বাজেট অধিবেশন

সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে বিতর্ক-উত্তেজনা


২৫ জুন ২০২৬ ১০:০৮

স্টাফ রিপোর্টার : এবারের বাজেট অধিবেশনে বাজেট ছাড়াও নানা বিষয়ে কথা ওঠে। সংসদ সদস্যদের কোনো কোনো কথায় বিতর্ক ছড়ায়, ছাড়ায় উত্তাপও। জাতীয় সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই- এমন ব্যক্তিকে নিয়ে কথা বলা বিধান না থাকলেও বিএনপি একজন সংসদ সদস্য সে বিষয়ে কথা বলেন, ফলে বিতর্ক ছড়ায়। পরে এ বিষয় নিয়ে রাজপথও উত্তপ্ত হয়। অন্যদিকে প্রাধানমন্ত্রী অসত্য তথ্য দিয়ে কথা বলেছেন, এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদ এমন বক্তব্য দিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে প্রতিবাদ করেন- এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী সংসদে না থাকায় অনেক মন্ত্রী অধিবেশনে আসেনি, মন্ত্রীদের বেঞ্চ খালি থাকায় জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ প্রেক্ষিতে চিফ হুইপ নানা অজুহাত তুলে ধরলেও স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মন্ত্রীদের বাইরে কাজ থাকলেও অধিবেশনে উপস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেট অধিবেশনে খালি মন্ত্রিসভা বেঞ্চ, উদ্বেগ স্পিকারের
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলের এক সংসদ সদস্য। এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও বেশি উপস্থিতি দেখতে চান বলে মন্তব্য করেছেন। গত ২২ জুন সোমবার স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপন করেন বিরোধীদলের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। সাইফুল আলম খান বলেন, বাজেট অধিবেশনে অধিকাংশ সময় অনেক মন্ত্রীকে সংসদে দেখা যায় না। সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা অনেক সময় উপস্থিত থাকেন না। তিনি এ বিষয়ে স্পিকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। জবাবে স্পিকার বলেন, বাজেট অধিবেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। অর্থমন্ত্রী উপস্থিত থাকলেও অন্য মন্ত্রীদেরও সংসদে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। তিনি মন্ত্রীদের প্রতি অধিবেশনে আরও বেশি অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকেন। তবে সংসদে তাদের উপস্থিত থাকা উচিত। তিনি বলেন, বাজেট-সংক্রান্ত আলোচনায় অর্থমন্ত্রী নিয়মিত উপস্থিত থাকেন এবং বিভিন্ন খাত সম্পর্কিত প্রশ্ন ও আলোচনার জবাব দিয়ে থাকেন। এ সময় টাঙ্গাইল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির সমালোচনা করার আগে বিরোধীদলের সদস্যদেরও নিজেদের উপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধীদলের নেতা ও উপনেতাও অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার বলেন, বিরোধী দলের নেতা উপস্থিত না থাকলেও মন্ত্রীদের উপস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংসদ সদস্যরা তাদের এলাকার সমস্যা ও বিভিন্ন বিষয় মন্ত্রীদের কাছেই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংসদের কার্যকারিতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে সরকারি ও বিরোধী সব পক্ষের সদস্যদের উপস্থিতি কাম্য।
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে হান্নান মাসউদের বক্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য (এমপি) আব্দুল হান্নান মাসউদের দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদ। হান্নান মাসউদ বলেন, বাজেটের ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। তার প্রমাণ একদিন পরেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আজকে সংসদে নেই। উনি (প্রধানমন্ত্রী) যখন বিভিন্ন ভাষণে গিয়ে অসত্য তথ্য দিয়ে বলেন, বিরোধীদল বাজেট নিয়ে মিছিল করছে। এর কারণ আমরা কেন মদ, সিগারেটের দাম বৃদ্ধি করেছি। প্রধানমন্ত্রী যখন অসত্য তথ্য দিয়ে কথা বলেন, তখন আমরা খুবই আশাহত হই। এ নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের সদস্যদের পাল্টাপাল্টি যুক্তিতে তৈরি হয় হট্টগোল। গত ২১ জুন রোববার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১১তম দিনে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদে যখন আমরা ঋণ নিয়ে কথা বলতে যাই, ইসলামী ব্যাংকের দখল নিয়ে কথা বলতে যাই, তখন প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে যখন বলেন, আপনারা সবাই জমিদার যারা ঋণ নেন নাই। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মূলত ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করেন। আমরা এ ধরনের সংসদ আর চাই না। এরপরেই সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারি দল ও বিরোধীদল হান্নান মাসউদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে কথা বলেন। সংসদে কথা বলার জন্য হান্নান মাসউদ পুনরায় ফ্লোর চান। একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এটি শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।’ এ সময় সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ বারবার দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার তাকে সতর্ক করে বলেন, ‘আপনার সময় শেষ। এভাবে যখন খুশি তখন দাঁড়ানো সংসদের রীতি নয়। প্লিজ টেক ইয়োর সিট। এটা শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।’ এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘হান্নান মাসউদ সংসদ নেতার ব্যাপারে কিছু কথা বলেছেন। আমি অনুরোধ করবো, বাইরের বিষয় টেনে এনে এখানে এক্সপাঞ্জ বা বক্তব্য দেওয়া যেন অ্যালাউ না করা হয়। সংসদের ভেতরে সংসদীয় নর্মস থাকা উচিত। সত্য-অসত্যের এই ঝগড়ায় গেলে হয়তো অনেক কিছু লজ্জাজনক হয়ে যাবে। তাই পুরো বিষয়টি ইগনোর করাই আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে।’ ‘মাননীয় সংসদ সদস্য আপনি বসুন, এটা শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ’ ডেপুটি স্পিকারের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, মাননীয় স্পিকার আমরা শাহবাগ থেকেই উঠে এসেছি।
