আওয়ামী রাজনীতির পুনর্বাসনে বামরা!


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:১৫

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের দ্বারা প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যাত ও পলাতক হয়েছে। এখন এ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী রাজনীতির পুনর্বাসনের দায়িত্ব কি বামপন্থিরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে? যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগ জনসাধারণকে অবিরাম ভীতসন্ত্রস্ত রেখে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছিল, সেই শৃঙ্খল ২০২৪ সালের আগস্টে চূড়ান্তভাবে নিক্ষেপ করেছে সাধারণ জনতা। কিন্তু বছর গড়াতেই না গড়াতেই সেই পুরনো স্লোগান আবারো মৃদু স্বরে হলেও উচ্চারিত হতে শোনা যাচ্ছে। আর সেই স্লোগান ভর করেছে ক্ষমতাভোগী আওয়ামী লীগের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অবশিষ্ট থাকা ভারতীয় আশীর্বাদপুষ্ট বামপন্থিদের ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে তার কিছু আলামত প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।
বামদের দ্বিচারিতা
এদেশের বামপন্থিরা; বিশেষত সিপিবি-বাসদ-জাসদ নানা ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী নীতি গ্রহণের জন্য বিখ্যাত। ভারতীয় উপমহাদেশে এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে উদাহরণ হিসেবে দুয়েকটি নমুনা দেয়া হলো।
যেমন ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান দৃষ্টিগোচর হয় না। বরং নিজেদের ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও বাস্তবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করতে দেখা যায়। এটি প্রকটভাবে দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে মিত্রবাহিনী গঠিত হওয়ার পর। যেহেতু মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্ত হয়েছিল, সেই সূত্রে ভারতীয় কমিউনিস্টরা প্রবল সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশের প্রতি একাত্ম হতে তাদের বাধেনি। সেসময় প্রকাশ্যে অক্ষশক্তির বিরোধিতা করতে এবং মিত্রবাহিনীর প্রশংসা করতে শোনা যায়। যদিও সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ভারতের ‘আজাদী’র লড়াই ব্রিটিশের ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
নিজেদের ‘পাকিস্তানের বিরোধী’ হিসেবে গৌরবান্বিতবোধ করা এবং ইসলামপন্থিদের ‘পাকিস্তানপন্থি’ হিসেবে নিন্দিত করার কারিগর এ বামদের দ্বিচারিতার আরেকটি উদাহরণ দিই। পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য যখন জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন করছিল, তখন এ বামরাই জামায়াতে ইসলামীকে ‘পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে ১৯৬৯ সালে সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়েছিল। এ সংক্রান্ত সংবাদপত্রের বিবরণে উল্লেখ করা হয়, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পাঁচজন ছাত্র নেতা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ করেন। এক যুক্ত বিবৃতিতে ছাত্রনেতৃবৃন্দ বলেন, জামায়াতে ইসলামী এখনো পাকিস্তানের অস্তিত্বেরই বিরোধী। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা ধর্মের নামে ভিত্তিহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে ছাত্রনেতৃবৃন্দ দোষারোপ করেন এবং জামায়াতে ইসলামীর এ অপপ্রচার বন্ধের উপায় নির্দেশের জন্য সমমতাবলম্বীদের প্রতি আহ্বান জানান। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী অপর ৫ জন ছাত্রনেতা হলেন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) সভাপতি শামসুদ্দোহা ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম এবং ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) সভাপতি জামাল হায়দার ও সম্পাদক মাহবুব উল্লাহ। প্রকাশিত এ বিবৃতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বামপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা হলো পাকিস্তানের অস্তিত্বের পাহারাদার আর জামায়াত হচ্ছে পাকিস্তানের বিরোধী।
পরগাছা রাজনীতি
রাজনীতিতে ‘পরগাছা’ হয়ে কাজ করার আদর্শ উদাহরণ হলো এ বামরা। অন্য দলে অনুপ্রবেশ করে তাকে দিগভ্রান্ত করার অপকৌশল গ্রহণ করে টিকে থাকার চিরাচরিত অভ্যাস হলো এদের। পঞ্চাশের দশক থেকেই বিভিন্ন দলে অনুপ্রবেশ করে তারা তাদের মতাদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকার কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসে প্রচুর বিবরণ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান লিখেছেন, “যে সকল কমিউনিস্ট ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিল, দলের প্রেসিডেন্ট মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সহায়তায় দলে তাদের অবস্থান দৃঢ় করতে থাকে। ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলে কমিউনিস্ট ও তাদের অনুসারীরা মনে করলো যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা ভাসানীর সহানুভূতি পাবে। তাদের বিবেচনায় ভাসানী একটা ট্রোজান ঘোড়া। অতএব উক্ত ঘোড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। তখন ইপিসিবির সদস্যরা ব্যাপক হারে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেয় এবং আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে আরো বেশি বামপন্থি আদর্শ ঢুকিয়ে মাওলানা ভাসানীকে তাদের পক্ষে আনার জন্য ধীরে ধীরে কাজ করতে থাকে। একই সাথে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের জন্য তারা আওয়ামী মুসলিম লীগকে চাপও দেয়। সেজন্য ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে দলের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়।” সাতচল্লিশের পরপরই নবগঠিত রাষ্ট্রটিতে বিভেদ, অরাজকতা ও অনুপ্রবেশের মাধ্যমে রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বামপন্থিরা। বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ সৃষ্টি, পুলিশ হত্যা ইত্যাদি উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছিল তাদের কর্মসূচির অংশ।
পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পর্যন্ত দখল নিতে সক্ষম হন। তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে এ বামদের তৎকালীন শক্তিশালী অংশটি মুক্তিযুদ্ধকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখাপেক্ষী করতে সমর্থ হয়। বামপন্থি তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের সাথে সাত দফা গোপন চুক্তি করে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে ভারতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল করার আয়োজন করে ফেলেন।
আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে বামপন্থিদের অংশগ্রহণসহ একটি একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারকে প্ররোচিত করে। যার ফলে গঠিত হয় ‘বাকশাল’ এবং একই সঙ্গে অন্যসব দলের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়। এমনকি তাদের ইন্ধনে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।
কমিউনিস্টরা যে শেখ মুজিব ও বাকশালকে তাদের একান্ত ‘আপনার’ করে ভাবে, তা তাদের একজন তাত্ত্বিকের বক্তব্যে বোঝা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এ শিক্ষক তাঁর একটি বক্তব্যে (৯ জানুয়ারি ২০১৬) উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মহিরুহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৃতীয় বিশ্বের একজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে নিজেকে বিশ্ব অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।… তিনি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার জনক ছিলেন না, তিনি চেয়েছিলেন জনগণের মুক্তি; বিশেষ করে ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’।” তিনি বাকশাল সম্পর্কে বলেন, “যখন চরম দক্ষিণপন্থী (জামায়াত ও মুসলিম লীগ), বিভ্রান্ত বামপন্থী (জাসদ ও চীনপন্থী বাম) ও নিজ দলের বিশ্বাসঘাতকদের (মোশতাক ও তাঁর অনুসারীদের) চাপে তিনি সংকটে জর্জরিত এবং প্রায় দিশাহারা, তখন তিনি অনন্যোপায় হয়ে তাঁর মতো করে ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ ডাক দিয়েছিলেন। ‘বাকশাল’ বা ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”
তাদের কর্মকাণ্ড লক্ষ করলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করা যায়-
তারা কখনোই ভারতীয় আগ্রাসন সম্পর্কে কথা বলেনি। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ও প্রবল সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেনি। কিন্তু নিজ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করতে তিলকে তাল বানিয়ে চলেছে।
তাদের তথাকথিত প্রগতিবাদের তলোয়ার ইসলামী ঘরানার বিরুদ্ধেই সর্বদা উত্তোলিত থেকেছে। একদা সশস্ত্র সংগ্রামের ঝান্ডাধারীরা আজ অন্যদের উগ্রবাদী, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি বিশেষণ দিয়ে হাওয়ার ওপর গদা ঘুরায়।
তাদের কোনো কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়নি। কোনো জনকল্যাণমূলক কাজেও উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের সম্পৃক্ত দেখা যায় না।
তারা আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনে উচ্ছ্বসিত হয়েছে। কিন্তু আজকের সময়ে ইউক্রেনে রুশ হামলার প্রতিবাদ করেনি। ইউক্রেনে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী আচরণের নিন্দা পর্যন্ত করেনি।
আওয়ামী পুনর্বাসনের কাজ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া আওয়ামী আদর্শ ও চেতনাকে জিইয়ে রাখা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের কাজ হাতে নিয়েছে এ বামরা- এটি দিনে দিনে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় তার এজেন্ডা ধরে রাখার দায়িত্ব নিয়ে উপস্থিত হয়েছে বামপন্থিরা।
তাদের ভাবনা হলো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে অথবা ন্যূনপক্ষে বিরোধীদল হিসেবে না থাকলে বামদেরও রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাকবে না। এখন তারা এর-ওর কাঁধে সওয়ার হওয়ার চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত বক্তব্য প্রচার করে রাজনীতিতে ধোঁয়াশা তৈরি করতে চাচ্ছে। এ ধোঁয়াশা ও কুয়াশার মধ্যে আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিচরণ সহজ হবে বলে তাদের ধারণা।
