তর্ক-বিতর্ক : স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা
২১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:২১
আমারা আমাদের স্বাধীনতা দিবস পালন করি ২৬ মার্চ। এটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। কারণ হিসেবে দাবি করা হয় ২৬ মার্চের অতি প্রত্যুষে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার একটি তারবার্তা পিলখানা থেকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছিলো। তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, ২৫ মার্চ সকালে পাকিস্তানের ২২ ব্যালুচ রেজি: পিলখানা ও ওয়ারলেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কাজেই এ তথ্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া ২৩ মার্চ ১৯৭১-এ অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কথা ভেবে শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করতে রাজি হননি যা আমরা মরহুম তাজউদ্দীনের মেয়ের বই থেকে জানতে পারি। একই কথা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও বলেছেন। ১৯৭১-এর নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এ বক্তৃতা দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন কিনা। জবাবে তিনি না সূচক উত্তর দেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক এন্থনী ম্যাসকারানাস তার বইয়ে উল্লেখ করেন যে, শেখ মুজিব যদি সত্যিই স্বাধীনতা চাইতেন; তাহলে তা ঘোষণা করা উচিত ছিল ৭ মার্চে। কারণ আর্মি ছিল সংখ্যায় খুবই অল্প। কাজেই তখন বিনা রক্তপাতে এদেশকে স্বাধীন করা যেত। অথচ ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা জয় পাকিস্তান বলে শেষ করেন। তার চোখের সামনে প্রতিদিন সৈন্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পশ্চিম থেকে এদেশে আসতে লাগলো ২৫ মার্চ পর্যন্ত। এ সময় তার নির্দেশে সবকিছু চলছিল। কিন্তু তিনি সৈন্য ও অস্ত্র খালাসের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দিলেন না। আর ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ পাকবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের আগে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ফাঁসিতে ঝুলবেন, তা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কয়েকটি দিবসের আলোচনা করে দেখা যাক। তারপর পাঠকই বিচার করবেন। দিবসগুলো নিয়ে আলোচনার আগে স্বাধীনতার অর্থ এবং এ দিবসটির তাৎপর্য জানা যাক। স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে যে, একটি রাষ্ট্রের অধিবাসী নিজ দেশের সার্বভৌম ক্ষমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে। আর স্বাধীনতা দিবস হচ্ছে; ওই স্বাধীনতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বা ১ম দিবস। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস পালন করে। কারণ ৪ জুলাই ১৭৭৬ সালে কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়। তেমনি পাকিস্তান ও ভারতে ১৪ এবং ১৫ আগস্ট ওহফরধহ ওহফবঢ়বহফবহপব অপঃ. কার্যকর হয়। ঐ দিবসগুলোয় দেশ দুটি স্বাধীনতা লাভ করে। এবার আমাদের প্রস্তাবিত দিবসগুলোর আলোচনা করা যাক।
২৭ মার্চ ১৯৭১: ঐ দিন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজের ও পরিবারের জীবনের মায়া উপেক্ষা করে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওই ঘোষণাটি অনেক মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জীবিত করেছিল। এ ঘোষণাকে আওয়ামী লীগ কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। কারণ এই দিনকে স্বীকার করার অর্থ হচ্ছে- তাদের ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার মিথ্যা বয়ানকে অস্বীকার করা।
১০ এপ্রিল ১৯৭১: ওই দিন নব গঠিত বাংলাদেশ সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করেন এবং প্রচার করেন। শেখ মুজিব নিজের ছাড়া অন্য কারো কৃতিত্ব মানতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাই এ দিবসটি আওয়ামী আমলে তেমন গুরুত্ব পায়নি। শেখ মুজিব তার জীবদ্দশায় স্বাধীনতার ঘোষণার স্থানটি কোনোদিন পরিদর্শন করতে যাননি।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: এই দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। যদিও আমাদের সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাস জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের বিজয়কে ছিনিয়ে নেয়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ও পরবর্তীতে সিমলা চুক্তিতে আমাদের কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল না।
