ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজিকে স্বর্ণ বলে ডাকা হয়। তাই তার নামানুসারে মোকামতলায় ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন নামকরণ হয়েছে। অর্থাৎ চার ইউনিয়নের দুটি ছেলের নামে, একটি ভাতিজির নামে আরেকটি নিজ বংশের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম তার পৈতৃক বাসভবন ‘মীরবাড়ীর’ নামে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করেছেন। অন্যদিকে তার দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে মোকামতলা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়। স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলার সাবেক আটমুল ইউনিয়নের বেতগাড়ী গ্রামে। তাদের বংশের নাম ‘মীর’। এই বংশের নামে তাদের পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ী’। এজন্য নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে মীরবাড়ীর নামে।