ইসলামোফোবিয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামই ফ্রান্সের দ্রুত অগ্রসরমান ধর্ম
২৫ জুন ২০২৬ ১০:২০
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
মুসলিমরা স্পেন জয় করে আমিরাত প্রতিষ্ঠা করার পর বর্তমান ফ্রান্সের কয়েকটি অঞ্চল জয় করলেও সেখানে ইসলামী শাসন স্থায়ী হয়নি। ৯ম শতাব্দীর পর থেকে মুসলিমরা দক্ষিণ ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি অঞ্চল জয় করে ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ফ্র্যাক্সিনেটে আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে। এরপর কিছু মুসলিম ছাড়া ৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তারা মুসলিম অঞ্চলে চলে যায়। ১৬০৯-১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে স্পেন থেকে হেনরি ল্যাপেয়ারের গবেষণামতে প্রায় ৫০,০০০ মরিস্কো ফ্রান্সে প্রবেশ করেছিল। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে যুদ্ধ করেন মুসলমানরা। যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন অগণিত মুসলিম। গাজী মুসলমানরা প্যারিসে প্রতিষ্ঠা করেন ‘Grande Mosquee de Paris’ ‘প্যারিস বড় মসজিদ’। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি, সেখানে প্রায় ১ কোটি মুসলমান। যদিও ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের একটি বিশেষ আইনে ফরাসি প্রজাতন্ত্র জাতি বা তাদের বিশ্বাসের বিষয়ে নাগরিকদের মধ্যে পার্থক্য করে আদমশুমারি সম্পাদন নিষিদ্ধ করে। তবে INED-এর মতো পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলো CNIL এবং জাতীয় কাউন্সিল দ্বারা অনুমোদন পেলে পৃথক করতে পারে। ধর্মীয় ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে মুসলিমরা দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী হলেও ফরাসি সরকার আজ মুসলিম নিধনে তৎপর।
ফরাসি কাউন্সিল অব দ্য মুসলিম ফেইথ : ফ্রান্স একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও ২০০২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাস সারকোজি ‘ফরাসি কাউন্সিল অব মুসলিম ফেইথ’ (Conseil Francais du Culte Musulman) গঠনের সূচনা করেন। CFCM অনানুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সরকার কর্তৃক স্বীকৃত একটি বেসরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ফরাসি কাউন্সিল অব মুসলিম ফেইথ (CFCM) দ্বারা মুসলিমদের দুটি প্রধান সংগঠন স্বীকৃত। একটি হলো, ফেডারেশন অব দ্য ফ্রেঞ্চ মুসলিম (Federation des musulmans de France), অপরটি ইউনিয়ন দ্য ইসলামিকস ডি ফ্রান্স (UOIF)। তবে মুসলমানরা তাদের অধিকার রক্ষায় ফ্রান্সে কমপক্ষে একটি ইসলামী সংগঠনকে সরকারি করার দাবি করলেও সেটি মানেনি সরকার।
ফ্রান্সে ইসলামোফোবিয়া : ইউরোপে Islamophobia and Anti Muslim Hate crime চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় সমসাময়িক আলোচিত নির্যাতনের দেশ ফ্রান্স। ইউরোপীয় মনিটরিং সেন্টার অন রেসিজম অ্যান্ড জেনোফোবিয়ার রিপোর্টে ইসলামফোবিয়ায় ফ্রান্সে মুসলিম কবর ধ্বংস ও ভাঙচুরের ঘটনা উঠে আসছে। আররাসের কাছে ১৪৮টি ফরাসি মুসলিম কবরের পবিত্রতা নষ্ট করা হয়েছে। কিছু কবরে ইসলাম ও মুসলমানদের অবমাননাকারী অশ্লীল শব্দ দাগানোর খবরও উঠে আসছে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ইসলামবিদ্বেষী একব্যক্তি প্যারিসের ক্রেটেইলে একটি মসজিদ থেকে বের হওয়া মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। লে প্যারিসিয়েন দাবি করেছিলেন যে, এই হামলাকারী আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত এবং সে বাটাক্লান চ্যাম্পস-এলিসিস হামলার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। সিসিআইএফের মতে, ইসলামোফোবিক আক্রমণ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ৪৪৬ থেকে বেড়ে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ৬৭৬ হয়েছে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলিমবিরোধী ঘটনা ৫৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ফরাসি সংবাদপত্র লিবারেশন ঘোষণা করেছে যে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক মুসলিমদের বিরুদ্ধে রেকর্ডকৃত ইসলামোফোবিয়া কর্মকাণ্ড ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে বৃদ্ধি পেয়েছিল তবে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। অন্যদিকে ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে যে সমস্ত ইউরোপীয়দের মধ্যে ৭২% ফরাসিরা মুসলিম সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে অনুকূলভাবে দেখেছে। তবে, ফরাসি কাউন্সিল অব দ্য মুসলিম ফেইথ বলেছে যে এই পরিসংখ্যানে বাস্তবতার প্রতিফলন হয়নি।
ক্র্যাকডাউন : ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে শার্লি হেবদোর গুলিবর্ষণের পর পর ফ্রান্সের ২৬টি মসজিদ আক্রমণের শিকার হয় এবং তিনটি মসজিদ বন্ধ করে দেয় ফরাসি সরকার। বন্ধ মসজিদ তিনটি ল্যাগনি-সুর-মারনে, লিয়ন ও জেনিভিলিয়ার্সে অবস্থিত ছিল। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানায় যে, আরো ২০টি মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয়কারী গিলস ডি কেরচোভ অনুমানের ভিত্তিতে বলেন যে, বর্তমান ফ্রান্সের নিরাপত্তা হুমকি ১৭,০০০ মুসলিম। আর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রেনোবলের কর্তৃপক্ষ আল-কাওসার মসজিদটি ‘ইসলামপন্থী মতাদর্শ’ প্রচার করার অভিযোগে ছয় মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণার পর মুসলিমদের আরো প্রায় ১৫টি ক্যাফে, স্কুল ও মসজিদ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ২০২০ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফ্রান্সের ইসলামবাদীদের বিরুদ্ধে একটি ক্র্যাকডাউন ঘোষণা করে বলেছিলেন যে, এই উদ্দেশ্য নিয়ে একটি বিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে পার্লামেন্টে পাঠানো হবে। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিদেশি ইমাম, হোম স্কুলিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামকে মোকাবিলায় একটি ‘ইসলামোলজি ইনস্টিটিউট’ তৈরি করা। এছাড়া তার সরকার একটি বিল উত্থাপন করেছে, যা প্রচলিত ধর্মীয় বিবাহের জন্য কুমারিত্বের প্রশংসাপত্র প্রদানকারী যেকোন ডাক্তারকে জেলের শাস্তি এবং জরিমানা করবে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের এহেন ইসলামবিদ্বেষমূলক কার্যক্রমে মুসলিমরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
নাগরিক বৈষম্য : এক জরিপে দেখা গেছে, ‘যে সকল মুসলিম চাকরির আশায় জীবনবৃত্তান্ত পাঠিয়েছেন তারা খ্রিস্টানদের তুলনায় ২.৫ গুণ কম সুযোগ পেয়েছেন’। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে একজন আলজেরীয় মুসলিম মহিলা নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানে ইসলামী কারণে একজন কর্মকর্তার সাথে করমর্দন না করায় কর্মকর্তা তার নাগরিকত্বের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক রিসার্চ (IFOP) ২৯ আগস্ট থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ বা তার বেশি বয়সী ১০০৭ জন মুসলমানের ওপর ভিত্তি করে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এই গবেষণামতে মুসলমানরা মনে করেন যে, তারা ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার। অন্যদিকে ফরাসি দৈনিক ল্য মোঁদ দ্বারা প্রকাশিত ২০১৩ সালের একটি আইপিএসওএস সমীক্ষা ইঙ্গিত করে যে, ফরাসি উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ২৬% বিশ্বাস করেন, যে ইসলাম ফরাসি সমাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলামিক হিজাব নিষিদ্ধ : ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে ইসলামী হেড স্কার্ফ পরা তিনজন মুসলিম ছাত্রীকে উত্তর প্যারিসের গ্যাব্রিয়েল-হাভেজ কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামী পর্দা নিষিদ্ধ করার জন্য প্রধান শিক্ষকদের নিকট সুপারিশ পাঠায়। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপের বৃহত্তম ক্রীড়া খুচরা বিক্রেতা ডেকাথলন ফ্রান্সে তাদের দোকানে একটি স্পোর্টস হিজাব বিক্রি শুরু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। কিন্তু ডেকাথলন স্পোর্টস হিজাব বিক্রি করতে সরকার থেকে বাধাগ্রস্ত হয়। তবে ইনস্টিটিউট অব লেবার ইকোনমিক্সের ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের সমীক্ষা অনুসারে, ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের পরে জন্মগ্রহণকারী মুসলিম মেয়ে ১৯৯৪ বিধিনিষেধ চালু হওয়ার পরে হাইস্কুল থেকে স্নাতক হয়েছে। অন্যদিকে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে বলেন যে, দৃশ্যমান ধর্মীয় চিহ্ন পরিধান নিষিদ্ধ করা উচিত। পরে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চে আইনটি সংসদে অনুমোদিত হয়। এই আইন দ্বারা নিষিদ্ধ আইটেমগুলোর মধ্যে রয়েছে মুসলিম হিজাব, ইহুদি ইয়ারমুলকস বা বড় খ্রিস্টান ক্রস। তবে মুসলিমদের সাথে বৈষম্য করে অন্যান্য ধর্মের প্রতীক; যেমন : ছোট ক্রস, দায়ুদের তারকা বা ফাতিমার হাতপরা এখনো অনুমোদিত। তখন ইরাকে কর্মরত দুইজন ফরাসি সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ান চেসনোট এবং জর্জেস মালব্রুনটকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ‘ইসলামিক আর্মি ইন ইরাক’ গ্রেফতার করে এবং মাথার স্কার্ফের আইন প্রত্যাহারে ফরাসি সরকারকে চাপ দেয়।
মুসলিম সংগঠন : ফ্রান্সে কিছু মুসলিম সংগঠন রয়েছে। তাদের কার্যক্রম হলো, হোমওয়ার্কে সাহায্য, আরবি ভাষার ক্লাস, পিং পং, ইসলামী আলোচনা ইত্যাদি। ফ্রান্সে মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান হলো সিএফসিএম (Conseil Français du Culte Musulman)। সিএফসিএমের লক্ষ্য হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা এবং ফরাসি মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনকে সংগঠিত করা। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের আরএমএফ (Rassemblement des musulmans de France) নামে একটি নতুন কাউন্সিল নির্বাচিত হয়। এটি একটি ব্যাপক বিস্তৃত তরুণ সংগঠন। যদিও ফ্রান্সসহ ইউরোপের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ হলো মুসলিমদের প্রায় ৭৫% যুবক। আরেকটি সংগঠন পিসিএম (PCM), এটি রাজনৈতিক সংহতি, আধ্যাত্মিকতা এবং ফরাসি সমাজে মুসলিমদের একত্রীকরণে জোর দেয়। তবে সংগঠনসহ ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় অসহযোগিতা পায়।
ইসলামিস্ট সেপারেটিজম : ফ্রান্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘কোন ইসলামিস্ট ফ্রান্সের শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না।’ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ব্যাপক সমালোচনার পরও GC ‘ইসলামিস্ট সেপারেটিজম’ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বেশ কয়েকজন মুসলিম নেতা ও ইমামকে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও মসজিদের ইমামদের হেনস্তা করতে ইতোমধ্যেই চালু করেছে চার্টার অব রিপাবলিকান ভ্যালুস (Charter of Republican Values)। এই নির্দেশপত্র অনুযায়ী প্রত্যেক ইমামকে এখন থেকে একটি অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেওয়া হবে। যাদের কাছে কার্ড থাকবে তারাই একমাত্র ইমাম হিসেবে কাজ করতে পারবেন। যেকোনো সময় কার্ডটি কেড়ে নেওয়ার অধিকার থাকবে রাষ্ট্রের। ‘দ্য কালেক্টিভ অ্যাগেইনস্ট ইসলামফোবিয়া ইন ফ্রান্স’ নামক একটি সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মারওয়ান মুহাম্মদ এক টুইট বার্তায় লিখেছেন ফ্রান্সে এখন মুসলিমদের সাথে যে অন্যায় হচ্ছে, তা নজিরবিহীন।