মিত্র বাহিনী হিসেবে এসে তারা চরম বৈরী আচরণ করে। এদেশ থেকে তারা কোটি কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল ভারতীয় বাহিনীর লুটতরাজে বাধা দেওয়ার কারণে স্বাধীন দেশে প্রথম রাজবন্দী হন। এ স্বাধীনতাকে তিনি নামকরণ করেন ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা।’ আমরা শিয়ালের খপ্পর থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর নেকড়ের খপ্পরে পড়ে গেলাম। পিন্ডির গোলামির পরিবর্তে দিল্লির গোলামি হলো আমাদের নিয়তি, যা পূর্ণতা লাভ করেছে বিগত ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে। ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছিলেন যে, টু নেশন থিওরিকে বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের স্বাধীন সত্তাকে ও স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হলো। সম্প্রতি ভারতের নতুন পার্লামেন্ট ভবনে অখণ্ড ভারতের একটি ম্যাপ স্থাপিত হয়েছে- যাতে বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্ব নেই।
অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতায় তারা মোটেই বিশ্বাসী নয়। বিগত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আচরণে তাদের সেই চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রতিনিয়ত সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, আমাদের নদীগুলো পানিশূন্য করা, আর বর্ষায় আমাদের পানিতে ডুবিয়ে মারা, আমাদের ওপর খুন, গুম ও ক্রসফায়ারের ফ্যাসিবাদী সরকার চাপিয়ে দিয়ে অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, শিল্প, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেশকে দেউলিয়া রাষ্ট্রে পর্যবসিত করাই হচ্ছে একাত্তরের সেই বন্ধুবেশী রাষ্ট্র ভারতের আচরণ। এর উদ্দেশ্য ভারতের পার্লামেন্ট ভবনের ম্যাপেই প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা। সেভেন সিস্টার্সের নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারত বাংলাদেশকে বিষফোড়া বিবেচনা করে থাকে। কাজেই ১৬ ডিসেম্বর হচ্ছে ভারতের বিজয় দিবস আর আমাদের জন্য ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে পরাজয়ের সূচনা দিবস।
৫ আগস্ট ২০২৪: আমাদের জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। এরকম গণজাগরণ ব্রিটিশ, পাকিস্তান বা ৫৩ বছরের বাংলাদেশে দেখা যায়নি। এদিন ফ্যাসিবাদী শাসনের শুধু অবসান দিবস নয়, বরং ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে আমাদের জনতার স্বাধীনতা লাভের আত্মত্যাগের বহিঃপ্রকাশ। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, স্বাধীনতা দিবস অর্থ হচ্ছে একটি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম দিন, যা আমরা পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ক্ষেত্রে দেখতে পাই। এই দিনটি হচ্ছে কোনো জাতির জন্য সবচেয়ে আনন্দের দিন। কিন্তু ২৬ মার্চ? এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণা হয়নি, দেশও স্বাধীন হয়নি। দিবসটি হচ্ছে আমাদের জন্য আনন্দের নয়, বরং শোকের। এদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে আমাদের অগণিত মানুষ নিহত হয়। তেমনি ২৭ মার্চ ও ১০ এপ্রিল স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলেও আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারিনি। তেমনি ১৬ ডিসেম্বর এ দেশ ছিল ভারতীয় বাহিনীর অধীনে। কাজেই ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আমাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা দিবস হওয়া উচিত সার্বিক বিবেচনায় এবং ‘স্বাধীনতাবিরোধী’র সংজ্ঞাও নতুন করে নির্ধারণ করা উচিত। ভারত যেহেতু আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, কাজেই যারাই ভারতের সহযোগী বা সমর্থক হবে, তারাই আমাদের স্বাধীনতার শত্রু, তারাই স্বাধীনতাবিরোধী। বর্তমানে যেহেতু নানা সংস্কারের চিন্তাভাবনা চলছে, কাজেই স্বাধীনতা দিবসের সংস্কারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রমাণ করার জন্য ৫২-এর ভাষা আন্দোলর থেকে শুরু করে ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা সব ক্ষেত্রে মিথ্যা ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। এ মিথ্যাচার দূর হওয়া দরকার। ৫ আগস্ট হচ্ছে স্বাধীনতার সত্য ইতিহাস, যা দেশে দেশে, যুগে যুগে যেকোনো আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অনাগত মানবসভ্যতাকে উজ্জীবিত করবে। (মতামত লেখকের নিজস্ব। এতে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নেই। তাই মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।)
লেখক : মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।