বাকি কথা টকশোতে বলবেন
নিলুফার চৌধুরী মনিকে স্পিকার দুই মিনিট সময় বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, দুই মিনিটে কথা শেষ করুন, বাকি কথা টকশোতে গিয়ে বলবেন। স্পিকারের এমন মন্তব্যে সংসদে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
মামুনুল হককে নিয়ে সংসদে দেওয়া বক্তব্য, রাজপথে কর্মসূচি, পরে এক্সপাঞ্জ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর ও ১১ দলীয় জোটে অন্যতম শীর্ষনেতা মামুনুল হককে নিয়ে দেওয়া বিএনপির সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাকের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছে জাতীয় সংসদ। একইসঙ্গে সেই সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার প্রসঙ্গে যে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, সেটিও এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে। গত ২২ জুন সোমবার বাজেট অধিবেশন শুরুর পর এ নিয়ে কথা বলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি এ সময় বলেন, ‘গত ১৯ জুন ঢাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবু আশফাক হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক সম্পর্কে কথিত পরকীয়া সম্পর্কে দুয়েকটি মন্তব্য করেছেন, যেটি অনভিপ্রেত। যেহেতু যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত। সেজন্য আবু আশফাক সাহেবের মন্তব্য আমি এক্সপাঞ্জ করেছি’। স্পিকার বলেন, ‘সাথে সাথে আমারও একটি বক্তব্য আমি সেখানে উল্লেখ করেছিলাম কোনো ব্যক্তির জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে আমার বক্তব্য এসেছিল। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় সম্পর্কিত সেই বক্তব্যও এক্সপাঞ্জ করা হলো’। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আপনারা সবাই সচেতন থাকবেন। যার পক্ষে এখানে এসে নিজেকে ডিফেন্ড করা সম্ভব নয়, তার উদ্দেশে কোনো বিরূপ মন্তব্য আপনারা করবেন নাÑ এটাই আশা করি’। মামুনুল হকের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কথা উঠলে বিরোধীদলীয় উপনেতা সেটির বিরোধিতা করেন। পরে এ নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভও প্রদর্শিত হয়। একপর্যায়ে সংসদের কার্যবিবরণীতে থেকে সেই আলোচনা এক্সপাঞ্জ করা হয়।
বাজেট অধিবেশনে শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। তিনি বলেছেন, সংসদ অধিবেশনের চেয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুজব নিয়ে সময় ব্যয় করা উচিত নয়। অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, এটি সংসদের শৃঙ্খলা ও ডিসেন্সির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৩তম দিন গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালে সংসদে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ও সংসদ কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্পিকার এবং বিরোধীদলীয় নেতা। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধিতা না করে বাজেট বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা উচিত। একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, শেখ হাসিনা ফিরলে জুলাই আন্দোলনে প্রোফাইল লালকারীদের জীবন কালো করে ছাড়বে।
অপরদিকে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি ও দলীয়করণ। তারা জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হবে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও সুরক্ষার বিষয় বিবেচনা করা হবে।
মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বন্ধ
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, আয়নাঘরসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে ঐকমত্য থাকা উচিত। তিনি বলেন, বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে দেশ টেকসইভাবে এগোতে পারে না। সংসদ সদস্য আবু তালেব মণ্ডল বলেন, দুর্নীতি ও মাদক দেশের প্রধান সমস্যা। তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির তৃতীয় বৈঠক সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে কমিটির সভাপতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির এ বৈঠকে অধিবেশন ও আলোচনার সময় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৭ জুন শুরু হওয়া এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে। এই অধিবেশনে বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য ৪০ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি অধিবেশনে গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।