ক্যাথলিক ফ্রান্স বিদায়, স্বাগতম ইসলাম : ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি ‘ইসরাইল ন্যাশনাল নিউজে ‘Catholic France, Adieu; Welcome, Islam’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। যার সরল অনুবাদ, ‘ক্যাথলিক ফ্রান্স বিদায়, স্বাগতম ইসলাম। নিবন্ধটির সাবহেডিং ছিলো, ‘Minarets instead of church towers, muezzins instead of churchbells’ (চার্চ টাওয়ারের বদলে মসজিদের মিনার এবং চার্চ ঘণ্টার বদলে মুয়াজ্জিনের আজান।’ লেখক নিবন্ধটি শুরু করেন এভাবে- ফ্রান্সে গির্জার ঘণ্টাধ্বনির দিন কি শেষ? ইতোমধ্যেই ফ্রান্সে অন্তত ৬০টি ক্যাথলিক গির্জা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো মুসলমানরা কিনে মসজিদ রূপান্তরের কাজ করছে। অন্যদিকে সম্প্রতি ফ্রান্সের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম নেতা দালিল বুবাকিউর ফ্রান্সে দুই বছরে মসজিদের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার আশা করছেন। বর্তমানে ফ্রান্সে মসজিদের সংখ্যা প্রায় ২,২০০টি। দালিল বুবাকিউর ফ্রেঞ্চ মুসলিম কাউন্সিলেরও প্রেসিডেন্ট। ফরাসি ইউনিয়ন অব ইসলামিক অর্গানাইজেশনের বার্ষিক এক সম্মেলনে তিনি এটি ব্যক্ত করেন। গ্রেট মস্ক অব প্যারিস বা প্যারিসের বড় মসজিদে প্রতিনিয়ত ধর্মান্তরিতদের জন্য অনুষ্ঠান করতে হয়, যা প্রমাণ করে দেশটিতে প্রতিকূলতার মধ্যেও মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া ফ্রান্সে ২০১৪-২০১৬ সালে সর্বকালের রেকর্ড সংখ্যক আসা শরণার্থীর অধিকাংশ ছিলেন মুসলিম।
ফ্রান্সে সর্ববৃহৎ কনফারেন্স : আরবি আল খালিজ এপ্রিল ২০১৮ ‘ফ্রান্সে সর্ববৃহৎ ধর্মীয় কনফারেন্স ৩৪তম আয়োজন’ নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদন করেছে, যা ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে থেকে নিয়মিত হয়ে আসছে। তিনদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রসিদ্ধ ইসলামিক স্কলার, গবেষক, মুসলিম সমাজবিজ্ঞানীরা উপস্থিত হন। বর্তমান বিশ্বের নামকরা মুসলিম দার্শনিক ড. তারেক রামাদান জেলে থাকায় শুধু সেবার উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাছাড়া সুদানের ড. বশির, অল ইউরোপিয়ান মুসলিম কমিউনিটির চেয়ারম্যান এবং ফ্রান্সের মুসলিম শিক্ষাবিদ আহমদ জাবাল্লাহসহ বহু সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক উপস্থিত ছিলেন। প্রায় দুই লক্ষাধিক মুসলিমদের উপস্থিতি ছিলো এই কনফারেন্সে। ‘বিজ্ঞানের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামই ফ্রান্সের দ্রুত অগ্রসর ধর্ম।’ মুসলিমদের এ ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কনফারেন্সটিতে আলোচনা হয়।
শার্লি হেবদো : ৭ জানুয়ারি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে, দুইজন লোক শার্লি হেবদোর দপ্তরে অতর্কিতভাবে ঢুকে গুলি চালাতে শুরু করে। সাময়িকীর সম্পাদক স্তেফানি শার্বনিয়ার যিনি শার্ব নামে বেশি পরিচিত ছিলেন, তিনি এবং আরও চারজন কার্টুন শিল্পী মারা যান। বাকি নিহতেদের মধ্যে ছিলেন দুজন কলাম লেখক, একজন কপি এডিটর, একজন অতিথি যিনি একটি বৈঠকে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছিলেন এবং অফিসের কেয়ারটেকার। সম্পাদকের দেহরক্ষী এবং একজন পুলিশ অফিসারও ঘটনায় নিহত হন। অভিযোগ করা হয় এই দুইজন হলেন দুই ভাই সাঈদ এবং শেরীফ কুয়াচি। একই সময়ে প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে আরেকটি কুয়াচি ভ্রাতৃদ্বয়ের পরিচিত আমেদী কুলিবালি নামে এক ব্যক্তি একটি সুপার মার্কেটে কয়েকজন ব্যক্তিকে পণবন্দী করে। পরে পুলিশ ওই দুই ভাইকে দ্রুত হত্যা করে এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে বিচার না করে সমস্ত মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালায়, যা বিশ্ব মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। শার্লি হেবদো প্রথাবিরোধী ব্যঙ্গ কার্টুন প্রকাশ করে থাকে। ইতোমধ্যে তারা কয়েকবার মুহাম্মদ সা. এর ব্যঙ্গাত্মক কার্টুনও প্রকাশ করেছে। সাময়িকীর পরিচালনা সম্পাদক জেরার্ড বায়ার্ড বিবিসিকে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে বলেন, আবার ম্যাগাজিনটির বিতর্ক সৃষ্টি ধারা নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