অনেকেই মনে করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বিপুল পরিবর্তনকে মেনে নেয়া ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। তাই তারা এর পক্ষে মৃদুস্বরে কথা বলে এবং উচ্চৈঃস্বরে এর অনুষঙ্গগুলোর সমালোচনা করার কৌশল গ্রহণ করে। এর কিছু লক্ষণ পরিস্ফুট হতে দেখা যায়। যেমন- বামপন্থি দলগুলোর ‘জুলাই ঘোষণাপত্র অনুষ্ঠান’ বর্জন করা এর অন্যতম। একটি খবরে বলা হয়, বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্তর্ভুক্ত দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) অন্তর্বর্তী সরকার আয়োজিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে। তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ঘোষণাপত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি বলে তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সেই ‘ডাস্টবিন’ রাজনীতির পুনঃপ্রয়োগের চেষ্টা করে সিপিবির সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন। তারা অভ্যুত্থানের মূল শক্তিকে ‘পাকিস্তানপন্থি’ আখ্যা দিয়ে পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির পুনর্বাসনের অপচেষ্টা চালায়। এক বিশ্লেষক বলেন, “এরা হলো মুজিববাদের প্রক্সি-ফ্রন্ট। ‘তুমি জানি, আমি জানি, অমুক অমুক পাকিস্তানি’ স্লোগানটি ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার দালালদের পাকিস্তানফোবিক উগ্র জাতীয়তাবাদকেই সাবস্ক্রাইব করে, যা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এটা মিসলিডিং।” তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সবকিছুর পরিবর্তন হয়, শুধু এ সংগঠনের খাসলত পরিবর্তন হয় না, হবেও না।’
আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৫ আগস্ট মঙ্গলবার জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভকে অবজ্ঞা করা হয়। এ অভিযোগ ওঠে ছাত্র ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। সেদিন তারা স্মৃতিস্তম্ভে ফুল না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেয়। এ নিয়ে জাবি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক বিরূপ সমালোচনা হয়। অনেকেই বলেন, এর মধ্য দিয়ে তারা জুলাই-আগস্ট চেতনাকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করেছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের মুজিববাদী চেতনার পক্ষেই অবস্থান প্রকাশ করেছে।
এখনকার মুখরা বামরা গত দেড় দশক আওয়ামী সরকারের নৃশংস শাসন ও বিচারহীনতা ও বিচারের নামে প্রহসনের বিরুদ্ধে কথা বলা দূরে থাকুক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব কর্মকাণ্ডের অনুমোদন দিয়ে এসেছে। এখন আওয়ামী রেজিম পরিবর্তনের কালে তারা অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির লোকদের বিরুদ্ধে সেই পুরনো স্লোগান হাজির করে পানি ঘোলা করতে চাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের একটি প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুকে বিতর্কিত করতে চেষ্টার মধ্য দিয়ে তাদের পুরনো চরিত্র হাজির করতে চেয়েছে।
বামদের একজন বয়োবৃদ্ধ তাত্ত্বিক গুরু সম্প্রতি দেশের বাম নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘সামাজিক বিপ্লব’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সেই পুরনো কায়দায় ইসলামপন্থিদের ‘ধর্ম ব্যবসায়ী’ পরিচয়ে উল্লেখ করে বলেন, ‘একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা, টিএসসিতে আলবদর-রাজাকারদের ছবি টানানো হচ্ছে। এ চেষ্টা আরো শক্তিশালী হবে, যদি না বামপন্থিরা ঐক্যবদ্ধ থাকে। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে, তারাও বুর্জোয়া, ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাস করে। সেজন্য আমরা যারা সমাজ পরিবর্তন করতে চাই, তাদের একত্র হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘চব্বিশের এ অভ্যুত্থানকে বিপ্লব বলা হচ্ছে। তবে এটা শুধুই একটা সরকারের পতনমাত্র। আসল বিপ্লব হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব।’
সিপিবিসহ বামপন্থিদের আগে সক্রিয় দেখা যেত প্রকাশ্যে আওয়ামী প্রকল্প ও এজেন্ডাগুলোয়। এখন দেখা যায় আরেক বিকল্পে। তারা নির্বাচনের দাবিতে মাঠে থাকছে। কিন্তু জুলাইয়ের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে তারা পূর্বের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখে চলেছে। তারা এখনো তাদের পক্ষ থেকে জুলাই জাগরণে শেখ হাসিনার মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের দাবিতে কোনো সমাবেশ বা আন্দোলন করতে দেখা যায় না। মানে, ওদের রাজনীতি সবসময়ই যা থাকার, তাই থাকছে। গণবিরোধী, আর বৃহৎ ক্ষমতার দালালি। এতদিন ছিল আওয়ামী লীগের ছায়ায়, এখন বিকল্পের ছায়ায়।
এ বামরা বরাবর বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এসেছে। তারা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে প্রতিবেশী দেশের অনুকূলে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সোভিয়েতের পতনের পর দিশাহারা বামরা ভারতের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিবেদিত হয়েছে। তারা এখন বাহাত্তরের সংবিধান পুনর্বহালের দাবি পর্যন্ত করতে পারছে। এর মধ্যে দিয়ে আওয়ামী রেজিম ফিরিয়ে আনার মতো দাবি করতে সাহস করছে।