শার্লি হেবদো আক্রমণ পরবর্তী ইসলাম : এম সি ইনস্টিটিউট, ফ্রান্স-এর প্রিন্সিপাল বদরুল বিন হারুন তার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের শার্লি হেবদো আক্রমণের গোটা বিশ্ব কেঁপে ওঠে। ফ্রান্সের অন্যতম চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘INSTITUT MONTAIGNE’ তাদের ‘A FRENCH ISLAM IS POSSIBLE’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- শার্লি হেবদো আক্রমণ পরবর্তী যে সমস্ত পরিবর্তন হয়েছিল তা প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ-এর বিশেষ সহযোগী, কলামিস্ট ও সাংবাদিক হাকিম আল কারভীর ভাষায়- ১. ফরাসি মুসলমানদের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাদের সম্পত্তির হার তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলমান ব্যবসায়ীরা ফ্রান্সের টপ ধনীদের তালিকায় ঢুকে গেছে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের হার ফ্রান্সে সর্বকালের রেকর্ড ব্রেক। ২. ইসলাম শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩. ফ্রান্সের শেষ দশ বছরে ইসলামী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি লাভ করেছে।
ফরাসি সরকার আজ মুসলিম নিধনে তৎপর যদিও আজকের ফ্রান্স তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নয়নে মুসলিমদের অবদান অনস্বীকার্য। যে সত্য এইচ এইচ আর প্রিন্স চার্লস ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ অক্টোবর Oxford এর Scheldonian Theatre-এ অনুষ্ঠিত Islam and the West শীর্ষক সেমিনারে বলেন, ‘পশ্চিমে ইসলামের সম্পর্কে যে ভুল ধারণা আছে তা নয়, বরং আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিনির্মাণে ইসলাম কী কার্যকর ভূমিকা রেখেছে সে সম্পর্কেও আমরা বেখবর। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক হুসাইন ওবামাও ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তব্যে মুসলিম সভ্যতার অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকায় স্পেন অথবা মিশরের কর্ডোভা বা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমৃদ্ধ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। ইউরোপের পুনর্জাগরণে এবং আলোকিত হওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে এই ইসলামী সভ্যতা।’ আর তৎকালীন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, বরিস জনসন বলেন, ‘ট্রাফালগার শব্দটি আরবি। পশ্চিম স্পেনের তারাফ আল-ঘার বন্দরে নেলসন ১৮০৫ সালে ফরাসি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্কয়ারের নাম আরবি। সেটি প্রমাণ করে, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ইসলামের কাছে ঋণী।’ তিনি আরো বলেন, আমার পরদাদা ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ লন্ডনে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম এবং কুরআনের হাফিজ।’ এ প্রসঙ্গে মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের সেক্রেটারি জেনারেল ডক্টর আবদুল বারি বলেন, ‘মুসলিমরা ইউরোপের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। তারা এর উন্নতি, প্রতিরক্ষা এবং মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের সুরক্ষা করে আসছে। আজকের ইউরোপ তাদের সে প্রচেষ্টারই ফল। Professor Salim T S Al Hasani, Muslim Heritage in Our World প্রসঙ্গে লেখেন, ‘অতীতের মুসলিম ব্যক্তিত্বরা- যার মধ্যে আছেন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, রসায়নবিদ, চিকিৎসাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, স্থাপত্যবিদ, অর্থনীতিবীদ, সমাজবিজ্ঞানী, শিল্পী এবং শিক্ষাবিদ- তারা সমাজ ও মানবতার প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ফ্রান্স, ইউরোপ তথা বিশ্বকে ঋণী করেছেন। সুতরাং সময় এসেছে ফ্রান্সে মুসলিম নিধন বন্ধ করে মুসলিমদের ঋণ পরিশোধের।
তথ্যসূত্র : France- Islam/Sheikh Dr Yasir Qadhi and Marwan Muhammad, ইউরোপে ইসলাম, Barack Obama, Cairo University-2009, Muslim Heritage in Our World by Professor Salim TS Al Hasani, BBC
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com